অন্নদাশঙ্কর রায় একবার বলেছিলেন, ‘সম্প্রতি প্রবন্ধ লেখকদের এক সম্মেলনে ভ্রমণ কাহিনিকারদেরও আসন দেওয়া হয়েছিল। তখন এই প্রশ্নটা আমার মনে ওঠে, ভ্রমণকাহিনি কি প্রবন্ধের ঘরের পিসি, না কথাসাহিত্যের ঘরের মাসি? না একাধারে দুই?’ প্রশ্ন জাগতেই পারে। সাহিত্যের বিভিন্ন শাখা যখন নানাভাবে পরিপুষ্ট হয়েছে, আলোচিত হয়েছে, ভ্রমণসাহিত্যের ললাটে ততটা আলোচনা বা সুনাম জোটেনি।
অথচ বাংলাসাহিত্য তো বটেই, বিশ্বসাহিত্যের দিকে দৃষ্টি দিলেও ভ্রমণসাহিত্যের প্রাচীনত্ব চোখে পড়বে। দ্বিতীয় শতাব্দীর গ্রিক ভূগোলবিদ Pausanias Description of Greec নামে ভ্রমণবিষয়ক স্মৃতিকথা লিখেছিলেন। বাংলা সাহিত্যেও উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটকের চেয়ে ভ্রমণসাহিত্য কিন্তু বয়সে ছোট নয়। বাংলা ভাষায় যিনি প্রথম ভ্রমণকাহিনি লিখেছিলেন, তার নাম বিশ্বনাথ মুখোপাধ্যায় (১৮৮৭-১৯৪৯)। ২৭ দিন ব্যাপ্ত ‘কালনা থেকে রংপুর’ ভ্রমণের কথা তিনি রোজনামচা আকারে লিখেছিলেন। তিনি যখন এই ভ্রমণকথা লিখেন, তখনও বাংলা গদ্য দাঁড়ায়নি। বলা চলে বিরামচিহ্নহীন আদি বাংলা গদ্যের নমুনা আমরা এই লেখায় পাই।
বাংলাসাহিত্যে প্রথম সার্থক ভ্রমণসাহিত্য রচয়িতার শিরোপা সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে দিতে হবে। তার ভ্রমণকাহিনির নাম ‘পালামৌ’। এটি প্রথমে ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। যৌবনে লেখক পালামৌ ভ্রমণ করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে সেই স্মৃতিই ‘পালামৌ’ নামক লেখায় লিপিবদ্ধ করে রাখেন। এই লেখায় সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের শৈল্পিক দৃষ্টি এবং গদ্যের পরিচয় আমরা পাই। ‘পালামৌ’র অনেক কথাই বর্তমানে প্রবচনের মর্যাদা পেয়েছে। সুকুমার সেন ‘পালামৌ’ সম্পর্কে বলেছেন, ‘বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বড় ভাই সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘পালামৌ’কে বাংলা গদ্য সাহিত্যে প্রথম সার্থক ভ্রমণকাহিনি হিসেবে গণ্য করা যায়।’ তবে লেখকের জীবিতাবস্থায় এটি গ্রন্থের রূপ পায়নি।
বাংলা সাহিত্যের অন্যান্য শাখার মতো ভ্রমণসাহিত্যকে যিনি সমৃদ্ধ করে তুলেছেন, তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ভ্রমণ সাহিত্য বিষয়ক তার বইগুলো হচ্ছে ‘য়ুরোপ প্রবাসীর পত্র’, ‘য়ুরোপ যাত্রীর ডায়েরী’, ‘পথের সঞ্চয়’, ‘জাপান যাত্রী’, ‘পশ্চিম যাত্রীর ডায়েরী’, ‘জাভা যাত্রীর পত্র’, ‘রাশিয়ার চিঠি’ প্রভৃতি। এসব লেখায় বিভিন্ন স্থানের বর্ণনা, রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক পরিচয়ের পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাদের অন্তর্লোকের দিকটিও ফুটিয়ে তুলেছেন। বাংলা ভ্রমণসাহিত্যের নাম উঠলেই সৈয়দ মুজতবা আলীর নাম অবারিতভাবে চলে আসে। ‘দেশ’ পত্রিকায় তার ‘দেশে বিদেশে’ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হওয়ার সময়ই পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সমর্থ হোন। এর কারণ ছিল তার রচনাশৈলী।
