জাতীয় পতাকার বিকৃতি রোধ নাগরিক দায়িত্ব

সম্পাদকীয়

জাতীয় পতাকা হচ্ছে একটি স্বাধীন জাতির মর্যাদার প্রতীক। পৃথিবীর প্রত্যেক স্বাধীন দেশের একটি করে জাতীয় পতাকা থাকে। পতাকাটি বহন করে

2020-12-23T23:45:00+00:00
2020-12-23T23:45:00+00:00
 
  বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১৮ ভাদ্র ১৪৩৩
বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সম্পাদকীয়
জাতীয় পতাকার বিকৃতি রোধ নাগরিক দায়িত্ব
প্রকাশ: বুধবার, ২৩ ডিসেম্বর, ২০২০, ১১:৪৫ পিএম 
জাতীয় পতাকা হচ্ছে একটি স্বাধীন জাতির মর্যাদার প্রতীক। পৃথিবীর প্রত্যেক স্বাধীন দেশের একটি করে জাতীয় পতাকা থাকে। পতাকাটি বহন করে সংশ্লিষ্ট দেশের তাৎপর্য। তেমনি স্বাধীন বাংলাদেশের গৌরবোজ্জ্বল উপাখ্যানের অন্যতম ধারক ও বাহক আমাদের জাতীয় পতাকা। এই পতাকার দুটি রঙের সঙ্গে মিশে রয়েছে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব আর গৌরব। পতাকার লাল-সবুজের প্রতিটি বিন্দুতে লুক্বায়িত রয়েছে এ দেশের সূর্যসন্তানদের অপরিমেয় আত্মত্যাগ এবং বীরত্বের কাহিনি। সহজ কথায়, বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা রাষ্ট্র ও জাতি হিসেবে আমাদের স্বকীয়তার প্রতীক, সার্বভৌমত্ব এবং অস্তিত্বের এক নির্ভরযোগ্য চিহ্ন। গভীর শ্রদ্ধা ও সর্বোচ্চ মর্যাদার সঙ্গে এই পতাকার সম্মান রক্ষা করা এদেশের প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক কর্তব্য। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এ ব্যাপারে দেশের অধিকাংশ নাগরিক উদাসীন।
বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস, শহীদ দিবসসহ বিভিন্ন জাতীয় দিবসে আমরা জাতীয় পতাকা ব্যবহার করে বিজয়ের উচ্ছ্বাস প্রকাশ করি; দেশের প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা প্রকাশ করি। অনেকেই অধিক উচ্ছ্বসিত হয়ে কিংবা আবেগের বশে দেশের প্রতি উপচেপড়া ভালোবাসা প্রদর্শন করতে গিয়ে ভালোবাসা বা শ্রদ্ধা জ্ঞাপনকে অসম্মান আর অবমাননার পর্যায়ে নিয়ে যাই। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া বিকৃত পতাকাসহ বেগম রোকেয়া বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ছবি এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
Advertisement
পতাকার এমন বিকৃতি পতাকাবিধির পাশাপাশি সংবিধানের ৪(১) অনুচ্ছেদের লঙ্ঘনও বটে! সংবিধানের ৪(১) অনুচ্ছেদে প্রজাতন্ত্রের জাতীয় পতাকার বর্ণনায় বলা হয়েছেÑ ‘সবুজ ক্ষেত্রের উপর স্থাপিত রক্তবর্ণের একটি ভরাট বৃত্ত থাকবে।’ জাতির সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ এবং জাতি গঠনের কারিগর শিক্ষকদের থেকে এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ নিঃসন্দেহে দুঃখজনক ব্যাপার। এসবের জন্য মূলত দায়ী আমাদের অজ্ঞতা এবং অসচেতনতা। কারণ জাতীয় পতাকা ব্যবহারের বিধি সম্পর্কে দেশের অধিকাংশ নাগরিকই জানেন না। আবার যে দু-চারজন জানেন তারা মানেন না। এই অজ্ঞতা এবং বেখেয়ালেই দেশজুড়ে জাতীয় পতাকার অবমাননা করা হচ্ছে অহরহ।
বিভিন্ন অনুষ্ঠান বা উপলক্ষে আমাদের দেশে পতাকার ওপর বিভিন্ন ছবি কিংবা লেখা ছাপাতে দেখা যায়। যা কি না ‘জাতীয় পতাকা বিধিমালা-১৯৭২ (সংশোধিত ২০১০)’-এর ৮ ধারার ৩ উপধারা অনুযায়ী অবৈধ। আজকাল আবার জাতীয় পতাকার আদলে বিভিন্ন পোশাক (শাড়ি, পাঞ্জাবি, ফতুয়া, টি-শার্ট) পরিধানের প্রচলন শুরু হয়েছে। পোশাক তৈরির নানা প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন উপলক্ষে জাতীয় পতাকার আদলে তৈরি এসব পোশাক বাজারে আনছে। অথচ পতাকা বিধির ধারা-৭-এর ১৮ এবং ১৯ উপধারা অনুযায়ী জাতীয় পতাকাকে পোশাক হিসেবে পরিধানের সুযোগ নেই। উপধারা-১৮-তে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের পতাকা কোন কিছুর আচ্ছাদন হিসাবে ব্যবহার করা যাবে না।’ এবং উপধারা-১৯ বলছে, ‘পতাকা এমনভাবে উত্তোলন, প্রদর্শন, ব্যবহার বা সংরক্ষণ করা যাবে না যাতে পতাকা ছিঁড়ে যেতে পারে বা ময়লা বা নষ্ট হতে পারে।’ ৭(২১) ধারায় এ-ও বলা আছে যে, ‘অনুমতি ছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্য বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে জাতীয় পতাকাকে ট্রেডমার্ক, ডিজাইন বা প্যাটেন্ট হিসাবে ব্যবহার করা যাবে না।’ তবুও এভাবে অনায়াসেই চেতনার মোড়কে প্রতিনিয়ত অবমাননা করা হচ্ছে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত পতাকাকে।
আবার মিছিল তথা শোভাযাত্রার ক্ষেত্রে মিছিলের মাঝখানে অথবা মিছিলের অগ্রগমনের পথের (লাইন অব মার্চ) ডানদিকে পতাকা ব্যবহারের সুস্পষ্ট নিয়ম ধারা-৭(৮)-এ বলা হলেও আমাদের দেশের রাজনৈতিক শোভাযাত্রা থেকে শুরু করে অন্যান্য শোভাযাত্রা... কোথাও তা মানা হয় না। ক্রিকেট কিংবা ফুটবল বিশ^কাপ খেলার সময় জাতীয় পতাকার আরেক ধারার অসম্মান সারা দেশেই দেখা যায়। পতাকা আইনের একাধিক ধারা-উপধারা লঙ্ঘন করে, নিজ দেশের জাতীয় পতাকাকে হেয় করে ওড়ানো হয় অগণিত ভিনদেশি পতাকা। জাতীয় পতাকা বিধির ৭ ধারার ৩, ৪, ৫ এবং ১১ উপধারায় বাংলাদেশের পতাকার সম্মানার্থে স্থান সংরক্ষিত রাখা, দুটি পতাকা উত্তোলিত হলে ভবনের ডানদিকে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলিত করা, দুই বা ততোধিক দেশের পতাকা প্রদর্শিত হলে ভিন্ন ভিন্ন দণ্ডে উত্তোলন করা এবং পতাকাগুলোর আয়তন প্রায় সমান করাসহ বেশ কিছু নির্দেশনা থাকলেও বিশ^কাপ খেলা চলাকালে উপর্যুক্ত একটি নির্দেশনাও মানা হয় না। উল্টো কতক ক্ষেত্রে নিজের দেশের নিতান্তই ছোট একটি পতাকা একই দণ্ডে ওপর-নিচ করে প্রদর্শিত হয়। সাধারণ জনগণের এসব হেঁয়ালিপনার পাশাপাশি সারা দেশে সরকারি-বেসরকারি গুরুত্বপূর্ণ অসংখ্য অফিসে নিয়মিত ওড়ানো হচ্ছে রঙ বিবর্ণ হয়ে যাওয়া বিকৃত জাতীয় পতাকা, যা সংবিধানের ৪(১) অনুচ্ছেদ এবং ‘জাতীয় পতাকা বিধিমালা-১৯৭২’-এর স্পষ্ট লঙ্ঘন। এর সবই বাংলাদেশ দণ্ডবিধি অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
পতাকা আইন অমান্যকারীদের জন্য ১ বছরের কারাদণ্ড বা ৫ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় শাস্তির বিধান রয়েছে। স্বাধীনতার অর্ধশত বছরে এসেও স্বাধীনতার প্রতীক জাতীয় পতাকার এমন অবমাননা অত্যন্ত দুঃখজনক ব্যাপার। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সরকারকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। পতাকা আইনের অধিক প্রচার-প্রচারণা এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি পতাকা আইন মেনে চলার বিষয়ে জনসাধারণকে আগ্রহী করে তোলা জরুরি। স্কুল-কলেজ-বিশ^বিদ্যালয় পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মশালার মাধ্যমে পতাকা আইন সম্পর্কে তরুণ প্রজন্মকে সম্যক ধারণা প্রদান করতে হবে। পতাকা আইন অমান্য করলে তথা পতাকার অবমাননা করলে নির্ধারিত শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। বিধিমালা অনুযায়ী জাতীয় পতাকা ব্যবহৃত হচ্ছে কি না কঠোরভাবে সরকারকে তা তদারকি করতে হবে। সময় থাকতে পরিস্থিতির উত্তরণ না ঘটালে জাতীয় পতাকার প্রতি অশ্রদ্ধা ও অসম্মান প্রদর্শন অদূর ভবিষ্যতে আমাদের একটি লক্ষ্যহীন জাতিতে পরিণত করবে। জাতীয় পতাকা একটি রাষ্ট্রের পরিচয়। আমাদের প্রিয় লাল-সবুজের পতাকা শুধু একখণ্ড কাপড় নয়। আসুন, জাতীয় পতাকার বিকৃতি রোধে জাতীয় পতাকা ব্যবহারের বিধিমালা সম্পর্কে সচেতন হই। সে সঙ্গে জাতীয় পতাকার যত্রতত্র ব্যবহার থেকে বিরত থাকি। বন্ধ হোক জাতীয় পতাকার অবমাননা, জাগ্রত হোক বিবেক।

ষ এসএএইচ ওয়ালিউল্লাহ
     শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ^বিদ্যালয়







Loading...
Loading...
সম্পাদকীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: