বেশিদিনের কথা নয়, একটি থ্রিলার উপন্যাস লিখেছিলেন মার্কিন কথাশিল্পী ডন কুন্টজ। আর সেই উপন্যাসের নাম ছিল, ‘দ্য আইস অব ডার্কনেস’। এই উপন্যাসটি দারুণভাবে সাড়া ফেলেছিল ১৯৮১ সালে। উপন্যাসের মূল প্রতিপাদ্য ছিল, হঠাৎ করে একদিন নিখোঁজ হয়ে যায় মা ক্রিশ্চিয়া ইভানসের ছেলে ড্যানি। অনেক পর জানা গেল, ছেলে তার মানুষের তৈরি বিষাক্ত এক ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে আটকে পড়েছে চীনের এক সামরিক গবেষণাগারে। আর সেই ভাইরাসটির নাম দেওয়া হয়েছিল উহান-৪০০।
এই উপন্যাসটি বেশ কিছুদিন পাঠকের চোখের আড়ালে ছিল। কিন্তু গত বছর অর্থাৎ ২০২০ সালের মার্চ মাসে অপর এক লেখক নিক হিটটন তার টুইটারে এই উপন্যাসের একটি পাতা পোস্ট করলে তা মুহূর্তের মধ্যে ইন্টারনেটে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। বিশ^^ব্যাপী যখন করোনা সংক্রমণের গতি বেড়ে যায়, তখন পশ্চিমা অনেক দেশ লকডাউন দেয়। এই লকডাউনের মধ্যে ফ্রান্সে আন্দোলন গড়ে ওঠে। আর সেই আন্দোলনটি হচ্ছে, বইয়ের দোকান খোলার দাবি। কারণ, এই বইটি পড়ার জন্য অনেক পাঠক আগ্রহী হয়ে ওঠে। পরে লকডাউনের মধ্যেও শুধুমাত্র বইয়ের দোকান খোলা রাখা হয়।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে উহান নামটি খুবই আলোচিত। আর বিশ^^ব্যাপী করোনাভাইরাস মহামারিরূপে ছড়িয়ে পড়ার পর উহান সম্পর্কে মানুষের কৌতূহল বেড়ে যায়। পাঠকদের মনে প্রশ্ন উঁকি দেয়, করোনাভাইরাসের পূর্বাভাস কি এই উপন্যাসে দেওয়া হয়েছে? উপন্যাসের আরও একটি চরিত্র রয়েছে, যার মুখ থেকে জানা যায় উহান-৪০০ মানুষের মস্তিষ্কে সংক্রমণ ঘটায়। দেশে দেশে যখন করোনাভাইরাসের সংক্রমণ, ভারতে তখনও ভয়াবহ করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হয়নি। ঠিক সেই সময় অর্থাৎ গত বছর এপ্রিলে ভারতের কিংবদন্তি নায়ক অমিতাভ বচ্চন লিখলেন একটি কবিতা। তিনি এই কবিতা নিজের টুইটারে প্রচার করলেন। তিনি যে ভাষায় লিখেছিলেন তা ছিল অনেক পাঠকের নাগালের বাইরে। তাই এই কবিতা অনুবাদ করেন জাভেদ হুসেন। কবিতার পঙ্্ক্তিমালা হচ্ছে, যাকেই দেখি, সবাই বলে জানা আছে ওদের প্রতিকার ধ্বনি/ এখন কে আর বলবে কার কথা শুনি, কার বা শুনি/ অন্য কেউ বলে, এসব কিছুই করো না/ সাবান দিয়ে হাত না ধুয়ে ভাই, কাউকে ছুঁয়ো না/ আসুক করোনাভাইরাস, দেখাবো বুড়ো আঙুল বৈভব’।
সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত তুরস্কের লেখক ওরহান পামুক ২০০৬ সালে দি নিউইয়র্ক টাইমসে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন, যার বাংলা হচ্ছে, বিশে^^ মহামারি নিয়ে বেশ কিছু উপন্যাস লেখা হয়েছে। কিন্তু এই মহামারি আমাদের কী শিক্ষা দেয়? তার লেখা একটি উপন্যাস যা ১৯০১ সালের ঘটে যাওয়া মহামারির পটভূমিতে লেখা। বিশ^^ব্যাপী এই মহামারির নাম ছিল প্লেগ। সে সময় প্লেগের প্রাদুর্ভাবে শুধুমাত্র এশিয়ায় লাখ লাখ মানুষের প্রাণ যায়। ওরহান পামুক ‘নাইটস অব প্লেগ’ উপন্যাস লেখার পর অনেকের প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছেন। প্লেগ নিয়ে আরও একটি উপন্যাস লিখেছিলেন ইতালির লেখক আলেসান্দ্রে মানজোনি। অনেকে ‘দ্য ব্যাথ্রয়েড’ উপন্যাসকে সবচেয়ে বাস্তবধর্মী উপন্যাস হিসেবে বিবেচনায় আনে। তিনি তার উপন্যাসে বর্ণনা করেছেন, লোকজন রাস্তায় চলছে ঠিকই, কিন্তু কেন জানি দূরত্ব বজায় রেখে চলছে।
আরও একটি উপন্যাস, যার লেখক ছিলেন ওজিয়ার গিসিলিন। তিনি তার উপন্যাসে লিখছেন, প্লেগ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সাম্রাজ্যের সুলতান সুলেমান ছয় ঘণ্টা পথ পরিক্রমায় একটি দ্বীপে আশ্রয় নেন। আর সেই দ্বীপে গিয়ে মহামারি থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন।
হোমারের ইলিয়ড একটি মহাকাব্য। এই মহাকাব্যে দেখা যায়, বন্দি করার শাস্তি হিসেবে গ্রিকদের শায়েস্তা করতে ট্রয় নগরীতে প্লেগ নামের এই মহামারি পাঠানো হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লেখক এডগার অ্যালেন পো বেশ কিছু গল্প লিখে খ্যাতি অর্জন করেন। তার একটি ছোটগল্প ‘দ্য মাস্ক অব দ্য রেড ডেথ’। এই গল্পে ফুটে উঠেছে মহামারি রোধ করতে কর্তৃপক্ষ যথাযথ কার্যক্রম নিতে ব্যর্থ হয়েছে, যাতে পরবর্তী সময়ে দেশে ভয়ঙ্কর প্লেগ দেখা দেয়। আরও একজন বিখ্যাত কথাশিল্পী আলবেয়ার কামু। তার বিখ্যাত উপন্যাস হচ্ছে ‘দ্য প্লেগ’। ইঁদুরের উৎপাত নিয়ে উপন্যাসের সূত্রপাত। ইঁদুরের উৎপাতে অতিষ্ঠ হয়ে মানুষ ইঁদুর মারতে শুরু করল। মরা ইঁদুরগুলো সব জমা হতে হতে ময়লা আবর্জনার স্তূপে পরিণত হলো। একসময় মাটিতেও পুঁতে ফেলল। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র ছিলেন একজন ডাক্তার। তিনি একদিন আবিষ্কার করলেন, তার প্রতিবেশী এক অজানা রোগে মারা যায়। এমনকি, তার স্ত্রীও মারা যায়। একদিন চোখের সামনে অগণিত মানুষের মৃত্যু তাকে অনূভূতিহীন করে তোলে।
মহামারি নিয়ে কালজয়ী উপন্যাস লেখেন গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস। তার উপন্যাসের নাম হচ্ছে, ‘লাভ ইন দ্য টাইম অব কলেরা’। এই উপন্যাসের শুরুটা অত্যন্ত মর্মান্তিক। এর পাশাপাশি মহামারি নিয়ে আরও একটি আলোচিত উপন্যাস হচ্ছে, ‘দ্য স্ট্যান্ড’। লেখক স্টিফেন কিং। এটি ১৯৭৮ সালে লেখা হলেও চরিত্রগুলো যেন সেই মহামারির দৃশ্য প্রাণবন্ত হয়ে চোখের সামনে ফুটে ওঠে।
দক্ষিণ আফ্রিকার আরও একজন শক্তিশালী লেখক ডোয়েন মেয়ার। তিনি ২০১৬ সালে ‘ফিভার’ নামে একটি উপন্যাস লেখেন, যাতে অত্যন্ত সাবলীল হয়ে ফুটে উঠেছে সেই মহামারির দৃশ্য। মহামারি নিয়ে আরেক বিখ্যাত উপন্যাস ‘ব্লাইন্ডনেস’। যার লেখক হলেন হোসে সারামাগো। উপন্যাসের প্রথমদিকে এক অন্ধ মানুষ স্বপ্ন দেখে সে অন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তারপর সত্যিই অন্ধ হয়ে যায় সে। কীভাবে একটা অন্ধ চোখ, যা দেখতে পায় না, সেটি অন্য কারও চোখকে সংক্রমিত করে, তা বুঝতে পারে না কেউ।
ইতিহাস বলে, সে সময় শরৎকাল। ১৯১৮ সাল। ইউরোপের ভূমিতে প্রথম মহাযুদ্ধ শেষ হতে যাচ্ছে। এমন সময় বিশ^^ব্যাপী নেমে এলো এক মহামারি। মানুষ এর নাম দিয়েছিল স্প্যানিস ফ্লু। এর দণ্ড থেকে মানুষ রক্ষা পায়নি। প্রথম মহাযুদ্ধে যত মানুষ মারা যায়, তার দ্বিগুণ মানুষ প্রাণ হারায় স্প্যানিস ফ্লুতে। গবেষকরদের মন থেকে এই ফ্লু মুছে যায়নি। আর যায়নি বলে পরবর্তীতে কত লেখক তার লেখনীতে এই দৃশ্যপট তুলে ধরেছেন নানাভাবে। তবে ফ্লু থেকে বেঁচে যাওয়া বেশ কয়েকজন স্মৃতিচারণ করতে ভুলে যাননি। এমনি এক লেখক উইলিয়াম এইচ সার্দো। তিনি তার স্মৃতিচারণে লিখেছেন, সকালে যারা আক্রান্ত হচ্ছিল, তাদের অনেকই মারা যাচ্ছিল রাতে। কমপক্ষে পাঁচ কোটি মানুষকে হত্যা করেছিল এই ভাইরাসটি। মৃতের সংখ্যা বেড়ে গেলে কফিনের অভাব দেখা দিয়েছিল।
আরও একজন ঔপন্যাসিক কাফকার এক উপন্যাসে স্প্যানিশ ফ্লু সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্য পাওয়া যায়। যা তার লেখার চমৎকার ভঙ্গিতে উঠে এসেছে। শুধু তাই নয়, পেইন্ট ব্রাশেও মহামারির চিত্রকর্ম ফুটে ওঠে। এডভার্ড মুংখ তার বেশ কিছু চিত্রকর্মে স্প্যানিশ ফ্লু তুলে ধরেছেন। পিটারি ব্রুগেল বেশ কিছু চিত্রকর্মের কাজ করেছেন, যা এখনও মানুষের মনে দাগ কাটে। এ ছাড়াও ইউরোপে দুজন বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী ছিলেন। পরে তারা মহামারিতে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। কারাভাজ্জিওর চিত্রকর্ম ভয়ঙ্কর দুর্যোগের দিনের কথা মনে করিয়ে দেয়। তবে কোনো কোনো লেখক তাদের লেখায় স্প্যানিশ ফ্লুকে উপজীব্য করতে চাননি। এর মধ্যে অন্যতম হলেন, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে। পুলিৎজার পুরস্কারপ্রাপ্ত উইলা ক্যাথার দুয়েকটি উপন্যাস লিখেছেন। এর মধ্যে ‘ওয়ান অব আওয়ার্স’ বিশেষভাবে আলোচিত।
এ ছাড়াও যেসব বইয়ে মহামারি প্রসঙ্গ রয়েছে এর মধ্যে ড্যানিয়েল ডিফোর ‘আ জার্নাল অব দ্য প্লেগ ইয়ার’, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘গৃহদাহ’, সমারসেট মমের ‘দ্য পেইন্টেড ভেইল’, ক্যাথোরিন আনা পটারের ‘পেল হর্স পেল রাইডার’, জহির রায়হানের ‘হাজার বছর ধরে’, মারিও বেলাটিনের ‘বিউটি স্যালুন’, মার্গারেট অ্যাটউডের ‘অরিক্স অ্যান্ড ক্রেক’, ক্রিস এডমিরালের ‘দ্য চিলড্রেন হসপিটাল’, জিউফ রাইম্যানের ‘দ্য চাইল্ড গার্ডেন’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। করোনা মহামারি নিয়ে বাংলাদেশে কমবেশি উপন্যাস লেখা শুরু হয়েছে। এর মধ্যে কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন ইতোমধ্যে বড় ক্যানভাসে লেখায় হাত দিয়েছেন। উপন্যাসটি পড়ার জন্য আমাদের আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।