নান্দনিক কবি ও কথাশিল্পী সিকান্দার আবু জাফর

মঈনুল হক চৌধুরী

আলোর রেখা

সিকান্দার আবু জাফর ছিলেন বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী। কবিতা, উপন্যাস, গান, নাটক, গল্পÑ সৃষ্টিশীল প্রায় সব মাধ্যমেই তিনি বিচরণ করেছেন। প্রবন্ধ

2019-08-09T00:00:00+00:00
2019-08-09T00:00:00+00:00
 
  সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬,
১২ শ্রাবণ ১৪৩৩
সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬
আলোর রেখা
নান্দনিক কবি ও কথাশিল্পী সিকান্দার আবু জাফর
মঈনুল হক চৌধুরী
প্রকাশ: শুক্রবার, ৯ আগস্ট, ২০১৯, ১২:০০ এএম 
সিকান্দার আবু জাফর ছিলেন বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী। কবিতা, উপন্যাস, গান, নাটক, গল্পÑ সৃষ্টিশীল প্রায় সব মাধ্যমেই তিনি বিচরণ করেছেন। প্রবন্ধ লিখেছেন, অনুবাদও করেছেন প্রচুর। তবে সব কিছুতেই তিনি ছিলেন স্বতঃস্ফ‚র্ত। যখন যেটি মনে হয়েছে, স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেছেন, তখন তিনি তাই লিখেছেন। এই বৈশিষ্ট্য ছিল তার ব্যক্তি-স্বভাবের অন্তর্গত। তিনি নিজে ছিলেন অসম্ভব স্বাধীনচেতা মানুষ। তার সৃষ্টিশীল চৈতন্যের মধ্যেও এই প্রবণতা ছিল দৃঢ়ভাবে প্রোথিত। তাই তার জীবন ও কর্মময় সৃষ্টিজগৎ ছিল একই সমান্তরালে- একই চৈতন্য ও বিশ^াসের নানা বিচিত্র বহিঃপ্রকাশ। তিনি তার কাব্যের মূল সুর খুঁজেছেন সমাজ সংঘাতের দুঃখ বেদনার মধ্যে। বক্তব্যে স্পষ্টভাষী এবং মেজাজে বলিষ্ঠ হওয়ার পক্ষপাতী সিকান্দার আবু জাফর। এ ধাঁচটি আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুলের কাব্যাদর্শ থেকে এসেছে। উল্লেখ্য, চল্লিশ দশকে যাদের কবি জীবনের সূত্রপাত তারা জ্ঞাত ও অজ্ঞাতসারে নজরুলের প্রভাব বলয় ছিন্ন করতে পারেননি। তবুও তার বক্তব্যকে অনায়াস নির্ভাবনায় প্রকাশ করতে সচেষ্ট সিকান্দার আবু জাফর। তার সময়ের বিকার ও অন্যায়কে একটি পরিহাস তিক্ততার মধ্যে প্রকাশ করেছেন কবিতায়। সিকান্দার আবু জাফর কোনো নির্দিষ্ট গÐিতে বা ছকে বাঁধা পড়ে থাকেননি। চল্লিশের দশক থেকে কবিতা লিখতে শুরু করেন তিনি। সৃষ্টিশীলতা অব্যাহত রেখে বিশেষ করে সময়ের প্রবাহমানতার সঙ্গে শুধু বিষয়ে নয়, আঙ্গিকের পরিবর্তনেও যোগ স্থাপনে সচেষ্ট। এখানেই তিনি সজীব কবি। তার কাব্যগ্রন্থ ‘কবিতা ১৩৭২’ স্পষ্টতই সিকান্দার আবু জাফরের পালা বদলের উজ্জ্বল স্বাক্ষর। তিনি সংগ্রামে, জাগরণে বারবার ফিরে আসেন অনুপ্রেরণার অভিভাবক হয়ে। কবি সিকান্দার আবু জাফর বাঙালির সেই অনুপ্রেরণার দায়িত্বশীল কবি ও সাংবাদিক। যিনি বাংলার সব থেকে বড় জাগরণের সংগ্রাম মহান স্বাধীনতা আন্দোলনে জাগিয়েছেন অন্য ধারায়। তার লেখনি বারবার শোষণ মেনে নেওয়া জাতিকে দেখিয়েছে মুক্তির সংগ্রামের বিপ্লবী দিশা। তিনি নিজেকে সরাসরি বামপন্থি পরিচয় দিয়েছেন এমন পাওয়া যায়নি সচরাচর। কিন্তু তার লেখার যে বিশেষত্ব তা বামপন্থার শ্রেণি সংগ্রামের সংস্কৃতিকেও স্পর্শ করে। আমাদের দেশে তার পরবর্তী কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর লেখায় এমন নির্দেশনাও পাওয়া যায়। তার সমসাময়িক কবি নির্মলেন্দু গুণের কবিতায় ও এ ধারা আছে। তবে যেসব কবির লেখা আমাদের অনেক বেশি আন্দোলিত করে তাদের মধ্যে সিকান্দার আবু জাফর অন্যতম। যিনি বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বিশাল অধ্যায় রচনা করেছেন। সিকান্দার আবু জাফর ছিলেন বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী। তিনি একাধারে কবি, গীতিকার, নাট্যকার, কথাসাহিত্যিক, অনুবাদক এবং সর্বোপরি সাংবাদিক। সাহিত্যিক হিসেবে সিকান্দার আবু জাফর যতটা প্রসিদ্ধ ছিলেন তার চেয়ে বেশি ছিলেন একজন পত্রিকা সম্পাদক হিসেবে। বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে সিকান্দার আবু জাফর বিশাল অধ্যায় রচনা করেছেন। আমরা যে মুক্তচিন্তার স্বাধীন বাংলাদেশ পেয়েছি তার মূলে ছিল তার কণ্ঠস্বর এবং তার সম্পাদিত ‘সমকাল’ পত্রিকার নানা উদ্দীপনামূলক নিবন্ধ।
সিকান্দার আবু জাফর ১৯১৯ সালের ১৯ মার্চ সাতক্ষীরা জেলার তালা উপজেলার তেঁতুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। কী যে অদ্ভুত মিল! বাঙালির জাতীয় নেতৃত্ব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তার রয়েছে অদ্ভুত এক মিল। তাদের দুজনের রয়েছে সংগ্রামী বর্ণিল জীবন। দুজন মফস্বল থেকে উঠে শুধু নগর নয়, জাতির পথনির্দেশনা দিয়েছিলেন। তাদের দুজনের জন্ম-মৃত্যু মাসও একই। কবির পিতা সৈয়দ মঈনুদ্দীন হাশেমী ছিলেন একজন
কৃষিজীবী ও ব্যবসায়ী। স্থানীয় বিডি ইংরেজি স্কুল হতে প্রবেশিকা পাস করে কলকাতায় বঙ্গবাসী কলেজে ভর্তি হন এবং কিছুকাল এ কলেজে অধ্যয়ন করেন। সিকান্দার আবু জাফর ছাত্রজীবনেই সাহিত্যচর্চা শুরু করেন এবং সেই সঙ্গে সাংবাদিকতার প্রতি আকৃষ্ট হন। কর্মজীবনের শুরুতে ১৯৪১ সালে কাজী নজরুল ইসলাম সম্পাদিত কলকাতার ‘দৈনিক নবযুগ’ পত্রিকায় সাংবাদিকতার মধ্যদিয়ে তার কর্মজীবন শুরু হয়। দেশ বিভাগের পর তিনি ঢাকায় চলে আসেন। পঞ্চাশের দশকে রেডিও পাকিস্তানের শিল্পী হিসেবে কাজ করেন। ১৯৪৮-৫৩ পর্যন্ত তদানীন্তন রেডিও পাকিস্তানে স্টাফ আর্টিস্ট ছিলেন। এরপর ১৯৫৩ সালে ‘দৈনিক ইত্তেফাকে’র সহযোগী সম্পাদক এবং ১৯৫৪ সালে ‘দৈনিক মিল্লাতে’র প্রধান সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৭ থেকে আজীবন দেশের প্রগতিশীল সাহিত্য আন্দোলনের অন্যতম মুখপাত্র ‘সমকাল’ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন। ১৯৫৭ সাল থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তিনি সাহিত্য পত্রিকা ‘সমকালে’র প্রকাশক ও সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি তার ‘সমকাল’ পত্রিকা ব্যবহার করতেন দেশ ও জাতির কল্যাণে। এ পত্রিকার মাধ্যমে তিনি ত্রিশোত্তর ধারার প্রগতিশীলমুক্ত সাহিত্য ধারার বিকাশ, আন্দোলন এবং নতুন লেখক সৃষ্টিতে প্রেরণা দান করেন। শুধু সাহিত্যিক হিসেবেই নয়, সাহিত্য পত্রিকা মাসিক সমকালের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হিসেবেও সিকান্দার আবু জাফরের অবদান স্মরণীয়। একজন বিপ্লবকামী কবি হিসেবে অসংখ্য গণসংগীত লিখে তিনি খ্যাতি অর্জন করেন। তার রচিত নাটক ‘সিরাজউদ্দৌলা’ সারা বাংলায় অত্যন্ত জনপ্রিয়তা লাভ করে। বিদ্রোহী কবি নজরুলের পরে সিকান্দার আবু জাফর ছিলেন নজরুল চরিত্রের দ্বিতীয় একজন। শুধু স্বাধীনতা সংগ্রাম নয় তার রচিত গান বাঙালির মুক্তির সংগ্রামেই প্রেরণা জুগিয়েছে। বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ এবং সাহসী সম্পাদক সিকান্দার আবু জাফর সময় দ্বারা আন্দোলিত হয়েছিলেন এবং তার লেখার মাধ্যমে জনসাধারণকে উজ্জীবিত করার প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন। বাংলা সাহিত্যের উন্নত ধারায় যেসব গুণীসাহিত্যিকের কথা স্মরণে আসে তাদের মধ্যে সিকান্দার আবু জাফর অন্যতম। তিনি আমাদের সাহিত্যাঙ্গনের ভিত রচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করেন। তৎকালীন পূর্ব বাংলায় বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও সংস্কৃতি চর্চার যে ধারা প্রবাহিত হয় সিকান্দার আবু জাফর ছিলেন তার অন্যতম পৃষ্ঠপোষক। পাকিস্তান সরকার রেডিও ও টিভিতে রবীন্দ্র সংগীত প্রচার বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিলে তিনি তার তীব্র বিরোধিতা করেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় তিনি স্বাধীন বাংলা সরকারের পক্ষ নিয়ে উল্লেখযোগ্য ভ‚মিকা পালন করেন। একজন সংগ্রামী কবি হিসেবে অসংখ্য গণসংগীত লিখে তিনি খ্যাতি অর্জন করেন। তার রচিত গান ‘আমাদের সংগ্রাম চলবেই’ মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যাপকভাবে অনুপ্রাণিত করে। আদ্যোপান্ত বাঙালি সিকান্দার আবু জাফর ছিলেন স্বাধীনতার জন্য উদগ্রীব একজন মানুষ। তার কবিতায় যুগ যন্ত্রণা বলিষ্ঠভাবে প্রতিফলিত হয়। তিনি ছিলেন অবিশ^াস্য সাহসের অধিকারী একজন মানুষ যার প্রমাণ পাওয়া যায় তার রচিত ‘বাঙলা ছাড়ো’ কবিতায়। ‘বাঙলা ছাড়ো’ কবি সিকান্দার আবু জাফরের একটি অসাধারণ কাব্য গাথা। রক্তচোখের আগুন মেখে ঝলসে যাওয়া আমার বছরগুলো/আজকে যখন হাতের মুঠোয় কণ্ঠনালীর খুন পিয়াসী ছুরি/কাজ কি তবে আগলে রেখে বুকের কাছে কেউটে সাপের ঝাপি/আমার হাতেই নিলাম আমার নির্ভরতার চাবি/ তুমি আমার আকাশ থেকে সরাও তোমার ছায়া/ তুমি বাংলা ছাড়ো। (সংক্ষেপিত)
সিকান্দার আবু জাফরের রচিত নাটক সিরাজউদ্দৌলা, শকুন্তলা উপাখ্যান, মহাকবি আলাওল ইত্যাদি। উল্লেখ্য ১৯৬৬ সালে তিনি নাট্যসাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। তার রচিত উপন্যাস, মাটি আর অশ্রæ, পূরবী, নতুন সকাল ইত্যাদি। গল্পগ্রন্থ : মতি আর অশ্রæ। কিশোর উপন্যাস : জয়ের পথে, নবী কাহিনি ইত্যাদি। অনুবাদ : রুবাইয়াৎ ওমর খৈয়াম, সেন্ট লুইয়ের সেতু, বারনাড মালামুডের জাদুর কলস, সিংয়ের নাটক ইত্যাদি এবং গানের মধ্যে মালব কৌশিক উল্লেখযোগ্য। সহজ সৌন্দর্যই সিকান্দার আবু জাফরের কথাশিল্পের প্রাণশক্তি। জীবন সম্পর্কে আন্তরিক দৃষ্টি, মৃত্তিকাস্পর্শী জীবনের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা, দরিদ্র ও নিপীড়িত মানুষের জন্য সহৃদয় সহানুভ‚তি ও বর্ণনার সারল্যের কারণে তার
কথাসাহিত্য পাঠক হৃদয়ে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
 সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক




Loading...
Loading...
আলোর রেখা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: