প্রকাশ: শুক্রবার, ২৮ মে, ২০২১, ১২:০০ এএম (ভিজিট : ৫০৫)
নজরুলসঙ্গীতের ভুবনে শিল্পী ফিরোজা বেগম এক কিংবদন্তির নাম। প্রখ্যাত এই শিল্পীর অসাধারণ সাফল্যের পেছনে যেমন রয়েছে খোদ কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রত্যক্ষ অনুপ্রেরণা, তেমনি কমল দাশগুপ্ত (নজরুলের অসংখ্য গানের সুরকার) এবং চিত্ত রায়ের (নজরুলের সহকারী) মতো ওস্তাদের সান্নিধ্য লাভ। চল্লিশের দশকের শুরুতে বিখ্যাত রেকর্ডিং কোম্পানি এইচএমভির রিহার্সেলে কবি নজরুল ইসলামের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ হয় নবীন শিল্পী ফিরোজা বেগমের। এ সময় তার গান শুনে মুগ্ধ হয়ে কাজী নজরুল ইসলাম আনন্দ উল্লাস করেন এবং এই ফিরোজা বেগম যে একদিন বড় শিল্পী হবেন সেই ভবিষ্য™^াণী প্রকাশ করেন। সেদিনের সেই নিষ্ঠাবান ও দৃঢ়চেতা তরুণী স্বনামধন্য গায়িকা ফিরোজা বেগম বিশেষ সাক্ষাৎকারে এসব কথা জানান। একই সঙ্গে তিনি কবি নজরুলের একটি অজানা বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেন এবং তার সঙ্গে কবির আনন্দ-বেদনা জড়িত কিছু ঘটনার স্মৃতিচারণ করেন। আর বর্তমান সময়ে নজরুলসঙ্গীত চর্চার সমস্যা ও ঘাটতি, নজরুলসঙ্গীতের বাণী ও সুরের বিকৃতির অভিযোগ ইত্যাদি বিষয়ে প্রণিধানযোগ্য মন্তব্য করেন এবং কিছু বিষয়ে যৌক্তিক কারণেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সাক্ষাৎকারটি প্রথম প্রকাশ হয় ২০০৯ সালে। ২০১৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর
ফিরোজা বেগম মারা যান। নজরুলজয়ন্তী উপলক্ষে সাক্ষাৎকারটি পুনঃপ্রকাশ করা হলো। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন জাকির হোসেন
প্রশ্ন : আপনার সঙ্গীতচর্চার হাতেখড়ি হয় কীভাবে?
ফিরোজা বেগম : আমার প্রথম রেকর্ড বের হওয়ার আগে আমি কারও কাছে গান শিখিনি। স্কুলজীবনে আমি গান, নাচ, আবৃত্তি করতাম এবং অধিকাংশ বিষয়েই আমি প্রথম পুরস্কার গ্রহণ করেছি। আমাদের বাড়িতে একটি গ্রামোফোন এবং কিছু রেকর্ড ছিল। এগুলো বাজিয়ে আমি গান করতাম। তখন আমি সব ধরনের গানই গাইতাম। কোন গান কার সেটা জানবার বয়স তখন আমার হয়নি। তখন জানতাম না আমি কী শিখছি। আমাকে যা বলা হতো আমি তাই করতাম। এটা ছিল একটু অস্বাভাবিক ব্যাপার। একসময় আমি দেখলাম অনেকের গান শিখে ফেলেছি এবং জানলাম কোন গান কার লেখা। আমি নিজেই হারমোনিয়াম বাজাতে শিখেছি। প্রথমে আমি যেভাবে হারমোনিয়াম বাজাতে শিখেছিলাম এখনও সেভাবেই বাজাই, এই কৌশলের কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। রেকর্ড বের হওয়ার পর আমি কমল দাশগুপ্ত এবং নজরুল ইসলামের সহকারী চিত্ত রায়ের কাছ থেকে শিক্ষালাভ করি। কমল দাশগুপ্ত আমার প্রধান গুরু। তিনি যতদিন বেঁচে ছিলেন আমার সব শিক্ষা তার কাছেই। কমল দাশগুপ্ত নজরুল ইসলামের অনেক গানের সুর করেছেন। কয়টা নির্দিষ্ট করে বলা যাবে না। কাজী নজরুল ইসলাম কতগুলো গানের সুর করেছেন এটাই এখনও গবেষকরা স্থির করতে পারেননি। এটা খুব কঠিন কাজÑ বর্তমানে এমন কেউ নেই যিনি সবটা বলতে পারেন। সেই জন্য বলা যায় নজরুল ইসলামের কাজ এখনও সমাপ্ত হয়নিÑ এখনও অর্ধসমাপ্ত রয়েছে। তার গানের সংখ্যা সঠিকভাবে না হলেও মোটামুটি বলা যায় তার গানের সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন হাজার। সত্যিকার অর্থে আমাদের হাতে কতগুলো গান এসেছে রেকর্ড বা অন্যান্য সূত্রে দেড় হাজার গান বোধহয় পাওয়া গেছে।
কলকাতায় আমি যখন গান করেছি তখন জীবিতদের অনেকেই কাজী সাহেবের সঙ্গে কাজ করতেন এবং তার সম্পর্কে অনেক কিছুই জানেন। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল যে আমি তাদের মুখ থেকে যেসব কথা শুনেছি সেটাই অথেনটিক এবং আমি আরও অনেক বেশি কিছু জানি যা এখনও বলা হয়নি বা গবেষকরা পুরোটা জানতে পারেননি। বিশেষ করে কাজী নজরুল ইসলামের ব্যক্তিগত জীবনের সমস্যাগুলো। ব্যক্তিগত জীবনে তার ওপর যে ঘাত-প্রতিঘাতগুলো এসেছে, এসব অনেক কিছু আমি জানি।
প্রশ্ন : এর দুয়েকটি ঘটনা বলবেন কি?
ফিরোজা বেগম : না এখন সেটা বলব না। নজরুল সম্পর্কে বক্তব্য রাখার সৌভাগ্যটা আমার জীবনের শুরু থেকেই হয়েছিল। সুতরাং যাদের কাছ থেকে শুনেছি আমি সেই কথাগুলোই বলতে পারতাম। আমি যাদের কাছ থেকে শুনেছি তাদের নজরুল ইসলামের প্রতি যে ভক্তি, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা সেটা আমি খুব কম লোকের মধ্যেই দেখেছি। কাজী সাহেব যে দুই জনের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি ঘনিষ্ঠ ছিলেন তাদের একজন হলেন চিত্ত রায়। তিনি কাজী সাহেবের প্রধান সহকারী ছিলেন। তিনি কাজী সাহেবের সবই জানতেন। কারণ তিনি প্রায় সব সময়ই সঙ্গে থাকতেন। আরেকজন হলেন কমল দাশগুপ্ত। তিনি কাজী সাহেবের বন্ধু, সহকারী ছিলেন। নজরুল ইসলাম গানের পরিকল্পনা, ভাবনাচিন্তা, ভাঙাগড়া, আলোচনা সব কিছুই কমল দাশগুপ্তের সঙ্গে করতেন। তার কাছেও কাজী সাহেবের অনেক কথা শুনেছি।
প্রশ্ন : এসব অজানা কথা বলতে না চাওয়ার পেছনে অভিমানটা কেন?
ফিরোজা বেগম : আমি বলতে যাব কেন! এটা তো গবেষণার কথা। এগুলো ইন্টারভিউতে বলার বিষয় নয়। তবুও একটি কথা বলি, উনার এই বৈশিষ্ট্যের কথা অনেকেই জানে না। যারা তার সান্নিধ্যে আসতে চাইতেন তিনি তাদের সকলের হাত দেখতেন, মুখমণ্ডল এবং কপাল দেখে অনেক কিছু পর্যবেক্ষণ করতেন। এ ছাড়াও উনি তন্ত্রসাধনা করেছেন বলে আমি শুনেছি। এই একটাই বললাম উনার অজানা কথা।
প্রশ্ন : নজরুল ইসলামের সঙ্গে আপনার প্রথম দেখা কখন, কোথায় এবং কীভাবে হয়?
ফিরোজা বেগম : চল্লিশের দশকের শুরুতে এইচএমভির রিহার্সেল রুমে উনার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয়। আমি তখন ছোট, বুঝতে পারিনি সেখানে অনেক গুণী ব্যক্তি এবং গায়ক ও গায়িকা ছিলেন। সেখানেই আমার সঙ্গে তার প্রথম দেখা হয়। উনি আমার গান শুনে আনন্দ উল্লাস প্রকাশ করেন এবং বলেন, ‘এতদিন পর আমি একজন সম্ভ্রান্ত মুসলমান পরিবারের মেয়েকে রিহার্সেল রুমে দেখলাম। সে যদি গানের জগতে প্রবেশ করে তাহলে আমি খুবই খুশি হব। গান শুনে মনে হলো সে খুব বড় গায়িকা হতে পারবে এবং আমি তার জন্য এই কামনাই করি। তোমরা যদি পার ওকে সব রকমের সহযোগিতা ক’রো। এটা তার জন্য নতুন জায়গা। ও কিন্তু অনেক নাম করবে।’
প্রশ্ন : কবির সঙ্গে তো আপনার অনেক স্মৃতি আছে। একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনার কথা বলবেন কি যা আপনার হƒদয়ে প্রায়ই নাড়া এবং সাড়া জাগায়।
ফিরোজা বেগম : আমি উনার ঘরে গেলে উনি আমার মুখের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতেন। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে কী যেন বলতে চাইতেন। উনি একটু উত্তেজিত হলে কিছু একটা বলতে চাইতেন। কলকাতা থাকাকালে এরকম যখন হতো তখন প্রমীলা নজরুল আমাকে বলতেনÑ উনি অশান্ত হয়ে উঠেছেন। ফিরোজা তুমি বরঞ্চ উনাকে একটি গান শোনাও। তখন হারমোনিয়াম আনতে বলা হতো। এটা বলার সঙ্গে সঙ্গে যে দরজা দিয়ে হারমোনিয়াম কেউ আনবে ওইদিকে তাকিয়ে থাকতেন আর কী যেন একটু খুঁজতেন। হারমোনিয়ামটা যেই আসত তখন উনি হেসে ফেলতেন। হারমোনিয়াম আনার পর উনি নিজে কাছে এসে হারমোনিয়ামটা টেনে রাখলেন। তখন আমার বুকের মধ্যে ধড়ফড় শুরু হয়ে গেছে। আমাকে তখন প্রমীলা নজরুল বললেন, তুমি তাড়াতাড়ি গান কর দেখবে কেমন শান্ত হয়ে যাবেন। তখন আমি গান করলাম তারপর কমলবাবু গান গাইলেন। উনি খুব সুন্দরভাবে শুনলেন। তারপর উনি খাটের থেকে নেমে এসে আমার পাশে বসে ডান কাঁধে হাত রাখলেন। এদিন উনার জš§দিন ছিল না। কিন্তু উনার জš§দিনে আমি যখন গিয়েছি তখন উনি আমার পাশে বসে কী যে হাসতেন তা বলে প্রকাশ করা যাবে না। আর যদি উনার কোনো দুঃখের গান গাইতাম তাহলে কেঁদে ফেলতেন। আমি যখন গাইলামÑ মুছাফির মুছরে আঁখিজল... তখন উনার দুই চোখ দিয়ে ঝরঝর করে পানি পড়ছে, উনি আমার হাতটা ধরে আছেন, আর একবার আমার মুখের দিকে সোজা হয়ে তাকাতেন আবার কাত হয়ে তাকাতেন। উনি কাঁদতেন এবং আমারও দুই চোখ দিয়ে পানি পড়ত। আমি উনার চোখে পানি দেখলে নিজেকে সামলাতে পরতাম না। তখন মনে হতো আমি এ কী দেখছি! একসময় উনি একটি একটি করে মালা তুলে আমাকে দিতেন এবং হারমোনিয়ামটা ফুলের মালা দিয়ে ভরে ফেলতেন।
প্রশ্ন : আপনার গান শুনে খুশি হয়ে কবি আপনাকে যে ফুলের মালা উপহার দিয়েছিলেন এর দুয়েকটা কি স্মৃতি হিসেবে সংগ্রহে রেখেছেন?
ফিরোজা বেগম : ফুলের মালা কি সবসময় থাকে! ফুল তো শুকিয়ে ঝরে যাবেই। এটাই ফুলের মালার ধর্ম। কবির জš§দিনে অনেকেই উনাকে ফুলের মালা দিতেন। আমি কোনো একটি ফাঁকে উনাকে গান শুনাতাম। যখন আমার গান রেকর্ড হতে শুরু করেছে তখনই উনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। সবাই জানত আমি রবীন্দ্রসঙ্গীতের শিল্পী হব। সেই মানুষ আমি সব কিছু রক্ষা করে নজরুল ইসলামের গানের চর্চা করে সবাইকে অবাক করে দিয়েছি। সব কিছু বাদ দিয়ে যখন নজরুল ইসলামের গানের চর্চা শুরু করলাম তখন অনেকেই আমাকে ভয় দেখিয়েছেন যে আমার গানের ভবিষ্যৎ হয়তো শেষ হয়ে গেল। আমি আর কিছু করতে পারব না। এই একটা বিষয় নিয়ে আমি খুব কষ্ট পাচ্ছিলাম। তখন আমার পাশে বলতে গেলে তেমন কেউ ছিল না। কমল দাশগুপ্ত আমাকে গান শিখাচ্ছিলেন। কমল দাশগুপ্তের মতো বিজ্ঞ লোক যে আমাকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছেন এটা আমার জন্য অনেক বড় পাওয়া। এটা তো কেউ ভাবতেও পারে না।
প্রশ্ন : কমল দাশগুপ্তের সঙ্গে আপনার পরিচয় কীভাবে?
ফিরোজা বেগম : আমার ™ি^তীয় রেকর্ডিংয়ের সময় তার সঙ্গে পরিচয়। আমার সৌভাগ্য তো এখান থেকেই শুরু। তখন তার মতো বড় শিক্ষাগুরুর কাছে শিখতে যাওয়া কেউ স্বপ্নেও দেখত না। তখন ভারতবর্ষে একটি কথা প্রচলিত ছিল যেÑ তুমি যতই গান করো না কেন যদি কমল দাশগুপ্তের কাছে না যাও, তার কাছ থেকে যদি একবার ঘুুরে না আসো তাহলে কিছুই করতে পারবে না। পরবর্তীতে তা সত্য প্রমাণিত হলো।
প্রশ্ন : বাংলাদেশে নজরুলসঙ্গীত চর্চার ক্ষেত্রে বর্তমান সময়ে সমস্যা এবং ঘাটতি বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী?
ফিরোজা বেগম : দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমি এখানে ছিলাম এবং তখন নজরুলসঙ্গীত সবচাইতে বেশি আমি গাইতাম। তখন আমার সুনাম হলেও সুধী সমাজে যে স্বীকৃতি তা ছিল না। আর তখন নজরুলসঙ্গীত শব্দটি ব্যবহার করা হতো না। তখন বল হতো আধুনিক গান শুনছেনÑ রচনা করেছেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম। আমি পরে রেকর্ডের মাধ্যমে নজরুলসঙ্গীত প্রবর্তন করি এবং বিভিন্নভাবে রেকর্ডের নাম নিয়ে অনুষ্ঠান করেছি। তবে বাংলাদেশে নজরুলসঙ্গীতের চর্চা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। এখন যেহেতু কাজী নজরুল ইসলাম বাংলাদেশের জাতীয় কবি সেহেতু তার সঙ্গীতের চর্চা আরও অনেক বেশি করা উচিত। এখন নজরুলসঙ্গীত চর্চার ক্ষেত্রে সমস্যা ততটা নেই, যতটা ঘাটতি আছে। তবে পৃষ্ঠপোষকতার একটু প্রয়োজন আছে। বর্তমান সময়ে কয়েকজন ভালো ভালো শিল্পী আছেন। তাদের কণ্ঠে নজরুলসঙ্গীত সকলের ভালো লাগার কথা। কারণ তারা পরিশ্রম করে নিজেদের তৈরি করেছেন। কিন্তু সেভাবে কারও রেকর্ড বের হচ্ছে না। তবে নজরুলসঙ্গীতের রূপকার হওয়া খুবই কঠিন। সেরকম শিল্পী কয়েকজন আছেন। আগামী দিনে যারা হবে তাদের বুঝতে হবে নজরুলসঙ্গীত অন্য গানের মতো নয়। লোকে অন্য গানের যতই গুণগান করুক না কেন নজরুলসঙ্গীত গাওয়া খুব কঠিন। তার চাইতে কঠিন নজরুলসঙ্গীত পরিবেশন করে মানুষকে মুগ্ধ করা।
প্রশ্ন : আপনার পরে আমরা বড় কোনো শিল্পী কেন পাইনি?
ফিরোজা বেগম : আমি কোনো বড়মাপের শিল্পী নই। আমার নাম হয়ে গিয়েছিল এটাই সবচাইতে বড় কথা। তখন নজরুলসঙ্গীত কেউ শুনত না। এরকম একটি বিষয় আমি তুলে ধরতে সফল হয়েছি এটাই আমার বড় পাওয়া। আমি যখন পৃথিবীতে থাকব না তখন আপনি বলতে পারবেন, আমার পাশে বসে আপনি আমার গান শুনেছেন, নজরুল বিষয়ে শুনেছেন। এটাই আমার জীবনের পরম পাওয়া।
প্রশ্ন : অন্য কবিদের গানের সঙ্গে নজরুলের গানের বিশেষ পার্থক্য কী?
ফিরোজা বেগম : অন্য কবিদের থেকে উনার গানের পার্থক্য হচ্ছে উনার গানের উপমা একেবারে প্রত্যক্ষ প্রকৃতির সঙ্গে, আরেকটি হলো উনার ভালোবাসার নিবেদন একেবারে সরাসরি। এর মধ্যে কোনো আবছা বা ছায়া-ছায়া ভাব নেই। যেমনÑ তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয় সে কি মোর অপরাধÑ অনেকে সুন্দরের অনেক উপমা টেনেছেন। কিন্তু উনি তা করেননি। আর তুমি কথাটা বলে উনি বুঝিয়ে দিয়েছেন কাকে তিনি বলছেন। উনার ভালোবাসার পাত্রীও একেবারে কম ছিল না। উনি অনেক দুঃখ পেয়েছেন। কিন্তু আমার মনে হয়েছে ভালোবাসার সাধ উনার মেটেনি। উনি তেমন ভালোবাসা কারও মধ্যে দেখেননি যে ভালোবাসা উনি কবিতায় প্রকাশ করেছেন। উনার অতৃপ্তি সব সময় ছিল। উনি সচ্ছলতা চেয়েছিলেন কিন্তু সারা জীবন দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে তার স্বাস্থ্য খারাপ হয়ে গেল এবং স্মৃতিশক্তি চলে গেল। তার পরেও উনি কবিতা, গান, নাটক, উপন্যাস লিখেছেন, এটা অন্য কারও ব্যাপারে চিন্তা করা যায় না। কারণ ওই সময় যারা সাহিত্য চর্চা করতেন তারা সবাই সচ্ছল ছিলেন। একমাত্র উনি দারিদ্র্যের সঙ্গে নিরন্তর লড়াই করেছেন। এ প্রেক্ষিতে চল্লিশ বছর বয়সে কোনো কবি যদি শেষ হয়ে যায়, এ বয়সে সাধারণত মানুষ পরিপূর্ণ হয়। পরিপূর্ণ দক্ষতা এবং সৃষ্টিশীলতা যখন সবচাইতে সমৃদ্ধ হয় সেই বয়সে তিনি স্তব্ধ হয়ে গেলেন। এটা আমি ভেবে সহ্য করতে পারি না। এখনও আমার চোখে পানি এসে যায়। এই অনুভূতি অন্য কারও মধ্যে নেই। উনার জন্য আমি আমার জীবনটা বলতে গেলে উৎসর্গ করে দিলাম। যারা তার সান্নিধ্যে এবং যারা তার গান গেয়ে ধন্য হয়েছে এ রকম তারা করতে পারত। আমি তো উনাকে ঠিকমতো পেলামই না। আমি উনাকে পেলে উনি তো আমার জন্য গান লিখতেন। যে সম্মান উনি চেয়েছিলেন তা উনাকে দেওয়া হয়নি বরং তাকে নিয়ে সমালোচনা করা হয়েছে। উনাকে সব রকমের প্রতিকূলতার সঙ্গে যুদ্ধ করতে হয়েছে। এই সব নিম্ন মানসিকতার অনেক মানুষের সঙ্গে উনি খাপ খাওয়াতে পারেননি। এর তীব্র প্রতিক্রিয়া উনার অনেক কবিতায় আছে।
প্রশ্ন: নজরুলসঙ্গীতের বাণী এবং সুর বিকৃতির অভিযোগ আছে। এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী?
ফিরোজা বেগম : হ্যাঁ, এ অভিযোগ আছে এবং এর কারণও আছে। এর কারণ হলো রবীন্দ্রনাথেরও একাধিক গানের একাধিক সুর আছে, তেমনি কাজী নজরুল ইসলামের গানের নিজের করা অন্যের করা সুরের মিশ্রণ ঘটে গেছে। কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় অন্যেরটা সফল হয়েছে উনারাটা হয়নি। আবার কোনো ক্ষেত্রে দেখা গেছে উনারটা সফল হয়েছে আর অন্যেরটা পেছনে পড়ে আছে। কিন্তু আবার এক সময় দেখা গেল যেটা পড়ে আছে সেটাও ভালো। এগুলো খারাপ কিছু নয়। আর কবি তো নিজেই একাধিক সুর করেছেন। আর কবির একটি বড় বিষয় হচ্ছে তার নিজের করা স্বরলিপির সঙ্গে তার পরিচালনায় রেকর্ডের মিল নেই। তার মানে গায়ক-গায়িকারা নিজের মতো করে অনেক কিছু করেছেন। আবার কবি নিজে রিহার্সেলের সময় তাদের বারবার পরিবর্তন করিয়েছেন। আর উনার হাতের লেখা বাণী আমার কাছে আছেÑ বাণী ও সুরের মালা দিয়ে তুমি আমারে ছুঁইয়াছিলে। কিন্তু গানটি রেকর্ড করার সময় সুরটা সুন্দর করার জন্য ‘সুরে ও বাণীর মালা দিয়ে তুমি...’ তাৎক্ষণিকভাবে পরিবর্তন করা হয়। এখন আমি যদি মূল লেখাটা পাই তাহলে তো আমি মহা ™^›ে™^ পড়ে যাব। উনার লেখা ‘বাণী ও সুরের...’ আর রেকর্ড হলো ‘সুরে ও বাণীর...’ এ রকম অনেক আছে। এই ছোটখাটো পরিবর্তন এমন কোনো গর্হিত ব্যাপার নয় যে একেবারে অর্থটাই অর্থহীন হয়ে যাবে। যারা বলেন রেকর্ডের মতো করেই গাইতে হবে আমি তাদের সঙ্গে একমত নই। এখন আমাদের এমন একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তি প্রয়োজন যিনি রেকর্ড শুনে সঠিকটি শিখিয়ে দেবেন। আগে-পাছে কী ভুল ছিল এটা সংশোধনের দায়িত্ব তার ওপরই পড়ে।