নিউজিল্যান্ডে নতুন সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ছবি : সংগৃহীতনির্বাচনে কোনো পক্ষই স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় নিউজিল্যান্ডে নতুন সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। চূড়ান্ত ফল জানতে দেশটির ভোটারদের অপেক্ষা করতে হতে পারে আরও কয়েক সপ্তাহ। প্রাথমিক ফলাফলে ক্ষমতাসীন ডানপন্থী জোট সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে থাকলেও বিরোধী বামপন্থী জোটের সঙ্গে আসনসংখ্যার ব্যবধান খুবই কম।
প্রাথমিক ফল অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টোফার লাকসনের নেতৃত্বাধীন মধ্য-ডানপন্থী ন্যাশনাল পার্টি সংসদের সবচেয়ে বড় দল হচ্ছে। তাদের সঙ্গে প্রচলিত জোটসঙ্গী উদারপন্থী অ্যাক্ট পার্টি এবং জনতুষ্টিবাদী নিউ জিল্যান্ড ফার্স্ট পার্টি সরকার গঠনের মতো আসন পেয়েছে। তবে কয়েকটি আসনে জয়-পরাজয়ের ব্যবধান খুব কম হওয়ায় এবং বিশেষ ভোট গণনা বাকি থাকায় এই সংখ্যাগরিষ্ঠতা বেশ নড়বড়ে।
২৭ নভেম্বর আনুষ্ঠানিক ফল ঘোষণা করা হবে। তার আগে নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না, শেষ পর্যন্ত কোন পক্ষ সরকার গঠন করবে।
বিশেষ ভোটের মধ্যে রয়েছে বিদেশে অবস্থানরত নিউজিল্যান্ডের নাগরিকদের ভোট এবং নিজ নির্বাচনী এলাকার বাইরে দেওয়া ভোট। ২০২৩ সালের নির্বাচনে এ ধরনের ভোট পড়েছিল ৬ লাখ, যা মোট ভোটের ২১ শতাংশ। এসব ভোট সাধারণত বামপন্থী দলগুলোর পক্ষে যায়। ২০২৩ সালে বিশেষ ভোটের কারণে মাওরি পার্টি ও গ্রিনস পার্টি মিলিয়ে অতিরিক্ত তিনটি আসন পেয়েছিল।
শনিবার রাতে প্রায় ৯৯ শতাংশ সাধারণ ভোট গণনা শেষে ন্যাশনাল পার্টি পেয়েছে ৪২টি আসন। অ্যাক্ট পার্টি পেয়েছে ১৩টি এবং নিউ জিল্যান্ড ফার্স্ট পেয়েছে ১২টি আসন। তিন দলের মোট আসন ৬৭। অন্যদিকে বামপন্থী জোট মাত্র তিন আসন পিছিয়ে রয়েছে।
অকল্যান্ডের ভায়াডাক্ট ইভেন্টস সেন্টারে দলীয় সমর্থকদের উদ্দেশে মধ্যরাতের কিছু আগে দেওয়া বক্তব্যে লাকসন বলেন, নির্বাচনের ফল এখনো ‘নিশ্চিত করে বলার মতো নয়’। বিশেষ ভোট গণনা শেষ হওয়ার পরই জোট গঠনের আলোচনা শুরু করা যাবে।
ন্যাশনাল পার্টি সংসদের সবচেয়ে বড় দল হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, নতুন সরকার গঠনের পথ তাদের সামনে খোলা রয়েছে। দলীয় ভোটে লেবার পার্টির চেয়ে মাত্র ০.০২ শতাংশ ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে ন্যাশনাল পার্টি।
অন্যদিকে ক্রিস হিপকিন্সের নেতৃত্বাধীন লেবার পার্টি পেয়েছে ৩৫টি আসন। তাদের প্রচলিত জোটসঙ্গী গ্রিনস পার্টি পেয়েছে ১৬টি এবং মাওরি পার্টি পেয়েছে পাঁচটি আসন। মধ্যপন্থী নতুন দল অপরচুনিটির সাতটি আসন যুক্ত করলেও বামপন্থী জোট সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যার চেয়ে তিন আসন পিছিয়ে রয়েছে।
ওয়েলিংটনের উত্তরে আপার হাটের কসমোপলিটান ক্লাবে সমর্থকদের সামনে বক্তব্য দিতে গিয়ে হিপকিন্স রসিকতা করে বলেন, নিউজিল্যান্ডের মানুষ তাদের মতামত জানিয়েছে, তবে তারা আসলে কী বলেছেন, তা বুঝতে আরও কিছুটা সময় লাগতে পারে।
তিনি বলেন, নতুন সরকার কেমন হবে, তা জানতে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। চূড়ান্ত ফল তাদের পক্ষে এলে লেবার পার্টি দ্রুত কাজ শুরু করবে।
