ছবি : সংগৃহীতহরমুজ প্রণালিতে একের পর এক জাহাজে হামলার মধ্যে ইরানের কেশম দ্বীপে আবারও বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দুই দেশের মধ্যে বড় ধরনের সংঘাত এড়াতে মধ্যস্থতাকারীরা কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে গেলেও পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে।
শুক্রবার রাতে কেশম দ্বীপে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দ্বীপটিতে ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকেন্দ্র লক্ষ্য করে চালানো ধারাবাহিক হামলার সর্বশেষ ঘটনা এটি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এসব হামলাকে ‘সীমিত হামলা’ বলে বর্ণনা করেছেন। তবে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
শনিবার ভোরে ইরানের সেনাবাহিনী জানায়, নতুন একটি অজ্ঞাত প্রযুক্তি ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এমকিউ-৯ ড্রোন ধ্বংস করেছে তারা। এর আগে শুক্রবার ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) দাবি করে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা একটি এমকিউ-১ ড্রোন ভূপাতিত করেছে। যুদ্ধ শুরুর পর এ মডেলের ১৬তম ড্রোন ধ্বংসের দাবি করেছে তারা।
যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক বাণিজ্য পরিচালনা সংস্থার (ইউকেএমটিও) তথ্য অনুযায়ী, ৬ নভেম্বর শেষ হওয়া সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি ও এর আশপাশে অন্তত ১১টি জাহাজে হামলা হয়েছে। এর মধ্যে তিনটি ডুবে গেছে।
পশ্চিমা সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার হিসাবে, জুলাইয়ের শুরুতে সংঘাত আবার শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ৮৮টি ক্ষেপণাস্ত্র বা অন্যান্য প্রজেক্টাইল হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। তবে সংস্থাটি সতর্ক করেছে, অধিকাংশ হামলার খবর প্রকাশ্যে আসছে না।
ইউকেএমটিওর সাপ্তাহিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি দিয়ে ১৭০টি জাহাজ বাইরে গেছে এবং ১৫৫টি জাহাজ প্রবেশ করেছে। সংঘাত শুরুর আগের তুলনায় এ চলাচল প্রায় ৬৫ শতাংশ কম।
ট্রান্সপন্ডার বা অবস্থান শনাক্তকারী যন্ত্র চালু রাখা অধিকাংশ জাহাজ ইরানের উত্তর দিকের নির্ধারিত পথ ব্যবহার করছে। তবে অনেক জাহাজ ওমানের কাছ দিয়ে দক্ষিণের পথেও চলাচল করছে। এসব জাহাজ তেল পরিবহনের জন্য অবস্থান শনাক্তকারী যন্ত্র বন্ধ রাখছে।
ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর দাবি, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পাশাপাশি অনুমোদনহীন পথে চলাচল করা তেলবাহী ট্যাংকার ও বাণিজ্যিক জাহাজ নৌ-মাইনে আঘাত হানার ঝুঁকিতে রয়েছে।
শনিবার ইরানের নৌবাহিনী জানায়, হরমুজ প্রণালির পূর্বাঞ্চলে অবস্থান শনাক্তকারী যন্ত্র বন্ধ রাখা একটি ট্যাংকার নৌ-মাইনে আঘাত পেয়ে আগুন ধরে যায়। তবে ওয়াশিংটনের দাবি, প্রণালিতে থাকা মাইনগুলো সরিয়ে ফেলা হয়েছে।
ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লায় আর সীমা রাখছে না ইরান
বহু বছর ধরে ইউরোপের দেশগুলোকে আশ্বস্ত করতে আইআরজিসি দাবি করে আসছিল, তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ২ হাজার কিলোমিটার বা ১ হাজার ২৪০ মাইলের মধ্যে সীমিত রাখা হয়েছে। এর বাইরে ইউরোপের দেশগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার কোনো পরিকল্পনা নেই বলেও ইঙ্গিত দিয়েছিল তারা।
তবে ইরানের বেসামরিক অবকাঠামোয় ব্যাপক বিমান হামলা আবারও শুরু করার হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। এমন পরিস্থিতিতে ইরানের সামরিক কর্মকর্তারা বলছেন, এখন আর কোনো সীমাবদ্ধতা মানা হবে না।
শনিবার এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বি বলেন, ‘আমাদের জন্য এই সীমাবদ্ধতা তুলে নেওয়া হয়েছে।’
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পক্ষ থেকে ভবিষ্যতে যেকোনো হুমকির জবাবে সর্বাত্মক সামরিক প্রতিক্রিয়া জানানোর নির্দেশ দেওয়ার পর মোহেব্বি এ মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, আইআরজিসির মহাকাশ বিভাগ ‘অবাক করে দেওয়ার মতো প্রতিরক্ষা সক্ষমতা’ তৈরি করেছে। নতুন করে বড় ধরনের হামলা শুরু হলে এসব সক্ষমতা কাজে লাগানো হবে।
মোহেব্বির ভাষায়, ‘নতুন সংঘাত শুরু হলে এসব উন্নত সক্ষমতার বাস্তব প্রয়োগ শুধু শত্রুদের হতবাক ও বিস্মিতই করবে না, বরং বিশ্বমঞ্চে ইরানের সামরিক কর্তৃত্ব আরও সুদৃঢ় করবে, প্রতিরোধের পক্ষকে উজ্জীবিত করবে এবং আগ্রাসীদের হিসাব-নিকাশ পুরোপুরি ভেস্তে দেবে।’
আইআরজিসি শিগগিরই আরেকটি ভূগর্ভস্থ ‘মিসাইল সিটি’ উন্মোচন করবে বলেও জানান তিনি। পাশাপাশি কিছু সামরিক সরঞ্জাম জনসমক্ষে প্রদর্শনের পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে সাধারণ মানুষ সেগুলো সরাসরি দেখতে পারেন।
ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান যদি তাদের পারমাণবিক নীতি পরিবর্তন করে বোমা তৈরির সিদ্ধান্ত নেয়, সে ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হবে বলেও মন্তব্য করেন মোহেব্বি।
এদিকে সপ্তাহান্তে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের যুদ্ধবিষয়ক অনুষ্ঠান ‘বে ভাগতে-ই ইরান’-এ উপস্থাপক ও বিশ্লেষকেরা বলেন, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী যেকোনো মুহূর্তে পাল্টা হামলার জন্য প্রস্তুত। বিশেষ করে ইসরায়েলের যেকোনো সামরিক তৎপরতার ওপর নজর রাখছে তারা।
অনুষ্ঠানে এক বিশ্লেষক বলেন, ‘ইসরায়েলের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো সম্পর্কে আমাদের সামরিক তথ্য সম্পূর্ণ। আমাদের পানি, বিদ্যুৎ ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হলে তারাও অন্ধকারে ডুবে যাবে এবং পানির সংকটে পড়বে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এটি কোনো ফাঁকা হুমকি নয়, বরং গুরুতর সতর্কবার্তা।’
যুদ্ধ ও আলোচনার মধ্যে দোদুল্যমান পরিস্থিতি
গত কয়েক সপ্তাহে পুরো অঞ্চলে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে—এমন হামলা ঠেকাতে মধ্যস্থতাকারীদের কূটনৈতিক তৎপরতা বেড়েছে। তবে এখন পর্যন্ত অগ্রগতি সীমিত।
শনিবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানান, গত ৪৮ ঘণ্টায় তিনি ১২টি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন। তাদের মধ্যে ওমান, কাতার, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের শীর্ষ কূটনীতিকেরাও রয়েছেন।
আরাগচি বলেন, এসব আলোচনায় তিনি তেহরানের ‘মৌলিক অবস্থান’ তুলে ধরেছেন। এর মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার জন্য ইরানের সাতটি শর্ত এবং ‘আঞ্চলিক শক্তির বাইরে অন্য কোনো শক্তির হস্তক্ষেপ ছাড়া’ আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও রয়েছে।
বৃহস্পতিবার মস্কো সফরে গিয়ে ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান মোহসেন রেজায়ি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কাছেও একই শর্তের কথা তুলে ধরেছেন বলে জানা গেছে। ওই সফরের উদ্দেশ্য ছিল সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির বার্তাও পৌঁছে দেওয়া।
ইরানের রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোস্তফা নাজাফির মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার পরিস্থিতি এখন ‘যুদ্ধ ও আলোচনার মধ্যে অবিরাম দোলাচলের’ মতো। আর সেই দোলাচল ক্রমেই সংঘাতের দিকে ঝুঁকছে। নাজাফিকে ইরানের নিরাপত্তাপ্রধানের ঘনিষ্ঠ বলে মনে করা হয়।
এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘এ মুহূর্তে যা স্পষ্ট, তা হলো এই দোলাচল চলতেই থাকবে। আর এই সংঘাতের সমাপ্তি ধারণার চেয়ে অনেক বেশি জটিল ও সময়সাপেক্ষ হবে।’
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্প ও রিপাবলিকানদের ঐতিহাসিক পরাজয় পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফটের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পারসি বলেন, নির্বাচনের পর স্বল্প মেয়াদে যুদ্ধের ঝুঁকি বাড়াতে পারে এমন তিনটি কারণ রয়েছে। তবে আলোচনায় বড় ধরনের অগ্রগতি হলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে।
পারসির মতে, ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় যে রাজনৈতিক মূল্য দিতে হয়েছে, তা ইতিমধ্যে ট্রাম্পকে দিতে হয়েছে। সামনে এ বিষয় নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো বড় কোনো নির্বাচনও নেই।
তিনি আল জাজিরাকে বলেন, ‘একদিকে, চুক্তিতে পৌঁছানোর চাপ কমে যাবে।’
পারসি আরও বলেন, যুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নেওয়া প্রভাবশালী ব্যক্তিদের চাপ বাড়তে পারে। কারণ, জানুয়ারির শুরুতে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর সংঘাত আরও বাড়ানোর ক্ষেত্রে ট্রাম্পের প্রশাসন রাজনৈতিক বাধার মুখে পড়তে পারে।
এ ছাড়া ইসরায়েলপন্থী কট্টর ডানপন্থী নেতা স্টিফেন মিলারকে হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ নিয়োগের বিষয়টিও ইঙ্গিত দেয়, ট্রাম্প হয়তো যুদ্ধ থামানোর পথে হাঁটতে প্রস্তুত নন।
পারসির মতে, আরেকটি বিষয় হলো নির্বাচনে পরাজয়ের পর ট্রাম্পের মানসিক অবস্থায় প্রতিশোধস্পৃহা তৈরি হতে পারে। তার ভাষায়, ‘গত কয়েক সপ্তাহে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রতিশোধপরায়ণতার একটি দিক দেখা গেছে। কারণ, তার ধারণা, ইরান তার প্রেসিডেন্সিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।’
সময়ের আলো/জেডি