আক্রমণ তৈরি হয়, সুযোগও আসে; তবু গোলের সামনে গিয়ে বারবার থমকে যায় লাল-সবুজের স্বপ্ন। ছবি : সংগৃহীতফুটবলে গোলের গল্প লেখা হয় স্ট্রাইকারের পায়ে। মাঝমাঠ থেকে নিখুঁত পাস, দুই প্রান্ত দিয়ে আক্রমণের ঝড় কিংবা রক্ষণ ভেঙে এগিয়ে যাওয়া— সবকিছুর শেষ ঠিকানা প্রতিপক্ষের জাল। কিন্তু বাংলাদেশের ফুটবলে সেই শেষ কাজটিই যেন সবচেয়ে কঠিন। আক্রমণ তৈরি হয়, সুযোগও আসে; তবু গোলের সামনে গিয়ে বারবার থমকে যায় লাল-সবুজের স্বপ্ন।
দীর্ঘদিনের এই গোল-সংকট কাটাতে এবার তরুণদের দিকে তাকিয়ে জাতীয় দলের কোচ টমাস ডুলি। তার পরিকল্পনায় নতুন আশার নাম মাহি খান, ফারহান আলী ওয়াহিদ, শুকি ইতোফুসা ও রোনান সুলিভান। প্রশ্ন একটাই, এদের মধ্যে কে হয়ে উঠবেন বাংলাদেশের নির্ভরযোগ্য গোল স্কোরার?
সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক ফুটবলে বাংলাদেশের গোল করার দুর্বলতা আরও স্পষ্ট হয়েছে। ফিফা আসিয়ান কাপের অভিযানে প্রতিপক্ষের জালে মাত্র দুবার বল পাঠাতে পেরেছে দল, বিপরীতে হজম করেছে ১৩ গোল। আক্রমণে গতি ছিল, সুযোগ তৈরির চেষ্টাও কম হয়নি। কিন্তু বক্সের ভেতরে সঠিক সময়ে অবস্থান নেওয়া, অল্প সুযোগ কাজে লাগানো কিংবা প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভেঙে গোল বের করে আনার জায়গায় ঘাটতি ছিল প্রকট। তাই একজন কার্যকর ফিনিশারের প্রয়োজনীয়তা নতুন করে সামনে এসেছে।
এ বাস্তবতায় তরুণদের নিয়ে আক্রমণভাগের বিকল্প বাড়াতে চাইছেন ডুলি। চারজনের পথচলা আলাদা, খেলার ধরনও ভিন্ন। কারও শক্তি শারীরিক গঠন, কারও গতি ও দক্ষতা আবার কারও বয়সভিত্তিক ফুটবলে গোল করার অভিজ্ঞতা। তবে জাতীয় দলের জার্সিতে নিজেদের প্রমাণ করাই হবে তাদের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
বক্সে ভরসা মাহি
প্রথমবারের মতো জাতীয় সিনিয়র দলে ডাক পেয়েছেন মাহি খান। ছয় ফুট উচ্চতার এই ফরোয়ার্ডের সবচেয়ে বড় শক্তি তার শারীরিক সক্ষমতা ও বক্সের ভেতরে উপস্থিতি। ইংল্যান্ডের নবম স্তরের লিগে মাল্টন এফসির হয়ে সাত ম্যাচে করেছেন নয় গোল। বল নিয়ন্ত্রণ, হেড এবং গোলের সুযোগ কাজে লাগানোর দক্ষতায় নজর কেড়েছেন তিনি।
প্রতিপক্ষের সেন্টারব্যাকদের সঙ্গে শারীরিক লড়াই কিংবা দুই প্রান্ত থেকে আসা উঁচু ক্রসকে গোলে রূপ দেওয়া, দুই ক্ষেত্রেই কার্যকর হতে পারেন মাহি। বাংলাদেশের আক্রমণে এমন একজন ফরোয়ার্ডের অভাব দীর্ঘদিনের, যিনি শুধু পায়ে বল পেলে নয়, সতীর্থদের ক্রস থেকেও গোলের সুযোগ তৈরি করতে পারবেন।
তবে ইংল্যান্ডের নিম্নস্তরের লিগে তার গোল করার সামর্থ্য জাতীয় দলের আন্তর্জাতিক ফুটবলে কতটা কার্যকর হবে, সেটি এখনও দেখার বিষয়। আন্তর্জাতিক মানের রক্ষণ সামলে নিজেকে প্রমাণ করাই হবে মাহির প্রথম পরীক্ষা।
ফুলহামের একাডেমি থেকে জাতীয় দলে ফারহান
ফারহান আলী ওয়াহিদের গল্পটা একটু আলাদা। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব ফুলহামের একাডেমিতে বেড়ে ওঠা এই ফরোয়ার্ড ইতিমধ্যে বাংলাদেশের জাতীয় দলের হয়ে অভিষেক করেছেন। ফিফা আসিয়ান কাপে বাংলাদেশের করা দুটি গোলের একটি এসেছিল তার পা থেকেই।
ফুলহাম অনূর্ধŸ-২১ দলের হয়ে দারুণ একটি মৌসুম কাটিয়েছেন ফারহান। সতীর্থ ও কোচদের ভোটে জিতেছেন একাডেমির বর্ষসেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার ‘জনি হেইনস ট্রফি ২০২৬’। গত মৌসুমে ২১ ম্যাচে গোল ও অ্যাসিস্ট মিলিয়ে ১৭ গোলে অবদান রেখেছেন ১৯ বছর বয়সি এই ফুটবলার।
ফুলহাম থেকে ধারে ইংল্যান্ডের পঞ্চম স্তরের দল বোরহাম উডে যোগ দেওয়ার পর সেখানেও গোলের দেখা পেয়েছেন। নতুন ক্লাবের হয়ে অভিষেক ম্যাচেই করেছেন এক গোল, সঙ্গে রয়েছে একটি অ্যাসিস্ট। উইংয়ে খেলার পাশাপাশি আক্রমণের বিভিন্ন জায়গায় বিচরণ করার সামর্থ্য তাকে বাড়তি গুরুত্ব দিচ্ছে। বাংলাদেশের আক্রমণে গতি, ড্রিবলিং ও গোলের সুযোগ তৈরিতে কার্যকর হতে পারেন ফারহান।
সাদা চুলের জাপানি বংশোদ্ভূত শুকি
বাংলা কিংবা ইংরেজি, কোনো ভাষাতেই খুব একটা স্বাচ্ছন্দ নন সাদা চুলের শুকি ইতোফুসা। তবে ফুটবল দিয়ে নিজের পরিচয় তৈরি করতে চান এই জাপানি বংশোদ্ভূত ফরোয়ার্ড। প্রায় ছয় ফুট উচ্চতার শুকির গায়ে ফিফা আসিয়ান কাপেই বাংলাদেশের ‘নাম্বার নাইন’ জার্সি তুলে দিয়েছিলেন কোচ ডুলি।
জাপানের বিভিন্ন বয়সভিত্তিক দলে খেলার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। খেলেছেন কাশিওয়া রেইসল নাগারেয়ামার মতো যুব দলে। পরে জাপানের আঞ্চলিক লিগের ক্লাব টোকিও ২৩ ও ব্রিউ সাগায় খেলেছেন। এরপর পাড়ি জমান লাওসের ফুটবলে। সেখানে শীর্ষ পর্যায়ের ক্লাব সাভানাখেত জেলোসের হয়ে খেলেছেন তিনি।
বাংলাদেশের হয়ে খেলার স্বপ্ন পূরণে ২০২৬ সালের আগস্টে লাওস ছেড়ে যোগ দেন ফর্টিস এফসিতে। নতুন ক্লাবের হয়ে এএফসি চ্যালেঞ্জ লিগে রেগারের বিপক্ষে করেছেন নিজের প্রথম গোল। শারীরিক গঠন ও বক্সে অবস্থান নেওয়ার দক্ষতার কারণে তাকে নিয়ে আশাবাদী হওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে জাতীয় দলের আক্রমণে নিজের জায়গা পাকা করতে হলে গোলের পাশাপাশি সতীর্থদের সঙ্গে বোঝাপড়াও বাড়াতে হবে।
রোনানের গল্পে আপাতত বিরতি
তরুণদের মধ্যে রোনান সুলিভানকেও ঘিরে ছিল বাড়তি প্রত্যাশা। তবে চোটের কারণে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ থেকে ছিটকে গেছেন তিনি। গত এপ্রিলে সাফ অনূর্ধŸ-২০ চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশের শিরোপাজয়ী দলের সদস্য ছিলেন এই ফরোয়ার্ড। পাকিস্তানের বিপক্ষে জোড়া গোল করে নিজের সামর্থ্যরে প্রমাণ দিয়েছিলেন। ফাইনালে পেনাল্টি শুটআউটে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে পানেনকা শট নেওয়ার সাহসও তার আত্মবিশ্বাসের পরিচয় দিয়েছিল।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট জোসেফস হকসের হয়ে কলেজ ফুটবলে খেলছেন রোনান। বয়সভিত্তিক পর্যায়ে নিজের সামর্থ্য দেখালেও সিনিয়র জাতীয় দলের ফুটবলে তাকে আরও সময় দিতে হবে। চোট কাটিয়ে ফিরে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কতটা ধারাবাহিক হতে পারেন, সেটিই এখন দেখার অপেক্ষা।
গোলের অপেক্ষা কি ফুরাবে?
তরুণদের ঘিরে আশার আলো থাকলেও বাংলাদেশের নাম্বার নাইন-সংকট যে রাতারাতি কেটে গেছে, তা বলার সুযোগ নেই। নতুনদের সামর্থ্য যাচাই, জাতীয় দলের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া এবং আন্তর্জাতিক ফুটবলের চাপ সামলানোর বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ। ২৫ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া আবাসিক ক্যাম্পে অনুশীলন ও প্রস্তুতি ম্যাচের পারফরম্যান্সও কোচের সিদ্ধান্তে ভূমিকা রাখবে।
ঘরের মাঠে আগামী ৫ নভেম্বর ভুটানের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ অভিযান শুরু করবে বাংলাদেশ। ১১ নভেম্বর একই প্রতিযোগিতার গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে প্রতিপক্ষ শ্রীলঙ্কা। নিজেদের মাঠে সমর্থকদের প্রত্যাশা পূরণ করতে হলে শুধু আক্রমণ সাজালেই চলবে না, গোলের সুযোগগুলোও কাজে লাগাতে হবে।
মাহির শারীরিক সক্ষমতা, ফারহানের গতি ও কারিগরি দক্ষতা, শুকির বক্সে উপস্থিতি কিংবা রোনানের গোল করার আত্মবিশ্বাস— প্রত্যেকের মধ্যেই রয়েছে আলাদা সম্ভাবনা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জাতীয় দলের জার্সিতে কে নিয়মিত গোলের দেখা পাবেন, সেটিই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। বাংলাদেশের ফুটবল দীর্ঘদিন ধরে একজন নির্ভরযোগ্য ফিনিশারের অপেক্ষায়। তরুণদের কেউ সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে পারবেন কি না, তার উত্তর দেবে মাঠের পারফরম্যান্স।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে