প্রকাশ: শুক্রবার, ২৫ জুন, ২০২১, ১০:৫৪ পিএম (ভিজিট : ৫৯৮)
আরও কয়েক বছর আগে থেকেই আমাদের এখানে অণুগল্প বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। সাহিত্যের অন্যান্য শাখার মতো অণুগল্প বা ফ্লাশফিকশনও আর একটি শাখা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে। আর সেই পথে বেশ শক্তভাবেই এগুচ্ছে। সময়ের প্রয়োজনে নতুন অনেক কিছুকেই গ্রহণ করতে হয়, একসময় তা অপরিহার্য ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। প্রথমদিকে নতুন অনেক কিছুই গ্রহণীয় বা আদরণীয় হয়ে ওঠে না।
সময়ের সিঁড়ি ধরে সময় ও বাস্তবতার প্রয়োজনে নিজস্ব অবস্থান নির্মাণ করে নিতে হয়। আর তা সম্ভব না হলে হারিয়ে যায়। অতীতে সাহিত্যে অপরিহার্য এরকম সংযোজন যেমন ঘটেছে, গুরুত্বপূর্ণ ও জনপ্রিয় হয়ে উঠতে না পেরে হারিয়েও গেছে। এসব ঘটনা কমবেশি আমাদের সাহিত্যে আছে। বিদেশি সাহিত্যেও আছে। সাহিত্যের কাল-বিচারে এটা একেবারেই পরিষ্কার বোঝা যায়।
অণুগল্পের কথা বলতে গেলে উপন্যাসের কথাÑ ছোটগল্পের কথা প্রাসঙ্গিকতায় অনিবার্য হয়ে ওঠে। আঠারো শতকের ফরাসিবিপ্লব ও শিল্পবিপ্লব উপন্যাসের জন্ম দিয়েছিল। আর ছোটগল্পের জন্ম হলো মানুষের আকাশহীনতা, দ্রুতগতির জীবনযাত্রা, অস্তিত্বের সংকট, ব্যক্তিজীবনের বহুমুখী সমস্যাসংকুল থেকে। এই যুক্তি যদি মেনে নেই, তাহলে আমেরিকানরা ব্যস্ততার কারণে ছোটগল্পকে গুরুত্ব দিয়েছে। কিন্তু এটাও তো সত্য, সেই সময়ে আমেরিকানদের চেয়েও বেশি ব্যস্ত ছিল ইংরেজরা। সেখানে শিল্পবিপ্লবের ফলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিরাট পরিবর্তন ঘটেছিল। শ্রেণিবৈষম্য তীব্রতর হয়েছিল। আবার ধনীলোকদের মধ্যে সাম্রাজ্যবাদী দম্ভও সৃষ্টি হয়েছিল। সেখানে তো তখন সার্থক ছোটগল্প তৈরি হয়নি।
ফ্রান্স বা রাশিয়ার জীবনযাত্রায় তেমন ব্যস্ততা ছিল না। বরং ফরাসিবিপ্লব-পরবর্তী পর্বে ফ্রান্সে অভিজাত সম্প্রদায়ের অবক্ষয় এবং মধ্যবিত্তের অস্তিত্বের সংকট সৃষ্টি হয়েছিল। রাশিয়ার অবস্থাও তখন একইরকম। ভিন্ন ভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে তখন তিন মহাদেশে একই সময়ে ছোটগল্পের আবির্ভাব ঘটেছিল। এটা নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর ব্যাপার। কারণ সেসময়ে যোগাযোগের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। তাহলে সময়ের অভাবে নয়, সময়ের প্রয়োজনেই ছোটগল্পের জন্ম হয়েছিল। আমাদের এখানে এর একশ বছর পরে ছোটগল্পের সার্থক অভিযাত্রা ঘটে রবীন্দ্রনাথের হাতে। তখন বাংলা ছোটগল্পের রূপ-রীতি-আকার-বর্ণ-গন্ধÑ এসব সম্পর্কে কোনো নির্দিষ্ট ধারণা ছিল না। রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প প্রথমে পাঠকনন্দিত হয়নি। মানুষের জীবনের ছোট ছোট দুঃখ কষ্ট আনন্দ বেদনা গ্রামীণ জীবনÑ পাঠকের কাছে প্রথমে আদৃত হয়নি। তবে, পরবর্তী সময়ে সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। পাঠক রবীন্দ্রগল্পকে গ্রহণ করেছে সাদরে।
