শঙ্খ বাজবে চিরদিন

আলোর রেখা

কুশল ভৌমিক‘শূন্যতাই জানো শুধু? শূন্যের ভিতরে এত ঢেউ আছে সে কথা জানো না?’ Ñশূন্যের ভেতর, শঙ্খ ঘোষশঙ্খ ঘোষ নেই অথচ

2021-04-30T00:00:00+00:00
2021-04-30T00:00:00+00:00
 
  সোমবার, ৮ জুন ২০২৬,
২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
সোমবার, ৮ জুন ২০২৬
আলোর রেখা
শঙ্খ বাজবে চিরদিন
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩০ এপ্রিল, ২০২১, ১২:০০ এএম   (ভিজিট : ৩৪৯)
কুশল ভৌমিক
‘শূন্যতাই জানো শুধু? শূন্যের ভিতরে এত ঢেউ আছে সে কথা জানো না?’
    Ñশূন্যের ভেতর, শঙ্খ ঘোষ
শঙ্খ ঘোষ নেই অথচ তিনি আছেন, ভীষণ রকমভাবে তার সাহিত্যকর্মে মৃত্যুঞ্জয়ী হয়ে। সেই পঞ্চাশ দশক থেকে নিভৃতে রাজনীতির সঙ্গে, গণমানুষের সঙ্গে, কাব্যবোধসম্পন্ন মননশীল মানুষদের সঙ্গে। কবিতার একটা সাঁকো নির্মাণের কাজ তিনি শুরু করেছেন। বোধকরি কেউ এতে দ্বিমত পোষণ করবেন না, তিনি সেই সাঁকো নির্মাণে ভীষণ সফল একজন। চল্লিশ-পরবর্তী বাংলা কবিতার ধারা স্পষ্টতই দুটো ভাগে বিভক্ত। ১. রোমান্টিক যুগের কবিদের অনুসরণ করে নিও-রোমান্টিক ধারা, ২. দেশভাগ, সামাজিক অস্থিরতা, রাজনৈতিক বিপণ্নতা, অন্তর্গত টানাপড়েনের প্রতিক্রিয়ায় যাবতীয় রোমান্টিসিজমকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে, স্পর্ধায় মাথা তুলবার প্রবণতা বা এন্টি-রোমান্টিসজম। শঙ্খ ঘোষ এ দুই ধারারই মিথস্ক্রিয়া অথচ স্বর নিচু, পরতে পরতে শব্দের আদরমাখা। তার কবিতা তাই অনায়াসে ছুঁয়ে দিয়েছে জীবন অথচ কখনই স্লোগান হয়ে যায়নি। আমৃত্যু তিনি নৈঃশব্দ্যের পূজারি হয়ে থেকেছেন অথচ তার স্বল্প উচ্চারণই বজ্রভেদী হয়েছে নন্দীগ্রামে, কামদুনিতে। ধ্যানমগ্ন থেকেও অনায়াসে তিনি হয়ে উঠেছেন মানুষের কবি।
শঙ্খ ঘোষের প্রকৃত নাম চিত্তপ্রিয় ঘোষ। জন্ম ১৯৩২ সালে অবিভক্ত ভারতের পূর্ববঙ্গে, বর্তমান বাংলাদেশের চাঁদপুর জেলায়। চাঁদপুরে জন্ম হলেও বংশানুক্রমিকভাবে তার পৈতৃক কর্মস্থল হবার সুবাদে তার শৈশবের একটা বড় অংশ কেটেছে পাবনার পাকশীতে। পাবনার চন্দ্রপ্রভা বিদ্যাপীঠ থেকে তিনি ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। স্বভাবতই বাংলাদেশের প্রতি তার গভীর নাড়ির টান ছিল। তিনি বারবার ছুটে এসেছেন বাংলাদেশে। তার কবিতায়, গদ্যে বারবার উঠে এসেছে দেশভাগ, ভাষা আন্দোলন আর মুক্তিযুদ্ধ। যদিও কবিদের কোনো দেশ থাকতে নেই। কবি মাত্রই সকল দেশের সকল মানুষের। তবুও কবি শঙ্খ ঘোষের সঙ্গে বাংলাদেশের এই জন্ম ও মননের আত্মিক টান আমাদের গর্বিত করে, আহ্লাদিত করে বৈকি।
কবি শঙ্খ ঘোষকে আমার কাছে আধুনিক কবিদের মধ্যে সবচেয়ে পরিমিতি বোধসম্পন্ন কবি মনে হয়। বাক্যসুষমা, নির্ভুল বানান, নিপুণ ছন্দশৈলীতে তিনি যেমন শুদ্ধাচারী তেমনি নীতি-আদর্শ জীবনাচরণেও ছিলেন ভীষণ নির্লোভ, শুদ্ধাচারী একজন মানুষ।
কেবল কবিতাই নয়, তিনি প্রচুর গদ্য লিখেছেন এবং তার গদ্য চুম্বকীয়, মনকাড়া, ভনিতাহীন সকালের রোদের মতো। শঙ্খ ঘোষের ‘জার্নাল’ স্মৃতিগদ্য পাঠ করলে সহজেই অনুভব করা যায় সহজ-সাবলীলভাবে বলা তার মুখের কথাগুলোও মূল্যবান সাহিত্য হয়ে টিকে থাকবে যুগের পর যুগ।
লেখালেখির শুরুর থেকেই শঙ্খ ঘোষকে অবশ্যপাঠ্য মেনেছি। তার ‘ছন্দের বারান্দায়’ হাঁটাহাঁটি করেননি এমন তরুণ কবি দু’বাংলাতেই হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে না। তার ‘বাবরের প্রার্থনা’র পঙ্ক্তিগুলো কিংবা ‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে’র সেই অবিস্মরণীয় লাইনগুলো কতবার যে আপনমনে আবৃত্তি করেছিÑ
‘একলা হয়ে দাঁড়িয়ে আছি
তোমার জন্য গলির কোণে
ভাবি আমার মুখ দেখাব
মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে।’
তার কবিতা তো অবশ্যই কালোত্তীর্ণÑ এ ব্যাপারে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই কিন্তু তার গদ্য আমার অসম্ভব প্রিয়। বারবার মুগ্ধ হয়েছি তার ঈর্ষণীয় গদ্যের মহিমাগুণে। তার ভ্রমণকাহিনি, স্মৃতিগদ্য কিংবা প্রবন্ধ পাঠ করলে আমাদের মনে হয় তার গদ্যসম্ভার যেন অফুরান আনন্দের প্রাণময়ী উৎস। একজন স্বল্পবাক এবং দৃশ্যত গম্ভীর মানুষটিও যেন প্রকৃতপ্রস্তাবে কতটা সুরচিক এবং প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা তা শঙ্খ ঘোষের ‘ইছামতীর মশা’ গদ্য সংকলনটি পাঠ না করলে জানাই হতো না। শঙ্খ ঘোষের গদ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলোÑ তার নিবিড় ভাব ও গভীর জ্ঞানের কথাগুলোকেও কখনও বিশ^বিদ্যালয়ের রাশভারী অধ্যাপকের দুর্বোধ্য লেকচার মনে হয় না, মনে হয়Ñ ভীষণ আন্তরিক কোনো বন্ধুর মুখোমুখি বসে তার জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞান, পঠন-পাঠন আর জীবনকে দেখার পরিধি খুব কাছ থেকে উপলব্ধি করছি। সত্যি কথা বলতে কীÑ শঙ্খ ঘোষের ‘নিঃশব্দের তর্জনী’, ‘জার্নাল’, ‘ঘুমিয়ে পড়া এলবাম’ গ্রন্থগুলো পাঠ করে কবিতার ভাবনাকে অবচেতনে নির্মাণ করার সাহস পেয়েছি। তার একটি গদ্যগ্রন্থÑ নাম : ‘শব্দ আর সত্য’। এই বইয়ের একটি প্রবন্ধের কয়েকটি লাইনÑ
‘শব্দবাহুল্যের বাইরে দাঁড়িয়ে, ভুল আস্ফালনের বাইরে দাঁড়িয়ে, সত্যিই যদি নিজেকে, নিজের ভেতর এবং বাহিরকে আগ্নেয় জীবনযাপনের বিভীষিকার সামনে খুলে দিতে পারেন কবি, সেই হবে আজ তাঁর অস্তিত্বের পরম যোগ্যতা, তাঁর কবিতা।’
এই লাইনগুলো সবসময় আমাকে উদ্দীপ্ত করে। মূলত শঙ্খ ঘোষই আমাকে শিখিয়েছেন কবিতার ক্ষেত্রে কী বলা যাবে, তার চেয়েও বেশি জরুরিÑ কী বলা যাবে না। শঙ্খ ঘোষের প্রবন্ধের ভাষায় ও পরিবেশনার মধ্যে আমরা সাহিত্যরুচির এক ধরনের নির্জন, ধ্যানমগ্ন, নিবিড় পরিশীলিত রূপ দেখতে পাই। তার প্রবন্ধের বিষয়বৈচিত্র্য এবং জ্ঞানের পরিধি এতই বিস্তৃত যে, পাঠান্তে অবচেতনেই মাথা নত হয়ে আসে।
সেই ‘বাবরের প্রার্থনা’র যুগ থেকেই কবি শঙ্খ ঘোষ আমাদের অন্তর্গত চেতনায় প্রবাহিত করে চলেছেন বহির্বাস্তবের চিরন্তন ধ্যানশিখা। সাজানো-গোছানো বাগানে শঙ্খ ঘোষের চিরকালই অনাস্থা : জীবনের রুক্ষ, রূঢ় বাস্তবতার ভেতর থেকেই তিনি সংগ্রহ করেন শিল্পের সুষমা। শব্দের আদরে, ছন্দের বিন্যাসে তা হয়ে ওঠে মহৎ কবিতা। এ যেন শব্দের ভেতর হেঁটে শব্দাতীত এক জগৎ নির্মাণ। ‘মূর্খ বড়ো সামাজিক নয়’ কবিতাটির প্রথম দু লাইন উদ্ধৃত করার লোভ সামলাতে পারছি নাÑ
‘ঘরে ফিরে মনে হয় বড়ো বেশি কথা বলা হলো?/ চতুরতা, ক্লান্ত লাগে খুব?’
কবি হিসাবে শঙ্খ ঘোষ কিংবদন্তি, রবীন্দ্র গবেষক হিসেবে সর্বজনবিদিত, প্রাবন্ধিক হিসেবে পূজনীয়, অধ্যাপক হিসেবে সুপণ্ডিত ও জনপ্রিয়, মানুষ হিসেবে শুদ্ধাচারী ও অনন্য। তার প্রাপ্তির খাতাও পরিপূর্ণ। সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার পেয়েছেন দুবার। ১৯৭৭ সালে ‘বাবরের প্রার্থনা’ কাব্যগ্রন্থের জন্য, ১৯৯৯ সালে কন্নড় ভাষা থেকে বাংলায় ‘রক্তকল্যাণ’ নাটকটি অনুবাদ করার জন্য। ‘ধুম লেগেছে হৃদকমলে’ গ্রন্থের জন্য রবীন্দ্র পুরস্কার পেয়েছেন ১৯৮৯ সালে। ২০১১ সালে ভারত সরকার তাকে পদ্মভূষণ উপাধিতে ভূষিত করে, জ্ঞানপীঠ পুরস্কার লাভ করেন ২০১৬ সালে। এ ছাড়াও লাভ করেছেন অজস্র পুরস্কার। আর সবচেয়ে বড় পুরস্কার মানুষের শ্রদ্ধা, ভালোবাসাÑ সে তো লাভ করেছেন ষোলআনাই।
শঙ্খ ঘোষের প্রতিভা ও অবদানকে সংজ্ঞায়িত বা মূল্যায়িত করা অসম্ভব। তিনি এমনই প্রণম্য একজন, যাকে বলা যেতে পারেÑ বিংশ শতাব্দীর বাংলা সাহিত্যের এক মহান আবির্ভাব। শঙ্খ ঘোষ নেই কিন্তু তার শঙ্খধ্বনি বাজবে চিরকাল।

ষ শিক্ষক, কবি ও প্রাবন্ধিক

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: