ছোবল

সনোজ কুন্ডু

আলোর রেখা

চৈত্রের মাটিফাটা খাঁ খাঁ দুপুর। কুমারও যেন মরা গাঙ। মাঝে মাঝে কিছু জায়গায় হাঁটুজল নদীর অস্তিত্ব নিয়ে বেঁচে আছে। যেখানে

2019-12-20T00:00:00+00:00
2019-12-20T00:00:00+00:00
 
  সোমবার, ৮ জুন ২০২৬,
২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
সোমবার, ৮ জুন ২০২৬
আলোর রেখা
ছোবল
সনোজ কুন্ডু
প্রকাশ: শুক্রবার, ২০ ডিসেম্বর, ২০১৯, ১২:০০ এএম   (ভিজিট : ৩৪৩)
চৈত্রের মাটিফাটা খাঁ খাঁ দুপুর। কুমারও যেন মরা গাঙ। মাঝে মাঝে কিছু জায়গায় হাঁটুজল নদীর অস্তিত্ব নিয়ে বেঁচে আছে। যেখানে গরু-ছাগল গোসলে নামতেও মুখ গোমড়া করে ফিরে আসতে চায়। বেওয়ারিশ দু’চারটে কুকুর মাঝেমধ্যে ঝুপুত-ঝাপুত ডুবসাঁতার খেলে শরীরের তাপ জুড়ায়। কিছু ছাইরঙা ব্যাঙ স্থায়ী বসতি গড়ে নিশ্চিন্তে হাবুডুবু খায়। পড়ন্ত বিকেলে বকপাখির ঝাঁক আহারের খোঁজে শূন্য থেকে নিচে নেমে পায়ের পাতা ভিজিয়ে ফুরুৎ উড়ে যায়। ভাগ্য মন্দ হলে শিকারির পেতে রাখা ফাঁদে কেউ মরণ যন্ত্রণায় ছটফট করে।
দিনের আয়ু ফুরিয়ে আসে। লাল সূর্য তখন সবটুকু পশ্চিমে।
একদল যুবক খেয়াঘাটের কাছে চারঠ্যাঙা বাঁশের পায়ে দাঁড়ানো চায়ের দোকানে আড্ডা দিচ্ছে। চায়ের কাপে তখন মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতা উছলে পড়ে। উত্তপ্ত ধোঁয়ার মতোই গরম দেশটা। টিক্কা খানকে কাছে পেলে এ মুহূর্তে তারা আস্ত গিলে খেতে পারে। খান সেনারা এ গ্রামে ঢুকলে রক্ষা নেই! কুচি কুচি করে কেটে লবণ মেখে কুত্তা দিয়ে খাওয়াবে।
ঠিক সে মুহূর্তেই গোপালগঞ্জের এসডিও রকিবুল হাসানের মোটরসাইকেলটা দোকানের কাছে এসে থামে। মুখে তার একরাজ্য মেঘ। চোখ জুড়ে চিন্তার জলছাপ। আতঙ্কে শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে চায়। মাথার টুপি বাইকে ঝুলিয়ে একদমে গলগল করে বলে যান পিলে চমকানো কিছু অশুভ সংবাদÑ ‘পাকসেনা আসছে। যেকোনো মুহূর্তে গ্রামে ঢুকে পড়বে। তোমরা রাস্তায় ব্যারিকেড দাও। কাঠের পুল ভেঙে দাও। উজানী তিনরাস্তা মোড়ে গাছ কেটে চলাচল বন্ধ করো। কথাগুলো তরতর করে বলে সাঁই সাঁই গতিতে চলে গেলেন।
এই দুঃসংবাদ সবার বুকে কাঁপন ধরায়। কারও পা চলছে না। স্থির বিমনা দাঁড়িয়ে থাকে। কী ফেলে কী করবে? কী করলে ভালো হয় কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।
তখনই গোপ্তরগাতী থেকে ছুটে আসে কমান্ডার জাফর মল্লিক। সাথে কাশালিয়ার হানিফ সিকদার, আয়নাল হক ও পরেশ বৈরাগী। একটা চিঠি প্রমথ সরকারের হাতে দিয়ে মুকসুদপুরের দিকে ছুটে যায় তারা।
অথচ একজন মানুষ দিব্যি আড়ালে দাঁড়িয়ে ঠোঁট টিপে হাসছেন। প্রমথ, দুলু লস্কর, সিরাজ ভাইদের গা ঘেঁষে দাঁড়ায় সেই সুখী মানুষটি। নাম তার নজর আলী। নিশ্চিন্তপুরের চেয়ারম্যান। মুসলিম লীগের একজন অন্ধ সমর্থক। মুখে তার মসলা মাখা পান। ফুচ করে পানের পিক ফেলে জিহŸা দিয়ে ঠোঁট চেটে তার অভয়বাণী শোনায়Ñ ‘ও মিয়া-মশাইরা, আমি তুমাগো চিয়ারমেন। আমার উপর ভরসা নাই? তুমরা ওই সরকারি চামচা এসডিও সাহেবের কথা শুনবা? বাড়িতে যাও। চিন্তা হইরো না। খালি খালি রাস্তাঘাট নষ্ট হরার কাম নাই। পাকসেনা আসলি আমি দ্যাখপানে।’
সে রাতে কারও চোখের পাতা এক হয়নি। হাতের কাছে যে যা পেয়েছে লাঠি-কোদাল-রামদা-কাস্তে নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়ে। গভীর রাতে প্রমথ এসে আরও খারাপ খবর দেয়। নজর আলীর বাড়ির দোতলা টিনের চালে পতপত করে উড়ছে পাকিস্তানি পতাকা। তার বারান্দায় হায়দার মোল্লা, মাজহার মুন্সী, মসজিদের ইমাম, সোহরাব লস্করসহ কিছু পাতি রাজাকার জটলা বেঁধে গোপন বৈঠক করছে। নজর আলী সবার কানে কানে কী এক বীজমন্ত্র দেবার সাথে সাথেই সবার চোখ-মুখ চকচক করে ওঠে। বিপ্লবরেখা ফুটে ওঠে চেহারায়। সবার মাথায় জিন্না টুপি। মাঝে মাঝে তাদের বুকে চাপানো আবেগ মুখ ফস্কে বেরিয়ে আসেÑ ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ।’
এসব খবর শুনে রহিম-দুলু-পরিতোষের সারা শরীর থরথরিয়ে ওঠে। তারা এসডিও সাহেবের কথা অমান্য করে ভুলের আগুনে পুড়তে থাকে।
সন্ধ্যারাতেই গ্রামে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। গ্রামে তখন মিলিটারি ঢুকেছে। চারদিকে শোরগোল পড়ে যায়।
সাথে সাথেই গাঁয়ের কোমল মাটির বুক ভেঙে ধুলো উড়িয়ে দানবের মতো জলপাইরঙা গাড়ি নজর আলীর তিনমাথা পথে দাঁড়ায়। নতুন অতিথি আগমনে চলে চোখ ধাঁধানো আয়োজন। সে কী অভ্যর্থনা। ক’জনার ভাগ্যে জুটেছে তা! নজর আলীর উছলে পড়া দরদ আর পাকিস্তানি সার্বভৌমত্বের প্রতি অকুণ্ঠ আনুগত্য দেখে একজন বিহারি সিপাইয়ের চোখ অতি আবেগে ছলছলিয়ে ওঠে। নানা রঙের ফুলের পাপড়ি ছড়িয়ে দেওয়া হয় অতিথি বরণের পথে। সব সৈন্যের গলায় পরানো হয় ফুলের মালা।
রাতে খাবারের আয়োজন চলে ধুমধামের সাথে। খাবার টেবিলেই ক্যাপটেন সাহেবের হাতে পৌঁছে যায় মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারের খসড়া তালিকা।
ক্যাম্পে উঠেই তারা ঘুমন্ত মানুষের ওপর পশু উন্মাদনায় ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাদের বিশ্বস্ত বাঙালি দোষরেরা নির্যাতনের নীলনকশা তৈরি করতে সাহায্য করে। বেছে বেছে মা-বোনদের ধরে নিয়ে আসে ক্যাম্পে। সুযোগ বুঝে নিজেরাও পাপিষ্ঠ কাজের অংশীদার হয়ে যায়।
বাংলার মাটিতে বাঙালির ছোবল।
দু’দিনের মধ্যেই সবুজ-শ্যামল ঘেরা গ্রামের চেহারা বদলে শ্মশানঘাটার নীরবতা নেমে আসে।
দাউদাউ জ্বলছে নিশ্চিন্তপুর।
পাকিস্তানি মিলিটারির বুটের ঠকঠক শব্দে গ্রাম থরথর কাঁপছে। আতঙ্কে ধুকধুক করে নিরীহ বাঙালির অসহায় অন্তর। ইয়াহিয়া গোষ্ঠীর ওই অমানুষেরা পাখির মতো টপাটপ মানুষ হত্যা শুরু করে। কত বাড়িতে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। খোদ পা চাটা রাজাকারের দল ঝোপঝাড় থেকে তর্জনি আঙুল দিয়ে হিন্দুদের ঘরবাড়িও দেখিয়ে দেয়। বানরের মত দাঁত কটমট করে সে ঘর, মন্দির পুড়িয়ে আলাদা উল্লাসে মেতে ওঠে। বাঙালির চোখে তারা যেন সাক্ষাৎ যমদূত।
সন্ধ্যা নামতেই সবাই জ্বলন্ত চুলোয় জল ছিটিয়ে গভীর জঙ্গলে লুকিয়ে প্রাণ বাঁচায়। এরই মধ্যে প্রাণের ভয়ে বহু গ্রাম, উজানী, বেদগ্রামের অনেক হিন্দু ভিটেমাটি ফেলে ভারতে পাড়ি জমায়।
যায়নি কেবল একজন। নাম তার পরিমল সাহা। দেহে যতক্ষণ প্রাণ আছে, পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি ফেলে একপাও সে নড়তে রাজি নয়। অন্ধকার নামতেই পুবপাড়ার আগুনের লেলিহান শিখা পরিমলের মন তাপায়। তরতর আগুনের শব্দ তার কানে আসে। সাঁই সাঁই বাতাসে ভাসে খাই খাই বিষাক্ত গন্ধ। গ্রামের নিরীহ মানুষ ভয়ে নিরাপদ আশ্রয় খোঁজে। কণ্ঠে তাদের আত্মা কাঁপানো চিৎকার।
গ্রামে মিলিটারি ঢুকছে রে!
পরিমল দরজা খুলে বাইরে আসতেই নজর আলীর মুখোমুখি হয়। সাথে একজন বিহারি সিপাই। মাছরাঙা পাখির মতো কথা গিলছে দু-চারটে উঠতি চামচা। নজর আলী একটা সাদা কাগজ পরিমলের সামনে বাড়িয়ে দেয় সই করতে। কথা দেয় দেশ স্বাধীন হলে সব জায়গাজমি বুঝিয়ে দেবে। কিন্তু পরিমল অতটা বোকা নয়; নজর আলী ক্ষেপে পাগলা কুকুর।
‘হেই মালাউনের বাচ্চা, গিরামের ব্যাবাক হিন্দুরা ভারতে চইল্যা গেল, তুই গেলি না ক্যা?’
বাজখাই কণ্ঠ শুনে ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে পরিমলের ছোটবোন সন্ধ্যা। নজর আলী শকুন চোখে তাকায়। বিশাল দেহের ওই বিহারি সিপাই সন্ধ্যাকে দেখে খুশিতে ডগমগ। একটু একটু এগিয়ে যায় লোলুপ দৃষ্টিতে। মনের জিহŸা দিয়ে চেটেপুটে খায় সন্ধ্যা রানীর শ্যামবর্ণ শরীর। অতি আহ্লাদে নজর আলীর কণ্ঠে গদগদ ভাবÑ ‘হেই পরিমল, তোর ভুÐি এত বড় হইলো কবে রে? আমারে তুই কবি না? আমার ছাওয়াল তাজুর সাথে বিয়া দিবি?’
পরিমল রাগে যেন গোখরা সাপ। দু’চোখে আগুনের ফুলকি ঝরে। সে দৃষ্টিতে চেয়ারম্যান যেন পুড়ে ছারখার হয়ে যাবে। আঙুল উঁচু করে বলে, ‘মুখ সামলিয়ে কথা বলেন। ছি! ছি! মুখে একটুও বাঁধল না আপনার?’
নজর আলী মেহেদী লাগানো দাড়িতে হাত বুলিয়ে হাসেÑ ‘শরম করবি ক্যান? তুই মুসলমান হবি। বাপের ব্যাটার লাহান বুক ফুলাইয়া চলবি। কিডা তোরে এই দ্যাশ হইতি খেদাবি? কার এত হিম্মত?’
পরিমল নিজের ক্রোধকে সামলাতে পারে নাÑ ‘ভুলে যাবেন না, আপনি কিন্তু আমাদের ভোটেই চেয়ারম্যান। এমন নির্দয় হলে ভগবান সহ্য করবে না।’
নজর আলী ঠোঁট কামড়ে হাসেÑ ‘এই জামানায় ভগবানের চোখ অন্ধ হইয়া গেছে রে পরিমল।’
সিপাইটি বড় বড় চোখে সন্ধ্যার মাথায় হাত বুলায়। উর্দুতে গলগল করে রূপের প্রশংসা করে। মুখে চুকচুক শব্দ করে ওর চিবুক ধরে। পরিমল জোর খাটিয়ে বোনকে হিংস্র পশুর থাবা থেকে ছিনিয়ে আনে। বাগানে ওঁৎ পেতে থাকা দুজন চেনা রাজাকার হুড়মুড় করে আঙিনায় লাফিয়ে পড়ে। ধস্তাাধস্তি করে বারান্দার খুঁটির সাথে পরিমলকে বেঁধে ফেলে। পরিমলের বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় রানা-তুহিনরাও ওই দলের; দু’দিন আগেও যাদের এই মাটিতে বসিয়ে মাংস-ভাত খাইয়েছে।
ভেতরের দৃশ্য আরও ভয়াল। সন্ধ্যার দেহভোগের উল্লাসে মেতে ওঠে নজর আলীরা। সন্ধ্যা তার সতীত্ব রক্ষার জন্য মরণপণ চেষ্টা চালিয়েও ব্যর্থ হয়। বোনের চিৎকার পরিমলের কানে বোমার শব্দে বিস্ফারিত হয়Ñ ‘দাদারে ওরা আমার সব নিয়ে গেল!’
একজন ভিক্ষুক এসে পরিমলের বাঁধন খুলে দেয়। হরহর করে ভেতরে গিয়ে দেখে সন্ধ্যার উলঙ্গ দেহটা মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। কণ্ঠ চেতিয়ে একটা শব্দই দুবার উচ্চারণ করেÑ সন্ধ্যা রে!
তখনই বোনের শেষ নিশ্বাসের বাতাসটা ফস করে পরিমলের কান্নাচোখ নির্দয়ভাবে ছুঁয়ে যায়। বদ্ধপাগলের মতো হাসতে হাসতে লাশটা কাঁধে নেয়। পা বাড়ায় বাগানের অন্ধকার পথেÑ
কোথায় যাবে? সে পথ কতদূর!!
কথাসাহিত্যিক

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: