মানি লন্ডারিং আইন সমকালীন প্রসঙ্গ

সম্পাদকীয়

অর্থনীতি একটি দেশের প্রধান চালিকাশক্তি। যে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যত স্বচ্ছ, সে দেশ ততই উন্নত। একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন বাধাপ্রাপ্ত

2020-12-30T22:49:00+00:00
2020-12-30T22:49:00+00:00
 
  বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬,
৩ আষাঢ় ১৪৩৩
বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬
সম্পাদকীয়
মানি লন্ডারিং আইন সমকালীন প্রসঙ্গ
প্রকাশ: বুধবার, ৩০ ডিসেম্বর, ২০২০, ১০:৪৯ পিএম   (ভিজিট : ৫৪৫)
অর্থনীতি একটি দেশের প্রধান চালিকাশক্তি। যে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যত স্বচ্ছ, সে দেশ ততই উন্নত। একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন বাধাপ্রাপ্ত হওয়ার পেছনে যেসব কারণ বিদ্যমান তার মধ্যে অন্যতম হলো মানি লন্ডারিং তথা অর্থপাচার। বর্তমানে দেশে অর্থপাচারের খবর নিত্য ঘটনা। পত্রিকা থেকে শুরু করে সব মিডিয়ার কেন্দ্রবিন্দু হলো অর্থপাচারের খবর। সাময়িক স্বপ্নপূরণের জন্য নিজের দেশের অর্থ অন্য দেশে পাচারের ফলে উন্নত দেশ আরও উন্নত হচ্ছে। অন্যদিকে আমাদের দেশের অর্থনৈতিক খাত ধ্বংস হচ্ছে। অর্থপাচারের এই প্রবণতা দুয়েক বছরে তৈরি হয়নি বরং ৭০ দশক থেকেই চলে আসছে। মূলত তখন থেকেই দেশের বড় বড় আমলা ও রাজনৈতিক নেতারা অর্থপাচারের এই সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। মানি লন্ডারিং তথা অর্থপাচার হলো একটি অবৈধ অর্থনৈতিক কার্যক্রম। ব্যাপকার্থে মানি লন্ডারিং বলতে বোঝায়, যে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অবৈধ সম্পদের উৎস গোপন করার উদ্দেশ্যে সেই সম্পদের আংশিক বা পূর্ণ অংশ রূপান্তর বা এমন কোনো বৈধ জায়গায় বিনিয়োগ করা হয় যাতে করে সেই বিনিয়োগকৃত সম্পদ থেকে অর্জিত আয় বৈধ বলে মনে হয়। অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংকের সক্রিয় সহায়তায় মানি লন্ডারিং কার্যক্রম চলে। মানি লন্ডারিং একটি ফৌজদারি অপরাধ। তবে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ২(ফ) ধারা মতে মানি লন্ডারিং অর্থÑ ‘বৈধ বা অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থ বা সম্পত্তি নিয়ম-বহির্ভূতভাবে বিদেশে পাচার করা অথবা জ্ঞাতসারে অপরাধলব্ধ আয়ের অবৈধ উৎস গোপন করবার উদ্দেশ্যে অর্থের হস্তান্তর, বিদেশে প্রেরণ বা বিদেশ হতে বাংলাদেশে আনাকে বোঝায়।’
ওয়াশিংটনভিত্তিক সংস্থা গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) সর্বশেষ তথ্য মতে ২০০৫ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত গত ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৭ হাজার ৫৮৫ কোটি ডলার পাচার হয়েছে। ২০১৫ সালে আরও পাচার হয়েছে ৫৯০ কোটি ডলার। সুতরাং মোট পাচার হয়েছে ৮ হাজার ১৭৫ কোটি ডলার। বর্তমান বাজার দরে যার মূল্যমান ৬ লাখ ৮৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। যে পরিমাণ অর্থ দেশ থেকে পাচার হয়েছে তা দিয়ে হরহামেশাই বাংলাদেশের দুই দফা জাতীয় বাজেট ঘোষণা করা সম্ভব। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য, অন্য সব দেশের অর্থপাচারের তথ্য পাওয়া যায় ২০১৭ সাল পর্যন্ত কিন্তু বাংলাদেশের সর্বশেষ তথ্য ২০১৫ সাল পর্যন্ত। কেননা পরের দুই বছর বিশে^র অন্যান্য দেশ তথ্য দিলেও বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের তথ্য জানা যায়নি। জিএফআইয়ের আরও তথ্য মতে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর গড়ে ৭৫৩ কোটি ৩৭ লাখ ডলার পাচার হয়। গড় অর্থ পাচারের হিসাবে ১৩৫টি উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ৩৩তম। অর্থপাচারের টাকার প্রায় বড় একটি অংশ পুঞ্জীভূত হয় সুইজারল্যান্ডের সুইস ব্যাংকে। অনেকেই ভাবতে পারেন সুইস ব্যাংকে যেহেতু কালো টাকা জমা হয় সেহেতু ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তথ্য প্রকাশ করলেই তো তাদেরকে চিহ্নিত করা যায়। কিন্তু এরূপ তথ্য তারা প্রকাশ করে না। কারণ ১৯৩০-এর দশকে ফ্রান্সের কিছু রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা টাকা পাচার করে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে রাখে। পরবর্তীতে সেই তথ্য ফাঁস হয়ে যায়। এরপরই ১৯৩৪ সালে সুইজারল্যান্ড ‘সুইস ব্যাংকিং অ্যাক্ট’ নামে একটি আইন পাস করে। ওই আইন অনুযায়ী কোনো গ্রাহকের তথ্য সুইস ব্যাংক প্রকাশ করতে পারবে না। এরপর থেকেই সুইস ব্যাংকগুলোর গোপন হিসাবে অর্থ রাখার প্রবণতা বেড়ে যায়। তবে ৩০ দশকের শেষ দিকে জার্মানিতে নাৎসিদের বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান শুরু করলে ইহুদিরা তাদের অর্থ সুইস ব্যাংকে রাখা শুরু করে। সুইস ব্যাংকের রমরমা ব্যবসা তখন থেকেই মূলত শুরু হয়। (সূত্র : প্রথম আলো; ১২ জুলাই ২০২০)।
সুইস ব্যাংকে সবচেয়ে বেশি অর্থ জমা রাখে যুক্তরাজ্যের নাগরিক। তারপর পর্যায়ক্রমে যুক্তরাষ্ট্র, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ফ্রান্স ও হংকং। বাংলাদেশের অবস্থান ৮৫তম। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের চেয়ে খারাপ অবস্থান একমাত্র ভারতের। ভারতের অবস্থান ৭৭তম। অন্যদিকে পাকিস্তানের অবস্থান ৯৯তম, নেপাল ১১৮তম, শ্রীলঙ্কা ১৪৮তম, মিয়ানমার ১৮৬তম এবং ভুটান ১৯৬তম। প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, ২০০৪ সালে সুইস ব্যাংকে অর্থ রাখা দেশের তালিকায় ভারত ছিল ৩৭তম। আর এখন তারা ৭৭তম। ২০০৫ সালে ভারতের নাগরিকদের রাখা অর্থের পরিমাণ ছিল ৪৭ হাজার ৬১৫ কোটি টাকা। একই সময় বাংলাদেশের ছিল ৮৬৩ কোটি টাকা। তবে সর্বশেষ ২০১৯ সালের তথ্য অনুযায়ী সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশের নাগরিকদের আছে ৫ হাজার ৩৩৭ কোটি টাকা। অন্যদিকে ভারতীয় নাগরিকদের আছে ৮ হাজার ১০ কোটি টাকা। সুতরাং আনুপাতিক হারে বাংলাদেশ ভারতের চেয়ে অর্থপাচারে শীর্ষে অবস্থান করছে। সম্প্রতি কর ফাঁকি, অপরাধমূলক ও জঙ্গি কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন বেড়ে যাওয়ায় ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে তাদের কঠোর অবস্থান থেকে সরে আসতে হচ্ছে। একই সঙ্গে দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সনদ অনুযায়ী, কয়েক বছর ধরে তারা শুধু কোনো নির্দিষ্ট দেশের শুধু জমাকৃত অর্থের পরিমাণ প্রকাশ করছে। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নাম প্রকাশে এখন অবধি অনিচ্ছুক।
বর্তমানে আলোচিত কিছু অর্থপাচার কাণ্ড হলোÑ এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রশান্ত কুমার হালদারের নামে ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ। এদিকে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও ১৪৮ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে কুয়েতে গ্রেফতার লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য কাজী শহিদ ইসলাম পাপুল। সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় ২২৩ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ উঠেছে যুবলীগ নেতা সম্রাটের বিরুদ্ধে। এ ছাড়াও জিকে শামীম, সাহেদ, সেলিম প্রধান বা গোল্ডেন মনিরের নামে কোটি কোটি টাকা অর্থপাচারের অভিযোগ উঠেছে। আর এসব ঘটনা আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য কতটা ভয়াবহ ও অভিশাপ তা আজ আমরা রন্ধ্রে রন্ধ্রে উপলব্ধি করছি।
অর্থপাচারের নেপথ্যে যেসব কারণ বিদ্যমান তা হলোÑ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কালো টাকা দেশে সহজে ভোগ করতে পারে না। এ জন্য তারা বিভিন্ন দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যে বিনিয়োগ করার পাশাপাশি বিভিন্ন দেশে সেকেন্ড হোমও গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। কানাডার বেগম পাড়াতেও বসতি স্থাপন করেছে বাংলাদেশের অনেক নাগরিক। কানাডার বেগমপাড়া বেশি আলোচনায় এলেও যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, দুবাই, ইন্ডিয়া ও থাইল্যান্ডে বহুলাংশে অর্থপাচার হচ্ছে। অর্থপাচার রোধে যে আইন দরকার তা বাংলাদেশে আছে, যা নেই তা হলো আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ। মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ৪ ধারা মতে, ‘কোনো ব্যক্তি মানি লন্ডারিং অপরাধ করলে বা অপরাধ সংঘটনের চেষ্টা বা ষড়যন্ত্র করলে তিনি কমপক্ষে ৪ বছর এবং সর্বোচ্চ ১২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং অর্থদণ্ড হবে সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির দ্বিগুণ মূল্যের সমপরিমাণ বা ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত, এ দুয়ের মধ্যে যেটা অধিক।’ অত্র ধারাতে আরও বলা হয়েছে যে, ‘যদি কোনো প্রতিষ্ঠান এরূপ কাজ করে, তাহলে পূর্বের দণ্ডই থাকবে তবে অর্থদণ্ড হবে সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির দ্বিগুণ মূল্যের সমপরিমাণ বা ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত, এ দুয়ের মধ্যে যেটা অধিক।’ একই আইনের ৮ ধারাতে বলা হয়েছে, ‘কোনো ব্যক্তি জ্ঞাতসারে যদি তার অর্থের উৎস বা হিসাব সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য প্রদান করেন তাহলে তিনি সর্বোচ্চ ৩ বছর কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।’
অর্থপাচারের তদন্ত সাধারণত দুদক করে থাকে। এক্ষেত্রে দুদককে আরও বেশি শক্ত অবস্থানে থাকতে হবে। দেশ থেকে বিনিয়োগ না হয়ে যদি এভাবে অর্থ পাচার হতে থাকে তাহলে দেশ শূন্য ঝুড়িতে পরিণত হবে। আজ আমরা মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার যে স্বপ্ন দেখছি, লাখ লাখ কোটি টাকা পাচার হলে সে স্বপ্ন শুধু স্বপ্নই থেকে যাবে। বাস্তবে রূপ নেবে না। মনে রাখতে হবে, পাচারকারীরা শুধু দেশ, জাতি বা সমাজের শত্রু না। বরং এরা রাষ্ট্রের জন্য করোনাভাইরাস। সর্বোপরি অর্থপাচার রোধে চাই একটি সুষ্ঠু সিদ্ধান্ত, যা দেশবাসীর সম্মিলিত প্রত্যাশা।

ষ আবুজার গিফারী
     শিক্ষার্থী; আইন বিভাগ, ইসলামী বিশ^বিদ্যালয়, কুষ্টিয়া


Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: