মিশরের স্বাধীন সংবাদমাধ্যম মাদা মাসরের প্রধান সম্পাদক লিনা আতাল্লাহ। ছবি : সংগৃহীতমিশরের স্বাধীন সংবাদমাধ্যম মাদা মাসরের প্রধান সম্পাদক লিনা আতাল্লাহকে লাইসেন্সবিহীন ওয়েবসাইট পরিচালনার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করেছেন দেশটির একটি আদালত। একই সঙ্গে সংবাদমাধ্যমটির ওয়েবসাইট বন্ধ এবং সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) কায়রোর আদালতে রায় ঘোষণার পর নিরাপত্তাকর্মীরা আতাল্লাহকে মাটি থেকে তুলে আদালতকক্ষের বাইরে নিয়ে যান।
মাদা মাসরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার বিকেলেও আদালত প্রাঙ্গণে আটক ছিলেন আতাল্লাহ। ছয় বছর ধরে সংবাদমাধ্যমটির বিরুদ্ধে চলা আইনি পদক্ষেপের মধ্যে এই রায়কে সবচেয়ে কঠোর পরিণতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির শাসনামলে মিসরে চালু থাকা অল্প কয়েকটি স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের একটি মাদা মাসর।
নিউ কায়রো মিসডিমিনার কোর্টের নবম সার্কিটের বিচারক মোহাম্মদ মোবারক সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে ৩০ লাখ মিসরীয় পাউন্ড জরিমানা করেন, যা প্রায় ৫৩ হাজার ৫০০ ডলারের সমান। পাশাপাশি ওয়েবসাইট বন্ধ ও সংবাদমাধ্যমটির সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দেন।
শুনানিতে উপস্থিত মানবাধিকার সংগঠন ইজিপশিয়ান ইনিশিয়েটিভ ফর পারসোনাল রাইটসের নির্বাহী পরিচালক হোসাম বাঘাত মাদা মাসরকে জানান, বিচারক আলোচনার পর আতাল্লাহ ও তার আইনজীবীদের ছাড়া আদালতকক্ষের সবাইকে বের করে দেন। পরে সাদাপোশাকের কর্মকর্তা ও নিরাপত্তাকর্মীরা কক্ষে প্রবেশ করেন। সেখানে জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার একজন কর্মকর্তাও উপস্থিত ছিলেন।
বাঘাতের ভাষ্য অনুযায়ী, বিচারক ও সুপ্রিম স্টেট সিকিউরিটি প্রসিকিউশনের একজন প্রতিনিধি আসামিপক্ষের সব প্রক্রিয়াগত আবেদন নাকচ করেন। এর মধ্যে নথি জমা দেওয়া ও সাক্ষীদের বক্তব্য শোনার আবেদনও ছিল। এসব আবেদনের জবাব না পাওয়ায় আসামিপক্ষের আইনজীবীরা আত্মপক্ষ সমর্থনে বক্তব্য দিতে অস্বীকৃতি জানান।
এরপর বিচারক আসামিপক্ষের অজানা একজন আইনজীবীকে আতাল্লাহর পক্ষে নিয়োগ দেন। আতাল্লাহর আট আইনজীবী এর প্রতিবাদ করেন। আতাল্লাহও আদালতকে জানান, তিনি ওই নিয়োগ মেনে নিচ্ছেন না। তবে বিচারক তার আপত্তি কার্যবিবরণীতে লিপিবদ্ধ করতে অস্বীকৃতি জানান।
বাঘাত আরও বলেন, এরপর বিচারক নিজেই আদালতনিযুক্ত আইনজীবীর নামে কিছু আবেদন লিখতে শুরু করেন, যদিও ওই আইনজীবী কোনো কথা বলেননি। পরে আসামিপক্ষের আইনজীবীদের চিৎকারের মধ্যেই রায় পড়ে শোনানো হয়।
সাংবাদিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) আতাল্লাহর আটকাদেশের নিন্দা জানিয়েছে। সংস্থাটির আঞ্চলিক পরিচালক সারা কুদাহ বলেন, আতাল্লাহকে দোষী সাব্যস্ত করা এবং মাদা মাসর বন্ধের নির্দেশ মিশরে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর বড় আঘাত। স্বাধীন গণমাধ্যম ভেঙে দেওয়ার লক্ষ্যেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
কুদাহ বলেন, জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট এমন অনেক বিষয়ে আতাল্লাহ ও মাদা মাসর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যেগুলো অন্যথায় সামনে আসত না। তার মতে, দেশের অন্যতম সম্মানিত একজন সম্পাদককে আটক করা এবং তার সংবাদকক্ষ বন্ধ করে দেওয়া হলে কোনো স্বাধীন সাংবাদিকই নিরাপদ থাকবেন না। তিনি আতাল্লাহকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়া এবং মাদা মাসরকে আবারও প্রতিবেদন প্রকাশের সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান।
গত ২২ অক্টোবর ছয় ঘণ্টার বেশি সময় জিজ্ঞাসাবাদের এক দিন পর মামলা নম্বর ৯০৭২/২০২৬-এ আতাল্লাহর বিচার শুরু করার নির্দেশ দেওয়া হয়। এর আগে প্রসিকিউটররা তার বিরুদ্ধে মিথ্যা সংবাদ প্রকাশের অভিযোগেও জিজ্ঞাসাবাদ করেন। দেশজুড়ে কারাগারগুলোতে বিক্ষোভ নিয়ে মাদা মাসরের একটি প্রতিবেদন ঘিরে প্রশ্ন করা হলেও শেষ পর্যন্ত অভিযোগপত্র থেকে বিষয়টি বাদ দেওয়া হয়। ১ লাখ মিসরীয় পাউন্ড জামিনে মুক্তি পেয়েছিলেন তিনি।
আতাল্লাহর প্রতিষ্ঠিত মাদা মাসর ২০১৩ সালে যাত্রা শুরু করে। ২০১৭ সালের মে মাস থেকে মিসরের ভেতরে সংবাদমাধ্যমটির ওয়েবসাইট বন্ধ করে রাখা হয়েছে। ২০১৮ সালে নতুন গণমাধ্যম আইন পাস হওয়ার পর থেকে প্রতিষ্ঠানটি একাধিকবার লাইসেন্সের আবেদন করে। তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে, এ তথ্য তারা জানতে পারে ২০২২ সালে। অন্য একটি মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের সময় আতাল্লাহকে ওই সিদ্ধান্ত দেখানো হয়েছিল।
সাংবাদিক ইউনিয়নের প্রধান খালেদ আল-বালশি বলেছেন, এ ধরনের বিরোধের সঠিক আইনি পথ হলো প্রশাসনিক আদালতে আবেদন করা, ফৌজদারি মামলা নয়।
গত ছয় বছরে মাদা মাসর, এর সাংবাদিক ও সম্পাদকদের বিরুদ্ধে এটি ষষ্ঠ মামলা। ২০২৫ সালের আগস্টে বেদর-৩ কারাগারে নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর ‘মিথ্যা সংবাদ’ প্রচার ও লাইসেন্স ছাড়া কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগে আতাল্লাহকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। ২০২২ সালে সরকারপন্থী আইনপ্রণেতাদের ‘অপমান’ করার অভিযোগে আতাল্লাহ ও মাদা মাসরের আরও তিন সাংবাদিকের বিচার হয়। এর আগে ২০১৯ সালের নভেম্বরে কায়রোয় সংবাদমাধ্যমটির কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে আতাল্লাহ ও কয়েকজন সহকর্মীকে সাময়িকভাবে আটক করেছিল নিরাপত্তা বাহিনী।
মাদা মাসরের বিরুদ্ধে রায় এমন এক সময়ে এলো, যখন এর এক মাসেরও কম আগে ২৮ ও ২৯ সেপ্টেম্বর অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার প্ল্যাটফর্ম মাতসাদাশের ছয় সাংবাদিককে গ্রেফতার করে নিরাপত্তা বাহিনী। ওই গ্রেফতারের পর সৃষ্ট শূন্যতা পূরণে মাদা মাসরসহ আটটি আরব সংবাদমাধ্যম যৌথ সংবাদকক্ষ চালুর ঘোষণা দেওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরই আতাল্লাহকে তলব করা হয়েছিল।
রায় ঘোষণার আগে ১১৯টি মানবাধিকার সংগঠন ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান মিসরে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর ‘নজিরবিহীন হামলার’ নিন্দা জানায়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, লাইসেন্সসংক্রান্ত বিধিনিষেধ স্বাধীন গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারসের ২০২৬ সালের সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে মিসরের অবস্থান ১৬৯তম। সংস্থাটির মূল্যায়ন অনুযায়ী, লেখক আলা আবদেল ফাত্তাহর মতো কয়েকজন পরিচিত ব্যক্তিকে মুক্তি দেওয়া হলেও সাংবাদিকদের কারাগারে রাখার ক্ষেত্রে মিসর এখনো বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দেশ।
সময়ের আলো/জেডি