জসীমউদ্দীন কবি হিসেবে পরিচিত হলেও তার গদ্যের পরতে পরতে জড়িয়ে আছে এক ধরনের মায়াময় আবেশ। বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করার অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি কয়েকটি বই রচনা করেছিলেন। এই বইয়ের গদ্যেও জড়িয়ে আছে তার স্বাদু গদ্যের জাদু। জসীমউদ্দীনের উল্লেখযোগ্য ভ্রমণবিষয়ক বই হলো, ‘চলে মুসাফির’, ‘হলদে পরির দেশে’, ‘যে দেশে মানুষ বড়’ প্রভৃতি। বুদ্ধদেব বসু আধুনিক বাংলা কবিতার পঞ্চপাণ্ডবের একজন। তবে তিনি কবিতার পাশাপাশি গদ্য লিখেছেন প্রচুর। প্রবন্ধ, উপন্যাস, নাটক। ‘আমি চঞ্চল হে’, ‘সব পেয়েছির দেশে’ তার উল্লেখযোগ্য ভ্রমণ বিষয়ক গদ্য। এই বইগুলো পাঠককে অন্য এক আনন্দের সন্ধান দেবে। অন্নদাশঙ্কর রায় বাংলা সাহিত্যে ছড়াকার হিসেবে স্বনামধন্য। তবে তিনি গদ্যও লিখেছেন। তার ‘পথে প্রবাসে’ বাংলা ভ্রমণসাহিত্যের এক উজ্জ্বল সংযোজন।
বাংলা ভ্রমণসাহিত্যের ধারা সবসময় সচল ছিল। কখনও এর প্রবাহ স্তিমিত হয়নি। কবি, সাহিত্যিকের পাশাপাশি যারা সৃজনশীল লেখার সঙ্গে জড়িত নয়, তারাও উল্লেখসংখ্যক ভ্রমণসাহিত্য রচনা করে বাংলা সাহিত্য ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছেন। তবে শুরুতে অন্নদাশঙ্কর রায়ের তোলা প্রশ্ন নিয়ে আরও দুয়েকটি কথা বলা যেতে পারে। আসলে ভ্রমণসাহিত্য কি শুধু স্থানের বর্ণনা, ভৌগোলিক পরিচয়, সাংস্কৃতিক পরিচয় তুলে ধরা হবে? নাকি এখানে মানুষের চরিত্রেরও বিশ্লেষণ বর্ণনা করা হবে। আসলে এখানে ফারাকটা খুব অল্প। যদি ভ্রমণের নীরস বর্ণনাই হয় লেখার মূল প্রতিপাদ্য, তা হলে সেটা বড়জোর ভ্রমণকাহিনি হতে পারে, সাহিত্য হবে না। আবার যদি মানুষের চরিত্রকে মূল ফোকাস করে তাদের অন্তর্দ্বন্দ্ব ফুটিয়ে তোলা হয়, তা হলে তা ভ্রমণসাহিত্যের পর্যায়ে থাকবে না।
এক্ষেত্রে প্রথম উদাহরণটি দেওয়া যেতে পারে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের আলোচিত উপন্যাস ‘শ্রীকান্ত’ যখন প্রকাশিত হয়, তখন এর নাম ছিল ‘শ্রীকান্তের ভ্রমণকাহিনী’। তবে নামের সঙ্গে ভ্রমণকাহিনি লেখা থাকলেও এটি উপন্যাসই। ভ্রমণসাহিত্য নয়। ঠিক একইভাবে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘চাঁদের পাহাড়’কেও অনেকে ভ্রমণসাহিত্যের শ্রেণিভুক্ত করলেও এটি মূলত উপন্যাস। রোমাঞ্চকর অভিযানের কাহিনি। আরেকটি উদাহরণ টেনে লেখাটির উপসংহার টানা যাক। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ‘ছবির দেশে, কবিতার দেশে’ ও ‘সুদূর ঝর্নার জলে’ বই দুটো পাশাপাশি রেখে পড়লেই ভ্রমণসাহিত্য আর উপন্যাসের সীমানা চিহ্নিত করা যাবে।
আয়ওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় সুনীলের সঙ্গে মার্গারিটা নাম্নী এক তরুণীর পরিচয় হয়। ‘ছবির দেশে, কবিতার দেশে’ বইয়ের অনেকটা জুড়ে মার্গারিটা থাকলে এই বই আরও অনেক কিছু ধারণ করেছে। অপর দিকে ‘সুদূর ঝর্নার জলে’ বইটি শুধু মার্গারিটাকে কেন্দ্র করেই পরিণতির দিকে প্রবাহিত হয়েছে। কোনটি ভ্রমণসাহিত্য আর কোনটি নয় তা এই বই দুটো পাশাপাশি রেখে পড়লে অনেক বেশি উপলব্ধি করা যাবে, যা সংজ্ঞা পড়ে বোঝা যাবে না।