সিকদার আমিনুল হক (১৯৪২-২০০৩) সমকালীন বাংলা কবিতাঙ্গনে একটি উজ্জ্বল নাম। কাল বিবেচনায় তিনি ষাটের কবি বলে বিবেচিত। গত শতকের ‘ষাটের দশক’ নানা কারণে, এই উপমহাদেশ এবং বৈশি^ক বিবেচনায় ভাষা গড়ার ইতিহাস হয়ে আছে। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে দুটি ভয়াবহ বিশ্বযুদ্ধ সভ্যতার চলার পথের মাটি কাঁপিয়ে দিয়েছিল। মানবমনে উত্থিত হয়েছিল নানা প্রশ্ন। বিশেষ করে রাষ্ট্রনেতা, সমাজ বিশ্লেষক, মানবাধিকারের পক্ষাবলম্বী মানুষের মনে, মনের অজান্তে একটি প্রশ্ন ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছিল যে, তাহলে মানবসভ্যতার ধ্বংস কি আসন্ন? যে প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না। যে প্রশ্নের উত্তরে কোনো আশাচিহ্ন নেই, সেই প্রশ্নভারে মানুষের সত্য হতাশা, ক্রোধ এবং আত্মক্ষয়ের বিষবীজ লুকিয়ে থাকাটাই স্বাভাবিক। দুটি বিশ্বযুদ্ধে অভিঘাতে বিশ্বব্যাপী যে উন্মাতাল ঝড়ঝঞ্ঝার জন্ম হয়েছিল তার প্রভাব আমাদের আর্থ-সামাজিক সাংস্কৃতিক প্রবাহকে কিছুটা হলেও উৎকণ্ঠিত করেছিল। গত শতকের মধ্যভাগে দেশভাগ ছিল এ অঞ্চলের মানুষের জন্য একটি অভিঘাত। হাজার বছরের সাংস্কৃতির ইতিহাস-ঐতিহ্য অবজ্ঞা করে শুধু ধর্মীয় অভিন্নতার কথা বলে একটি অদ্ভুত রাষ্ট্রের জন্ম হলো। দেশটির পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে হাজার মাইলের ফারাক। ভাষা, সংস্কৃতির ব্যবধানটা ছিল বিষের কাঁটার মতো। এমন অস্বাভাবিকতার পরিণতি যা হওয়ার তাই হলো। দেশের পশ্চিমাঞ্চল আবিভর্‚ত হলো শোষক হিসেবে। অবিশ্বাস, অনাস্থার ফাটল দিনে দিনে বাড়তেই থাকল। বড় আঘাতটি এলো বায়ান্নতে। কথিত স্বাধীনতা লাভের পরপরই আঁচ করা যাচ্ছিল আগ্রাসন, শোষণের ষড়যন্ত্রগুলো। আঘাত একেবারে জাতিসত্তার অস্তিত্বের ওপর, মাতৃভাষা বদলে দেওয়া। আর যাই হোক,
মাতৃভাষার প্রশ্নে আপসের কোনো সুযোগ নেই। পূর্ব বাংলার মানুষ মাতৃভাষার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াল। উন্মেষ ঘটল বাঙালি জাতীয়তাবাদের। সেই স্রোতধারা বহু বাঁক ঘুরে পৌঁছল মুক্তিযুদ্ধে। যুদ্ধজয়ের প্রাপ্তি মহান স্বাধীনতা। উল্লিখিত বৈশ্বিক এবং দেশীয় আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে, সংশ্লিষ্টতায় এদেশের সাহিত্যাঙ্গনও আলোড়িত হয়েছে। ইতিহাসের বিশালতায় যারা মানবসন্তান, সিকদার আমিনুল হক তাদেরই একজন।
চল্লিশ-পঞ্চাশ দশকের পটভ‚মিতে, ষাট দশকের যে প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল, ষাটের কবি-লেখকরা তাদের ভাবনায় চিন্তায় আকাক্সক্ষায় নতুন এক সংবেদনা তৈরি করেছিলেন। ফলে তাদের কাব্যভাষা, উচ্চারণ ইত্যাদিতে কেবল কালের উত্তাল সামগ্রিকতা শনাক্ত করা যায়। অনেকের মতো সিকদার আমিনুল হকের কবিতায় ক্ষয়ক্ষতি ক্ষরণচিহ্ন দেখা যাবে এটা স্বাভাবিক। কিন্তু প্রতিটি সৃষ্টিশীল মানুষই সামগ্রিকতার মধ্যে থেকেও নিজস্বতায় যুক্ত। সিকদার আমিনুল হকের প্রথমদিকের কবিতায় উচ্চারণের অসংলগ্নতা দেখা যাবে। কিন্তু এর পরিধি খুব বিস্তারিত নয়। তার প্রথম কাব্য ‘দূরের কার্নিশ’ যখন বেরুল, বাংলা কবিতার পাঠক শুনতে পেলেন এক নতুন কাব্যঝঙ্কার। ওই গ্রন্থের কোনো কোনো কবিতায়, অনুজ্জ্বল দূরবর্তী হলেও বর্ণনা অভিনবত্বের ইঙ্গিত পাওয়া গেল। দ্বিতীয় কাব্য ‘তিন পাপড়ির ফুল’-এ এসে অভিনবত্বের আভাষটি যথেষ্ট স্পষ্ট হলো, হলো পরিমিলনের পথরেখা। বলা যায়, এরপর থেকে সিকদার আমিনুল হককে আর দ্বিধা-জড়তায় থাকতে হয়নি। পেয়ে গেছেন নতুন একটি কাব্য সরণি। মগ্নতার চৈতন্যলোকে উচ্চারণ করেছেন বাংলা শব্দমাধুর্যের অভিনবত্ব, শক্তি ও সৌন্দর্যের রূপময়তা। বাংলা কবিতার ছন্দ ঐতিহ্যের ধারক হয়েও তিনি নতুন এক ছন্দপ্রকরণ উদ্ভাবন করেছেন। টানা গদ্যের কবিতা বা ‘ফ্রিভার্স’ বলতে আমরা কাব্যধারার সঙ্গে পরিচিত, তিনি এতে যোগ করলেন অভিনবত্ব। টানা গদ্যে লেখা, অথচ বাংলা কবিতার যে ছন্দলাবণ্য, তা অন্তঃস্রোতস্বিনীর মধ্যে সতত প্রবাহিত। নিজস্ব কাব্য সরণিতে তিনি পরিভ্রমণ করেছেন নিভৃত, নির্ভার, নিয়ত মগ্নতায়। দীর্ঘ তার নির্মিত কবিতা সরণি। লক্ষ করা যাবে, সিকদার আমিনুল হক তার কবিতা ভ্রমণে, যেতে যেতে বপন করেছেন বিচিত্র বৃক্ষ, রপন করেছেন ফুলবীজ, ফলবীজ। বৃক্ষ থাকলে থাকবে হাওয়ার হিল্লোল, সবুজ শাখাপত্র, পাখির আনাগোনা, বসবাস, ফুল-ফলের সমাহার। বপিত বীজে জন্মের নতুন সম্ভাবনার নতুন বৃক্ষ-লতা-গুল্ম। সিকদার আমিনুল হকের কবিতা সরণির দীর্ঘ অগ্রসরতায় পাওয়া যায় এমনি নানা সমৃদ্ধির আয়োজন।
অকালমৃত্যুর পর সিকদার আমিনুল হককে নিয়ে দীর্ঘ একটি কবিতা লিখেছিলেন তার অগ্রজ কবি সৈয়দ শামসুল হক। কবিতাংশের এক জায়গায় আছে, ‘তোমার মতো কেউ কবিতা লিখত না, লিখবে না।’ একটি ছোট কাব্যবাক্যে বিস্তারিত আছে কবি সিকদার আমিনুল সম্পর্কে উজ্জ্বল মূল্যায়ন। সৈয়দ শামসুল হকের ইঙ্গিতময়তার অপ্তবাক্যটির মতো উপলব্ধি করেছেন সিকদার আমিনুল হকের পাঠককুল। তার স্বতন্ত্র কাব্যস্বর তার কাব্যস্বভাব ও শরীরের স্বাতন্ত্র্য। বাংলা কবিতার পাঠক, বিদগ্ধ সমালোচক, অনুসন্ধানী গবেষক সবাই কবুল করেছেন। দেশকে ধারণ করেছেন, বেদনায় রোদনে আনন্দে হাস্যে বিশ্বভাষার বহুমাত্রিকতা প্রবাাহিত আছে সিকদার আমিনুল হকের কবিতার শিরায়-উপশিরায়।
নানা খর্বতার ভেতর আমাদের বসবাস। আকাশ ঢেকে যায় স্বার্থের শামিয়ানায়, বাতাস বিষাক্ত হয় লোভের পোড়াগন্ধে। সিকদার আমিনুল হক এ সমাজেই বাস করতেন। বিত্তের বৃত্তে ঘুরপাক খাওয়া মানুষের পার্শ্ববর্তী থেকেও নিজেকে রেখেছেন কলুষমুক্ত, সহজ, স্বচ্ছ। কবিতাকে রেখেছেন আরও নিরাপদস্থলে। ফলে তার কবিতা হয়ে উঠেছে শিল্পসুষমায় মোড়ানো নতুন অভিজ্ঞতা। তিনি ছিলেন শিল্পের ঋজুরেখা আঁকায় মগ্ন এক কবি। তার দেখা বিষয়, অভিজ্ঞতার সঙ্গে রেখাবদ্ধ করতে পারতেন না দেখা বিষয় না লাভ করা অভিজ্ঞতার ছোঁয়াটুকু। সংকেতময়, ইঙ্গিতধর্মিতা কবিতার আবরণ এবং আভরণ। বাস্তবতা এবং পরাবাস্তবতার মধ্যে বিভেদরেখা তিনি প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিলেন তার কবিতা অবয়ব থেকে। থাকা এবং না থাকার ফারাকটা উপলব্ধির স্বচ্ছতার কারণে প্রায় একই বিন্দুতে, অনেক ক্ষেত্রে, পৌঁছে গেছে।
সিকদার আমিনুল হক ছিলেন কবিতাগ্রন্থ মানুষ। কবিতা ছাড়া অন্য কিছুই তিনি ভাবতে পারতেন না। বেঁচে থাকার শেষের দিকে অন্তত দুই দশক তিনি কবিতার বাইরে কোনো বিষয়ে যুক্ত ছিলেন না। কবিতা আর কবিতা, আরও আরও কবিতা। তার সকাল হতো কবিতা দিয়ে, ঘুমের আগে কবিতা, ঘুম জাগরণে তাও কবিতা। তিনি বলতেন, অন্তত এক লাইন কবিতা না লিখে একদিনও নয়। নিজের জীবনে এ আপ্তকথা বাস্তবায়িত করেছেন।
নিমগ্ন, নিবেদিত কবি সিকদার আমিনুল হক জীবদ্দশায় লেখালেখির জন্য খুব একটা আলোচিত হননি। কবিতায় প্রাখর্য থাকলেও নিজের অবস্থান ঠাঁই হয়েছে সহযাত্রী অগ্রজ-অনুজ কবি-লেখকের অবজ্ঞার অন্ধকারে। বাংলা একাডেমি পুরস্কার মিলেছে জীবনের অন্তিম সময়ে এসে। সেই অবজ্ঞার ধারা এখনও আছে। এই কবির প্রয়াণ ঘটেছে তাও দেড় যুগ হতে চলেছে। আজও মেলেনি একুশে পদক । আামরা চাই, বরণ্য এ কবি মরণোত্তর একুশে পদক দেওয়া হোক।
কবি