এশিয়া মহাদেশের বিস্ময় : জাবির নতুন গ্রন্থাগারে কলোসিয়ামের ছায়ায়

হাবিবুর রহমান সাগর, জাবি প্রতিনিধি

শিক্ষা

পরীক্ষার আগের রাত। ঘড়িতে তখন সাড়ে ৭টা। হলের রিডিং রুমে তিল ধারণের জায়গা নেই। ফ্যানের নিচের চেয়ারটিও আগেভাগে দখল হয়ে

2026-11-04T22:04:59+00:00
2026-11-04T22:04:59+00:00
 
  বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬,
২০ কার্তিক ১৪৩৩
বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬
শিক্ষা
এশিয়া মহাদেশের বিস্ময় : জাবির নতুন গ্রন্থাগারে কলোসিয়ামের ছায়ায়
হাবিবুর রহমান সাগর, জাবি প্রতিনিধি
প্রকাশ: বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৬, ১০:০৪ পিএম 
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। ছবি : সময়ের আলো
পরীক্ষার আগের রাত। ঘড়িতে তখন সাড়ে ৭টা। হলের রিডিং রুমে তিল ধারণের জায়গা নেই। ফ্যানের নিচের চেয়ারটিও আগেভাগে দখল হয়ে গেছে। কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে এক শিক্ষার্থী ছুটছেন কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের দিকে। কিন্তু সেখানে গিয়েও যে খুব একটা লাভ হবে না, তা তার অজানা নয়। কারণ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৪ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর জন্য বর্তমান কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে আসন রয়েছে মাত্র ৪৪৭টি। ফলে অনেককেই শেষ পর্যন্ত ফিরে যেতে হয় হলে কিংবা অন্য কোনো আশ্রয়ে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) ক্যাম্পাসে এমন দৃশ্য দীর্ঘদিনের। তবে এবার সেই চিত্র বদলের স্বপ্ন দেখাচ্ছে নতুন একটি স্থাপনা। পুরোনো গ্রন্থাগারের পাশেই নির্মিত হচ্ছে ছয়তলা বিশাল ভবন। যার স্থাপত্যশৈলীতে ফুটে উঠেছে ইতালির রোমে অবস্থিত ঐতিহাসিক কলোসিয়ামের অনুপ্রেরণা। বৃত্তাকার অবয়ব আর ব্যতিক্রমী নকশার কারণে সবুজ ক্যাম্পাসের মাঝখানে ভবনটি ইতোমধ্যে দৃষ্টি কেড়েছে সবার। প্রকল্প-সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, নতুন এই গ্রন্থাগারে একসঙ্গে ছয় থেকে সাত হাজার শিক্ষার্থী বসে পড়াশোনা করতে পারবেন।

প্রায় ১০১ কোটি ৮৬ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন এই গ্রন্থাগার কেবল একটি নতুন ভবন নয়; বরং দীর্ঘদিনের পাঠকক্ষ-সংকট কাটিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, গবেষণা ও জ্ঞানচর্চার পরিসর সম্প্রসারণের একটি বড় উদ্যোগ। তবে এর বিশালত্বের পাশাপাশি রয়েছে স্থাপত্যের অভিনবত্ব, প্রযুক্তির সংযোজন, পরিবেশগত প্রশ্ন এবং ভবিষ্যৎ প্রত্যাশার নানা হিসাব।

সংখ্যায় নতুন গ্রন্থাগার
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারটি নির্মিত হচ্ছে প্রায় আড়াই লাখ বর্গফুট জায়গাজুড়ে। ছয়তলা ভবনটিতে একসঙ্গে ছয় থেকে সাত হাজার পাঠকের বসার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এ ছাড়া থাকছে ৩০টি বিশ্রামকক্ষ, সেমিনার হল, আর্ট গ্যালারি, প্রদর্শনী কক্ষ, রেকর্ডিং স্টুডিও, আর্কাইভ এবং বই বাঁধাই ও ছাপার সুবিধা।

প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ভবনটির নির্মাণব্যয় প্রায় ১০১ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। নির্মাণকাজ করছে মাহবুব অ্যান্ড অনিক ট্রেডিং কনসোর্টিয়াম লিমিটেড। ভবনটির স্থপতি ফারহিয়া ফেরোজ।

পরিসংখ্যানের দিকে তাকালেই নতুন গ্রন্থাগারের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বর্তমানে ১৪ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর বিপরীতে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে আসন মাত্র ৪৪৭টি। অর্থাৎ গড়ে প্রতি ৩১ জন শিক্ষার্থীর জন্য রয়েছে একটি আসন। অন্যদিকে নতুন ভবনে সাড়ে ছয় হাজার আসন বিবেচনায় নিলে প্রতি দুজন শিক্ষার্থীর জন্য একটি আসনের সুযোগ তৈরি হবে। বর্তমানের তুলনায় আসনসংখ্যা প্রায় সাড়ে ১৪ গুণ বাড়বে।

নির্মাণব্যয় ও আসনসংখ্যার হিসাবেও রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। ১০১ কোটি ৮৬ লাখ টাকা ব্যয়কে সাড়ে ছয় হাজার আসন দিয়ে ভাগ করলে প্রতিটি আসনের বিপরীতে ব্যয় দাঁড়ায় আনুমানিক ১ লাখ ৫৭ হাজার টাকা। তবে এই ব্যয় কেবল চেয়ার-টেবিল বা পাঠকক্ষ নির্মাণের জন্য নয়। বরং গবেষণা, প্রযুক্তি, সংরক্ষণ, প্রকাশনা ও অন্যান্য আধুনিক সুবিধা যুক্ত করার ব্যয়ও এর অন্তর্ভুক্ত।

২০১৮ সালে একনেকে অনুমোদিত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় নির্মিত হচ্ছে নতুন গ্রন্থাগারটি। ওই প্রকল্পের মোট ব্যয় ছিল ১ হাজার ৪৪৫ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। প্রকল্পের আওতায় ২২টি ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। সেই হিসাবে নতুন গ্রন্থাগারের জন্য বরাদ্দ মোট প্রকল্পব্যয়ের প্রায় সাত শতাংশ।

চার দশকের পুরোনো সংকটের অবসানের অপেক্ষা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর ১৯৭১ সালের ১২ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। দেশের একমাত্র সম্পূর্ণ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সময়ের সঙ্গে বড় হয়েছে। কিন্তু শিক্ষার্থীদের জ্ঞানচর্চার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র গ্রন্থাগারটি দীর্ঘদিন ধরেই ধারণক্ষমতার সীমাবদ্ধতায় ভুগছে।

বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে এই সংকটের চিত্র। ২০১১ সালের একটি প্রতিবেদনে প্রায় ১২ হাজার শিক্ষার্থী ও পাঁচ শতাধিক শিক্ষকের বিপরীতে গ্রন্থাগারে বই ও জার্নালের অপ্রতুলতার কথা বলা হয়েছিল। অন্য একটি প্রতিবেদনে আসনসংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছিল মাত্র ৩০০। ২০২২ সালে হলগুলোর রিডিং রুম নিয়ে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনেও শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার জায়গা সংকটের বিষয়টি উঠে আসে।

তৃতীয় বর্ষের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী আহোনা শাহরিন মনে করেন, অব্যবস্থাপনা ও প্রতিকূল পরিবেশের কারণে বর্তমান গ্রন্থাগারে পড়াশোনা ও গবেষণার সুযোগ সীমিত। নতুন ভবন চালু হলে দীর্ঘদিনের এই ভোগান্তি অনেকটাই কমবে বলে আশা তাঁর। দ্রুত নির্মাণকাজ শেষ করে গ্রন্থাগারটি শিক্ষার্থীদের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করার প্রত্যাশাও জানিয়েছেন তিনি।

কলোসিয়ামের স্থাপত্যে জ্ঞানের নতুন ঠিকানা
নতুন গ্রন্থাগারের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক এর স্থাপত্যশৈলী। প্রাচীন রোমের ঐতিহাসিক কলোসিয়ামের আদলে বৃত্তাকার নকশায় নির্মিত হচ্ছে ভবনটি। একটির পর একটি স্তম্ভ, বৃত্তাকার অবয়ব ও খোলামেলা পরিসর ভবনটিকে দিয়েছে ভিন্নমাত্রা। সবুজে ঘেরা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের মধ্যে আকাশ থেকে তোলা ছবিতে ভবনটিকে অনেকটা বিশাল আংটির মতো দেখায়।

প্রাচীন রোমের কলোসিয়াম ছিল হাজার হাজার মানুষের সমাগমের স্থান। সেখানে মানুষ একসঙ্গে বসে বিভিন্ন আয়োজন উপভোগ করত। আর জাহাঙ্গীরনগরের নতুন গ্রন্থাগারে একই ধরনের বৃত্তাকার স্থাপত্যের ভিন্ন প্রয়োগ ঘটানো হয়েছে। এখানে বিনোদনের পরিবর্তে মানুষের সমাগম ঘটবে জ্ঞান, শিক্ষা ও গবেষণার প্রয়োজনে।


ভবনটির নকশায় খোলা জায়গা, আলো-বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা এবং বৃত্তাকার বারান্দার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে এটি কেবল বই পড়ার জন্য নির্ধারিত একটি প্রচলিত ভবন নয়; বরং শিক্ষার্থীদের পারস্পরিক যোগাযোগ, আলোচনা ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডেরও একটি কেন্দ্র হয়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে।

পুরোনো গ্রন্থাগারের সামনের ‘সপ্তক’ ভাস্কর্যও এই স্থাপনার সৌন্দর্যে আলাদা মাত্রা যোগ করেছে। পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা পুরোনো ও নতুন দুটি ভবন যেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অতীত ও ভবিষ্যতের মধ্যে এক নীরব সংলাপ তৈরি করেছে।

ছয়তলায় ছয় রকম আয়োজন
স্থপতি ফারহিয়া ফেরোজের নকশায় ভবনটির প্রতিটি তলাকে সাজানো হয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্যে। পাঠ্যবই থেকে গবেষণা, ডিজিটাল প্রযুক্তি থেকে প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাস সংরক্ষণ—সবকিছুর জন্যই রাখা হয়েছে পৃথক ব্যবস্থা। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্যও বিশেষ সুবিধা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

নিচতলা : সেবার প্রবেশদ্বার
ভবনের নিচতলায় থাকবে কেন্দ্রীয় সার্ভিস বিভাগ, প্রশিক্ষণকেন্দ্র এবং জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটি প্রেস। এখানে সদস্য হওয়া, বই সংগ্রহ, বিভিন্ন প্রশিক্ষণ গ্রহণ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব প্রকাশনা কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ থাকবে।

দ্বিতীয় তলা : পাঠকের জগৎ
এই তলায় থাকবে পাঠ্যবই, ম্যাগাজিন, সংবাদপত্র ও রেফারেন্স সামগ্রীর জন্য পৃথক পরিসর। শিশুদের জন্য বিশেষ সংগ্রহ, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের উপযোগী ব্যবস্থা এবং উন্মুক্ত পাঠকক্ষও রাখা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তাদের সন্তানদের জন্য শিশু কর্নার থাকায় এটি পরিবারের ছোট সদস্যদেরও বইয়ের জগতে পরিচিত হওয়ার সুযোগ করে দেবে।

তৃতীয় তলা : গবেষণা ও প্রযুক্তির কর্মশালা
গবেষণা-পরামর্শ কক্ষ, সাহিত্য বিভাগ ও ভিডিও রেফারেন্স সেকশনের পাশাপাশি এখানে থাকবে ডিজিটাল ম্যাপিং ও ভৌগোলিক তথ্যব্যবস্থা (জিআইএস) ল্যাব। ভূগোল, পরিবেশবিজ্ঞান ও নগর পরিকল্পনার শিক্ষার্থীরা এখানে মানচিত্র ও উপগ্রহ-উপাত্ত নিয়ে কাজ করতে পারবেন। ফলে গ্রন্থাগারটি প্রচলিত পাঠকক্ষের ধারণা ছাড়িয়ে গবেষণার একটি আধুনিক কেন্দ্রে পরিণত হওয়ার সুযোগ পাবে।

চতুর্থ তলা : ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সংরক্ষণাগার
বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ইতিহাস, গবেষণাপত্র, দাপ্তরিক নথিপত্র ও সাংস্কৃতিক উপকরণ সংরক্ষণের জন্য নির্ধারিত থাকবে এই তলা। প্রতিষ্ঠার পর থেকে পাঁচ দশকের বেশি সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দলিল-দস্তাবেজ এক জায়গায় সংরক্ষণের উদ্যোগ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাস চর্চায় নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।

পঞ্চম ও ষষ্ঠ তলা : বই প্রস্তুত ও সংরক্ষণের পরিসর
এই দুই তলায় থাকবে ভাড়া-গ্রন্থাগার, বই সংরক্ষণ ও রেফারেন্সের জায়গা। পাশাপাশি বই বাঁধাই, প্রক্রিয়াকরণ ও ছাপার ব্যবস্থাও রাখা হচ্ছে। ফলে বই সংগ্রহ থেকে শুরু করে তালিকাভুক্তি, বাঁধাই ও মুদ্রণ পর্যন্ত বিভিন্ন কার্যক্রম একই ভবনে সম্পন্ন করার সুযোগ তৈরি হবে।

এ ছাড়া পুরো ভবনে থাকছে ৩০টি বিশ্রামকক্ষ, আর্ট গ্যালারি, প্রদর্শনী কক্ষ, দলগত আলোচনার স্থান ও সেমিনার হল। অর্থাৎ এখানে যেমন থাকবে একাগ্রচিত্তে পড়াশোনার পরিবেশ, তেমনি থাকবে চিন্তা বিনিময় ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের সুযোগ।

প্রযুক্তিনির্ভর গ্রন্থাগারের পথে
আধুনিক গ্রন্থাগারের ধারণা এখন আর শুধু বইয়ের তাক আর পাঠকক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডার, আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী, অডিও-ভিজ্যুয়াল উপকরণ ও প্রযুক্তিনির্ভর সেবাই হয়ে উঠছে এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

জাবির নতুন গ্রন্থাগারেও থাকছে প্রযুক্তির নানা সংযোজন। প্রকল্প-সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক গ্রন্থাগার ও গবেষণা ডেটাবেস ব্যবহারের সুযোগ, অডিও-ভিজ্যুয়াল রেকর্ডিং স্টুডিও, রেফারেন্স কিয়স্ক এবং ভার্চুয়াল রিয়ালিটি (ভিআর) স্টুডিও স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি গবেষণার তথ্যসূত্র ব্যবস্থাপনায় এন্ডনোট ও জোটেরোর মতো সফটওয়্যার ব্যবহারের সুযোগ রাখার কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

তবে এসব প্রযুক্তির কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন নিয়মিত অর্থায়ন ও দক্ষ জনবল। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক গবেষণা ডাটাবেজের সাবস্ক্রিপশন চালু রাখা, সফটওয়্যার হালনাগাদ এবং প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম রক্ষণাবেক্ষণে প্রতিবছর অর্থ ব্যয় করতে হবে।

এদিকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩২৩ কোটি ৩৫ লাখ টাকার বাজেটে গ্রন্থাগারে আরএফআইডি প্রযুক্তি স্থাপন, সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ ও পুরোনো বৈদ্যুতিক লাইন পরিবর্তনের জন্য প্রায় চার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। আরএফআইডি প্রযুক্তি চালু হলে বই ধার দেওয়া, ফেরত নেওয়া এবং বইয়ের তালিকা ব্যবস্থাপনার কাজ আরও সহজ ও স্বয়ংক্রিয় হবে।

নির্মাণের শেষ প্রান্তে, অপেক্ষায় শিক্ষার্থীরা
শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় বিঘ্ন কমাতে নির্মাণকাজের একটি অংশ রাত ও ভোরে পরিচালনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক নাসির উদ্দিন। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম সচল রেখে নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়ার এই উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের জন্য স্বস্তিদায়ক।

সাম্প্রতিক এক সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন গ্রন্থাগারের নির্মাণকাজ প্রায় ৯০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। গ্রন্থাগার নির্মাণ তদারকি কমিটির প্রধান ও শিক্ষা বিষয়ক উপ-উপাচার্য অধ্যাপক শামসুল আলম জানিয়েছেন, ভবনটি চালু হলে শিক্ষা ও গবেষণায় আধুনিক সুযোগ-সুবিধা যুক্ত হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক পরিবেশ আরও শক্তিশালী হবে। কাজের অগ্রগতি পর্যালোচনায় ২৬ অক্টোবর প্রকৌশলীদের সঙ্গে বৈঠকের পরিকল্পনাও ছিল।

তার প্রত্যাশা, আগামী বছরের মধ্যে শিক্ষার্থীরা নতুন গ্রন্থাগারে পড়াশোনা শুরু করতে পারবেন। অন্যদিকে প্রকল্প-সংশ্লিষ্টদের বরাত দিয়ে প্রকাশিত আরেকটি প্রতিবেদনে ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে ভবনটি হস্তান্তরের লক্ষ্যমাত্রার কথা বলা হয়েছে। ফলে নির্মাণকাজ শেষ করে শিক্ষার্থীদের ব্যবহারের উপযোগী করতে আরও কিছুটা সময় লাগতে পারে।

উন্নয়নের পাশাপাশি বিতর্কও
বড় অবকাঠামো প্রকল্পের সঙ্গে নানা প্রশ্ন ও সমালোচনা থাকাই স্বাভাবিক। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন গ্রন্থাগারও এর বাইরে নয়। ভবনটির অবস্থান, ক্যাম্পাসের মাস্টারপ্ল্যান এবং আশপাশের খেলার মাঠের ভবিষ্যৎ নিয়ে ইতোমধ্যে বিভিন্ন মহলে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

প্রথমত, ভবনের অবস্থান নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন। মূল পরিকল্পনায় পুরোনো গ্রন্থাগার ভেঙে একই স্থানে নতুন ভবন নির্মাণের কথা থাকলেও তা সম্ভব হয়নি। প্রকল্প পরিচালক জানিয়েছেন, পুরোনো ভবন ভাঙা সম্ভব না হওয়ায় নতুন গ্রন্থাগার এবং লেকচার থিয়েটার-কাম-পরীক্ষা হলের অবস্থান পরিবর্তন করতে হয়েছে। ফলে নতুন ভবনটি পুরোনো গ্রন্থাগারের পাশেই নির্মিত হচ্ছে। এখন প্রশ্ন উঠেছে, পুরোনো ভবনটি ভবিষ্যতে কী কাজে ব্যবহার করা হবে।

দ্বিতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক মাস্টারপ্ল্যান নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের একাংশের অভিযোগ, সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়াই একের পর এক অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এতে ক্যাম্পাসের সবুজ পরিবেশ ও প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে গাছ কাটা এবং জলাশয়ের আশপাশে নির্মাণকাজ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

তৃতীয়ত, নতুন গ্রন্থাগারের পাশের এএফএম কামালউদ্দিন হলের খেলার মাঠ পুনর্নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েও রয়েছে ভিন্নমত। কেউ মাঠের বিনোদন ও খেলাধুলার পরিবেশ অক্ষুণ্ন রাখার পক্ষে, আবার কেউ গ্রন্থাগারের পরিবেশ ও প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলছেন।

তবে এসব প্রশ্নের কারণে নতুন গ্রন্থাগারের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বরং উন্নয়ন পরিকল্পনায় শিক্ষা, পরিবেশ ও শিক্ষার্থীদের অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার মধ্যে ভারসাম্য নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

ভবন বড় হচ্ছে, বইয়ের ভাণ্ডার কতটা সমৃদ্ধ হবে?
একটি গ্রন্থাগারের পরিচয় শুধু তার স্থাপত্য কিংবা আসনসংখ্যায় নির্ধারিত হয় না। এর প্রকৃত শক্তি নির্ভর করে বই, জার্নাল, গবেষণাপত্র ও তথ্যভাণ্ডারের সমৃদ্ধির ওপর।

বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে এক লাখ ২০ হাজারের বেশি শিরোনামের বই রয়েছে। অন্যদিকে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে নতুন ভবনে প্রায় তিন লাখ বই রাখার ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে নতুন ভবনের বিশাল পরিসর কার্যকর করতে বই ও গবেষণা সামগ্রীর সংগ্রহ বাড়ানো জরুরি।

এ ক্ষেত্রে অন্তত তিনটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, বিভাগভিত্তিক চাহিদা অনুযায়ী বই, জার্নাল ও ই-রিসোর্স সংগ্রহে নিয়মিত বাজেট বরাদ্দ। দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল সেবা, আরএফআইডি, জিআইএস ল্যাব ও ভিআর স্টুডিও পরিচালনায় দক্ষ জনবল নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ। তৃতীয়ত, বিদ্যুৎ, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা ও অন্যান্য রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ের জন্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন নিশ্চিত করা।

কারণ, একটি আধুনিক গ্রন্থাগার নির্মাণের চেয়ে সেটিকে কার্যকর ও সমৃদ্ধ রাখা অনেক দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্ব।

শুধু পাঠাগার নয়, হয়ে উঠুক শিক্ষার্থীদের মিলনকেন্দ্র
আধুনিক নগর ও বিশ্ববিদ্যালয় পরিকল্পনায় গ্রন্থাগারকে অনেক সময় ‘তৃতীয় স্থান’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মানুষের প্রথম স্থান ঘর, দ্বিতীয় স্থান কর্মক্ষেত্র বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আর তৃতীয় স্থান হলো এমন একটি পরিসর, যেখানে মানুষ কাজ বা ক্লাসের বাইরেও সময় কাটায়, ভাবনার আদান-প্রদান করে এবং নতুন সম্পর্ক গড়ে তোলে।

আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে জাহাঙ্গীরনগরের শিক্ষার্থীদের জীবনে এমন একটি জায়গার গুরুত্ব আরও বেশি। সকালে ক্লাস, দুপুরে হলের খাবার, বিকেলে খেলাধুলা কিংবা আড্ডা এর বাইরে পড়াশোনা, গবেষণা ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের জন্য একটি সমন্বিত পরিবেশ প্রয়োজন।

নতুন গ্রন্থাগারের বিশ্রামকক্ষ, আর্ট গ্যালারি, প্রদর্শনী কক্ষ ও দলগত আলোচনার স্থান সেই সুযোগ তৈরি করতে পারে। এখানে সাহিত্য বিভাগের শিক্ষার্থী পরিচিত হতে পারেন ভূগোলের গবেষণার সঙ্গে, আবার বিজ্ঞান বিভাগের কোনো শিক্ষার্থী সময় কাটাতে পারেন শিল্পকর্মের প্রদর্শনীতে। বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এমন যোগাযোগ ও ভাববিনিময়ই একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানচর্চাকে বহুমাত্রিক করে তোলে।

তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে গ্রন্থাগারটির ব্যাবহারিক ব্যবস্থাপনাও হতে হবে শিক্ষার্থীবান্ধব। বিশেষ করে খোলার সময়, রাতের পাঠের সুযোগ, আসন ব্যবহারের নিয়ম, প্রযুক্তিগত সেবার সহজলভ্যতা এবং পুরোনো ভবনের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে ভবনের চারপাশের সবুজ পরিবেশ সংরক্ষণেও প্রশাসনকে দায়িত্বশীল হতে হবে।

অপেক্ষার অবসান হোক জ্ঞানের আলোয়
আবার ফিরে যাওয়া যাক সেই পরীক্ষার আগের রাতের শিক্ষার্থীর কাছে। সাড়ে ৭টায় যিনি জায়গার অভাবে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের দরজা থেকে ফিরে যেতে বাধ্য হন। তাঁর কাছে নতুন গ্রন্থাগার নিছক একটি দৃষ্টিনন্দন ভবন নয়; বরং নিশ্চিন্তে বসে পড়াশোনা করার একটি প্রত্যাশিত ঠিকানা।

১৯৮৫ সালে নির্মিত পুরোনো ভবনটি যে সময়ের শিক্ষার্থীদের জন্য তৈরি হয়েছিল, বিশ্ববিদ্যালয় আজ তার চেয়ে অনেক বড়। শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে, বেড়েছে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার পরিধি। সেই পরিবর্তিত বাস্তবতায় নতুন গ্রন্থাগার নির্মাণ সময়ের দাবি।

তবে ভবনের সৌন্দর্য, আসনসংখ্যা কিংবা প্রযুক্তিগত সুবিধাই এর সাফল্যের চূড়ান্ত মাপকাঠি নয়। প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে শিক্ষার্থীরা কতটা নির্বিঘ্নে এটি ব্যবহার করতে পারছেন, গবেষকেরা কতটা সমৃদ্ধ তথ্যভাণ্ডার পাচ্ছেন এবং জ্ঞানচর্চার পরিবেশ কতটা বিস্তৃত হচ্ছে তার ওপর।

রোমের কলোসিয়াম ইতিহাসের এক বিস্ময়কর স্থাপত্য। আর জাহাঙ্গীরনগরের নতুন গ্রন্থাগার সেই স্থাপত্যের অনুপ্রেরণায় নির্মিত হলেও এর উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন এখানে তৈরি হবে জ্ঞান, চিন্তা ও স্বপ্নের নতুন পরিসর। প্রায় ১০২ কোটি টাকার এই বিনিয়োগ যেন কেবল ইট-পাথরের সৌন্দর্যে সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং শিক্ষার্থীদের মেধা, মনন ও গবেষণার বিকাশে হয়ে ওঠে কার্যকর অবকাঠামো।

সবশেষে প্রত্যাশা একটাই নতুন গ্রন্থাগারের দরজা খুললে যেন আর কোনো শিক্ষার্থীকে আসনের অভাবে ফিরে যেতে না হয়। বইয়ের তাক হোক সমৃদ্ধ, প্রযুক্তির ব্যবহার হোক সহজলভ্য, আর কলোসিয়ামের ছায়ায় গড়ে উঠুক জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানচর্চার এক নতুন ইতিহাস।

সময়ের আলো/জোই
  বিষয়:   এশিয়া মহাদেশ  বিস্ময়  জাবি  নতুন গ্রন্থাগার  কলোসিয়াম  ছায়া  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
শিক্ষা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: