সংগৃহীত ছবিহরমুজ প্রণালির পশ্চিমাঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের একটি স্পাই ড্রোন অক্ষত অবস্থায় নামিয়ে আনার দাবি করেছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি)। একই সময়ে হরমুজ প্রণালিতে তিনটি ট্যাঙ্কার মাইন বিস্ফোরণের কবলে পড়ে আগুন ধরে যাওয়ার খবর জানিয়েছে ইরান। এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানের বিরুদ্ধে স্বল্পমেয়াদি ও তীব্র সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিতে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোকে বলেছে ওয়াশিংটন। খবর ইরনা, আইএসএনএ, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ও এএফপির।
ইরানি বার্তা সংস্থা ইরনা বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির পশ্চিমাঞ্চলে ড্রোনটি আটক করা হয়। আইআরজিসির ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার ইউনিটের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তাদের যোদ্ধারা হরমুজের পশ্চিমাঞ্চলে মার্কিন সামরিক বাহিনীর একটি এমকিউএম-১৭০ স্পাই ড্রোন অক্ষত অবস্থায় মাটিতে নামিয়ে এনেছেন। ড্রোনটির উদ্দেশ্য ছিল পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে থাকা ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা শনাক্ত করা।
আইআরজিসি জানায়, ড্রোন থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে তাদের নৌ বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত হয়েছেন, এটি পারস্য উপসাগরের কোনো একটি দেশের উপকূল থেকে ওড়ানো হয়েছিল। এর আগে ইরানের বিপ্লবী গার্ড একটি এমকিউ-১ ড্রোন ভূপাতিত করার তথ্য দিয়েছিল।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালানোর পর হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয় আইআরজিসি। এরপর থেকে জলপথটি দিয়ে জ্বালানিবাহী জাহাজের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। বৃহস্পতিবারও ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের দেওয়া শর্ত না মানা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে না।
হরমুজ প্রণালির পূর্ব আকাশে একটি এমকিউ-১ ড্রোন প্রতিহত করে ধ্বংস করার দাবিও করেছে আইআরজিসি। বৃহস্পতিবার আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা আইএসএনএ বাহিনীটির বরাতে এ খবর জানায়। আইআরজিসির দাবি, এ নিয়ে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ১৪টি এমকিউ-১ ড্রোন প্রতিহত করে ধ্বংস করেছে। আইএসএনএর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঘটনাটি ঘটেছে হরমুজ প্রণালির পূর্ব আকাশে, সিরিক উপকূলীয় এলাকার বিপরীতে। এমকিউ-১ যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি একটি মনুষ্যবিহীন আকাশযান। তবে ড্রোনটির পরিচালনাকারী কে ছিল, তা আইআরজিসি নির্দিষ্ট করে জানায়নি।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের নতুন করে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলার মধ্যে এসব ঘটনা ঘটল।
নির্বাচনের পর ইরানে হামলার প্রস্তুতি নিতে বলেছে যুক্তরাষ্ট্র
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানের বিরুদ্ধে সংক্ষিপ্ত ও তীব্র সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিতে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোকে বলেছে ওয়াশিংটন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি। তবে নির্বাচনের পর বড় ধরনের হামলার দিকেই তাঁর ঝোঁক রয়েছে। চূড়ান্ত শান্তিচুক্তির পথ তৈরি করতে গত জুনে স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারক পরে ভেস্তে যায়। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলসহ বিভিন্ন বিষয়ে মতবিরোধ এর অন্যতম কারণ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
হরমুজ প্রণালিতে ট্যাঙ্কারে আগুন
আইআরজিসির দাবি, তিনটি ট্যাঙ্কার তাদের রাডার ও নেভিগেশন ব্যবস্থা বন্ধ করে হরমুজ প্রণালির অননুমোদিত দক্ষিণ পথ দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। এ সময় সেগুলো মাইন বিস্ফোরণের কবলে পড়ে এবং আগুন ধরে যায়।
হরমুজ প্রণালিতে একটি জাহাজে আগুন লাগার খবর নিশ্চিত করেছে ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও। তবে আগুন লাগার কারণ কিংবা হতাহতের বিষয়ে বিস্তারিত জানায়নি সংস্থাটি। এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্য একটি জাহাজের ক্যাপ্টেনের কাছ থেকে এ-সংক্রান্ত তথ্য পেয়েছে ইউকেএমটিও। প্রণালির ঠিক বাইরে ওমানের খাসাব থেকে প্রায় ৯ নটিক্যাল মাইল বা ১৭ কিলোমিটার উত্তরে জাহাজটিকে দেখা গেছে।
বিশ্বের তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি। ফেব্রুয়ারিতে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান জলপথটির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। অনুমতি ছাড়া প্রণালি দিয়ে চলাচলের অভিযোগে জাহাজে হামলার ঘটনাও ঘটেছে।
ইরানের নিরাপত্তা প্রধানকে ভ্যান্সের চিঠি
ইরানের ওপর নতুন করে হামলা ঠেকানো এবং শান্তি আলোচনা পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে দেশটির নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহসেন রেজাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। সূত্রের বরাতে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এ তথ্য জানিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ইরানের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা পর্ষদের প্রধান রেজাইয়ের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন ভ্যান্স। সম্ভাব্য আলোচনার কাঠামো নিয়ে চিঠিতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের বিষয়ে উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি আরব দেশকে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে বলে জানিয়েছে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল। তবে ট্রাম্প এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি।
এর জবাবে ইরানের সামরিক বাহিনী সতর্ক করে বলেছে, নতুন করে হামলা চালানো হলে তারাও ব্যাপক পরিসরে পাল্টা আঘাত হানবে। মোহসেন রেজাই বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো, বিশেষ করে ডেটা সেন্টার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলো সম্ভাব্য পাল্টা হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