ড. এম আব্দুল করিম
স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে দানাদার শস্য উৎপাদন তিন গুণেরও অধিক বৃদ্ধি পেয়েছে। ধান, গম ও ভুট্টার উৎপাদন চার কোটি টন ছাড়িয়ে গেছে। সবজি উৎপাদনও বেড়েছে আশানুরূপ। ব্যতিক্রম শুধু তেল ও ডালজাতীয় ফসল, যার উৎপাদন এক দশক আগের তুলনায় কমেছে। হেক্টরপ্রতি ফলন বৃদ্ধি পেলেও তেল ও ডাল ফসলের বহু জমিতে দানাদার শস্য উৎপাদন করার ফলেই মোট উৎপাদন কমেছে।
কৃষি-গবেষকদের উচ্চ ফলনশীল জাত ও প্রযুক্তির উদ্ভাবন,
কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ কর্তৃক তা কৃষক পর্যায়ে পৌঁছানো, বুদ্ধিদীপ্ত ও পরিশ্রমী কৃষকদের নিরন্তন কৃষিকর্ম এবং অনুকূল
কৃষি আবহাওয়া, মাটি ও পরিবেশ ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির মূল কারণ। বিভিন্ন সময়ে সঠিক কৃষিনীতি প্রণয়ন ও তার বাস্তবায়ন উত্তরোত্তর ফসল উৎপাদন বৃদ্ধিতে চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে। বিশেষ করে ১৯৭৬-৭৮ সাল সময়ে মজা পুকুর ও খাল খনন করে ছোট ছোট জলাধার নির্মাণ ও পানি সরবরাহ কর্মসূচি গ্রহণ, ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা, ১৯৭৮-৮২ সালকালীন সার ও ১৯৮০-৮৮ সাল নাগাদ পানি ব্যবস্থাপনা বেসরকারিকরণ, ১৯৮৯-৯০ সাল নাগাদ পাওয়ার টিলার, বীজ ও কীটনাশক ব্যবসা উদারীকরণ, ১৯৯৩ সালে বীজনীতি, ১৯৯৯ সালে জাতীয় কৃষিনীতি প্রণয়ন এবং সময়ে সময়ে কৃষি বিশ^বিদ্যালয় সৃষ্টির মাধ্যমে দক্ষ কৃষিবিদ তৈরি, ইত্যাদি সার্বিক কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে।
টেকসই কৃষি উৎপাদনের চ্যালেঞ্জসমূহ : বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদনে প্রধান চ্যালেঞ্জসমূহের মধ্যে দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য প্রতিবছর প্রায় ৬০-৭০ হাজার হেক্টর কৃষিজমি হ্রাস, জনসংখ্যার ক্রমবৃদ্ধি, প্রায়
এক মিলিয়ন হেক্টর লবণাক্ততা, কয়েক লাখ হেক্টর জলাবদ্ধতা, প্রতিবছর বন্যা ও খরা, সাইক্লোন, যুবকদের কৃষি কাজে অনীহা, শ্রমিক স্বল্পতা বিশেষ করে ধানকাটা
মৌসুমে, কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণ ও উচ্চ প্রযুক্তির প্রয়োগে ।
ধীরগতি, কৃষিপণ্যের ন্যায্য মূল্যপ্রাপ্তির অনিশ্চয়তা ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
করোনা প্রাদুর্ভাবকালে মানুষের অবাধ যাতায়াত বিঘ্নিত হওয়ায় দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাহতসহ ফসল উৎপাদনের ইনপুট যেমন সার, বীজ, কীটনাশক ইত্যাদির জোগান, খাদ্য চাহিদা ও জোগানের ভারসাম্য রক্ষা,
কৃষিপণ্যের ন্যয্য মূল্য প্রাপ্তি ইত্যাদি মারাত্মক হুমকির মধ্যে পড়েছে। ছোট-বড় অনেক কারখানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং সেবাখাত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বহু কর্মজীবী মানুষ শহর ছেড়ে গ্রামে ফিরে গেছেন। ফলে শহর ও গ্রামের কৃষিপণ্যের উৎপাদন ও বাজারের ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। সাধারণ মানুষের আয় রোজগার কমে যাওয়ার ফলে চাল ও গমের মতো দানাদার শস্যের চাহিদা না কমলেও ফল, সবজি, মাংস বা দুধের মতো দামি পণ্যের চাহিদা কমতে শুরু করেছে। বাংলাদেশে দানাদার শস্যের উৎপাদন বেশ বৃদ্ধি পেলেও মানুষের পাশাপাশি পোল্ট্রি ও মাছের খাদ্যের উপাদান হিসেবেও এর চাহিদা এক দশক আগের তুলনায় কয়েকগুণ বেড়েছে। ফলে চাল, গম ও ভুট্টা মিলে এক কোটি টনের বেশি খাদ্যশস্য আমদানি করতে হয়। কোনো কারণে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হলে দেশের অর্থনীতি এক মারাত্মক হুমকি ও অনিশ্চয়তায় পতিত হবে।
বন্যা-২০২০-এর প্রভাবে ইতোমধ্যে ২৬ জেলায় প্রথম পর্যায়ের বন্যায়, যা জুন মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে দেখা দিয়েছে, প্রায় ৭৬,০০০ হেক্টর এবং জুলাই মাসের মাঝামাঝি নাগাদ দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রায় ৮৩,০০০ হেক্টর জমির প্রায় ৫০০ কোটি টাকার ফসল বিনষ্ট হয়েছে। প্রায় এক মিলিয়ন ঘরবাড়ি পানিতে ডুবে গেছে। বন্যায় আউশ ধান, পাট, তিল, বাদাম, এবং সবজির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। যেসব জমিতে আগাম আমন ধান লাগানো হয়েছিল, বিশেষ করে বোনা আমন ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এর পূর্বে মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহে সাইক্লোন আম্ফানের কারণেও দক্ষিণাঞ্চলে সবজিসহ অন্যান্য কৃষিপণ্যের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন বিশ^বিদ্যালয়ের এক গবেষণা রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বিশে^ বারবার বন্যা আক্রান্ত হটস্পট এলাকার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বর্তমানের তুলনায় এ শতাব্দীর শেষান্তে বন্যার প্রকোপ দশগুণ বৃদ্ধি পাবে। নিকট-ভবিষ্যতে উপকূল এলাকায় বসবাসরত বিশে^র প্রায় ২৫০ মিলিয়ন মানুষ বন্যায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা আছে। কাজেই, ভবিষ্যতে বন্যার প্রকোপ আরও বাড়বে সেটা বিবেচনায় নিয়েই পরিকল্পনা করতে হবে।
কৃষি উৎপাদন প্রবহমান রক্ষণার্থে করণীয় : বাংলাদেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি প্রধানত তিনটি : যেমনÑ কৃষি, তৈরি পোশাক রফতানি ও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। তৈরি পোশাক রফতানি ও রেমিট্যান্স খাত করোনাকালে অনিশ্চয়তার মধ্যে আবর্তিত। এমতাবস্থায় কৃষি উৎপাদন প্রবহমান রাখা ও তা বৃদ্ধিই দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। করোনা সময়কাল ও পরবর্তীতে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির ধারাবাহিকতার জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
স্বল্পমেয়াদি বা দ্রুত যেসব ব্যবস্থাদি গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয় তার মধ্যে বন্যা-২০২০-এর ক্ষতি পোষাতে করণীয় : প্রতিবছরই কম-বেশি বন্যা হয়। বন্যার প্রকোপ মোটামুটি এক মাসের মতো দীর্ঘ হয়। বন্যায় প্রতিবছর ২-৪ বিলিয়ন টন হিমালয়ের পলি মাটি বাংলাদেশের নদ-নদীর মাধ্যমে প্রবাহিত হয়, যার কিছু অংশ দেশের অভ্যন্তরে নদীতে জমা হয়ে চর তৈরি করে। বাকি পলি মাটি বঙ্গোপসাগরে জমা হয়ে দ্বীপের সৃষ্টি করে। সমুদ্র উপকূলে প্রতিবছর প্রায় ১৫ মিটার করে বাংলাদেশের আয়তন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসব পলি মাটি খুবই উর্বর, যার জন্য আমাদের গরিব কৃষকরা সার ছাড়াই বা স্বল্প সার প্রয়োগ করেই ফসল উৎপাদন করতে পারেন। তবে যে বছর বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হয়, সে বছর চর ও নিম্নমধ্যাঞ্চলের আমন ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। এটাও লক্ষণীয়, যে বছর বড় ধরনের বন্যা হয় তার পরবর্তী বছরে রবি ফসল যেমনÑ বোর ধান, গম, ভুট্টা, তেল ও ডালজাতীয় ফসলের বাম্পার ফলন হয়। এবারের বন্যা একটি দীর্ঘস্থায়ী বন্যা। তবে এখন বন্যার পানি কমতে শুরু করেছে, যা দ্রুতই নেমে যাবে। যদি কৃষকদের আমন ধানের চারার চাহিদা মেটানো যায় এবং সারসহ অন্যান্য উপকরণ সহজপ্রাপ্ত করা যায় তাহলে আমন ধানের ফলনের ক্ষতি অনেক কম হবে।
ছাদকৃষি বা ছাদবাগান : করোনার সময়ে মানুষ ঘরমুখী হওয়ায় তাদের ছাদকৃষির প্রতি আগ্রহ বেড়েছে। ফ্ল্যাটবাড়িতে বসবাসকারীরাও ব্যালকনিতে কিছু না কিছু কৃষিকর্ম, যেমনÑ সবজি, ফুল বা মসলাজাতীয় ফসল উৎপাদন করছে। এসব কৃষিকাজে মূলত গৃহিণীরাই মুখ্য ভূমিকা পালন করছে। এটা দেশের টেকসই কৃষি উৎপাদনের জন্য খুবই ইতিবাচক একটি স্বতঃস্ফূর্ত পদক্ষেপ। অনেক ছাদেই কৃষিকাজ হচ্ছে, তবে তা মূলত শখের বশে। ছাদে উৎপাদিত কৃষিপণ্যকে
কৃষি বিপণনের মূল বাজারের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। এতে উৎপাদনকারীরা অধিক উৎসাহিত হবেন এবং আর্থিকভাবেও কিছুটা স্বাবলম্বী হবেন।
কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্যের নিশ্চয়তা : করোনার ফলে উৎপন্ন ফসলের অবাধ বিপণন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কৃষক দেশের যে প্রান্তেই ফসল উৎপাদন করুক, তার পণ্য বাজারের মূল চ্যানেলে যুক্ত করতে হবে। কৃষিপণ্য সংগ্রহের জন্য কৃষকের কাছাকাছি সংগ্রহকেন্দ্র এবং গুদামঘর তৈরি করা যেতে পারে। কৃষক যাতে দেশ-বিদেশের দৈনন্দিন বাজারমূল্য সম্পর্কে অবহিত থাকতে পারেন, সে জন্য তাদের বিনামূল্যে ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করতে হবে।
কৃষিনেট বিপণন : কৃষিপণ্য ব্যাপকভাবে বিপণনের জন্য বিনা ট্যাক্সে বিদ্যমান বাজার ব্যবস্থার পাশাপাশি কৃষিনেট বিপণন উৎসাহিত করতে হবে। দারাজ, আমাজন কিংবা আলিবাবার মতো বহুজাতিক কোম্পানি অনলাইন সার্ভিসের মাধ্যমে দেশে বেশ কিছুদিন আগে থেকেই বিপণন শুরু করেছে এবং যার দ্রুত বিস্তার ঘটছে। আমাদের যুবসমাজকে কৃষিনেট বিপণন কাজে যুক্ত করতে হবে।
কৃষি শ্রমিকদের অবাধ যাতায়াত সহজীকরণ : কৃষিকাজে সহযোগিতা করার জন্য, বিশেষ করে ধান কাটার মৌসুমে, কৃষি শ্রমিকরা দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাতায়াত করেন। করোনাকালে অবাধ যাতায়াত ব্যাহত হচ্ছে। যানবাহন সীমিতভাবে চলাচল করলেও ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। কৃষি উৎপাদন অব্যাহত রাখার স্বার্থেই বিনা ভাড়ায় কিংবা নামমাত্র ভাড়ায় কৃষি শ্রমিকদের যাতায়াতের ব্যবস্থা নির্বিঘ্ন রাখতে হবে।
কৃষি-কূটনীতি : বাংলাদেশে এলাকাভিত্তিক অনন্যসাধারণ অনেক কৃষিপণ্য আছে, যা বিদেশিদের কাছে যথাযথভাবে তুলে ধরতে পারলে আমাদের কৃষি বাজার ব্যাপক প্রসারিত হবে। যেমনÑ দিনাজপুরের কাটারিভোগ চাল, বাংলামতি চাল, অমৃতসাগর কলা, ফজলিসহ বিভিন্ন জাতের সুস্বাদু আম ইত্যাদি। মধ্যপ্রাচ্য থেকে করোনা প্রাদুর্ভাবে বাংলাদেশের অনেক শ্রমিক কর্মহীন হয়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন। ওইসব দেশসমূহের সরকারের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে, যাতে তাদের জমি দীর্ঘমেয়াদি লিজ নিয়ে আমাদের শ্রমিকরা কৃষিপণ্য উৎপাদন করতে পারেন।
ইউনিয়ন পর্যায়ে কৃষিবিদ নিয়োগ এবং দুর্গম এলাকায় কাজ করার জন্য প্রণোদনা : কৃষি একটি গতিশীল (ডাইনামিক) বিজ্ঞান। প্রতিনিয়ত কৃষিপ্রযুক্তি উদ্ভাবিত হয় এবং তা পরিবর্তিত হয়। কৃষকদের নতুন প্রযুক্তি সম্পর্কে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিতে হয় এবং উদ্ভাবিত প্রযুক্তি সম্পর্কে সঠিকভাবে অবহিত রাখতে হয়। উপজেলা পর্যায়ে নিয়োজিত বর্তমান কৃষিবিদ জনবল দ্বারা উপজেলার বিশাল এলাকায় সে কর্ম সম্পাদন প্রায় অসম্ভব। এ জন্য প্রতি ইউনিয়নে কমপক্ষে দুজন করে কৃষি গ্র্যাজুয়েট নিয়োগ করা প্রয়োজন। দুর্গম এলাকায় প্রতিকূল ইকোসিস্টেম, যেমনÑ চরাঞ্চল বা হাওর এলাকায় কাজের জন্য হিল এলাউন্সের মতো প্রণোদনার ব্যবস্থা থাকা উচিত। তা করা না হলে এসব এলাকায় কেউ সাচ্ছন্দ্যে কাজ করতে উৎসাহিত হবে না।
মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা : দীর্ঘমেয়াদি কৃষি
ব্যবস্থাপনা : দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার লক্ষ্য হবে দেশে টেকসই
কৃষি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা। যেমনÑ বৃহৎ জলাধার নির্মাণ করে বর্ষার অতিরিক্ত পানি ধরে রেখে খরার সময় সেচকার্যে তা ব্যবহার করা, ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো বড় শহরে বাসাবাড়িতে ব্যবহৃত পানি কেন্দ্রীয় সেচ লাইনের মাধ্যমে জলাধারে জমা করে খরা বা রবি মৌসুমে ব্যবহার করা, কোঅপারেটিভ গঠনের মাধ্যমে জমির আইল প্রয়োজন অনুসারে নতুনভাবে নির্মাণ করে জমির আকার বড় করে যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে কৃষিকাজ পরিচালনা করা ইত্যাদি।
প্রতিকূল ইকোসিস্টেম কৃষি ব্যবস্থাপনা : দেশের প্রায় দশ লাখ হেক্টর লবণাক্ত ভূমি, আট লাখ হেক্টর চরাঞ্চল, হাওর, পাহাড়ি এলাকা ও জলাবদ্ধ কৃষিজমির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করতে হবে। দেশের বিভিন্ন কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও কৃষি বিশ^বিদ্যালয়ে এসব সমস্যাকবলিত এলাকার জন্য গবেষণা চলছে, যা আরও জোরদার করতে হবে। এসব প্রতিষ্ঠানসমূহে যেসব প্রযুক্তি ইতোমধ্যে উদ্ভাবিত হয়েছে তা কৃষকের কাছে পৌঁছে দিতে হবে এবং প্রয়োগের জন্য কৃষককে উৎসাহিত করতে হবে। প্রয়োজন মোতাবেক কৃষককে প্রণোদনা দিতে হবে।
কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণ ও উচ্চপ্রযুক্তির সন্নিবেশ ঘটিয়ে যুবসমাজকে যুক্ত করা : বাংলাদেশে কৃষি-যান্ত্রিকীকরণ এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়ে গেছে। একদিকে শ্রমিক সঙ্কট আর অন্যদিকে যান্ত্রিকীকরণের ব্যাপ্তি না ঘটায়
কৃষিকাজ ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে কৃষি উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দেশের কৃষিতে যুবসমাজও আগ্রহী হচ্ছে না। তাদের কৃষিকাজে সম্পৃক্ত করার জন্য কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণের পাশাপাশি আরও উন্নত প্রযুক্তির, যেমনÑ সাইবার কৃষি বা প্রিসিশন কৃষির সন্নিবেশ ঘটাতে হবে। কৃষি উৎপাদনে বায়োটেকনোলজির সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে হবে।
গুদামাগার নির্মাণ : লক্ষ করা যায় যে, ভর-মৌসুমে
কৃষিপণ্যের মূল্য কম থাকার পরও কৃষকের কাছাকাছি সংরক্ষণাগার না থাকায় কৃষক তার পণ্য স্বল্পমূল্যে বিক্রি করতে বাধ্য হয় এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কোঅপারেটিভ বা সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতায় কৃষকদের সুবিধামতো এলাকায় সংরক্ষণাগার নির্মাণ করা গেলে, কৃষক তার ফসল সংরক্ষণ করতে পারবে এবং সুবিধাজনক সময়ে ন্যায্যমূল্যে বিক্রি করে প্রত্যক্ষভাবে লাভবান হতে পারবে।
খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ : যদিও খাদোৎপাদনে বাংলাদেশ অভূতপূর্ব সাফল্য দেখিয়েছে, কিন্তু খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে তেমন অগ্রগতি সাধিত হয়নি। ফলে অনেক কৃষিপণ্য যেমনÑ আম, কাঁঠাল, আনারস, কলা, সবজি, ইত্যাদি ভর-মৌসুমে সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে যায়। তা ছাড়া কৃষক তার পণ্যের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হয়। প্রক্রিয়াজাতকরণ নিয়ে বহুদিন ধরেই আলোচনা হচ্ছে, কিন্তু যে গতিতে এর বাস্তবায়ন হওয়া উচিত ছিল, তা হচ্ছে না। বড় বড় কারখানা প্রতিষ্ঠার চেয়ে যদি কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে খামার পর্যায়ে ছোট ছোট কারখানা গড়ে তোলা যায়, তবে তা বেশি কার্যকরী ও টেকসই হবে। তাতে অনেক যুবক উদ্যোক্তা হবে এবং বহু কর্মসংস্থানও হবে। এ ব্যাপারে থাইল্যান্ডের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যেতে পারে। সেখানে কৃষক পর্যায়ে সারা দেশেই ফলবাগান এলাকায় এ ধরনের বহু ছোট ছোট ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা গড়ে উঠেছে। আমাদের রাজশাহী অঞ্চলের কৃষকদের আম, মধুপুর বা পার্বত্য অঞ্চলের কৃষকদের আনারস, যেসব এলাকায় কলা বেশি হয় সেখানে, মুন্সীগঞ্জ বা যেখানে বেশি আলু উৎপাদন হয় সেখানে আলু-চিপস ইত্যাদি প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য ছোট ও মাঝারি-উদ্যোক্তা তৈরি করতে হবে।
কৃষিক্ষেত্রের ব্যাপক অগ্রগতি বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এ যাবৎ বহুমাত্রিক সুরক্ষা দিয়েছে। করোনাকালীন এবং তৎপরবর্তীতে বিশ^-অর্থনীতিতে যে অস্থিরতা বা অনিশ্চয়তা পরিলক্ষিত হচ্ছে বা হওয়ার আশঙ্কা দেখা যাচ্ছে, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলাদেশ তা থেকে অনেকটাই মুক্ত থাকতে পারে। কৃষিক্ষেত্রের বহুমাত্রিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে বেকার যুবশক্তিকে মূলধারার অর্থনীতিতে যুক্ত করার অপার সম্ভাবনার দ্বারও করোনাকালে উন্মুক্ত হয়েছে। সে সম্ভাবনাকে আমাদের কাজে লাগাতে হবে।
ষ অধ্যাপক, কৃষিতত্ত্ব বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান
কৃষি বিশ^বিদ্যালয়, গাজীপুর