ছবি : সময়ের আলো ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, ক্যানসার, উচ্চ রক্তচাপ ও কিডনি বিকল— বিশ্বজুড়ে বাড়ছে অসংক্রামক রোগের বোঝা। এসব রোগের কারণে বিশ্বে মোট মৃত্যুর ৭৪ শতাংশ ঘটে। অথচ আক্রান্ত ব্যক্তিদের বড় একটি অংশ জানেন না, তাদের শরীরে বাসা বেঁধেছে প্রাণঘাতী রোগ। প্রতি তিনজন ক্যানসার রোগীর একজনের রোগ মৃত্যুর আগে শনাক্ত হয় না।
বছরে নতুন করে ক্যানসারে আক্রান্ত হন প্রায় ২ কোটি ৬ লাখ মানুষ; এর মধ্যে ৬৫ থেকে ৭০ লাখের রোগ শনাক্ত না হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে আক্রান্ত বিশ্বজুড়ে প্রায় ৮৫ কোটি মানুষ, যাদের অধিকাংশই অসুস্থতার কথাও আগে থেকে জানতেন না।
এ কারণেই এসব রোগকে বলা হয় ‘নীরব মহামারি’। অথচ এসব রোগের ঝুঁকি কাদের আছে তা আগে থেকে জানা গেলে, প্রতিরোধ ব্যবস্থার মাধ্যমে সেসব রোগ ঠেকাতে উদ্যোগ নেওয়া যায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে অসুস্থ হওয়ার আগেই মানুষের বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁঁকি শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে।
এই কাজটিই করছে হংকংভিত্তিক এআই চালিত ও ডেটানির্ভর প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা এবং ফিটনেস প্ল্যাটফর্ম। ৮০টির বেশি রোগের ঝুঁকি নির্ণয়ে সক্ষম এআই স্বাস্থ্য প্রযুক্তি রয়েছে তাদের। ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটি তাদের উদ্ভাবিত অ্যাপসের উদ্বোধন করে। এখন পর্যন্ত ৪০টিরও বেশি দেশে তাদের এই অ্যাপসে নিবন্ধন করেছে প্রায় ৩ লাখ (২ লাখ ৯০ হাজার)। তাদের মধ্যে এই অ্যাপস ব্যবহার করে সেবা নিয়েছেন এমন মানুষের সংখ্যা যেমন আছে তেমনি আছে নতুন নিবন্ধনকারীও।
সম্প্রতি হংকংয়ে সরেজমিনে প্রতিষ্ঠানটির এআই হেলথ অ্যাসেসমেন্ট সেন্টারে প্রযুক্তির ছোঁয়ায় স্বাস্থ্য পরীক্ষার বিভিন্ন পদ্ধতি এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জানা যায়। লিভফরওয়েল জানিয়েছে, বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য একত্র করে সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি বিশ্লেষণ এবং ব্যক্তিভিত্তিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার পরামর্শ দিতে এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়।
এ সময় ইলেকট্রিক্যাল ইম্পিডেন্স টোমোগ্রাফি (ইআইটি) স্ক্রিনিং প্রযুক্তি সম্পর্কেও ধারণা দেন ই-সেন্স ইনোভেশন অ্যান্ড টেকনোলজি লিমিটেডের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ডা. রাসেল চ্যান। প্রযুক্তির কার্যকারিতা, স্বাস্থ্য পরীক্ষার নির্ভুলতা, সেবার খরচ এবং সেবা গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রতিনিধি দলের সদস্যরা বিভিন্ন প্রশ্ন করেন।
লিভফরওয়েলের সহপ্রতিষ্ঠাতা মিরান্ডা ওং এবং ডা. রাসেল চ্যান এসব প্রশ্নের উত্তর দেন। বিভিন্ন দেশের মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থা ও স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে এ ধরনের প্রযুক্তি কীভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে, তা নিয়েও আলোচনা হয়।
লিভফরওয়েলের সহপ্রতিষ্ঠাতা মিরান্ডা ওং বলেন, এশিয়ার বিভিন্ন দেশের প্রতিরোধমূলক চিকিৎসাব্যবস্থা, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার চাহিদা এবং বাজার পরিস্থিতি নিয়ে কাজ করছে তারা। স্বাস্থ্যশিক্ষা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং স্থানীয় পর্যায়ে অংশীদারিত্বের সমন্বয়ে মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী টেকসই সেবা মডেল গড়ে তোলা হবে।
মিরান্ডা ওং আরও বলেন, বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবার পরিবেশ ও সাধারণ মানুষের প্রয়োজন সম্পর্কে আরও জানার পাশাপাশি দেশটির বিভিন্ন খাতের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখতে চায় প্রতিষ্ঠানটি এ সফর ভবিষ্যতে পারস্পরিক যোগাযোগ ও সহযোগিতার নতুন সুযোগ তৈরি করবে। গবেষণা ও তথ্য যাচাইয়ের পাশাপাশি তথ্যের সুশাসন, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সুরক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান মেনে চলার বিষয়টিও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।
ড. রাসেল চ্যান ইলেকট্রিক্যাল ইম্পিডেন্স টোমোগ্রাফি প্রযুক্তিনির্ভর স্বাস্থ্য পরীক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে অবহিত করেন। তিনি ‘ইলেকট্রিক্যাল ইম্পিডেন্স টোমোগ্রাফি’ (ইআইটি) স্ক্যানিং প্রযুক্তির কার্যকারিতা ও নানা ইতিবাচক দিক তুলে ধরেন। এ সময় তিনি তাদের চিকিৎসাকেন্দ্রে এআই প্রযুক্তির সাহায্যে ৫৫টি রোগ নির্ণয়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে রক্ত, প্রস্রাব, মল, কফ, শরীরের কোষ, হাড়ের মজ্জা, বীর্য, লালা এবং সোয়াবসহ বিভিন্ন নমুনা পরীক্ষা করা হয়।
লিভফরওয়েল জানিয়েছে, এশিয়ার প্রথম ডিজিটাল হেলথ ইকোসিস্টেম, যা প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা, এআই এবং আচরণগত উৎসাহের সমন্বয়ে গঠিত। আন্তর্জাতিক মেডিকেল-গ্রেডের ডিভাইস এবং এআই মোশন ক্যাপচার প্রযুক্তির মাধ্যমে এটি শারীরিক অবস্থার মূল্যায়ন ও ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সমাধান দিয়ে থাকে। প্রতিষ্ঠানটির ফ্ল্যাগশিপ সেবা ‘ভিআইভি পাস’ ২৪/৭ স্বাস্থ্য মনিটরিং, এক্সারসাইজ প্রেসক্রিপশন ও ফুড সাপ্লিমেন্টের বিষয়েও পরামর্শ দেয়। এ ছাড়া ‘সুইট পয়েন্ট’ ও ‘ওয়েলসপ’ ব্যবস্থার মাধ্যমে সুস্থ জীবনযাত্রার চর্চাকে পয়েন্ট ও পুরস্কারে রূপান্তর করে ‘মোভ টু আর্ন’ ধারণাকে বাস্তবায়নও করছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই প্রযুক্তি কতটা সুফল বয়ে আনতে পারে এ প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বাস্থ্যসেবায় এআইয়ের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে শুধু প্রযুক্তি নয়, চিকিৎসাব্যবস্থার কাঠামো ও অর্থায়ন পদ্ধতিতেও পরিবর্তন প্রয়োজন। তারা বলছেন, এআইয়ের মাধ্যমে সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি শনাক্ত করা গেলেও সেই তথ্যের ভিত্তিতে সময়মতো চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় প্রযুক্তির সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন হবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে