গুড বাই ২০২০ : স্বাগত ২০২১

রণেশ মৈত্র

সম্পাদকীয়

চিরাচরিত প্রথা হলো আগে নতুনকে স্বাগত জানানো, পরে পুরাতনকে বিদায় জানানো। সে প্রথা কতটা বিজ্ঞানসম্মত সে বিতর্কে না গিয়েও বলছি,

2020-12-31T22:20:00+00:00
2020-12-31T22:20:00+00:00
 
  বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬,
৩ আষাঢ় ১৪৩৩
বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬
সম্পাদকীয়
গুড বাই ২০২০ : স্বাগত ২০২১
রণেশ মৈত্র
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০২০, ১০:২০ পিএম   (ভিজিট : ৫২২)
চিরাচরিত প্রথা হলো আগে নতুনকে স্বাগত জানানো, পরে পুরাতনকে বিদায় জানানো। সে প্রথা কতটা বিজ্ঞানসম্মত সে বিতর্কে না গিয়েও বলছি, ঘটন-অঘটন এই ২০২০-কে আগে গুড বাই জানানো মানবসভ্যতাকে বাঁচানোর স্বার্থেই প্রয়োজন। ২০২০-এ এসে মানবসভ্যতার যে হাল বিশ^বাসীকে অসহায়ভাবে প্রত্যক্ষ করতে হলো তা অতীতে কোনোদিন কোনো জাতিকেই প্রত্যক্ষ করতে হয়নি। তাই ২০২০-এর দ্রুত বিদায় একান্তই আকাক্সিক্ষত।
মানুষের বা যেকোনো প্রাণীর কাছে তার জীবনই হলো সর্বাধিক মূল্যবান। জীবনকে বাঁচাতে, জীবনকে সাজাতে, জীবনকে অর্থবহ করে তুলতে শৈশব থেকেই মানুষকে অসীম উদ্যোগ নিয়ে তৎপর হতে দেখা যায় সর্বত্রই। মানুষের জীবন বাঁচাতে পরিবেশ বাঁচানো, নদী বাঁচানো, চিকিৎসাব্যবস্থা গড়ে তোলা, শহরে-নগরে হাসপাতাল গড়ে তোলা। হাজার হাজার স্কুল-কলেজ-বিশ^বিদ্যালয় গড়ে তোলাÑ ইত্যাকার কত কিছুই না সৃষ্টি করে মানুষ। সেই মানুষ কোনো আদিমকালে প্রথম এই পৃথিবীতে এসে তিলে তিলে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে, গড়ে তুলেছে সভ্যতা, তার বহু চিন্তারধারা ও ক্ষেত্র। সৃষ্টি করে সঙ্গীত, নৃত্য, নাটক ও নানাবিধ মাধ্যমে এগুলো গড়ে তুলতে। তার বিকাশ ঘটাতে, সর্বত্র তার বিস্তার ঘটাতে লেগেছে বহু বছর-বহু শতাব্দী। মানুষই সবকিছুর স্রষ্টা, মানুষ তার ক্রিয়াকলাপের মধ্য দিয়ে, বহুমাত্রিক পদ্ধতিতে তা দিনের পর দিন প্রতিষ্ঠিত করেও চলেছে।
সেই মানুষকে, মানুষের জীবনকে, মানুষের পৃথিবীকে, তার জীবনকে চুরমার করে দিয়েছে ২০২০। একটি মাত্র বছরেই কোটি কোটি মানুষ করোনাভাইরাস আক্রান্ত হয়ে লাখ লাখ মানুষের মৃত্যুও ঘটেছে সর্বত্র। আজ ডিসেম্বরের শেষে বা নতুন বছরের জানুয়ারিতে এসেও দেখা যাচ্ছে প্রতিটি দেশেই প্রতিদিনই মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে, মৃত্যু হচ্ছে তার একটি অংশ। এ যেন এক বিরামহীন প্রক্রিয়া-সমাপ্তিহীন প্রক্রিয়া।
আমরা বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক, সমাজ বিজ্ঞানী, শিল্পী, প্রকৌশলী, সাংবাদিককে হারিয়েছি হারানোর প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। ১৯৭১-এ যেমন বাংলাদেশকে বুদ্ধিজীবীহীন করার এক বিভীষিকাময় প্রক্রিয়া প্রত্যক্ষ করেছিলাম তার ৪৯ বছর পর আবার করোনা নামক আর এক বিভীষিকার সম্মুখীন
হতে হয়েছে।
শুধু বাংলাদেশে এমনটি ঘটেছে এমন নয়। প্রতিদিনই মিডিয়ার হেডলাইনে আসছে
পৃথিবীর সবদিক থেকে অসংখ্য মৃত্যুর খবর। এই মৃতের তালিকায় কে কে বা কারা কারা আছে তা জানা যায়নি। করোনার আঘাতে অনেক দেশ হারিয়েছে বিজ্ঞানী, শিক্ষক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, প্রকৌশলী, ক্রীড়াবিদ, রাজনীতিকসহ সমাজের নানা স্তরের অজস্র জ্ঞানী-গুণিজনকে। এই মৃত্যুতেই থেমে থাকেনি করোনার আঘাত। মাঠে মাঠে কৃষক কল-কারখানায় লাখ লাখ শ্রমিক, বিশ^ব্যাপী কোটি কোটি বেকার, বিত্তহীন, নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত সবাই আছে এই মৃত্যুর সারিতে। পৃথিবীটাই যেন হয়েছে এক