এখন কথা হচ্ছে, বাংলা অণুগল্পের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি কী দাঁড়াচ্ছে? অণুগল্পের ভেতর দিয়ে জীবনের দর্শন-বাস্তবতা আনন্দ-বেদনা সুখ-দুঃখ কতটুকু ধরা যায়? কতটুকু ধরতে পারছে? উপন্যাস ও ছোটগল্পের মতো অণুগল্পও আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে আরও বহু আগেই সৃষ্টি হয়েছে। গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছেÑ সমাদৃত হয়েছে। আমাদের অণুগল্পের চেহারা কেমনÑ আকারটা কেমনÑ মেসেজ কেমনÑ বর্ণ-গন্ধ কেমনÑ নাকি এটা পুরো বোধের ও অনুভবের! নাকি এর চেহারা-আকৃতি-মাল-মশলা দেখে গুণবিচার করা সম্ভব! এসব প্রশ্ন থাকতেই পারে। শুধু শিরোনামেই যেমন একটি অণুগল্প অর্থবহ হয়ে উঠতে পারে, আবার হাজার শব্দের হতে পারে। এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো ব্যাকরণ এখনও নেই। যেমন ছোটগল্পের ক্ষেত্রেও ছিল না।
ছোটগল্পের আকার-আকৃতি ও অতৃপ্তিকর সমাপ্তি নিয়ে রবীন্দ্রনাথ যে ধারণাটি প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, পরবর্তী সময়ে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসরা সেই ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে ছোটগল্প রচনা করে খ্যাতিমান হয়েছেন। অণুগল্প নিয়ে আমাদের সাহিত্যে যে আগ্রহ ও পাঠকপ্রিয়তা তৈরি হয়েছে, সেটা নতুনের অপ্রতিরোধ্য অভিযাত্রা ভাবতে চাই। কিন্তু সাহিত্যে স্থায়ী হিসেবে পরিগণিত হতে গেলে অণুগল্পকে আরও বিস্তর কঠিন পথ হাঁটতে হবে দৃঢ়তায়। তবে, মেধা ও মননেÑ জীবন-সমাজ-বাস্তবতা সেখানে কোন স্বরূপে এবং কতটা উচ্চমার্গের শৈল্পিকতায় প্রতিষ্ঠিত হবে, তা একটা বড় ব্যাপার। যদি কবিতার মতো বোধ-চিন্তা-আবেগে কোষবন্দি হয়ে পড়ে, তাহলে কবিতার অতল গহ্বরে অণুগল্প হারিয়ে গেলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। কথাটা এ কারণেই বলছি, অনেক অণুগল্পই দেখা যায় কবিতার ঢঙে রচিতÑ ভাবে-স্বাদে কবিতাকে তীব্রভাবে মনে করিয়ে দেয়। এটা তো এখন বলা যেতেই পারে, সময়ের প্রবহমান স্রোতে অণুগল্পের নিজস্ব রূপ বহুমাত্রিক পরীক্ষা-নিরীক্ষায় কঠিন পথ হেঁটে আপন শক্তিমত্তায় প্রতিষ্ঠিত হবেÑ সেই প্রবল আলোটা ভালোভাবেই প্রতিফলিত হচ্ছে। একদিন এভাবেই উপন্যাস ও ছোটগল্পকেও বহু পথ পেরিয়ে আসতে হয়েছে।
প্রাবন্ধিক