স্টিফেন মিলার। ছবি : সংগৃহীতযুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ হিসেবে নিজের ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা স্টিফেন মিলারকে নিয়োগ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে এ সিদ্ধান্তের পর ডেমোক্র্যাটদের পাশাপাশি কয়েকজন রিপাবলিকান নেতারও তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন তিনি। সমালোচকেরা মিলারকে ‘বিদ্বেষ ছড়ানো ব্যক্তি’, ‘বিদেশিবিদ্বেষী’ ও ‘বিপজ্জনক উগ্রপন্থি’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
শুক্রবার বিকেলে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে আকস্মিকভাবে এ নিয়োগের ঘোষণা দেন ট্রাম্প। এর মধ্য দিয়ে সুসি ওয়াইলসের স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন মিলার। ওয়াইলসকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার বিষয়টিও নিশ্চিত করেন প্রেসিডেন্ট।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয়ের কয়েক দিনের মধ্যেই এ ঘোষণা এল। ওই নির্বাচনে ট্রাম্পের নীতির বিরুদ্ধে ভোটারদের স্পষ্ট রায় এসেছে এবং কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণও শেষ হয়েছে।
ইলিনয়ের ডেমোক্র্যাট সিনেটর ডিক ডারবিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘ট্রাম্প এই বিদ্বেষ ছড়ানো ব্যক্তিকে পদোন্নতি দিয়ে প্রমাণ করলেন, তিনি কিছুই শেখেননি।’
সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হতে যাওয়া চাক শুমার বলেন, ‘ঐতিহাসিক পরাজয় থেকেও ট্রাম্প কিছু শেখেননি। মিলারকে নিয়োগ দিয়ে এর চেয়ে খারাপ সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব ছিল না।’
প্রতিনিধি পরিষদের শীর্ষ ডেমোক্র্যাট নেতা হাকিম জেফরিস মিলারকে ‘বিপজ্জনক বিদেশিবিদ্বেষী ও বেপরোয়া উগ্রপন্থি’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর দাবি, মিলারের হাতে আমেরিকানদের রক্ত লেগে আছে। তাকে বরখাস্ত করারও দাবি জানিয়েছেন তিনি।
মেরিল্যান্ডের ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস ভ্যান হলেন বলেন, মিলারকে পদোন্নতি দেওয়া আমেরিকার জনগণের প্রতি আরেকটি আঘাত এবং ভোটারদের প্রতি ট্রাম্পের অবজ্ঞার বহিঃপ্রকাশ।
ট্রাম্পের উপপ্রধান স্টাফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসা মিলার প্রশাসনের সবচেয়ে বিতর্কিত ব্যক্তিদের একজন। ডানপন্থি নীতিপ্রস্তাব ‘প্রজেক্ট ২০২৫’-এর অন্যতম রচয়িতা তিনি। টেলিভিশনে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে ট্রাম্পের বিরোধীদের সমালোচনা এবং জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের অধিকার বাতিলের মতো নীতির পক্ষে কথা বলেছেন মিলার। এমনকি গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান চালানোর সম্ভাবনার কথাও তুলেছেন তিনি।
ট্রাম্পের নীতিবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে ব্যাপকভাবে অভিবাসী বহিষ্কারের পরিকল্পনার অন্যতম রূপকার হিসেবে পরিচিত মিলার। তাঁর পদোন্নতির সমালোচনা করতে গিয়ে ডেমোক্র্যাট নেতারা এ নীতির কথাই তুলে ধরেছেন।
ক্যালিফোর্নিয়ার বিদায়ী গভর্নর গ্যাভিন নিউসম মিলারকে হোয়াইট হাউসে প্রবেশ করা সবচেয়ে ‘ঘৃণ্য গুন্ডাদের’ একজন বলে মন্তব্য করেছেন। তার মতে, মঙ্গলবারের নির্বাচনে পরিবর্তনের পক্ষে ভোট দেওয়া প্রত্যেক আমেরিকানের প্রতি এটি অপমান।
তবে ট্রাম্পের রিপাবলিকান মিত্র ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা মিলারের নিয়োগকে স্বাগত জানিয়েছেন। হোয়াইট হাউসের যোগাযোগবিষয়ক পরিচালক স্টিভেন চেউং তাঁকে ‘ট্রাম্পের একেবারে পুরোনো ও বিশ্বস্ত সহযোগী’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ট্রাম্পের এজেন্ডার পক্ষে মিলারের চেয়ে বড় সমর্থক আর কেউ নেই।
উটাহর রিপাবলিকান সিনেটর মাইক লি বলেন, অবৈধ অনুপ্রবেশ ও বামপন্থিদের আইনবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে মিলার আইনের শাসনের দৃঢ় সমর্থক।
মিসৌরির সিনেটর এরিক শমিটও নিয়োগের পক্ষে কথা বলেছেন। এক্সে তিনি লেখেন, দেশ এখন গুরুত্বপূর্ণ এক সন্ধিক্ষণে রয়েছে এবং কী ঝুঁকির মুখে আছে, তা মিলার ভালোভাবেই বোঝেন।
ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ, স্বাস্থ্যমন্ত্রী রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়র এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওসহ মন্ত্রিসভার সদস্যরাও মিলারের কাজের প্রশংসা করেছেন।
তবে সব রিপাবলিকান এ নিয়োগে খুশি নন। ইন্ডিয়ানার রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য মারলিন স্টুটজম্যান চলতি সপ্তাহের শুরুতে প্রশাসনের ব্যাপক অভিবাসী বহিষ্কার কর্মসূচি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে মিলারকে বরখাস্ত করার দাবি জানিয়েছিলেন। শুক্রবার ট্রাম্পের তাঁকে পদোন্নতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জানতে চাইলে সেমাফোরকে স্টুটজম্যান বলেন, এটি ‘ভয়াবহ সিদ্ধান্ত’।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের চিফ অব স্টাফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করা মাইলস টেলরও নিয়োগের সমালোচনা করেছেন। পরে তিনি ট্রাম্পবিরোধী রিপাবলিকানদের সঙ্গে যুক্ত হন।
টেলর বলেন, ‘আমি দুই বছর স্টিফেন মিলারের সঙ্গে কাজ করেছি। হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ হিসেবে তার নিয়োগ আমাদের প্রজাতন্ত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বিপজ্জনক ব্যক্তিগত নিয়োগগুলোর একটি। এ বিষয়ে আমার কোনো দ্বিধা নেই।’
শুক্রবার সমালোচনার বিষয়ে জানতে চাইলে হোয়াইট হাউস মিলারকে ট্রাম্পের এজেন্ডা বাস্তবায়নের ‘গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ হিসেবে তুলে ধরে।
এক বিবৃতিতে বলা হয়, ওয়াশিংটন ডিসি ও মেমফিসে অপরাধ দমন, রেকর্ডসংখ্যক নিয়ন্ত্রণমূলক বিধিনিষেধ প্রত্যাহার, যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি খাতের বিকাশ, মাদক চক্র ভেঙে দেওয়া এবং সীমান্ত সুরক্ষায় মিলার নেতৃত্ব দিয়েছেন। নতুন দায়িত্বেও তিনি আমেরিকার জনগণের জন্য ঐতিহাসিক সাফল্য এনে দিতে কাজ করবেন।
নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করে ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন মিলার। এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, প্রেসিডেন্টের সেবা করার সুযোগ পেয়ে তিনি ‘ভাষায় প্রকাশের অতীত সম্মানিত’ বোধ করছেন।
মিলার আরও লেখেন, ‘এখন আমাদের লক্ষ্য আগের চেয়ে স্পষ্ট, প্রেসিডেন্টকে সমর্থন এবং এই মহান প্রজাতন্ত্রকে রক্ষায় সর্বশক্তি দিয়ে লড়াই করা।’
সময়ের আলো/জেডি