রাকিবুল রকি
বাংলা নাটকের শুরুর ইতিহাসের সঙ্গে ‘বেলগাছিয়া নাট্যশালা’ আর ‘জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির নাট্যশালা’ নাম দুটো জড়িয়ে আছে। জোড়াসাঁকো নাট্যশালার মাধ্যমেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে নাটক এবং মঞ্চের ঘনিষ্ঠ পরিচয় ঘটে। তাদের পারিবারিক পরিবেশ ছিল সাহিত্যচর্চার জন্য অনুকূল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন, ‘বাড়িতে দিনরাত্রি সাহিত্যের হাওয়া বহিত।’ নাটক, থিয়েটারে সব সময় সরগরম থাকত ঠাকুরবাড়ির পরিবেশ। তবে ছোট থাকায় তাকে দূর থেকেই তা দেখতে হতো। ‘জীবনস্মৃতি’তে ‘বাড়ির আবহাওয়া’ উপশিরোনামে লিখেছেন, ‘বেশ মনে পড়ে বড়দাদা একবার কী-একটা কিম্ভূত কৌতুকনাট্য রচনা করিয়াছিলেন,Ñ প্রতিদিন মধ্যাহ্নে গুণদাদার বড়ো বৈঠকখানাঘরে তাহার রিহার্সাল চলিত। আমরা এ-বাড়ির বারান্দায় দাঁড়াইয়া খোলা জানালার ভিতর দিয়া অট্টহাস্যের সহিত মিশ্রিত অদ্ভুত গানের কিছু কিছু পদ শুনিতে পাইতাম এবং অক্ষয় মজুমদার মহাশয়ের উদ্দাম নৃত্যেরও কিছু কিছু দেখা যাইত। গানের এক অংশ এখনো মনে আছেÑ
ও কথা আর বোলো না, আর বোলো না,
বলছ বঁধু কিসের ঝোঁকেÑ
এ বড়ো হাসির কথা, হাসির কথা,
হাসবে লোকেÑ
হাঃ হাঃ হাঃ হাসবে লোকে!Ñ
এতবড়ো হাসির কথাটা যে কী তাহা আজ পর্যন্ত জানিতে পারি নাইÑ কিন্তু এক সময়ে জানিতে পাইব, এই আশাতেই মনটা খুব দোলা খাইত।’
এই যে বাড়িতে নাটকের চর্চা, পাশাপাশি অপ্রাপ্তবয়সের কারণে দূরে থাকার জন্য শিশুমনে যে কৌতূহল জন্ম নিয়েছিল, তা নিঃসন্দেহে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনে আশীর্বাদ হয়েই এসেছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রথমে নাটকে অংশগ্রহণ করতেন। জ্যোতিরিন্দ্রনাথের প্রহসন ‘এমন কর্ম আর করব না’তে প্রথম অভিনয় করেন অলীকবাবুর ভূমিকায়। এ সময় তার বয়স ছিল মাত্র ষোল বছর। তারপর বিলেত থেকে ফিরে এসে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরেরই নাটিকা ‘মানময়ী’তে তিনি অভিনয় করেন। এবার তিনি মদনের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। ১৮৮১ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘বাল্মীকিপ্রতিভা’ নাটক রচনা করেন। ১৮৮১ সালেই তা অভিনীত হয়। এ নাটকে তিনি বাল্মীকির ভূমিকায় অভিনয় করেন। অপ্রাসঙ্গিক হলেও বলা যায়, এ নাটকের মঞ্চসজ্জা বেশ আলোড়ন ফেলেছিল।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সারাজীবনই শিল্পচর্চায় নিমগ্ন ছিলেন। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধের পাশাপাশি তিনি নাটকও রচনা করেছেন। তার নাটকের সংখ্যা ৫০টি।
২.
১৯২১ সালে প্রকাশিত হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ঋণশোধ’ নাটক। বলে রাখা ভালো এটি ‘শারদোৎসব’ নাটকের রূপান্তর। শান্তিনিকেতনের শিক্ষার্থী দিয়ে অভিনয় করানোর জন্য ‘শারদোৎসব’ নাটকটি লেখা হয়। ফলে এখানে কোনো নারী চরিত্র নেই। শান্তিনিকেতনের শিক্ষার্থীদের নিয়ে অভিনীত করার জন্য তিনি যেসব নাটক রচনা করেছিলেন, সেগুলোর একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য এগুলো নারী চরিত্র বর্জিত। বিশেষ করে বলা যায়, ‘শারদোৎসব’ থেকে ‘ফাল্গুনী’ পর্যন্ত আমরা পুরুষ চরিত্রেরই প্রাধান্য দেখতে পাই।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একই বিষয় নিয়ে একাধিক রচনা যেমন সৃষ্টি করেছেন, তেমনি একই বিষয়কে একই মাধ্যমে সংযোজন, বিয়োজন, পরিমার্জন, পরিশোধন করেছেন। যেমন ‘গুরু’ ‘অচলায়তন’-এর ‘কিঞ্চিত রূপান্তরিত এবং লঘুতর’ রূপ। ‘রাজা’ নাটকের সংক্ষিপ্ত রূপ হচ্ছে ‘ধরূপরতন’ প্রভৃতি।
‘শারদোৎসব’ নাটকের সঙ্গে ‘ঋণশোধ’ নাটকের প্রধান পার্থক্য হলো ‘ঋণশোধ’ নাটকে ভূমিকা এবং শেখর চরিত্র সংযুক্ত হওয়া।
‘ঋণশোধ’ নাটকে দেখতে পাই রাজা বিজয়াদিত্য শরৎকালে মন্ত্রীদের অনুরোধ সত্ত্বেও রাজ্যজয়ের জন্য না বেরিয়ে সন্ন্যাসী ছদ্মবেশে প্রজাসাধারণের সঙ্গে শরতের ছুটি কাটানোর জন্য বেরিয়েছেন। বেতসনদীর তীরে একদল বালকের সঙ্গে তার দেখা হয়। দেখা হয় ঠাকুরদাদার সঙ্গে। তারা শরতের ছুটি হাসি আনন্দে কাটাচ্ছে। কিন্তু উপনন্দ নামে একটি ছেলে সে খেলায় যোগ দেয়নি। তার প্রভু বীণাচার্য সুরসেন লক্ষেশ^রের কাছে ঋণ রেখে মারা গেছে। উপনন্দ স্বেচ্ছায় সে ঋণ মাথায় নিয়ে ঋণশোধের জন্য পুঁথি লিখে যাচ্ছে। রাজার মনে হয় তিনি মনের মতো সাথী পেয়েছেন। তিনি ছেলেটি সম্পর্কে ঠাকুরদাদাকে বলেন, ‘এর চেয়ে সুন্দর কি আর কিছু আছে। ঐ ছেলেটিই তো আজ শারদার বরপুত্র হয়ে তাঁর কোল উজ্জ্বল করে বসেছে। তিনি তাঁর আকাশের সমস্ত সোনার আলো দিয়ে ওকে বুকে চেপে ধরেছেন।’
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘দুঃখের তপস্যা’ দিয়ে যে আনন্দকে পেতে চেয়েছেন, ঋণশোধ নাটকে দেখি তারই প্রতিফলন। প্রকৃতি তার সর্বস্ব উজাড় করে দিয়ে ঋণ শোধ করছে। উপনন্দ ছুটির দিনেও কাজ করে ঋণশোধ করছে। এই জন্যেই সে শেষপর্যন্ত রাজার পালিত পুত্র হতে পেরেছে। রাজা উপনন্দের সব ঋণ শোধ করে দিয়ে উপনন্দকে দত্তক নিয়েছেন। বলাবাহুল্য এই সৌভাগ্য ছিল উপনন্দের চিন্তারও বাইরে। রাজাকে প্রকৃত রাজা হতে হলে সাজতে হয় সন্ন্যাসী। তাই তো দেখি, রাজা সোমপাল বিজয়াদিত্যকে উৎখাত করতে চাইলেও নাটকের উপান্তে নিজের সমস্ত অহঙ্কার বিসর্জন দিয়ে রাজা বিজয়াদিত্যের মহত্ত্ব প্রচার করতে। রাজা বিজয়াদিত্য সন্ন্যাসী হবার কারণেই রক্তপাত, লোকক্ষয় ছাড়াই সোমনাথের হৃদয় চিরদিনের মধ্যে জয় করে নিয়েছেন। লক্ষেশ^র এবং ঠাকুরদাদার দিকে যদি তাকাই, ঠাকুরদাদার কোনো চাহিদা ছিল না। সে ছুটির দিনে ছেলেদের সঙ্গে উৎসব করতে বেরিয়েছিল, শেষপর্যন্ত সে আশ্রয় পেল গিয়ে রাজদরবারে। কিন্তু লক্ষেশ^রের ছিল নিদারুণ জাগতিক মোহ। সে মাটির তলে গজমোতির কৌটা লুকিয়ে রেখেছিল। সেই গজমোটির কৌটা কখন হারিয়ে যায়, কখন রাজার লোক নিয়ে যায়, সেই চিন্তায় সর্বদাই অস্থির থাকত। গজমোতির কৌটা শেষতক হাতবদল না হলেও জাগতিক মোহের কারণে, লোভের কারণে, সন্ন্যাসীবেশী রাজার কথায় সব ত্যাগ করতে রাজি না হওয়ায় বঞ্চিত হয় বৃহৎ লাভ থেকে। আনন্দ থেকে। বলা যায়, সোনাকে যেমন খাঁটি হতে হলে আগুনে পুড়তে হয়, তেমনি আনন্দের অধিকারী হতে হলে দুঃখের ভেতর দিয়েই যেতে হয়।
রবীন্দ্রনাথ ‘শান্তিনিকেতন পত্রে’ প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘লক্ষ্মী সৌন্দর্য ও সম্পদের দেবী; গৌরী যেমন তপস্যা করিয়া শিবকে পাইয়াছিলেন, মর্ত্যলোকে লক্ষ্মীও তেমনি দুঃখের সাধনার দ্বারাই ভগবানের সহিত মিলন লাভ করেন।
...উপনন্দ তাহার প্রভুর নিকট হইতে প্রেম পাইয়াছিল, ত্যাগস্বীকারের দ্বারা প্রতিদানের পথ বাহিয়া সে যতই সেই প্রেমদানের সমান ক্ষেত্রে উঠিতেছে ততই সে মুক্তির আনন্দ উপলব্ধি করিতেছে। দুঃখই তাহাকে এই আনন্দের অধিকারী করে।’
‘ঋণশোধ’ নাটকে দুঃখের মধ্য দিয়ে যেমন আনন্দকে পাওয়ার
তত্ত্ব প্রকাশিত হয়েছে, তেমনি মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির যে এক সম্পর্ক, তাও উদঘাটিত হয়েছে।
এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে নাটকের প্রধান চরিত্র রাজা বিজয়াদিত্য কতটা বাস্তবসম্মত? আদৌ এমন রাজা পাওয়া সম্ভব কি না যে শক্তিবলে রাজ্যজয় না করে সন্ন্যাসী বেশে প্রজাদের জয় করবে? না, তেমনটি হয়তো পাওয়া যাবে না। তবে তেমনই হওয়া উচিত। সাহিত্য নিছক সমাজের অনুকরণ নয়, বরং সমাজ কেমন হওয়া উচিত, তারই একটি রূপরেখা নির্ণয় করা সাহিত্যের দায়িত্ব। অন্য চরিত্রগুলো সম্পর্কেও একই প্রশ্ন তোলা যায়। তবে এর উত্তরে বলা যায়, তারা তত্ত্বের সীমারেখায় যতই আবর্তিত হোক না কেন, রবীন্দ্রনাথ শৈল্পিক আঁচড়ে তাদের জীবন্ত করে তুলেছেন।
লক্ষেশ^র যখন শেখরের কথা বুঝতে না পেরে বলে, ‘...লোকটা যখন কথা কয় সব ঝাপসা ঠেকে। রাজারা স্পষ্ট কথা সহ্য করতে পারে না, তাই বোধ হয় দায়ে পড়ে এইরকম অভ্যেস করেছে।’
তখন মনে হয় লক্ষেশ^র কোনো এক মন্ত্রবলে শতবর্ষের ব্যবধান পেরিয়ে আমাদের সমান্তরালে দাঁড়িয়ে এই সময়েরই কথা বলছে। এখানেই শিল্পের জিৎ। শিল্পের যাদুর কাঠির ছোঁয়ায় নির্দিষ্ট কাল চিরকালীন হয়ে ওঠে।
তাই বলা যায়, রবীন্দ্রনাথের ‘ঋণশোধ’ এখনও আবেদন হারায়নি। আবেদন হারিয়ে শুধু নির্দিষ্ট কালের ইতিহাসের প্রতিনিধি হয়ে পড়েনি।
‘শারদোৎসব’ নাটকের সঙ্গে ‘ঋণশোধ’ নাটকের তুলনামূলক আলোচনা করলে অবশ্য ‘শারদোৎসব’ নাটককেই এগিয়ে রাখতে হবে। ঋণশোধে যে ভূমিকা সংযুক্ত হয়েছে, ‘শারদোৎসব’ নাটকে তা না থাকায় পাঠক/দর্শক নাটক শেষ হবার আগপর্যন্ত বুঝতে পারে না সন্ন্যাসী একজন রাজা। ফলে লক্ষেশ^রের সঙ্গে সন্ন্যাসীবেশী রাজার কথাবার্তা, রাজা সোমপালের কথাবার্তা, উপনন্দের কথা আলাদা একটি ব্যঞ্জনা তোলে। নাটক শেষে মন্ত্রী, অমাত্যবর্গের আগমনের ফলে সন্ন্যাসীর পরিচয় উদঘাটনের যে টুইস্ট, সেটি নেই ‘ঋণশোধ’ নাটকে। তারপরেও নীলিমা ইব্রাহিমের ভাষায় বলা যায়, ‘‘ঋণশোধ’কে আমরা ‘কিছুই না গোছের’ ক’রে হাল্কাভাবে উড়িয়ে দিতে পারি না।’
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা সাহিত্যে বিপুল সম্ভার রেখে গেছেন। বাংলা নাটকে রূপক, সাঙ্কেতিক নাটক তারই সংযোজন। এক্ষেত্রে তার কোনো পূর্বসূরি নেই। বাংলা নাটককে তিনি সমৃদ্ধ করে গেছেন। তার এত এত ভালোকাজ যে, সে ভালো কাজের কারণে আড়ালে চলে গেছে তার অনেক কাজ। আমরা দু-চার-দশটি রবীন্দ্রনাটকের নাম স্মরণ করলে হয়তো ‘ঋণশোধে’র নাম নেই না। কিন্তু শতবর্ষ পেরিয়ে আসা এই নাটকের সান্নিধ্যে আসলে বোঝায় যাবে, ‘ঋণশোধ’ রবীন্দ্রবিভায় পরিপূর্ণভাবেই সমুজ্জ্বল।
ষ প্রাবন্ধিক ও শিক্ষক