স্বপ্নের পদ্মা সেতু

সম্পাদকীয়

স্বপ্নের পদ্মা সেতুর পুরোটাই আজ দৃশ্যমান। পদ্মার মাঝনদীর অতল জলে নানা কর্মযজ্ঞ শেষে বহু প্রতিকূলতা অতিক্রম করে বসানো হলো পদ্মা

2020-12-30T22:49:00+00:00
2020-12-30T22:49:00+00:00
 
  বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬,
৩ আষাঢ় ১৪৩৩
বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬
সম্পাদকীয়
স্বপ্নের পদ্মা সেতু
প্রকাশ: বুধবার, ৩০ ডিসেম্বর, ২০২০, ১০:৪৯ পিএম   (ভিজিট : ৫২৫)
স্বপ্নের পদ্মা সেতুর পুরোটাই আজ দৃশ্যমান। পদ্মার মাঝনদীর অতল জলে নানা কর্মযজ্ঞ শেষে বহু প্রতিকূলতা অতিক্রম করে বসানো হলো পদ্মা সেতুর ৪১তম স্প্যানটি। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী দৃঢ়তার সঙ্গে নিজস্ব অর্থায়নে সেতু নির্মাণকে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে শরীয়তপুর জেলার জাজিরার নাওডোবায় নদী শাসনের কাজ ও মাওয়া প্রান্তে মূল পাইলিং কাজের উদ্বোধন করেন। পদ্মা সেতুর মোট ৪২টি পিলারের মধ্যে রয়েছে ২১টি মাওয়া এবং ২১টি জাজিরা প্রান্তে। ২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর সেতুর জাজিরা পয়েন্টে ৩৭ ও ৩৮ নম্বর পায়ারের ওপর প্রথম স্প্যান বসানোর মধ্য দিয়ে পদ্মা সেতুর স্প্যান বসানোর কাজ শুরু হয়। মাঝ পদ্মা নদীতে ৪১ নম্বর স্প্যানই সেতুর শেষ স্প্যান। ৪২ নম্বর পায়ারটি জাজিরার নাওডোবা নদীর পাড়ে। ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা বহুমুখী প্রকল্পের আওতায় রয়েছে মূল সেতু, নদীশাসন, সংযোগ সড়ক ও সার্ভিস এলাকাসহ পাঁচ পর্যায়ের নির্মাণকাজ।
সেতুর ৪২টি পায়ারের ৪১ স্প্যানের ওপর স্থাপিত হবে সেতুর ৪১টি স্টিল স্টাকচার। এই স্ট্রাকচারের ওপর চলবে সেতুর অবকাঠামো নির্মাণে অন্যান্য কাজ। সড়কপথে যান চলাচলের জন্য নির্ধারিত ১৫ মিটার চওড়া কংক্রিটের সড়কের বাইরেও সেতুর মধ্যে থাকছে রেললাইন, গ্যাসলাইন ও অপটিক্যাল ফাইবার। ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর পদ্মা সেতু নির্মাণকাজ শুরু হয়ে পর্যায়ক্রমে পদ্মা সেতুর পৌনে এক কিলোমিটার জনগণের নজরে আসে। মুন্সীগঞ্জের মাওয়া ও শরীয়তপুরের জাজিরার মধ্যে স্থাপিত দ্বিতল এই পদ্মা সেতু। ভাঙ্গার অংশ যোগ করলে মোট দৈর্ঘ্য দাঁড়াবে প্রায় ৯ কিলোমিটার। পদ্মা সেতুর ১১ কিলোমিটার সংযোগ সড়কের মধ্যে সাড়ে ৯ কিলোমিটার সড়কই জাজিরা পয়েন্টে ও বাকি দুই কিলোমিটারের মতো সড়ক মাওয়া অংশে পড়েছে। এ ছাড়া সংযোগ সড়কের মধ্যে থাকছে ৯৭০ মিটারের ৫টি সেতু, ২০টি বক্স কালভার্ট, ৮টি আন্ডারপাস ও দুটি টোল প্লাজা। সেতু প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে পদ্মার দুই পারে ৭টি পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপিত করার প্রকল্প রয়েছে। পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলোতে জনসাধারণের জন্য মসজিদ, খেলার মাঠ, মার্কেটসহ সব ধরনের ব্যবস্থা রাখারও পরিকল্পনা রাখা আছে।
বিশাল প্রকল্প পদ্মা সেতু নির্মাণের পরীক্ষামূলক পাইলিং আরম্ভ হয় ২০১৫ সালের মার্চে। নদীর তলদেশে মাটির স্তরের গঠন জটিলতা কাটিয়ে প্রবল স্রোতকে উপেক্ষা করে সেতুর পাইলিং কাজ চলে নদীর দুই পারেই। নদীর পানির স্তরের ৫০ ফুট উঁচুতে বসে প্রতিটি স্প্যান। মূল নদীর মধ্যে ১৫০ মিটার পরপর ৪২টি পিলারে ৬টি করে পাইল বসনো হয়েছে। নির্মাণকাজে জটিলতার জন্য ২২টি পাইলের ডিজাইন পরিবর্তন করা হয়েছে। ২০২১ সালের মধ্যে পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ পুরোপুরি শেষ হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। ২০১২ সালের ২৯ জুন পদ্মা সেতু নির্মাণের ১২০০ মিলিয়ন ইউএস ডলার ঋণ আকস্মিকভাবে বাতিল করে বিশ^ব্যাংক। ২০০৭ সালে একনেক পদ্মা সেতুর জন্য ১০ হাজার ১৬১ কোটি টাকার পদ্মা বহুমুখী প্রকল্পটি অনুমোদন করে। নকশা পরিবর্তন করায় দৈর্ঘ্য বেড়ে যাওয়ায় ২০১১ সালে প্রথম দফায় ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় বাড়িয়ে একনেক ২০ হাজার ৫০৭ কোটি ২০ লাখ টাকার অনুমোদন দেয়। ১৯১৮ সালে
তৃতীয় দফায় পদ্মা সেতু নির্মাণের ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় সেতুর মোট ব্যয় দাঁড়ায় ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য নদীশাসনের কারণে মূল পদ্মা নদীর বেশ কয়েকটি শাখা-প্রশাখার গতি পরিবর্তন হয়েছে। ফলে লাগছে বাড়তি জমি। এ ছাড়া নদী থেকে উত্তোলিত বালু ও মাটি ফেলার জন্যও বাড়তি জমির প্রয়োজনে বেড়েছে প্রকল্প ব্যয়।
এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম পদ্মা সেতু কংক্রিট আর স্টিল দিয়ে দ্বিতল বিশিষ্ট। সেতুর ওপর দিয়ে গাড়ি ও নিচ দিয়ে ট্রেন চলাচল করবে। সেতুর ওপরের তলায় থাকবে চার লেনের মহাসড়ক। এশিয়ান হাইওয়ের সংযোগ হিসেবেও সেতুটি কার্যকর ভূমিকা রাখবে। নিচতলায় স্থাপিত হবে রেললাইন যা হবে ১৬৮ কিলোমিটার দীর্ঘ। এ ছাড়াও রেলপথে ৩টি ফ্লাইওভার, ৪০টি লেভেলক্রসিং ও আন্ডারপাস থাকবে। সেতুর ওপর দিয়ে ঘণ্টায় ১৬০ কিলোমিটার বেগে ট্রেন চলাচল করতে পারবে। সেতুটি নির্মাণে পূর্ণতা লাভ করলে ঢাকার সঙ্গে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ২১টি জেলার সড়ক ও রেল যোগাযোগে আশাতীত সাফল্য বয়ে আনবে। স্বপ্নের পদ্মা সেতু দিয়ে যুগপৎভাবে সড়ক ও রেলপথ উন্মুক্ত হলে ঘুরতে শুরু করবে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির চাকা। বিশেষ করে দেশের দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার সঙ্গে রাজধানীর যাতায়াত ব্যবস্থা সুগম হবে। জেলাগুলোতে আরও আধুনিক শিল্পকারখানা গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টি করবে। মানুষের কর্মসংস্থানের বিশাল সুযোগের মধ্য দিয়ে জীবন-জীবিকার পথ উন্মুক্ত হবে। দেশের কোটি কোটি মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়ন ঘটবে। পদ্মা নদী পারের তিন জেলাÑ মুন্সীগঞ্জ, মাদারীপুর ও শরীয়তপুরে উন্নয়নের ধারায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। সেতু নির্মাণ শেষে সেতুর ওপর দিয়ে সড়ক ও রেলপথে যানবাহন চলাচল উন্মুক্ত হলে এর সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণ, যানবাহন চলচলে শৃঙ্খলা বজায় রাখাসহ কঠোর নিয়ন্ত্রণ তদারকি, বিশেষ করে সড়ক ও সেতু ব্যবহারকারীদের দায়িত্ববোধের ওপর নির্ভর করবে বাংলাদেশের এমন একটি মেগাপ্রকল্প বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ গ্রহণের সার্থকতা।

ষ মুসাহিদ উদ্দিন আহমদ
    প্রাবন্ধিক




Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: