ছবি : সংগৃহীত যুক্তরাষ্ট্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের আশঙ্কায় বিশ্ব শেয়ারবাজারে কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের বাজারমূল্য উধাও হওয়ার পর শুক্রবার ঘুরে দাঁড়ানোর আভাস দিয়েছে ওয়াল স্ট্রিট। এ ধসের জেরে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সরকারি বন্ডের দিকে ঝুঁকেছিলেন বিনিয়োগকারীরা। তবে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে সূচক বাড়ার পূর্বাভাসে কিছুটা স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে।
বাজারে অস্থিরতার প্রভাব ইউরোপেও পড়েছে। শুক্রবার ইউরোপের প্রধান শেয়ারবাজারগুলোর সূচক দেড় শতাংশের বেশি কমেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নাসডাক ফিউচার সূচকে ১ দশমিক ৫ শতাংশ উত্থানের আভাস পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে বাজারের আতঙ্ক পরিমাপক ভিআইএক্স সূচকও কিছুটা কমেছে।
এআই খাতের শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারে মিশ্র প্রবণতা দেখা গেছে। আগের দিন বড় দরপতনের পর শুক্রবার প্রাক্-বাজার লেনদেনে এনভিডিয়ার শেয়ারের দাম বেড়েছে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। চিপ নির্মাতা এএমডি, ইন্টেল, ব্রডকম ও মাইক্রোন টেকনোলজির শেয়ারের দাম বেড়েছে ৪ দশমিক ৫ থেকে ৮ শতাংশ পর্যন্ত। এ ছাড়া টেসলার শেয়ার ২ শতাংশ এবং স্পেসএক্সের শেয়ার ৪ শতাংশ বেড়েছে।
তবে এশিয়ার বাজারে পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। জাপানের নিক্কেই ও দক্ষিণ কোরিয়ার কোস্পি সূচক প্রায় ৬ শতাংশ করে কমেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০২৫ সালের এপ্রিলের শুল্কসংক্রান্ত ‘লিবারেশন ডে’ ঘোষণার পরের সময়ের তুলনায় নিক্কেই সূচকে এটিই ছিল এক দিনে সবচেয়ে বড় পতন। তাইওয়ানের প্রধান শেয়ারসূচক একপর্যায়ে ৮ শতাংশের বেশি কমলেও পরে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ায়।
লন্ডনভিত্তিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান মার্লবরোর তহবিল ব্যবস্থাপক জেমস অ্যাথি বলেন, বাজারে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারী ও হেজ ফান্ডগুলোর শেয়ার বিক্রির প্রবণতা একে অপরকে আরও প্রভাবিত করছে। তাঁর মতে, বাজারের সূচকগুলো এখনো রেকর্ড উচ্চতার কাছাকাছি এবং এআই খাতে বিপুল বিনিয়োগ অব্যাহত রয়েছে। ফলে আগামী দিনগুলোতে বাজারের আস্থা এবং এআই প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় ধরনের পরীক্ষা হতে পারে।
প্রত্যাশার চেয়ে বেশি কর্মসংস্থান যুক্তরাষ্ট্রে
শেয়ারবাজারে অস্থিরতার মধ্যেও নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে মার্কিন ডলার, জাপানি ইয়েন ও সুইস ফ্রাঁর চাহিদা বেড়েছে। তবে সরকারি বন্ডের বাজারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা কিছুটা থেমেছে। ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদহার বেড়ে ৪ দশমিক ৮৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মসংস্থান পরিস্থিতির তথ্য প্রত্যাশার চেয়ে ভালো এসেছে। দেশটিতে অকৃষি খাতে নতুন কর্মসংস্থান বেড়েছে ১ লাখ ৬৫ হাজার। পাশাপাশি বার্ষিক মজুরি বৃদ্ধির হার কমে প্রায় সাড়ে পাঁচ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো ৩ শতাংশের নিচে নামার যে পূর্বাভাস ছিল, তা সত্য হয়নি। মজুরি বৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ১ শতাংশে।
অন্যদিকে জাপানের ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের সুদহার একপর্যায়ে কমে ১ দশমিক ৭৯৫ শতাংশে নেমেছে, যা গত ৩০ জুনের পর সর্বনিম্ন। জার্মানির সরকারি বন্ডের সুদহারও আগস্টের শেষ দিকের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যায়। পরে অবশ্য কিছুটা বেড়েছে।
বিশ্ববাজারে তেলের দাম আবারও ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের দিকে এগোলেও ২০২০ সালের পর সবচেয়ে বড় সাপ্তাহিক দরপতনের পথে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান নমনীয় করতে পারে—এমন প্রত্যাশা থেকে তেলের দামে এই পতন হয়েছে।
এআই নিয়ে উদ্বেগে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে নাসডাক
চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের ঐতিহাসিক জয়ের পর এআই খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। বিশেষ করে এআই অবকাঠামো নির্মাণে বিপুল ব্যয় এবং ভবিষ্যতে সেই বিনিয়োগ থেকে প্রত্যাশিত মুনাফা পাওয়া নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।
টেক্সাসের নবনির্বাচিত ডেমোক্র্যাট গভর্নর জিনা হিনোজোসা বৃহস্পতিবার জানিয়েছেন, অঙ্গরাজ্যে নতুন আইন করা হবে। এর মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক ডেটা সেন্টার নির্মাণের কারণে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর যে প্রভাব পড়ছে, তা মোকাবিলার উদ্যোগ নেওয়া হবে। যুক্তরাষ্ট্রের ডেটা সেন্টারগুলোর বড় একটি অংশ টেক্সাসে অবস্থিত।
বৃহস্পতিবার প্রযুক্তিনির্ভর নাসডাক সূচক ৫ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে। এতে বাজারমূল্য কমেছে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার কোটি ডলার। একই দিনে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকের আওতাধীন কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত বাজারমূল্য থেকেও প্রায় ৩ লাখ কোটি ডলার উধাও হয়েছে।
সিএমসি মার্কেটসের এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্য বিভাগের প্রধান ক্রিস্টোফার ফোর্বস বলেন, পরিস্থিতি বেশ বিপর্যয়কর। বিনিয়োগকারীদের শেয়ারদরের পতনে মার্জিন কল ও অভিযোগের চাপ বেড়েছে। অনেক বিনিয়োগকারী নির্দিষ্ট শেয়ার বা বাজারের ভবিষ্যৎ নিয়ে দৃঢ় অবস্থানে থাকায় লোকসানের বিষয়টি তাঁদের জন্য আবেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
এআই খাতে বিপুল বিনিয়োগের বিপরীতে ভবিষ্যতে পর্যাপ্ত মুনাফা পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়েও সংশয় বাড়ছে। বিশেষ করে ডেটা সেন্টার ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের বিপুল ব্যয় বিনিয়োগের সম্ভাব্য মুনাফা কমিয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিনিয়োগকারীরা। এতে হেজ ফান্ড ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়েছে।
বাজার স্থিতিশীল করতে এশিয়ায় কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ
বাজারের অস্থিরতা কমাতে এশিয়ার কয়েকটি দেশের কর্তৃপক্ষও উদ্যোগ নিয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া সাময়িকভাবে ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীদের ঋণনির্ভর বা লিভারেজড বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কিছু বিধিনিষেধ শিথিল করেছে।
অন্যদিকে তাইওয়ানের অর্থ মন্ত্রণালয় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তাদের বাজারে সহায়তা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে বলে রয়টার্সকে জানিয়েছে একাধিক সূত্র।
শুক্রবার তাইওয়ানের শেয়ারবাজার ৪ দশমিক ৫ শতাংশ পতনে লেনদেন শেষ করেছে। তবে সপ্তাহজুড়ে সূচকটির পতন হয়েছে ১২ দশমিক ২ শতাংশ, যা ১৯৯১ সালের পর সবচেয়ে বড় সাপ্তাহিক দরপতন।
দক্ষিণ কোরিয়ার এআই চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারেও কিছুটা পুনরুদ্ধার দেখা গেলেও দিন শেষে বড় পতন হয়েছে। জাপানে প্রযুক্তি খাতের বড় বিনিয়োগকারী সফটব্যাংকের শেয়ারের দাম কমেছে ১১ শতাংশ। প্রতিষ্ঠানটির ঋণখেলাপির ঝুঁকির বিপরীতে বিমা ব্যয়ও চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
ইন্টারঅ্যাকটিভ ব্রোকার্সের প্রধান কৌশলবিদ স্টিভ সোসনিক বলেন, বাজারে এত বড় ধাক্কার পর দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর আশা করা কঠিন। স্বল্প মেয়াদে শেয়ারবাজারে অতিরিক্ত দরপতন হয়ে থাকতে পারে, তবে অস্থিরতার পেছনের মূল কারণ ও উদ্বেগগুলো সহজে দূর হওয়ার নয়।
সময়ের আলো/জেডি