ময়মনসিংহ নগরীতে মশার উপদ্রবে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন বাসিন্দারা। এর মধ্যে বাড়ছে ডেঙ্গুর সংক্রমণও। নগরীর খাল ও ড্রেনগুলো মশার প্রজননকেন্দ্রে পরিণত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে মশক নিধনে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও কমছে না ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। বিশেষ করে মহানগরীর ছয়টি ওয়ার্ডে ডেঙ্গুর প্রকোপ ব্যাপকভাবে বেড়েছে। আশেপাশের আরও ছয়টি ওয়ার্ডেও বাড়ছে সংক্রমণ। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন চিকিৎসকেরা।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রতিদিনই বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর চাপ। হাসপাতালের তৃতীয় তলায় ডেঙ্গু আইসোলেশন ওয়ার্ডে শয্যা সংকট দেখা দেওয়ায় মেঝে ও বারান্দায় রেখেও রোগীদের চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৫৯ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ১৩০ জন। তাদের মধ্যে ৯৪ জন পুরুষ, ২০ জন নারী ও ১৬ জন শিশু। একই সময়ে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ৬২ জন।
হাসপাতালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে ডেঙ্গুতে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছিল। অথচ গত দুই মাসেই মারা গেছেন ২৪ জন। এর মধ্যে সেপ্টেম্বরে ১৩ জন এবং চলতি অক্টোবরে ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ভর্তির সংখ্যাও বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে।
বছরের প্রথম ছয় মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত ১২৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হন। পরবর্তী চার মাসে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ৪১০ জনে। মাসভিত্তিক হিসাবে জুলাইয়ে ৩৬০ জন, আগস্টে ৯৬৯ জন, সেপ্টেম্বরে ১ হাজার ৫৭৯ জন এবং চলতি অক্টোবরে ১ হাজার ৫০২ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চলতি মৌসুমে এ পর্যন্ত ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত ৪ হাজার ৫৯৫ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৪ হাজার ৪৩০ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। এ পর্যন্ত মারা গেছেন ৩৪ জন। রোগীর চাপ সামাল দিতে প্রশাসনিক ভবনের তৃতীয় তলায় পৃথক ডেঙ্গু ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে।
এদিকে নগরীর বিভিন্ন এলাকার ড্রেন ও খাল ময়লা-আবর্জনায় ভরে থাকায় মশার লার্ভা জন্মানোর উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়েছে। অপরিচ্ছন্ন বাড়ির আঙিনা, নির্মাণাধীন ভবন এবং পুরোনো টায়ারে জমে থাকা পানিতেও বাড়ছে মশার বিস্তার। মাঝেমধ্যে ওষুধ ছিটানো হলেও তাতে কার্যকর ফল পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ নগরবাসীর। মশার উপদ্রবের সঙ্গে ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়তে থাকায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন তারা।
নগর ভবন সূত্রে জানা গেছে, জনবল সংকটের কারণে আগে একসঙ্গে সব ওয়ার্ডে মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছিল না। মহানগরীর ৩৩টি ওয়ার্ডে মাত্র ২০ জন কর্মী দিয়ে এ কার্যক্রম চালানো হতো। পরে আরও ৩০ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী যুক্ত করা হয়েছে। বর্তমানে ২৫টি ফগার মেশিনের মাধ্যমে ৩৩টি ওয়ার্ডে নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম চলছে।
তবে ৬, ১০, ১১, ১২, ১৩ ও ১৪ নম্বর ওয়ার্ডে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি হওয়ায় এসব এলাকায় সকাল ও বিকেলে দুই বেলা ওষুধ ছিটানো হচ্ছে।
সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. এইচ কে দেবনাথ জানান, চলতি মৌসুমে প্রায় এক হাজার লিটারের বেশি অ্যাডাল্টিসাইড ও লার্ভিসাইড প্রয়োগ করা হয়েছে। মশা নিয়ন্ত্রণে ক্র্যাশ প্রোগ্রামও পরিচালনা করা হয়েছে। ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও জনসচেতনতা বাড়াতে মাইকিং এবং লিফলেট বিতরণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি ড্রেন ও খাল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। ডেঙ্গুর প্রজননস্থল ধ্বংসে বিভিন্ন ভবন ও স্থাপনায় নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে।
ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক রুকুনোজ্জামান রোকন নগরবাসীকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতার কোনো বিকল্প নেই।’
তিনি জানান, প্রতিটি ওয়ার্ডে প্রতিদিন পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম তদারকি করছেন তিনি। মশক নিধনে বরাদ্দ অপ্রতুল হলেও অন্যান্য খাতের ব্যয় কমিয়ে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হচ্ছে।