ছবি : সংগৃহীতযুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে সামরিক সংঘাতের আশঙ্কার মধ্যেও নিজেদের অবস্থানে অনড় রয়েছে ইরান। দেশটির লক্ষ্য শুধু যুদ্ধবিরতি নয়, বরং যুদ্ধের স্থায়ী অবসান এবং ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা ঠেকাতে কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলা। এদিকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর নিয়ন্ত্রণকে কাজে লাগিয়ে ওয়াশিংটনের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে তেহরান।
সংঘাতের বিস্তার ঠেকাতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো যখন কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াচ্ছে, তখন ইরানের অবস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) চীন জানিয়েছে, উত্তেজনা প্রশমনে সহায়তার জন্য তারা শিগগিরই ওই অঞ্চলের সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে একজন বিশেষ দূত পাঠাবে।
সোমবার ইরান, সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা তেহরানে বৈঠক করেন। আগস্টে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করা সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের প্রতিনিধিরা ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করেন। বৈঠক শেষে চার দেশ সংলাপ অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দেয়।
তবে ইরান নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, উপসাগরীয় অঞ্চলে দেশটির বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের অবসান এবং ভবিষ্যতে নতুন করে হামলা না চালানোর নিশ্চয়তা দাবি করছে। বিনিময়ে হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল পুনরায় চালুর বিষয়ে সহযোগিতার কথা বলছে তেহরান। অন্যদিকে চূড়ান্ত শান্তিচুক্তির আগে ইরানের কাছ থেকে আরও ছাড় চায় যুক্তরাষ্ট্র, বিশেষ করে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে।
ইরান পডকাস্টের সম্পাদক ও উপস্থাপক নেগার মোর্তাজাভি আল জাজিরাকে বলেন, ইরানের অগ্রাধিকার শুধু আরেকটি যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করা নয়। দেশটি যুদ্ধের স্থায়ী অবসান এবং এমন প্রতিরোধব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চায়, যাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলার চক্র বারবার ফিরে না আসে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থা নেই তেহরানের
ইরানের বর্তমান অবস্থানের পেছনে অন্যতম কারণ ওয়াশিংটনের প্রতি গভীর অবিশ্বাস। গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালায়। এরপরও আলোচনার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র গত জুন ২০২৫ থেকে তিন দফায় ইরানে হামলা চালিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
চলতি বছরের জুনে পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু, ইরানি বন্দরে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ প্রত্যাহার এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা শুরুর শর্ত নির্ধারণে একটি সমঝোতা স্মারক হয়েছিল। কিন্তু দ্রুতই সেই সমঝোতা ভেঙে পড়ে। জুলাইয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর ইরানও উপসাগরীয় দেশগুলো ও জর্ডানে মার্কিন সামরিক স্থাপনা এবং জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালায়।
সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির জ্যেষ্ঠ অনাবাসিক ফেলো সিনা তুসি বলেন, আগের আলোচনা ও যুদ্ধবিরতির ব্যবস্থাগুলো ইরানকে নতুন করে সামরিক হামলা থেকে রক্ষা করতে পারেনি বলে তেহরানের অবস্থান আরও কঠোর হয়েছে। এখন দেশটি আরও কার্যকর ও দীর্ঘস্থায়ী নিশ্চয়তা চাইছে।
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজায়ি গত সপ্তাহে বলেন, নতুন কোনো হামলা হলে তার জবাব দিতে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী প্রস্তুত। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে ব্যবহৃত ঘাঁটিগুলোতে হামলা এবং প্রতিবেশী দেশগুলোতে সামরিক অভিযান চালানোর কথাও বলেন তিনি।
রেজায়ির ভাষ্য অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞা স্থগিত, ইরানের জব্দ সম্পদ মুক্ত, বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার এবং ভবিষ্যতে হামলা না চালানোর সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা না পাওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া বা শান্তি আলোচনা শুরু করার বিষয়ে তেহরান এগোবে না।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ নিয়ে স্পষ্ট অবস্থান জানাননি। রোববার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমার প্রশ্ন হলো, আমি কি তাদের সঙ্গে চুক্তি করব, নাকি তাদের পুরোপুরি শেষ করে দেব?’ এর আগে তিনি বলেছিলেন, ৩ নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে হামলা চালানো হবে না।
মার্কিন নির্বাচনেও প্রভাব ফেলতে পারে যুদ্ধ
আগামী সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন। এতে প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসন এবং সিনেটের ১০০টির মধ্যে ৩৫টি আসনের জন্য ভোট হবে। নির্বাচনের ফল ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির শেষ দুই বছরে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কোন দলের হাতে থাকবে, তা নির্ধারণ করবে।
যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধটি ক্রমেই অজনপ্রিয় হয়ে উঠছে। চলতি মাসের শুরুতে রয়টার্স ও ইপসোসের এক জরিপে দেখা গেছে, ইরান যুদ্ধ পরিচালনায় ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন মাত্র ৩৪ শতাংশ মার্কিন নাগরিক। তার দুই মেয়াদেই এ বিষয়ে এটিই সর্বনিম্ন সমর্থন।
কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা খুব সামান্য। সিনেটে তাদের অবস্থান ৫৩-৪৭ এবং প্রতিনিধি পরিষদে ২১৮-২১৪। যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দামও বেড়েছে। বিশেষ করে ডিজেলের দাম প্রায় দ্বিগুণ হওয়ায় কৃষক ও ছোট ব্যবসায়ীরা চাপে পড়েছেন। মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় তাই নির্বাচনি প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।
কিছু প্রতিবেদনে ইরানি কর্মকর্তাদের বরাতে বলা হয়েছে, মার্কিন নির্বাচনের আগে ট্রাম্পকে রাজনৈতিক সাফল্য থেকে বঞ্চিত করতে তেহরান ইচ্ছাকৃতভাবে আলোচনা দীর্ঘায়িত করতে পারে। কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটরা নিয়ন্ত্রণ পেলে যুদ্ধ পরিচালনা নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর নজরদারি বাড়তে পারে, যা তার পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ আরও সীমিত করবে।
মোর্তাজাভির ভাষায়, ইরান ওয়াশিংটনকে, এমনকি ভবিষ্যৎ মার্কিন প্রেসিডেন্টদেরও, এই শিক্ষা দিতে চায় যে ইরানে হামলার মূল্য দিতে হবে। তার মতে, ইরানের প্রতিরোধকৌশল শুধু সামরিক নয়, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মূল্যও চাপিয়ে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে তৈরি।
এর আগে মঙ্গলবার ইসরায়েলেও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু পরাজিত হলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথভাবে ইরানে নতুন হামলা চালানোর উদ্যোগ জটিল হয়ে উঠতে পারে। বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করেন, ট্রাম্পকে যুদ্ধের অনুমোদন দিতে রাজি করানোর ক্ষেত্রে নেতানিয়াহুর ভূমিকা ছিল প্রধান।
তবে গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বে বিরোধী জোট জয়ী হলেও ইরানের বিষয়ে ইসরায়েলের অবস্থান নরম হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। সাবেক সামরিক প্রধান আইজেনকটও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন।
হরমুজ প্রণালি ইরানের বড় দর-কষাকষির হাতিয়ার
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ দেশটির অন্যতম শক্তিশালী কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক হাতিয়ার। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হতো।
ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নেয়ার ইস্ট পলিসির তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালির আশপাশে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার সংখ্যা অক্টোবরে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ইরানের ট্যাংকারে হামলার পর গত সপ্তাহে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৭ ডলার ছাড়িয়ে যায়। যুদ্ধের আগে দাম ছিল প্রায় ৭২ ডলার। তবে প্রণালিতে জাহাজ চলাচল এখনো যুদ্ধ-পূর্ব পর্যায়ে ফেরেনি।
আইজি গ্রুপের প্রধান বাজার বিশ্লেষক ক্রিস বিউচ্যাম্প মনে করেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী চাপের লড়াইয়ে ইরান ইচ্ছাকৃতভাবে এই অর্থনৈতিক চাপকে কাজে লাগাচ্ছে। তার ভাষায়, দুই পক্ষই দেখছে কে আগে ভেঙে পড়ে। আপাতত দাম বাড়াতে ইরান জাহাজে হামলা চালিয়ে যেতে প্রস্তুত।
আঞ্চলিক কূটনীতিতে নতুন উদ্যোগ
তেহরানে চার দেশের বৈঠক এমন সময়ে হয়েছে, যখন ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের সৌদি আরবে কয়েক সপ্তাহের হামলার পর আঞ্চলিক উত্তেজনা বেড়েছে। সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক নতুন মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় রিয়াদকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
ওয়াশিংটনের আরব সেন্টারের অনাবাসিক ফেলো ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক রামি খুরি বলেন, বৈঠকের তাৎক্ষণিক লক্ষ্য উত্তেজনা কমানো, কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় ফেরা এবং স্থায়ী যুদ্ধবিরতির পথ তৈরি করা। এরপর সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে আরও শক্তিশালী মধ্যস্থতার মাধ্যমে আলোচনা হতে পারে।
তার মতে, এ উদ্যোগ মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তাব্যবস্থায় পরিবর্তনের সূচনাও হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবনির্ভর ব্যবস্থার বদলে আঞ্চলিক দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তা নির্ধারণে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
সিনা তুসির মতে, মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও আঞ্চলিক দেশগুলো ক্রমেই বুঝতে পারছে, ইরানের নিরাপত্তা থেকে তাদের নিজেদের নিরাপত্তাকে আলাদা করে দেখা সম্ভব নয়। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত চলতে থাকলে ইয়েমেনের পরিস্থিতি স্থিতিশীল করা যেমন কঠিন, তেমনি আঞ্চলিক সামরিক উত্তেজনার মধ্যে ইরানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সমঝোতাও কঠিন হবে।
তবে আলোচনার সবচেয়ে বড় বাধা এখনো যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইরানের অনাস্থা। মোর্তাজাভি বলেন, দুটি যুদ্ধের অভিজ্ঞতার পর তেহরান মার্কিন প্রতিশ্রুতি নিয়ে গভীরভাবে সন্দিহান। নতুন কোনো চুক্তি যেন পরবর্তী হামলার আগের সাময়িক বিরতি হয়ে না থাকে, সে জন্য ইরান সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা চায়।
তার মতে, ইরান আলোচনায় প্রস্তুত এবং যুদ্ধের অবসানে প্রস্তাবও দিয়েছে। কিন্তু হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে নিজেদের প্রভাব ও দর-কষাকষির ক্ষমতা সামরিক বা অর্থনৈতিক চাপের মুখে ছেড়ে দিতে রাজি নয় তেহরান। দেশটির লক্ষ্য আরেকটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি নয়, বরং যুদ্ধের স্থায়ী অবসান।
সূত্র : আল জাজিরা
সময়ের আলো/জেডি