জোবায়েদ হোসেন। ছবি : সংগৃহীত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষার্থী ও শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য জোবায়েদ হোসেন হত্যা মামলায় তিন আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেছেন আদালত। এর মধ্য দিয়ে মামলাটির আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হলো।
রোববার (৮ নভেম্বর) দুপুরে ঢাকার ১৫তম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক মুহাম্মদ মাজহারুল ইসলাম আসামিদের অব্যাহতির আবেদন নাকচ করে অভিযোগ গঠনের আদেশ দেন। একই সঙ্গে আগামী ৯ ডিসেম্বর সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য করেন।
মামলার তিন আসামি হলেন জোবায়েদের ছাত্রী বার্জিস শাবনাম বর্ষা, বর্ষার প্রেমিক মো. মাহির রহমান এবং মাহিরের বন্ধু ফারদীন আহম্মেদ আয়লান। তাঁরা গ্রেফতারের পর থেকে কারাগারে রয়েছেন। রোববার শুনানির জন্য তাদের কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়।
বাদীপক্ষের আইনজীবী ইশতিয়াক হোসেন জিপু এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
এর আগে গত ৩০ জুন মামলার তদন্ত শেষে তিনজনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দেয় পুলিশ। বংশাল থানার উপপরিদর্শক ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আশরাফ হোসেন অভিযোগপত্রটি দাখিল করেন। মামলার নথি অনুযায়ী, তিন আসামিই হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, জোবায়েদ হোসেন (২৫) জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি করতেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে বর্ষার বাসায় গৃহশিক্ষক হিসেবে পড়ানোর সুবাদে তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়।
তদন্তে উঠে আসে, বর্ষার সঙ্গে মাহিরের দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। পরে জোবায়েদের সঙ্গেও বর্ষার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তাদের শারীরিক সম্পর্কের বিষয়টি জানতে পেরে মাহির ক্ষুব্ধ হন। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, জোবায়েদের কাছে বর্ষার আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও সংরক্ষিত থাকার অভিযোগ তুলে তাকে হত্যার জন্য মাহিরকে প্ররোচিত করেন বর্ষা। মাহির বিষয়টি তার বন্ধু আয়লানকে জানান। পরে দুজন মিলে হত্যার পরিকল্পনা করেন। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তাঁরা একটি সুইচ গিয়ার চাকু সংগ্রহ করেন এবং বেশ কিছুদিন ঘটনাস্থল পর্যবেক্ষণ করেন।
তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, বর্ষা ও জোবায়েদের মোবাইল ফোন থেকে উদ্ধার করা ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণে তাদের মধ্যে নিয়মিত হোয়াটসঅ্যাপ যোগাযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়। ঘটনার দিন বিকেল ৪টা ২৭ মিনিটে তারা নিজেদের লাইভ লোকেশনও শেয়ার করেন। একই সময়ে বর্ষা ও মাহিরের মধ্যেও একাধিকবার যোগাযোগ হয়। তদন্ত কর্মকর্তার দাবি, পরিকল্পনা অনুযায়ী জোবায়েদের অবস্থান ও চলাফেরার তথ্য মাহিরকে জানাচ্ছিলেন বর্ষা।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, ঘটনার দিন পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী বর্ষার বাসায় পড়াতে যান জোবায়েদ। মাহির ও আয়লান সেখানে আগে থেকেই ওত পেতে ছিলেন। জোবায়েদ ভবনের নিচতলায় প্রবেশ করলে কথোপকথনের কথা বলে তাকে থামান মাহির। একপর্যায়ে তার সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে সুইচ গিয়ার চাকু দিয়ে জোবায়েদের গলায় আঘাত করেন তিনি। গুরুতর আহত জোবায়েদ আত্মরক্ষার জন্য সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠার চেষ্টা করলে তৃতীয় তলার সিঁড়িতে পড়ে যান। পরে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়।
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ১৯ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে বংশাল থানার ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের নুর বক্স লেনের ১৫ নম্বর হোল্ডিংয়ের রৌশান ভিলায় পড়াতে যান জোবায়েদ। ওই দিন সন্ধ্যা ৫টা ৪৮ মিনিটের দিকে বর্ষা জোবায়েদের বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জুনিয়র শিক্ষার্থী সৈকতকে মেসেঞ্জারে জানান, জোবায়েদ স্যার খুন হয়েছেন।
পরে রাত ৭টার দিকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. কামরুল হাসান মুঠোফোনে জোবায়েদের ভাই এনায়েত হোসেনকে বিষয়টি জানান। এনায়েত তার শ্যালক শরীফ মোহাম্মদকে সঙ্গে নিয়ে রাত সাড়ে ৮টার দিকে মোটরসাইকেলে ঘটনাস্থলে যান। ভবনের সিঁড়ি ও দেয়ালে রক্তের দাগ দেখতে পান তারা। তৃতীয় তলার সিঁড়িতে গিয়ে জোবায়েদের রক্তাক্ত মরদেহ উপুড় অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন।
ময়নাতদন্ত শেষে ২০ অক্টোবর কুমিল্লার কৃষ্ণপুর গ্রামে জোবায়েদকে দাফন করা হয়। পরদিন ২১ অক্টোবর সকাল ১০টার দিকে তার ভাই এনায়েত হোসেন সৈকত বাদী হয়ে বংশাল থানায় হত্যা মামলা করেন। ওই দিনই বর্ষা, মাহির ও আয়লান আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। পরে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়। একই মামলায় প্রীতম নামের আরেক ব্যক্তি ওই দিন আদালতে সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন।
সময়ের আলো/জেডি