ছোট দলগুলোর আসন বাড়ছে
মন্থর অর্থনীতি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে প্রধান দুই দলের সমর্থন কমে যাওয়ায় ছোট দলগুলোর প্রতি ভোটারদের আগ্রহ বেড়েছে। অ্যাক্ট, নিউ জিল্যান্ড ফার্স্ট ও গ্রিনস পার্টির পাশাপাশি নতুন দল অপরচুনিটিও প্রথমবারের মতো সংসদে জায়গা করে নিয়েছে।
নির্বাচনের আগে জনমত জরিপে অপরচুনিটিকে সরকার গঠনে নির্ধারক ভূমিকা রাখার মতো দল হিসেবে দেখা হচ্ছিল। প্রাথমিক ফল অনুযায়ী, ডানপন্থী জোটের সরকার গঠনে দলটির সমর্থন প্রয়োজন হচ্ছে না। তবে বিশেষ ভোটের ফল পাল্টে গেলে দলটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এখন পর্যন্ত ৫ দশমিক ৯ শতাংশ ভোট পেয়েছে মধ্যপন্থী দলটি। ফলে সংসদে প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় ভোটের ন্যূনতম সীমা পার হয়েছে তারা। ১৯৯৬ সালে নিউজিল্যান্ডে মিশ্র সদস্য আনুপাতিক (এমএমপি) নির্বাচনী পদ্ধতি চালুর পর এই প্রথম কোনো নতুন দল সরাসরি এই সীমা অতিক্রম করে সংসদে প্রবেশ করছে। এর আগে ছোট দলগুলো মূলত বড় দল থেকে বেরিয়ে আসা সংসদ সদস্য বা গোষ্ঠীর মাধ্যমে গঠিত হয়েছিল।
অকল্যান্ডে সমর্থকদের উদ্দেশে অপরচুনিটির নেতা কিউলে ওং বলেন, ফলাফল তাঁদের জন্য বেশ আশাব্যঞ্জক। তবে বাকি ভোট গণনা শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
আসন বণ্টনের হিসাবেও জটিলতা
নিউজিল্যান্ডের নির্বাচনে ভোটাররা দুটি ভোট দেন। একটি নিজ নির্বাচনী এলাকার সংসদ সদস্য নির্বাচনের জন্য, অন্যটি কোনো রাজনৈতিক দলকে। এ পদ্ধতির লক্ষ্য হলো, জাতীয় পর্যায়ে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে সংসদে আসন নিশ্চিত করা।
তবে কোনো দল তার দলীয় ভোটের অনুপাতে যত আসন পাওয়ার কথা, নির্বাচনী এলাকায় তার চেয়ে বেশি আসনে জয়ী হলে অতিরিক্ত আসনগুলোও ধরে রাখতে পারে। একে বলা হয় ‘ওভারহ্যাং’।
ন্যাশনাল পার্টি দলীয় ভোটের অনুপাতে প্রাপ্য আসনের চেয়ে বেশি আসনে জয়ী হয়েছে। ফলে আসনসংখ্যার ভারসাম্য রক্ষায় সংসদে অতিরিক্ত পাঁচটি আসন যুক্ত হতে পারে। সরকার গঠনের পথে এটি দলটির জন্য সুবিধাজনক হলেও এর কিছু রাজনৈতিক মূল্যও দিতে হচ্ছে।
দলটির চারজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী—নিকোলা উইলিস, পল গোল্ডস্মিথ, ক্রিস বিশপ ও জেরি ব্রাউনলি—নতুন সংসদে ফিরতে পারছেন না। তাঁদের কেউ নিজ নির্বাচনি এলাকায় জয়ী হননি, আবার দলীয় তালিকা থেকে সংসদ সদস্য হওয়ার মতো পর্যাপ্ত ভোটও পায়নি দলটি।
অন্যদিকে মাওরি পার্টি পেয়েছে অতিরিক্ত পাঁচটি ওভারহ্যাং আসন।
সব অতিরিক্ত আসন যুক্ত হলে নতুন সংসদে সদস্যসংখ্যা দাঁড়াতে পারে ১৩০, যা এমএমপি পদ্ধতি চালুর পর সর্বোচ্চ। সে ক্ষেত্রে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন হবে ৬৫টি আসন।
বিশেষ ভোটের ফল প্রকাশ হতে আরও দুই সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হবে। এরপর সরকার গঠনে কয়েক সপ্তাহ ধরে আলোচনা চলতে পারে। এই সময় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রচলিত নিয়ম অনুসরণ করা হবে বলে জানিয়েছেন লাকসন।
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার পরিচালনার সুপ্রতিষ্ঠিত নিয়ম কার্যকর থাকবে। সরকারের দৈনন্দিন কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবেই চলবে।
সময়ের আলো/জেডি