ভয়াল মৃত্যুপুরী।
কত স্বামী হারিয়েছে তার প্রিয়তমা স্ত্রীকে, কত স্ত্রী হারিয়েছে তার প্রিয়তম স্বামীকে, কত ছেলেমেয়ে তার মা ও বাবাকে, কত ভাইবোন তাদের ভাইকে বা বোনকে, কত বন্ধু হারিয়েছে তার বন্ধু বা বান্ধবীকে, কত ছাত্রছাত্রী হারিয়েছে তাদের কত প্রিয় শিক্ষক-শিক্ষিকাকে, কত হাসপাতাল হারিয়েছে তার অসংখ্য ডাক্তার, নার্স ও অপরাপর স্বাস্থ্যকর্মীকে তার কোনো ইয়ত্তা নেই।
বস্তুত গোটা পৃথিবীজুড়ে এই একটি বছর (২০২০) জুড়ে চলছে এক ভয়াবহ গণহত্যা যার কোনো নজির এতকাল পৃথিবীতে ছিল না। এই গণহত্যা প্রতিরোধে এগিয়ে এসেছেন বিশে^র খ্যাতনামা বৈজ্ঞানিকরা। তারা নানা দেশেই আবিষ্কার করে সদ্য পৃথিবীর বাজারে ছেড়েছেন করোনার ভ্যাকসিন। ইউরোপ-আমেরিকা ও প্রাচ্যের বেশ কিছু দেশে ভ্যাকসিন প্রয়োগও শুরু হয়েছে। ভ্যাকসিন আবিষ্কারক বিজ্ঞানীরা প্রকৃতই যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন করোনাভাইরাসকে নির্মূল করতে, কোটি কোটি মানুষকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে। অন্তত আরও তিন মাস বিশ^জুড়ে নানা বয়সি সুস্থ-অসুস্থ মানুষের মধ্যে নারী ও পুরুষের মধ্যে প্রয়োগের মাধ্যমেই সঠিকভাবে জানা সম্ভব হবে ভ্যাকসিনগুলো কতটা করোনা প্রতিরোধে সক্ষম। আবার শীতকালকে সামনে রেখে করোনার দ্বিতীয় দফা আক্রমণ নতুন করে শঙ্কিত করে তুলেছে বিশ^বাসীকে। এই দ্বিতীয় ঢেউয়ের আঘাত যত মৃদু হয় ততই মঙ্গল।
করোনার যে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া বিশ^ব্যাপী সৃষ্টি হয়েছে তাতে সর্বত্র ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির কবলে পৃথিবীর সব খাত। বিমান পরিবহন, ট্রেন সার্ভিস, জাহাজ চলাচল খাতগুলো সীমাহীন লোকসানের কবলে পড়েছে। অসংখ্য কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় লাখ লাখ শ্রমিক বেকারত্বের শিকার দ্রব্যমূল্য ক্রমশ বৃদ্ধি পাওয়ায় স্বল্প ও নিম্নবিত্তের মানুষের দৈনন্দিন সাংসারিক ব্যয় নির্বাহে বিপর্যস্ত। অভুক্ত-অর্ধভুক্ত মানুষের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। সব দেশের সরকার যদিও ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থা করেছেন তা প্রয়োজনের তুলনায় নেহায়েতই অনুল্লেখযোগ্য। ২০২০-এর করোনায়
সাংস্কৃতিক খাতের ক্ষতি অপূরণীয়। সঙ্গীত বিদ্যালয়-মহাবিদ্যালয়গুলো বন্ধ, সঙ্গীতানুষ্ঠান, নৃত্যানুষ্ঠান, নাট্যানুষ্ঠান, সিনেমা হলগুলো বন্ধ। বন্ধ অভিনেতা-অভিনেত্রীদের শুটিং। বিনোদনের সব পথই বন্ধ করে দিয়েছে করোনা।
এত দুঃসংবাদের মধ্যে দুটি বড় মাত্রার সুসংবাদ হলোÑ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে সে দেশের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরাজয়। ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকাজুড়ে করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যু প্রতিরোধে ইচ্ছাকৃতভাবে নিষ্ক্রিয় থেকে অসংখ্য মানুষকে সংক্রমণ ও মৃত্যুর শিকারে পরিণত করেছেন। চীনকে এই ভাইরাস সৃষ্টি ও বিশ^ময় ছড়িয়ে দেওয়ার এবং এ কাজে বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা চীনের সহযোগী বলে উত্থাপন করে নিজ দেশের ক্ষেত্রে তার দায়িত্বে ইচ্ছাকৃত অবহেলা করে মারাত্মক অপরাধের ও বর্ণবাদী বৈষম্য সৃষ্টির প্রতীকে পরিণত হয়েছিলেন। তাই তার পরাজয় বিদায়ি বছরের উৎকৃষ্টতম ঘটনা। আমেরিকাবাসীরা এই অহমিকায় ভরা, দায়িত্বহীন, বর্ণবাদের ও সাম্প্রদায়িকতার রক্ষককে ভোটে হারিয়ে গোটা গণতান্ত্রিক বিশে^র ধন্যবাদ পেয়েছেন।
অপরটি হলো এত বিপুল সংখ্যায় সব দেশে সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঘটনা বিশ^ব্যাপী ঘটলেও সমাজতান্ত্রিক কিউবায় আক্রান্তের সংখ্যা ১১ হাজার ২০৫ এবং মৃত্যু মাত্র ১৪২ (২৮ ডিসেম্বর, ২০২০ পর্যন্ত) এ রাখতে পেরে গৌরবের দাবি করতে পারে। অনুরূপভাবে চীনের নিকটবর্তী সমাজতান্ত্রিক দেশ ভিয়েতনামে আজতক সংক্রমিত হয়েছে ১ হাজার ৪৪১ জন এবং মৃত্যু ঘটেছে মাত্র ৩৫ জনের, ভারতে ব্যাপক সংক্রমণ ও মৃত্যু ঘটা সত্ত্বেও কমিউনিস্ট শাসিত রাজ্য কেরালা ২ হাজার ৯৭৬-এ করোনা মৃত্যু সীমিত রাখতে পেরেছে। অস্ট্রেলিয়ায় এ যাবত ২৮ হাজার ৩১২ জন সংক্রমিত এবং মৃত মাত্র ৯০৮, নিউজিল্যান্ডে আক্রান্ত ২ হাজার ১৪৪ এবং মৃত মাত্র ২৫।
এবারে চীনে প্রায় দেড়শ কোটি মানুষের মধ্যে এ যাবত আক্রান্ত ৮৬ হাজার ৯৭৬ এবং মৃত্যু মাত্র ৪ হাজার ৬৩৪। উল্লেখ্য, এই চীনেই করোনাভাইরাসের উৎপত্তি। এই কম মৃত্যুর দেশগুলো প্রমাণ করেছে, নিয়মকানুন কড়াকড়িভাবে মানলে করোনা নিয়ন্ত্রণে
রাখা সম্ভব।
নববর্ষ ২০২১
স্বাগত বিপুল আশাবাদের নতুন বছর ২০২১। ওপরের বর্ণনাগুলো থেকেই মূর্ত হয়ে উঠেছে নতুন বছরে বিশ^বাসীর আকাক্সক্ষা কী? করোনাভাইরাসের হাত থেকে তার দ্বারা সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঘটনা বন্ধ করাই হলো নতুন বছরের কাছে সবার প্রত্যাশা। আসলে ব্যাপকভাবে পৃথিবীব্যাপী প্রয়োগের বছর হবে ২০২১। এই ব্যাপক মানে আসলে কতটা তা আজও অনুমান করা যাচ্ছে না। তবে পৃথিবীর ২৫ ভাগ মানুষ যদি ভ্যাকসিনটি ২০২১-এর মধ্যে পেয়ে যায় তবে সম্ভবত দৃশ্যমান হয়ে উঠতে শুরু করবে
এর সুফল।
২০২২-এ তা হলে বাদবাকি সবাই ভ্যাকসিন পেয়ে যাবেন নিশ্চিত করেই বলা যায় কারণ ভ্যাকসিন উৎপাদনকারী সংস্থাগুলো ব্যাপক সংখ্যক ভ্যাকসিন উৎপাদনে আত্মনিয়োগ করবেন তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থেই।
তবে আমাদের মতো গরিব দেশগুলোতে কী হারে ভ্যাকসিন দেওয়া কখন থেকে শুরু হবে তা এখনও অনিশ্চিত। প্রত্যাশা এসব প্রতিবন্ধকতা সফলভাবে মোকাবিলা করে দ্রুত ভ্যাকসিনেশন দেওয়া শুরু এবং শেষ হোক। মানুষ বাঁচুক। মানুষের হতাশা কাটুন। অর্থনীতি সচল হয়ে উঠুক পৃথিবীব্যাপী। কলকারখানা-কৃষি উৎপাদন চালু হোক ব্যাপক হারে। বেকারত্ব দূর হোক। শিক্ষার অচলাবস্থা কাটুক। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডও পুনরুজ্জীবিত হোক।
আমেরিকার মতো পৃথিবীর সব সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রনায়কের পতন ঘটুক। বাইডেন আমেরিকার মানুষকে করোনামুক্ত, বর্ণবাদমুক্ত, সাম্প্রদায়িকতা মুক্ত করে গড়ার যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট নিয়েছে তা পরিপূর্ণভাবে প্রতিপালন করুন।
বেশি প্রত্যাশা নয় এটুকুই হোক অন্তত। স্বাগত ২০২১।

ষ  সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, ঐক্য ন্যাপ

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: