প্রকাশ: শুক্রবার, ২০ ডিসেম্বর, ২০১৯, ১২:০০ এএম (ভিজিট : ২৯৫)
খুব ভোরবেলাÑ সুরুয ওঠার পরপর হোটেল থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে আসি মনুমেন্ট উত্থিত সবুজ ঘাসের মলে। রাজধানীর যান চলাচল এখনও জমে ওঠেনি, সড়কে জগিং করনেওয়ালাদের পাশ কাটিয়ে, প্রায় নির্জন রাস্তায় জ্বলতে নিভতে থাকা ট্র্যাফিক বাতিগুলোকে ইগনোর করে, ওয়াশিংটন ডিসির ফটোজেনিক ইমারত ক্যাপিটল হিলকে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে মর্নিংওয়াকের কদমচালে চলে আসি জেফারসন মেমোরিয়ালের কাছাকাছি। মেমোরিয়ালের ঠিক সামনেই টাইডেল বেসিন বলে একটি কৃত্রিম হ্রদের জলে জড়িয়ে আছে রুপালি ধূসর কুয়াশা। আমার হাতের মুঠোয় ধরা কফির মগ থেকেও উঠছে তাজা ভাপ। একটু হাঁপিয়ে উঠেছি, তাই কোথাও বসে একটু কফি খেয়ে নিতে হয়। মেমোরিয়ালের মার্বেল পাথরের সিঁড়ি বেয়ে দু’ধাপ ওপরে উঠি। এখান থেকে আপার লেয়ারে ডোমের নিচে জেফারসনের বিশাল ব্রোঞ্জমূর্তিটি পরিষ্কার দেখা যায়। হ্রদের রুপালি বাতাবরণে বাসন্তী রঙের সুরুয যেন অতিকায় ডিমপোচ হয়ে প্রতিফলিত হচ্ছে। রোদচশমা নিয়ে বেরোইনি, তাই শ্বেতমার্বেলের সোপানে বসে লেকের দিকে তাকিয়ে থাকা মুশকিল হয়। তাই আরও কয়েক কদম হেঁটে চলে আসি টাইডেল বেসিনের চেরিগাছের ছায়াময় হাশিয়ায়।
এখানে ছোট্ট একটি বাগিচার ডিজাইন আমাকে খুব করে এটরাক্ট করে। ল্যান্ডস্কেপের নকশাটি সম্পূর্ণ বৃত্তাকার। ঠিক ঢোকার মুখে ম্যাগনোলিয়ার দুটি ম্যাচিওর তরু যেন বলনৃত্যে যাওয়ার জোশ নিয়ে সেজেছে খুব করে। তাদের শুভ্র গাউনে লেসের ফুল্ল এমব্রয়ডারিতে উপচে পড়ছে ফিকে গোলাপি সব পুষ্প। আমি ঝরা ফুল মাড়িয়ে ঢুকে পড়ি বৃত্তের ভেতরভাগে। এখানে সবুজ কোনো ঝোপ ছেঁটে তৈরি করা হয়েছে গোলাকার ব্যাকগ্রাউন্ড। কাছেই পায়ে চলা নুড়িপাথরময় পথের এপাশে অল্প নিচু আরেকটি বন্ধনী। এই গোল ঘেরাটোপে ফুটে আছে ফ্রসেনথিয়া ফুলের সম্পূর্ণ সোনালি ঝাড়। বাগিচার ভেতরে আরশির মতো একটি রিফ্লেকশন পুল ধ্বনিময় হয়ে আছে ফোয়ারার জল ঝরে ঝরে।
আমি এবার হেঁটে হেঁটে চলে আসি মর্নিংগেøারির নীল ফুলে ফুলে ছাওয়া ট্রেলাসে। তার পিছনদিকে সিমেন্টের সাদামাটা বেঞ্চে বসে যুক্তরাষ্ট্রের এক যশস্বী রাজনৈতিক জন মেসন সাহেব। ছড়িটি পাশে রেখে বসে আছেন ভদ্রলোক; লিবারেল মতাদর্শের জন্য বিখ্যাত ছিলেন তিনি, ভালোবাসতেন প্রকৃতি। অনেক বছর কাজ করেছেন এনভায়রনমেন্ট প্রিজারভেশনের জন্য। তার ব্রোঞ্চের দেহের দিকে তাকিয়ে মনে হয়, যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে বিস্তর বিতর্ক করে ক্লান্ত হয়ে তিনি বেরিয়েছেন আফটারনুন ওয়াকে। বয়সও হয়েছে, আর সূর্যও অস্ত যাচ্ছে, তাই বেঞ্চে বসে একটু জিরিয়ে নিচ্ছেন।
একটু তাজ্জব লাগে ড্যাফোডিলের একঝাঁক শিশিরমাখা কলির দিকে তাকিয়ে! ¯িপ্রং সিজন এখনও ঠিক আসেনিÑ এ ফুলগুলোকে একটু আর্লি মনে হয়। আরও অবাক লাগে, কেয়ারির পাশে দাঁড় করিয়ে রাখা একটি হেভি ডিউটি হুইলচেয়ার দেখে। এ হুইলচেয়ারে মোটর লাগানো আছে। এটা চেপে ঘুরে বেড়ানো যায় মাইলকে মাইল। জনহীন হুইলচেয়ারের ছত্রীতে ছড়ানো কিছু দানা। টুকটুক করে তা খুঁটে খাচ্ছে দুটি ছানাপোনা নিয়ে একটি মা রবিন পাখি। সিটে রাখা ইনজেকশনের সিরিঞ্জ, ক্যাপসুলের স্ট্রিপ আর ছত্রীর ডাঁটিতে আটকানো অক্সিজেনের সিলিন্ডার। তা হুইলচেয়ারের আরোহী মহোদয় গেলেন কোথায়?
তাকে পাওয়া যায় বার্নিংবুশ ঝোপের আবডালে একটি বেঞ্চে। বয়স্ক লোক, খানিক আধশোয়া হয়ে ফ্যাল্টহ্যাটের ব্রিম নামিয়ে তেরচা সূর্যালোক থেকে চোখ বাঁচাচ্ছেন। পাশে বড়সড় চীনাবাদামের প্যাকেটটি খোলা। খোসা ছড়িয়ে তিনি তা খাওয়াচ্ছেন কোলে বসা একটি কাঠবিড়ালিকে। তার অন্যপাশেও পায়ের কাছে পিছনের দু’পায়ের ওপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আরও দুটি কাঠবিড়ালি। তারা লেজ কুঁকড়িয়ে অপেক্ষা করছে কখন তাদের বাদাম খাওয়ার টার্ম আসবে। ভদ্রলোক আমার উপস্থিতি টের পেয়ে ফ্যাসফেসে গলায় কাশতে কাশতে বলেন, ‘গুডমর্নিং, তুমি আমার পাশে বসতে পারো। এ বাগিচায় এটাই একমাত্র খালি বেঞ্চ। অন্যটায় তো জন মেসন বসে বসে ডে-ড্রিমিং করছেন। তাকে ডিসটার্ব করার কোনো মানে হয় না।’ আমি তার পাশে বসতে গেলে কাঠবিড়ালি লাফ দিয়ে ঘাসে নেমে পিছনের দু’পায়ে ভর দিয়ে সামনের দু’পা দিয়ে ছুলে ছুলে বাদাম খায়। তিনি বলেন, কয়েক বছর আগে আমি যখন এ বাগিচার ল্যান্ডস্কেপিং করি, তখন থেকে এখানকার কাঠবিড়ালি ও পাখিদের সাথে পরিচয়। আজকাল একেবারে একা হয়ে গেছি, আসতে তো চাই প্রতিদিন। কিন্তু হার্টের অবস্থা ভালো যাচ্ছে না, তাই আসাও হয় না। বলে ভদ্রলোক নেবুলাইজার দিয়ে ভেনটোলিন জাতীয় কোনো মেডিসিন ইনহেইল করে একটুক্ষণ হাঁপিয়ে বলেন, আমার পার্টনারÑ মাই ওল্ড লেডি পাস হয়ে যাওয়ার পর প্রতিদিনই একবার করে এখানে এসে কাঠবিড়ালিদের খাইয়ে যেতাম। কিন্তু হার্টে থার্ড অ্যাটাকের পর আর আসতে পারছি কই? ডাক্তার বলেছে আর বড়জোর মাস ছয়েক, আবার হতে পারে আট কিংবা নয় মাস। এখন ঘরে বসে বসে, শেষের সে দিনÑ হ্যাঁ, আই মিন-ফিউনারেলের প্ল্যান করি। আমার সময়ের কেউ আর বিশেষ বেঁচে নেই, যারা আছে তারাও আর এদিকে থাকে না। কাঠড়িালিরা তো আর ফিউনারেলে চার্চে গিয়ে আমাকে গুডবাই বলতে পারবে না। তাই এখন থেকে যাকে পাচ্ছি তাকে আমার ফিউনারেলের জন্য অগ্রিম দাওয়াত দিয়ে রাখছি। বুঝলে... ফোর্থ অ্যাটাক আসবে খুব শিগগির। তখন তো কাউকে বলার সুযোগ হবে না।
আরেকটি হুলা কাঠবিড়াল গাছের ডাল থেকে দোল খেয়ে নেমে আসে তার ঘাড়ের কাছে। তিনি তার লোমে হাত বুলাতে বুলাতে বলেন, ‘তোমাকে কি আমার ফিউনারেলের জন্য অগ্রিম দাওয়াত দিতে পারি? কিছু ভেবো না, শেষ অনুষ্ঠানের অ্যারেঞ্জমেন্ট হবে উইকএন্ডে, রবিবারে চার্চের সার্ভিসের পর। তোমাকে অফিস ফাঁকি দিতে হবে না। ওই যে সোনালি ফ্রসেনথিয়ার ঝোপ দেখছÑ আমার কফিনের ওপর রাখা থাকবে শুধু তারই এক গুচ্ছ। আর যদি রাইট সিজনে মারা যাই, তাহলে হয়তো একটি বা দুটি মর্নিং গেøারির নীল ফুল। দ্যাটস ইট। তুমি ঘণ্টাখানেকের জন্য ফিউনারেলে আসতে পারবে না?’ মানুষটি চোখে অনুনয় নিয়ে আমার দিকে তাকালে আমি দাওয়াত গ্রহণ করতে রাজি হই। ভদ্রলোক হাঁপাতে হাঁপাতে পকেট থেকে একটি নোটবুক বের করে আমাকে টেলিফোন নাম্বার ও ইমেইলের অ্যাড্রেস লিখতে বলেন। আমি তা লিখতে গেলে তিনি বলেন, ‘আমার কেয়ার-গিভারের কাছে তোমার অ্যাড্রেস থাকবে। ওয়ান্স আই অ্যাম ডান, আমার হয়ে গেলে সে তোমাকে টেলিফোন করবে। ডু কাম, আসবে কিন্তু প্লিজ!’