বৈদেশিক শ্রমবাজার এবং আমাদের করণীয়

সম্পাদকীয়

সাধারণত ‘শ্রমবাজার’ বলতে বুঝায় এমন একটি প্লাটফর্ম যেখানে মালিক ও শ্রমিক পরস্পরের স্বার্থের জন্য মিলিত হয় এবং উভয়পক্ষ তাদের প্রয়োজন

2020-12-31T22:20:00+00:00
2020-12-31T22:20:00+00:00
 
  বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬,
৩ আষাঢ় ১৪৩৩
বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬
সম্পাদকীয়
বৈদেশিক শ্রমবাজার এবং আমাদের করণীয়
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০২০, ১০:২০ পিএম   (ভিজিট : ২২৭৪)
সাধারণত ‘শ্রমবাজার’ বলতে বুঝায় এমন একটি প্লাটফর্ম যেখানে মালিক ও শ্রমিক পরস্পরের স্বার্থের জন্য মিলিত হয় এবং উভয়পক্ষ তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী শ্রমের ক্রয়-বিক্রয় করে থাকেন। শ্রমবাজারের মাধ্যমে শ্রমিক ও নিয়োগকর্তার মধ্যে সমন্বয় সাধিত হয়।
বাংলাদেশের মতো যেকোনো উন্নয়নশীল দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের অন্যতম চাবিকাঠি হচ্ছে জনশক্তি রফতানি। বর্তমানে বিশে^ জনশক্তি রফতানিকারক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান ষষ্ঠ। বর্তমানে বিশে^র ১৭৩টি দেশের শ্রমবাজারে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ বাংলাদেশি প্রবাসে কাজ করছে। মূলত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি শ্রমিক কাজ করে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি শ্রমিক কাজ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরবে। এখন পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যই দেশের রেমিট্যান্সের প্রধান উৎস। দেশে কর্মসংস্থানেরর অপ্রতুলতা এবং নিজের পরিবারের উন্নত জীবনযাপনের আশায় অধিকাংশ প্রবাসীরা বিদেশে পাড়ি জমান।
প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ জীবন ও জীবিকার তাগিদে পৃথিবীর এক স্থান থেকে অন্য স্থানে গমন করেছে। ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে ইউরোপের সঙ্গে ভারতের সমুদ্রপথে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়। যার সুবাদে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ বিশেষ করে পর্তুগাল, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, ডেনমার্ক থেকে ভাগ্যান্বেষী প্রচুর লোক বাংলায় এসে ব্যবসা চালু করে। তাদের মধ্যে অনেকেই বাংলার বিভিন্ন এলাকায় কুটি প্রতিষ্ঠা করে। তাদের বাসস্থান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অনেক বাঙালি কর্মচারী, শ্রমিক, গৃহপরিচারিকা, আয়া ইত্যাদি হিসেবে নিয়োগ পায়। একই সময়ে ব্রিটেনের শিল্প বিপ্লব ও ইউরোপের অন্য দেশে শিল্প বাণিজ্যের দ্রুত বিকাশের ফলে সেসব দেশে গৃহপরিচারিকা ও নিম্নমানের বহু কাজের জন্য লোকের ব্যাপক সঙ্কট দেখা দেয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে ইউরোপীয়রা বিশেষ করে ব্রিটিশরা বাংলায় তাদের কর্মচারী, শ্রমিক, গৃহপরিচারিকার অনেককে নিজ দেশে নিয়ে যায়। যা থেকে শুরু হয়েছিল বিদেশিদের বাংলা থেকে লোক নিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া। তবে নিজ আগ্রহে ভাগ্যান্বেষণের জন্য বিদেশে বাংলাদেশিদের যাত্রা শুরু হয় ১৯৫০ এর দশকে। দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের পর ব্রিটেনে শ্রমিকের সঙ্কট দেখা দেয়। তখন তারা সস্তা পারিশ্রমিকে শ্রমিকের চাহিদা পূরণের জন্য কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলো থেকে শ্রমিক নেওয়ার জন্য শ্রমিকদের আকৃষ্ট করতে থাকে। বাংলাদেশের বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলের তরুণরা এই সুযোগে ব্রিটেনে গমন করেন। তাদের মধ্যে বেশিরভাগ ইংল্যান্ডের রাজধানী লন্ডনে অবস্থান করে। ক্রমেই ইংল্যান্ডে বাংলাদেশি শ্রমিকদের কম মজুরির কারণে তাদের চাহিদা বাড়তে থাকে। যার ফলে সেই সময়ে সিলেটের অনেক লোক ইংল্যান্ডে গিয়েছিলেন। এখনও সিলেটের বেশিরভাগ প্রবাসী ইংল্যান্ডের রাজধানী লন্ডনে অবস্থান করছেন। ১৯৭০-এর দশকে মধ্যপ্রাচ্যের তেলের বাজারের ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার পর সেখানে সস্তা শ্রমের চাহিদা বেড়ে যায়। যার ফলে বাংলাদেশিদের জন্য নতুন শ্রমবাজারের সৃষ্টি হয়। মধ্যপ্রাচ্যের প্রথম দেশ হিসেবে সৌদি আরবে ১৯৭৬ সালের ১৭ এপ্রিল বাংলাদেশ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শ্রমিক পাঠানো শুরু হয়। ওইদিন ২১৭ জন শ্রমিক সৌদি আরবে গমন করেন। তারপর ক্রমান্বয়ে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশগুলোয় শ্রমিক পাঠানো শুরু হয়। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এখনও তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্পর্কিত বেশিরভাগ কার্যক্রমে বিদেশি শ্রমিকদের ওপর নির্ভরশীল।
বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি শ্রমিক মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে কাজ করছে যদিও তাদের বিশাল একটা অংশ অদক্ষ। মধ্যপ্রাচ্যে বেশিরভাগ বাংলাদেশি শ্রমিকরা মূলত নির্মাণ খাতে, রেস্তোরাঁয়, ওয়ার্কশপ, দোকানে বা অন্যত্র বিভিন্ন ছোটখাটো কাজ করেন। এসব খাতে কাজ করতে হয় বেশি এর বিপরীতে পারিশ্রমিক কম। মধ্যপ্রাচ্যে বেতন বেশি পাওয়া যায় এমন উল্লেখযোগ্য কিছু পেশা হলোÑ অটো মেকানিকস, ড্রাইভিং, প্যাটার্ন মেকিং, পাইপ পিটিং, ইলেকট্রিক্যাল মেশিন মেইনটেন্যান্স, রেফ্রিজারেশন ও এয়ারকন্ডিশনিং, টাইলস ফিক্সিং, রড বাইন্ডিং, শাটারিং, গ্রাফিক্স, ওয়েব ডিজাইন, সুইং মেশিন অপারেটিং, ব্লক-বাটিক, ইলেকট্রিক্যাল, ইলেকট্রনিক্স ইত্যাদি। এসব পেশায় কাজ করতে গেলে মোটামুটি দক্ষতার প্রয়োজন হয়। কিন্তু দক্ষ শ্রমিকের স্বল্পতার কারণে এসব খাতে বাংলাদেশিদের অংশগ্রহণ কম। ফলে অন্য দেশের দক্ষ শ্রমিকরা এসব খাত দখল করে নিচ্ছে। দক্ষতার পাশাপাশি বাংলাদেশি নতুন শ্রমিকদের আরেকটি ঘাটতি থাকে সেটি হলো স্থানীয় ভাষা রপ্ত করে না যাওয়া। যার ফলে কিছু মানুষ দক্ষ হওয়া সত্তে¦ও স্থানীয় ভাষা না জানার কারণে নিজের দক্ষতাকে উপস্থাপন করতে পারে না। ফলে আমরা দেখতে পাই কিছু দেশের শ্রমিক সংখ্যা আমাদের চেয়ে সংখ্যার কম হলেও দক্ষ জনবলের কারণে তারা বেশি রেমিট্যান্স তাদের দেশে পাঠাচ্ছে।
অতএব আমাদের দক্ষ শ্রমিক তৈরির দিকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। তা ছাড়া আমাদের প্রধান বৈদেশিক শ্রমবাজার ‘মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার’ বিভিন্ন কারণে সঙ্কুচিত হয়ে যাচ্ছে। এর উল্লেখযোগ্য কারণগুলো হলো, বিশ^বাজারে তেলের দাম কমে যাওয়া, রাজনৈতিক অস্থিরতা, অভ্যন্তরীণ বেকারত্ব বেড়ে যাওয়া, বিভিন্ন খাতে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার বেড়ে যাওয়া ইত্যাদি। তাই সহজেই অনুমেয় ভবিষ্যতে কঠিন সময় অপেক্ষা করছে। তাই আমাদের দক্ষ শ্রমিক তৈরির পাশাপাশি বিকল্প শ্রমবাজারের অনুসন্ধান করতে হবে। সম্প্রতি করোনা মহামারির কারণে অনেক প্রবাসী দেশে ফেরত এসেছেন। নতুন শ্রমিক পাঠানো সম্পূর্ণভাবে বন্ধ আছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে করোনা পরবর্তী সময়ে বৈদেশিক শ্রমবাজারে দক্ষ শ্রমিকের প্রচুর চাহিদা সৃষ্টি হবে। সে দিক বিবেচনা করে দক্ষ ও অভিজ্ঞ জনশক্তি তৈরির লক্ষ্যে ‘কর্মসংস্থান অধিদফতর’ গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। এদিকে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তথ্যসূত্রে জানা যায়, বর্তমানে দেশে দক্ষ শ্রমিক তৈরিতে ৪৭টি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে যেগুলোয় বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন নতুন নতুন ট্রেড চালুর পরিকল্পনা করার উদ্যেগ গ্রহণ করা হয়েছে। এ ছাড়া দেশের সব জেলায় প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং ইতোমধ্যে এ বিষয় নিয়ে কাজ শুরু করেছে মন্ত্রণালয়। এ ছাড়াও আরও জানা যায়, প্রথম পর্যায়ে ৮ বিভাগের ৭১টি উপজেলায় প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নির্মাণ করতে যাচ্ছে সরকার। এগুলো নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ। তবে খেয়াল রাখতে হবে শুধু যেন অবকাঠামো নির্মাণে আর কাগজ-কলমে যেন এ উদ্যোগ সীমাবদ্ধ না থাকে। এখান থেকে যেন দক্ষ জনশক্তি তৈরি সেদিকে সদা দৃষ্টি রাখতে হবে। ক্ষেত্রবিশেষে প্রয়োজনে বিদেশ থেকে ট্রেইনার এনে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। নিয়মিত মনিটরিং করতে হবে। ভালো হয় সরকারি কার্যক্রমের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগকে এ খাতে উৎসাহিত করলে। তাহলে এ খাতে প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হবে। আমাদের প্রতিযোগী দেশগুলো যেমনÑ ভারত, শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম ইতোমধ্যে এ খাতে তাদের বিনিয়োগ বাড়িয়েছে এবং তাদের বেসরকারি খাতগুলোও সমান তালে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করছে। সবচেয়ে ভালো হয় চাহিদাসম্পন্ন কোনো নির্দিষ্ট খাতে (যেমন; ট্যুরিজম, হোটেল ম্যানেজমেন্ট) ফোকাস করে ওই খাতে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা। যেমনÑ ভিয়েতনাম দক্ষ নার্স তৈরি করে এবং ইউরোপের অনেক দেশেই তাদের নার্স রয়েছে। ভারত আইটি সেক্টরের দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে বিখ্যাত। এরকমভাবে কোনো চাহিদাসম্পন্ন নির্দিষ্ট খাতে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে পারলে বাংলাদেশকে বিশ^ ওই নির্দিষ্ট জনশক্তির ব্র্যান্ড হিসেবে জানবে।
করোনা মহামারির কারণে যেখানে সবাই আশঙ্কা করেছিল বাংলাদেশ অর্থনৈতিক মন্দায় পড়বে সেখানে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের কারণে বাংলাদেশ সেই ধাক্কা অনেকটা ভালোভাবেই সামাল দিয়েছে। কিন্তু এই রেমিট্যান্স যোদ্ধারা বিশে^র বিভিন্ন জায়গায় অত্যাচার-নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। নারী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে এই হারটা আশঙ্কাজনকভাবে বেশি। সরকারকে এই বিষয়গুলো কূটনৈতিকভাবে সমাধান করতে হবে। কারণ প্রবাসীরা শুধু নিজ দেশেরই অর্থনীতির চাকা গতিশীল রাখছেন না যেই দেশে যাচ্ছেন সেই দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।
বিদেশ গমন প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে এবং অভিবাসন ব্যয় কমাতে হবে। আমাদের প্রবাসী শ্রমিকদের অনেকের ৩-৪ বছর সময় চলে বিদেশ যাওয়ার সময়ে করা ঋণ শোধ করতে। অনেকে আবার না বুঝে দালালের প্রতারণার শিকার হয়ে সর্বস্ব হারান। এ ব্যাপারে সবাইকে সচেতন হতে হবে এবং এসব প্রতারকদের আইনের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। যারা ভাগ্যান্বেষণে বিদেশে যাবেন তাদেরও নিজ উদ্যোগে দক্ষ এবং অভিজ্ঞ হওয়ার চেষ্টা করতে হবে। ‘যা করার বিদেশে গিয়ে করব’Ñ এ ধরনের চিন্তাভাবনা মন থেকে সম্পূর্ণরূপে দূর করতে হবে।
সব প্রবাসী শ্রমিকদের ‘জীবন বিমার’ আওতায় আনতে হবে। বিদেশে কোনো সমস্যায় পড়লে সে সমস্যা থেকে উত্তরণের উপায় সম্পর্কে জানাতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট দেশে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাসকে বন্ধুসুলভ হতে হবে। পরিশেষে এই বিজয়ের মাসে শ্রদ্ধা জানাই সেসব বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদদের প্রতি যাদের কারণে আমরা মুক্ত স্বাধীন স্বদেশ পেয়েছি পাশাপাশি সেসব রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের প্রতি যাদের কারণে আমরা অর্থনৈতিক মুক্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।

ষ  নুর মোহাম্মদ শাওন
     শিক্ষার্থী, লোকপ্রশাসন বিভাগ
     ইসলামী বিশ^বিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: