দ্য বিট্রথেড : মহামারির অনন্য দলিল

আলোর রেখা

সালাহ উদ্দিন মাহমুদএকটি সংক্রামক ব্যাধি যখন বিশাল জনগোষ্ঠীর মাঝে খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে; তখন রোগটিকে মহামারি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।

2021-05-21T23:08:00+00:00
2021-05-21T23:08:00+00:00
 
  সোমবার, ৮ জুন ২০২৬,
২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
সোমবার, ৮ জুন ২০২৬
আলোর রেখা
দ্য বিট্রথেড : মহামারির অনন্য দলিল
প্রকাশ: শুক্রবার, ২১ মে, ২০২১, ১১:০৮ পিএম   (ভিজিট : ১৬৫)
সালাহ উদ্দিন মাহমুদ
একটি সংক্রামক ব্যাধি যখন বিশাল জনগোষ্ঠীর মাঝে খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে; তখন রোগটিকে মহামারি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। পৃথিবীতে যুগে যুগে অসংখ্য মহামারি সংঘটিত হয়েছে। এসব মহামারিতে মৃত্যু হয়েছে কোটি কোটি মানুষের। এ ক্ষেত্রে প্লেগ আর ফ্লুর নামই বেশি শোনা যায়। অনেক সময় দেখা যায়, বিভিন্ন কারণে একটি ছোট অঞ্চলে প্রাদুর্ভাব ঘটা রোগ মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে বিশে^^র বিভিন্ন প্রান্তে। তখন মহামারি রূপ নেয় প্যান্ডেমিক বা বিশ^^মারিতে। আজকের নভেল করোনাভাইরাস তদ্রƒপ বিশ^^ব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। কেড়ে নিচ্ছে লাখ লাখ মানুষের জীবন। স্থবির হয়ে পড়েছে জনজীবন।
পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে অভিশপ্ত বছর ধরা হয় ২০২০ সালকে। এর আগে প্লেগ, বসন্ত ও কলেরার মতো মহামারিতে ঝরেছে অসংখ্য জীবন। ধ্বংস হয়েছে অনেক সভ্যতা। গত ২০০ বছরে সাতবারের মতো মহামারিতে আক্রান্ত হয়েছে বিশ^^। করোনাভাইরাসের ১০০ বছর আগে এসেছিল প্রাণঘাতী ‘স্প্যানিশ ফ্লু’। কিন্তু তখন পৃথিবীর প্রায় সব দেশ একসঙ্গে এভাবে আক্রান্ত হয়নি। তখন পৃথিবীর সব দেশ এভাবে একসঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েনি। করোনাভাইরাস আমাদের দূরত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে। মানুষে মানুষে বিচ্ছিন্নতা তৈরি করেছে।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, যুগে যুগে মানবসভ্যতা নানা রকম ক্রান্তিকাল অতিক্রম করেছে। বিভিন্ন অপ্রত্যাশিত ঘটনার সাক্ষী হয়েছে পৃথিবী। যার ফল ভোগ করছে মূলত মানুষ। মানুষ আসলে প্রকৃতির কাছে অসহায়। তবে প্রকৃতির এই বৈরী আচরণে যে অমানবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, তা নিয়ে আবার সৃষ্টি হয়েছে মহৎ সাহিত্য। বিকশিত হয়েছে চিত্রকলা ও শিল্পবোধ। যুগে যুগে মহামারিকে কেন্দ্র করে সাহিত্যের গতিপ্রকৃতিতেও এসেছে পরিবর্তন। রচিত হয়েছে প্রবন্ধ, গল্প, উপন্যাস, নাটক ও কবিতা। কেননা সৃজনশীলতা কখনই কোনো পরিস্থিতিতে থেমে থাকেনি। যুদ্ধ করতে করতেও মানুষ সাহিত্য রচনা করেছে। মহামারির সঙ্গে লড়াই করতে করতেও মানুষ সাহিত্য রচনা করেছে। মহামারির তাণ্ডব তুলে এনেছে সাহিত্যকর্মে। বলা যায়, মহামারি যেমন ছিনিয়ে নেয়; তেমনি নতুন নতুন উপাদান দিয়ে সমৃদ্ধ করে আমাদের শিল্প-সাহিত্যকে। তাই তো ড্যানিয়েল ডিফোর ‘আ জার্নাল অব দ্য প্লেগ ইয়ার’, আলেসান্দ্রো মানজোনির উপন্যাস ‘দ্য বিট্রথেড’, আলবেয়ার কামুর ‘প্লেগ’, গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের ‘লাভ ইন দ্য টাইম অব কলেরা’, হোসে সারামাগোর ‘ব্লাইন্ডনেস’ এবং ওরহান পামুকের ‘নাইটস অব প্লেগ’ তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
আজকের আলোচনায় আমি দৃষ্টি দিতে চাই আলেসান্দ্রো মানজোনির উপন্যাস ‘দ্য বিট্রথেড’-এর দিকে। শুরুতেই বলে নেওয়া ভালো, ইতিহাস ও সাহিত্যের মহামারিগুলো আসলে একই রকম। তা জীবাণু বা ভাইরাসের কারণে নয়; বরং আমাদের অভিন্ন প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ার কারণে বেশি ছড়িয়ে পড়ে। সব সময়ই মহামারি শুরু হলে মানুষের প্রথম প্রতিক্রিয়া হলোÑ তার উপস্থিতি অস্বীকার করা। প্রতিটি প্রেক্ষাপটেই দেখা গেছে, জাতীয় ও স্থানীয় সরকার সময়মতো এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। এমনকি তথ্য-উপাত্ত বিকৃত করে মহামারির ভয়াবহতাকে কম করে দেখানোর দৃষ্টান্তও ইতিহাসে কম নয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সাহিত্যে রোগবিস্তার সম্পর্কে জানতে অতুলনীয় একটি বই ড্যানিয়েল ডিফোর ‘আ জার্নাল অব দ্য প্লেগ ইয়ার’। বইটির শুরুর দিকে উঠে এসেছে, কীভাবে লন্ডনের কিছু এলাকার কর্তৃপক্ষ প্লেগ থেকে মৃতের সংখ্যা কমিয়ে দেখাতে মৃত্যুর কারণ হিসেবে কিছু নতুন রোগ আবিষ্কার করেছিল।
তবে ঔপন্যাসিক ওরহান পামুক মনে করেন, ইতালির লেখক আলেসান্দ্রো মানজোনির উপন্যাস ‘দ্য বিট্রথেড’ সম্ভবত প্লেগের ধ্বংসযজ্ঞ নিয়ে লেখা সবচেয়ে বাস্তববাদী সাহিত্যকর্মের একটি। মানজোনি একাধারে কবি, নাট্যকার, লেখক এবং ইতালির জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব। তিনি উপন্যাসে ঐতিহাসিক বাস্তবতা তুলে ধরতে শুরু করেন। তার ‘দ্য বিট্রথেড’ উপন্যাসটি ১৮২৭ সালে প্রকাশিত হয়। মানজোনি তার উপন্যাসে ইতালির মিলান শহরের ১৬৩০ সালের প্লেগের সময়কালীন কর্তৃপক্ষের অদক্ষতার কারণে স্থানীয় মানুষের সঙ্গত ক্ষোভের কথা লিখেছেন। প্লেগ যখন পঙ্গপালের মতো ধেয়ে আসছেÑ তার অকাট্য তথ্য-প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও মিলানের গভর্নর স্থানীয় ছোটখাটো রাজবংশের কোনো এক রাজপুত্রের জন্মদিনের উৎসব পর্যন্ত বাতিল করেননি। তার এই উদাসীনতা জনগণকে ক্ষুব্ধ করে তোলে।
মানজোনির লেখায় আমরা দেখতে পাই, কীভাবে মিলানে বাতাসের বেগে দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়েছিল ঘাতক প্লেগ। যার মূলে ছিল রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের অপ্রতুল ব্যবস্থা গ্রহণ, আইন প্রয়োগে শিথিলতা এবং স্থানীয় নাগরিকদের অবজ্ঞা-অবহেলা। ফলে সাহিত্যে যখনই সংক্রামক ব্যাধির কথা উঠে এসেছে; তখনই জনরোষের মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে তৎকালীন ক্ষমতাবান বা দায়িত্বশীলদের অযোগ্যতা, স্বার্থপরতা ও উদাসীনতার কথা।
মহামারির সময়ে আরেকটি বিশ^^জনীন মানবিক প্রতিক্রিয়া হলোÑ গুজব আর অপতথ্যের উৎপাদন। যা আপাতদৃষ্টিতে কারও প্ররোচনার জন্য অপেক্ষা করে না। কে বা কারা কোথা থেকে এই গুজব ও অপতথ্য ছড়িয়ে দেয়; তা বলা মুশকিল। ফলে মহামারির চেয়েও ভয়ঙ্করভাবে ছড়িয়ে পড়ে এসব গুজব। সেই সময়ে যথাযথ তথ্য এবং সম্যক ধারণা পাওয়া অসম্ভব ছিল বলে এসব গুজব সৃষ্টি ছিল অনিবার্য।
তাই তো মানজোনি লিখেছেন, মানুষ কীভাবে দেখা হলে দূরত্ব বজায় রেখেও অন্যকে এলাকার খবরাখবর জিজ্ঞেস করত। যাতে তারা পরিস্থিতির একটি সামগ্রিক ধারণা পেতে পারে। কোথায় নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধান পাওয়া যাবে, তা বুঝতে এ ছাড়া অন্য কোনো উপায় তাদের ছিল না। সংবাদপত্র, বেতার, টেলিভিশন বা ইন্টারনেট-বিবর্জিত জগতে সংখ্যাগরিষ্ঠ নিরক্ষর মানুষের কাছে কোথায় বিপদ আছে, তা কতটা গুরুতর। আর তাতে আক্রান্ত হলে দুর্ভোগ কেমন, তা আঁচ করতে একমাত্র সম্বল ছিল তাদের কল্পনাশক্তি। এই কল্পনাশক্তির বলেই তারা সামনের দিকে এগিয়ে যেতেন।
‘দ্য বিট্রথেড’-এ মানজোনি আমাদের এক পৈশাচিক চরিত্র বা অশুভ শক্তির কথা বলেছেন, যা ইউরোপে মধ্যযুগের প্রতিটি মহামারিতে মানুষের কল্পনায় স্থায়ীভাবে জায়গা করে নিয়েছিল। মানুষের অনুভূতির জগতে একটি স্থান দখল করে নিয়েছিল। তখন মুখে মুখে এই অশুভ শক্তির উপস্থিতির কথা শোনা যেত। বলা হতোÑ প্রতিদিন রাতের অন্ধকারে রোগের জীবাণুমাখা তরল দিয়ে ঘরের দরজার হাতল আর পানির ফোয়ারা দূষিত করে দিয়ে যাওয়া হয়। কিংবা কখনও কখনও শোনা যেত কোনো পরিশ্রান্ত বৃদ্ধের কথা। যিনি চার্চের মেঝেতে বিশ্রাম নিতে বসলে হঠাৎ পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া কোনো নারী দাবি করতেন যে, বৃদ্ধ লোকটি রোগ ছড়িয়ে দিতে তার জীবাণুমাখা কোটটাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সবকিছুতে ঘষে দিচ্ছেন। এ কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে অনতিবিলম্বে সেখানে জড়ো হয়ে যেত স্থানীয় মারমুখী জনতা। বৃদ্ধের উপরে চড়াও হতেন সবাই।
মহামারির ইতিহাস এবং সাহিত্য থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, আক্রান্ত জনগোষ্ঠীর মধ্যে রোগের যন্ত্রণা, মৃত্যুভয়, আধ্যাত্মিক আতঙ্ক এবং অশনি অনুভূতি কতটা প্রবল, তার ওপর নির্ভর করে তাদের ক্রোধ এবং রাজনৈতিক অসন্তোষের মাত্রা। তাই তো অতীতের মতোই এবারের করোনাভাইরাস মহামারিতে জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও আঞ্চলিক পরিচয়নির্ভর ভিত্তিহীন গুজব এবং অপবাদ ঘটনাপ্রবাহের ওপর একটি বড় প্রভাব বিস্তার করেছে। তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষের যুগেও আমরা গুজব বা অপতথ্য থেকে মুক্তি পাইনি। ভবিষ্যতে করোনাভাইরাস নিয়ে মহৎ কোনো সাহিত্য রচিত হলে আমরা এসব বিষয়ের পূর্ণ বিবরণ পাব বলে আশা করি।
এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, এ পর্যন্ত যেকোনো মহামারি নিয়ে যত সাহিত্য রচিত হয়েছে; তাতে তৎকালীন বাস্তব অবস্থা ফুটে উঠেছে। তৎকালীন সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার বিবরণ পাওয়া যায়। মানুষের শিক্ষা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধ উচ্চকিত হয়েছে। সবশেষে আমার মনে হয়েছে, আলেসান্দ্রো মানজোনির উপন্যাস ‘দ্য বিট্রথেড’ সম্ভবত বাংলাদেশে কম পঠিত হয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি পঠিত হয়েছে আলবেয়ার কামুর ‘প্লেগ’।
এটি নিয়ে বিশদ আলোচনাও হয়েছে বাংলা ভাষায়। ‘দ্য বিট্রথেড’-এর বাংলা অনুবাদও তেমন পাওয়া যায় না। তাই ভবিষ্যতে যারা মহামারি নিয়ে উপন্যাস লিখতে চান, তাদের জন্য বইটি অবশ্যপাঠ্য। আমি বইটির বাংলা অনুবাদ ও বহুল পাঠ কামনা করছি।

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: