ছবি : সংগৃহীত ইয়েমেনের তাইজ প্রদেশে শুক্রবার একটি বাজারে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত হয়েছেন কয়েক ডজন মানুষ। এ হামলার জন্য একে অপরকে দায়ী করেছে দেশটির চলমান যুদ্ধে জড়িত দুই পক্ষ। এর মধ্য দিয়ে সংঘাতের পাশাপাশি দেশটিতে মানবিক সংকটও আরও গভীর হয়েছে।
ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার গত ৫ অক্টোবর ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে ‘ডন অব ইয়েমেন’ নামে সামরিক অভিযান শুরু করে। দেশটির লোহিত সাগর উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকা হুতিদের দখলে চলে যাওয়ার পর এ অভিযান শুরু করা হয়। লড়াই অব্যাহত থাকায় এ পর্যন্ত বাস্তুচ্যুত হয়েছেন কয়েক লাখ মানুষ।
ইয়েমেনের প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিল জানিয়েছে, হুতিদের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস এবং দেশের সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারে তাদের অভিযান চলবে। এ অবস্থানকে ‘ফেরানো যাবে না’ বলেও উল্লেখ করেছে কাউন্সিল। পর্যবেক্ষকদের মতে, রাজনৈতিক সমাধানের আগে দেশটিতে সংঘাত আরও বাড়তে পারে।
কী এই ‘ডন অব ইয়েমেন’ অভিযান?
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের প্রধান রাশাদ আল-আলিমি গত ৫ অক্টোবর এ অভিযানের ঘোষণা দেন। এর লক্ষ্য হুতিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকাগুলো পুনর্দখল এবং রাজধানী সানা মুক্ত করা। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে শহরটি হুতিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিমান সহায়তা এবং সরকারি বাহিনী ও তাদের মিত্রদের স্থল অভিযানের মাধ্যমে হুতিদের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করার চেষ্টা চলছে।
লোহিত সাগর উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ নিয়ন্ত্রণমুক্ত করা এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও এ অভিযানের অন্যতম লক্ষ্য। সেপ্টেম্বরে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখা দখল করে নেয় হুতিরা।
কতটা এলাকা পুনর্দখল করেছে সরকারি বাহিনী?
অভিযান শুরুর দিনই সরকারি বাহিনী ধুবাব ও বাব আল-মান্দেবের আশপাশের কয়েকটি অবস্থান পুনর্দখলের দাবি করে। তবে তাদের অগ্রগতির প্রকৃত পরিমাণ স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। এ ছাড়া পশ্চিম তাইজের হাইফান, আল-ওয়াজিয়াহ ও আশপাশের পাহাড়ি অবস্থান দখলের কথাও জানায় তারা।
১৩ অক্টোবরের মধ্যে লড়াই ছড়িয়ে পড়ে মারিবে। সেখানে মাস ক্যাম্পের আশপাশে এবং হারিবের উত্তরে অগ্রগতির দাবি করে সরকারি বাহিনী।
তবে তাইজ প্রদেশের কিছু এলাকা হারায় তারা। এর ফলে শহরটিকে ঘিরে হুতিদের অবরোধ আরও জোরালো হয়। প্রায় এক মাস ধরে চলা এ অবরোধে শহরটির বাসিন্দাদের জীবনযাত্রা সংকটের মুখে পড়েছে।
শুক্রবার সরকারি বাহিনী জানায়, তারা তাইজের আল-নিদানি গ্রাম, শাব আল-সারারি, সানামাত এলাকার বড় অংশ এবং ধি আল-বারহের রিবাত আল-কার্ন এলাকা পুনর্দখল করেছে। আল-আকরুদ ফ্রন্টের তাভাত ওয়াথিব ও হাবিল আল-সারাম পাহাড়ও সরকারি সেনা ও জোটের যোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলে দাবি করা হয়।
এ ছাড়া বিভিন্ন রণাঙ্গনে হুতিদের অবস্থান লক্ষ্য করে ১ হাজার ২১১টি অভিযান চালানোর কথা জানিয়েছে সরকারি বাহিনী। লাহিজ প্রদেশের তুর আল-বাহাহ ফ্রন্টেও নতুন অবস্থানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি করেছে তারা।
তবে ইয়েমেনের রাজধানী সানা পুনর্দখলের মতো অবস্থায় এখনো পৌঁছাতে পারেনি সরকারি বাহিনী। যুক্তরাজ্যের অ্যাবারডিন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক থমাস বনি জেমস আলজাজিরাকে বলেন, সানা পুনর্দখল এবং হুতিদের শাসনের অবসান ঘটানো সহজ নয়।
তিনি বলেন, কাগজে-কলমে সরকারি বাহিনীকে বড় মনে হলেও তাদের সেনারা বিভিন্ন রণাঙ্গনে ছড়িয়ে রয়েছে এবং তাদের অস্ত্র ও সরঞ্জাম পুরোনো। পাহাড়ঘেরা সানা প্রতিরক্ষার জন্যও সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। ২০১৫ সাল থেকে সৌদি-আমিরাত জোট অনেক বেশি সামরিক শক্তি নিয়েও শহরটি দখলের কাছাকাছি যেতে পারেনি।
অভিযানে আর কী অর্জনের দাবি সরকারের?
থমাস বনি জেমসের মতে, ‘ডন অব ইয়েমেন’ অভিযানের লক্ষ্য হুতিদের পুরোপুরি পরাজিত করা নয়; বরং তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা।
তিনি বলেন, এ অভিযানকে পূর্ণ বিজয়ের চেষ্টা হিসেবে না দেখে হুতিদের জন্য যুদ্ধের ব্যয় বাড়ানো এবং সম্ভাব্য শান্তিচুক্তির আগে সৌদি আরবের অবস্থান শক্তিশালী করার উদ্যোগ হিসেবে দেখা ভালো। তাঁর মতে, পরবর্তী তিন মাসে কী ঘটে, সেটিই অভিযানের সাফল্য বা ব্যর্থতা বোঝার ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বৃহস্পতিবার ইয়েমেনের প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিল জানায়, অভিযান শুরুর পর থেকে সশস্ত্র বাহিনী ৪০ হাজার ৭৬১টি সামরিক অভিযান চালিয়েছে। এসব অভিযানে প্রায় ২০ হাজার হুতি নেতা ও সদস্য এবং ৫ হাজারের বেশি যানবাহন ‘নিষ্ক্রিয়’ করা হয়েছে বলে দাবি করেছে কাউন্সিল।
এর আগে সামরিক কমান্ড জানিয়েছিল, অভিযানের প্রথম কয়েক সপ্তাহে ১৭ হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। পুরো মাসে প্রতিদিন ৯৫১ থেকে ১ হাজার ২৭২টি অভিযান পরিচালনার কথাও জানানো হয়।
গত মাসে এক দিনে ১ হাজার ৫৪০ হুতিকে হত্যা বা আহত করার দাবি করেছিল ইয়েমেন সরকার। গত সপ্তাহে তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়, ৫ অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত ১৬ হাজার ১০০ হুতি যোদ্ধা ও কমান্ডার নিহত বা আহত হয়েছেন।
অন্যদিকে, হুতিরা জানিয়েছে, উত্তেজনা শুরুর পর থেকে নভেম্বরের প্রথম দিক পর্যন্ত তাদের ওপর ৩ হাজার ৯৩০টি হামলা ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। তবে এসব পরিসংখ্যানের কোনোটিই স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি আলজাজিরা।
কীভাবে পাল্টা হামলা চালাচ্ছে হুতিরা?
আনসার আল্লাহ নামেও পরিচিত হুতি বিদ্রোহীরা সংঘাত শুরুর পর থেকে শত শত মানুষের প্রাণহানির জন্য দায়ী বলে জানিয়েছে বিভিন্ন পক্ষ।
শুক্রবার তাইজ প্রদেশের আল-হাদারা বাজারে হামলার জন্য হুতিদের দায়ী করেছে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী। তাদের দাবি, ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কয়েক ডজন মানুষ নিহত ও আহত হয়েছেন, যাঁদের অধিকাংশই বেসামরিক নাগরিক।
সরকারি বাহিনীর মুখপাত্র কর্নেল মাজেদ আল-নাজিলি বলেন, হুতিরা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে বাজারটিতে হামলা চালিয়েছে। তিনি ঘটনাটিকে যুদ্ধাপরাধ বলে উল্লেখ করেন।
তবে হুতিরা এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে হামলার জন্য ইয়েমেন সরকারের সমর্থক সৌদি আরবকে দায়ী করেছে।
২০১৪ সালে রাজধানী সানা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর ইয়েমেনের সামরিক বাহিনীর বিপুলসংখ্যক অস্ত্র হুতিদের হাতে আসে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক কালোবাজারের ওপর নির্ভর করে গোষ্ঠীটির সামরিক সক্ষমতা আরও বেড়েছে।
দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের সক্ষমতা বাড়ায় সৌদি আরবের বিভিন্ন এলাকা, এমনকি গত জুনে ইসরায়েলেও হামলা চালাতে পেরেছে হুতিরা।
সম্প্রতি তাদের আরেকটি প্রাণঘাতী হামলায় শাবওয়া প্রদেশে সরকারি নিরাপত্তা বাহিনীর অন্তত ৭০ জন নিয়োগপ্রার্থী নিহত হন।
সাধারণ মানুষের ওপর কী প্রভাব পড়ছে?
সরকারি বাহিনী ও হুতিদের লড়াইয়ে ইয়েমেনের মানবিক পরিস্থিতি বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয়বিষয়ক দপ্তর (ওসিএইচএ) শুক্রবার জানিয়েছে, আগস্টে সংঘাত বাড়ার পর থেকে দেশটিতে ৩ লাখ ২৩ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। তাঁদের বেশির ভাগই আশ্রয় নিয়েছেন তাইজ প্রদেশে।
ইয়েমেনে অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষের পাঁচজনের মধ্যে দুজনের বেশি এখন তাইজে রয়েছেন। হুতিদের অবরোধে শহরটি ঘিরে থাকায় প্রায় ৮ লাখ মানুষের কাছে প্রয়োজনীয় সরবরাহ পৌঁছানো যাচ্ছে না।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তরের হিসাবে, আগস্ট থেকে ইয়েমেনে ২৮১ জন বেসামরিক মানুষ হতাহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৬৯ জন নিহত এবং ২১২ জন আহত হয়েছেন। হতাহতদের এক-তৃতীয়াংশের বেশি শিশু।
তাইজ প্রদেশের অবরোধবিষয়ক বিভাগের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক সালাহ আহমেদ গালেব আল-মাজিদি আলজাজিরাকে পরিস্থিতিকে ‘বিপর্যয়কর’ বলে বর্ণনা করেছেন।
হুতিদের অবরোধের কারণে চিকিৎসাসামগ্রী, খাদ্য, জ্বালানি ও পানির মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য প্রদেশটিতে পৌঁছাতে পারছে না। শহরে অবশিষ্ট ডিজেলের মজুতও প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান মজুত দিয়ে ৪৮ ঘণ্টারও কম সময় চলতে পারবে।
জ্বালানি শেষ হয়ে গেলে হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগ ও চিকিৎসাকেন্দ্র বন্ধ করে দিতে হবে বলে সতর্ক করেছে কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে জরুরি চিকিৎসাসেবাও রয়েছে।
তাইজের স্বাস্থ্যবিষয়ক উপ-গভর্নর ইলান আবদুল হাও আলজাজিরাকে জানান, জ্বালানির অভাবে প্রদেশটির প্রায় ৪০ শতাংশ হাসপাতাল বন্ধ হয়ে গেছে। যেগুলো এখনো চালু রয়েছে, সেগুলোও সক্ষমতার অর্ধেক দিয়ে সেবা দিচ্ছে।
সামনে কী হতে পারে?
থমাস বনি জেমসের মতে, ইয়েমেনে শীত ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে তাইজের অবরোধ আরও কঠোর হলে সংঘাতের মধ্যে আটকে পড়া সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়বে।
তিনি বলেন, সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তাইজের বাসিন্দাদের নিয়ে। অক্টোবরের শুরুতে হুতিরা শহরটি ঘিরে ফেলার পর ৮ লাখের বেশি মানুষ মানবিক সহায়তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। সামনে শীত, সহায়তার অর্থের সংকট এবং অবরুদ্ধ শহর—আরও লড়াইয়ের অর্থ সাধারণ ইয়েমেনিদের জন্য আরও দুর্ভোগ।
ইয়েমেনের বাইরেও সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে। হুতিরা সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনায় হামলা অব্যাহত রেখেছে। জেমস বলেন, হুতিরা প্রায় প্রতিদিনই সৌদি আরবকে লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। ২০২২ সালের পর প্রথমবারের মতো সৌদি আরবও প্রকাশ্যে ইয়েমেনের ভেতরে আবার বোমা হামলা চালাচ্ছে।
তার মতে, দুই পক্ষই একে অপরের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে। এ ধরনের পরিস্থিতি যুদ্ধকে আরও বিস্তৃত করে তুলতে পারে।
আঞ্চলিক অন্যান্য সংঘাতও ইয়েমেনকে বৃহত্তর যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলতে পারে। একইভাবে ইয়েমেনের সংঘাতও আঞ্চলিক পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করতে পারে। ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ অচলাবস্থায় থাকায় এ ঝুঁকি আরও বাড়ছে বলে মনে করেন জেমস।
তিনি বলেন, ইয়েমেন এখন ইরানকে ঘিরে বৃহত্তর সংঘাতের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র আবার ইরানে হামলা চালালে সৌদি আরবের ওপর চাপ বাড়াতে ইরান হুতিদের ব্যবহার করতে চাইতে পারে।
সময়ের আলো/জেডি