ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। ছবি : সংগৃহীতগোলের পর দৌড়ে এসে শূন্যে লাফ, দুই হাত প্রসারিত করে ঘুরে দাঁড়ানো, এরপর গ্যালারির দিকে মুখ করে সেই চিরচেনা ‘সিউউউ’! ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর এই উদযাপন ফুটবলপ্রেমীদের কাছে যেন আলাদা এক আবেগের নাম। দুই দশকের বেশি সময় ধরে এমন অসংখ্য মুহূর্ত উপহার দিয়েছেন পর্তুগিজ মহাতারকা। তার পায়ের জাদুতে ভেঙেছে একের পর এক রেকর্ড, পর্তুগালের হয়ে এসেছে প্রথম শিরোপা। কিন্তু এবার পর্তুগালের সাত নম্বর জার্সিতে আর দেখা যাবে না সেই চেনা উদযাপন। ইনস্টাগ্রামে ভিডিও বার্তায় আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানানোর ঘোষণা দিয়েছেন ৪১ বছর বয়সি রোনালদো। তার বিদায়ে আবেগে ভাসছে ফুটবল বিশ্ব। তবে বিদায়ের আয়োজন নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
পর্তুগাল ফুটবল ফেডারেশন সম্মাননা জানাতে চাইলেও জাতীয় দলের হয়ে শেষবার মাঠে নামার আগ্রহ নেই রোনালদোর।
গত বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা ভিডিও বার্তায় নিজের ২৩ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানার ঘোষণা দেন রোনালদো। পর্তুগালের সাত নম্বর জার্সি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়ার সময় এসেছে বলে জানান তিনি। ২০০৩ সালের আগস্টে শুরু হওয়া এই যাত্রা তার জীবন বদলে দিয়েছে। সিদ্ধান্তটি সহজ ছিল না বলেও স্বীকার করেন পাঁচবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী এই তারকা। বিদায়বার্তায় পর্তুগিজ সমর্থকদের উদ্দেশে বলেন, ‘২৩ বছর ধরে আমাকে বিশ্বাস করার জন্য ধন্যবাদ। পর্তুগাল সবসময় আমার অংশ হয়ে থাকবে।’
রোনালদোর বিদায়ের ঘোষণা আসার পরই তাকে যথাযথ সম্মান জানানোর উদ্যোগ ঘোষণা দেয় পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশন (এফপিএফ)। এক বিবৃতিতে সংস্থাটি জানিয়েছে, রোনালদোর বিদায় যথাযথ সম্মাননা ছাড়া হতে দিতে চায় না তারা। ফেডারেশনের ভাষায়, তিনি শুধু অসাধারণ একজন ফুটবলার নন, জাতীয় দলের অনুপ্রেরণাদায়ী নেতা এবং পর্তুগিজ ফুটবলের গর্ব। সমর্থক ও দেশের মানুষ যেন আবারও একসঙ্গে দাঁড়িয়ে তাকে অভিবাদন জানাতে পারেন, সে জন্য বিশেষ আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে সেই আয়োজনের ধরন ও সময় এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
এদিকে পর্তুগিজ সংবাদমাধ্যম অবজার্ভারের বরাত দিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, রোনালদোর আপাতত জাতীয় দলে ফিরে একটি বিদায়ি ম্যাচ খেলার ইচ্ছা নেই। ফলে ফেডারেশনের পরিকল্পিত সম্মাননা অনুষ্ঠান কীভাবে হবে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোচ জর্জে জেসুসের সঙ্গে তার সম্পর্কের টানাপোড়েনও এর পেছনে ভূমিকা রেখেছে। গত বৃহস্পতিবার কোচের সঙ্গে রোনালদোর একটি ফোনালাপের পরিকল্পনা ছিল। ফেডারেশন সভাপতি পেদ্রো প্রোয়েনসার মধ্যস্থতায় সেই আলোচনার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। রোনালদো বর্তমানে কোচের সঙ্গে যোগাযোগে আগ্রহী নন বলেও দাবি করেছে ওই সংবাদমাধ্যম।
রোনালদোর বিদায়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছে তার সাবেক ও বর্তমান ক্লাবগুলো। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড লিখেছে, ‘অসাধারণ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের জন্য অভিনন্দন, ক্রিশ্চিয়ানো। অবসরজীবন উপভোগ করো।’ তার শৈশবের ক্লাব স্পোর্তিং সিপি জানিয়েছে, পর্তুগালের জন্য তার করা সবকিছুর জন্য কৃতজ্ঞ তারা। জুভেন্তাসও অভিনন্দন জানিয়েছে জাতীয় দলের হয়ে তার অবিশ্বাস্য পথচলাকে। ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনোও শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। তার ভাষায়, ‘ধন্যবাদ ক্রিশ্চিয়ানো, আপনার ভালোবাসা, অবিস্মরণীয় মুহূর্ত ও আমাদের সুন্দর খেলায় আপনি যে বিশাল অবদান রেখেছেন, তার জন্য। অনেক গর্বের সঙ্গে আপনি পর্তুগিজ জাতীয় দলের জার্সি পরেছিলেন। আপনার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার আজীবন ফুটবল ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে।’
সতীর্থদের বার্তাতেও ফুটে উঠেছে রোনালদোর প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ও পর্তুগাল দলের সতীর্থ ব্রুনো ফার্নান্দেস লিখেছেন, ‘অনুপ্রেরণা দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ। ছোটবেলার আদর্শের সঙ্গে জাতীয় দলে অসাধারণ সব মুহূর্ত ভাগাভাগি করতে পারা আমার জন্য অনেক বড় সৌভাগ্যের।’ নানি তাকে অভিহিত করেছেন পর্তুগিজদের গর্ব হিসেবে। তার ভাষায়, রোনালদো শুধু একজন অসাধারণ ফুটবলার নন, তিনি পুরো জাতিকে বিশ্বাস করতে শিখিয়েছেন যে পর্তুগিজ হয়েও বিশ্বের সেরা হওয়া সম্ভব।
বর্তমান সতীর্থ রাফায়েল লেয়াও তাকে বলেছেন প্রজন্মের পর প্রজন্মের আদর্শ। সাবেক সতীর্থ পেপে লিখেছেন, ‘এটা ফুটবলের চেয়েও বেশি কিছু ছিল। সবকিছুর জন্য ধন্যবাদ, ক্রিস।’ ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সাবেক ডিফেন্ডার রিও ফার্দিনান্দের কাছে রোনালদোর পুরো পথচলাই যেন সিনেমার গল্প। ব্রাজিলিয়ান তারকা নেইমার মন্তব্য করেছেন, ‘কিংবদন্তি।’ রিয়াল মাদ্রিদের ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের ভাষায়, ‘চিরকাল এক নম্বর!’
শুধু ফুটবল তারকারাই নন, রোনালদোর বিদায়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন পর্তুগালের প্রধানমন্ত্রী লুইস মন্তেনেগ্রোও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লিখেছেন, ‘ধন্যবাদ।’ দেশের হয়ে রোনালদোর অবদান চিরকাল প্রতিধ্বনিত হবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মাঠের বাইরেও তিনি বিশ্বের সামনে পর্তুগালের প্রতিনিধিত্ব করে যাবেন।
জাতীয় দলের হয়ে রোনালদোর অর্জনও অনন্য। ২৩৪ ম্যাচে ১৪৬ গোল করে পুরুষদের আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বোচ্চ ম্যাচ ও গোলের রেকর্ড নিজের করে রেখেছেন তিনি। ছয়টি বিশ্বকাপে গোল করার বিরল কীর্তিও গড়েছেন। ২০১৬ সালে পর্তুগালকে প্রথমবারের মতো ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ জেতানোর পাশাপাশি ২০১৯ ও ২০২৫ সালে নেশনস লিগের শিরোপা জয়ে রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। ২০০৪ সালের ইউরো ফাইনালে গ্রিসের কাছে হেরে যে কিশোরের চোখে অশ্রু জমেছিল, সেই রোনালদোই একসময় পর্তুগালকে এনে দিয়েছেন ইউরোপ জয়ের আনন্দ।
তবে আন্তর্জাতিক ফুটবলের অধ্যায় শেষ হলেও গোলের গল্প এখনো শেষ হচ্ছে না। সৌদি আরবের ক্লাব আল-নাসরের হয়ে খেলা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে তার ক্যারিয়ার গোলসংখ্যা ৯৮৫। অর্থাৎ ফুটবল ইতিহাসে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে ১০০০ গোলের মাইলফলক ছুঁতে প্রয়োজন আর মাত্র ১৫টি গোল। পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশনও বিদায়ি বার্তায় তাকে হাজার গোলের লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়ার শুভকামনা জানিয়েছে।
পর্তুগালের মাদেইরার ছোট্ট দ্বীপ থেকে উঠে এসে যিনি বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে নিজের জন্য আলাদা আসন তৈরি করেছেন, তার আন্তর্জাতিক অধ্যায় শেষ হচ্ছে। হয়তো আর কখনো পর্তুগালের জার্সিতে শোনা যাবে না সেই ‘সিউউউ’ ধ্বনি। তবে রোনালদোর রেখে যাওয়া রেকর্ড, অর্জন ও অসংখ্য স্মৃতি থেকে যাবে ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে। জাতীয় দলের বিদায়ঘণ্টা বাজলেও সামনে এখনও একটি স্বপ্ন-১০০০ গোল।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে