প্রকাশ: শুক্রবার, ৩০ এপ্রিল, ২০২১, ১২:০০ এএম (ভিজিট : ২৯০)
হাবিবুল্লাহ ফাহাদ
মৃন্ময়ের জন্য পাঞ্জাবিতে ফুল তুলছে কবিতা। তিন দিন ধরে রাতদিন কাজ করছে। গেল পাঁচ বছর ধরে প্রতিবছর মৃন্ময়ের নতুন বছর শুরু হয় কবিতার হাতের কাজের পাঞ্জাবি পরে। ওদের বিয়ে হয়েছে তিন বছর হচ্ছে। প্রেম ছিল দুবছরের। যে যেখানেই থাকুক গত পাঁচ বছর ওদের এই সময়টা একসঙ্গেই কাটে।
মৃন্ময় দুদিন হয় অফিসের কাজে ঢাকার বাইরে গেছে। আজ রাতেই ফেরার কথা। তার আগেই কবিতার পাঞ্জাবির কাজটাও শেষ হয়ে যাবে। ডানপাশের ঘাড় থেকে নিচ পর্যন্ত একটা লতার মতো চেনটানা নকশা, মাঝে মাঝে ক্রস সেলাইয়ের সাদাফুল। নীল-সাদা শেডের সুতোয় লতাটা আগেই তোলা হয়ে গেছে। বাকি কেবল সাদা ফুলগুলো।
মৃন্ময়ের সঙ্গে কবিতার বয়সের ব্যবধান পাঁচ বছরের। কবিতাই বড়। কিন্তু মৃন্ময়ের পাশে দাঁড়ালে কেউ বলবে না, মৃন্ময় ছোট। মাঝে মাঝে মৃন্ময় তার কাঁচা-পাকা চুলগুলো দেখিয়ে বলে, দেখো আমিই বুড়ো হয়ে যাব। তুমি বুড়ি হবে না। তখন লোকে বলবে, বুড়োর তরুণী বউ।
কবিতা ঠোঁটটা হালকা বাঁকিয়ে অভিমানের সুরে বলে, কেন হিংসে তোমার? আমি বুড়ি হলেই তুমি খুশি হও, তাই না? তখন তরুণী দেখে আরেকজনে সঙ্গেÑ
মৃন্ময় কবিতাকে কথা শেষ করতে দেয় না। ঠোঁটে আঙুল চেপে ধরে। ‘কবিতা কখনও বুড়ো হয় শুনেছ? কবিতা সব সময় তরুণী।’
দুই রুমের ছোট্ট ফ্ল্যাটটাতে কবিতা, মৃন্ময় আর তুলি। এই তিনজন। মৃন্ময় যখন অফিসে থাকে, তখন তুলির সঙ্গেই কথা বলে সময় কাটে কবিতার।
‘তুলি দেখ তো কেমন হয়েছে পাঞ্জাবিটা? মৃন্ময়কে খুব মানাবে তাই না, বল?’
তুলি কিছু বলে না। ঘাড়টা একবার বাঁদিকে, একবার ডানদিকে কাত করে ভালো করে দেখে।
‘দেখ তো আকাশি জমিনে ফুলগুলো খুব ফুটছে তাই না রে?’
তুলি চিনচিনে একটা অদ্ভুত শব্দ করে। কবিতা বোঝে। ওর কিছু পছন্দ হলেই কেবল এভাবে প্রকাশ করে। অপছন্দ হলে মুখ ঘুরিয়ে নেয়।
তুলির মুখে এখনও কথা ফোটেনি। কেবল নিজের নামটা বলতে পারে।
কেউ যদি জানতে চায় কী নাম তোর?
টুলি টুলি টুলি। একসঙ্গে তিনবার নাম বলে তুলি।
কবিতা আর মৃন্ময়ের পাঠশালায় পড়াশোনা চলছে তুলির। টিয়াপাখিকে কথা শেখাতে ওদের দুজনের যা ব্যস্ততা, তা দেখলে যে কেউ অবাক হবে। দিন পনের হচ্ছে প্রতিদিন সকালে রেওয়াজ করানোর মতো ‘শুভ সকাল’ কথাটা শিখিয়ে যাচ্ছে মৃন্ময়। ‘তুলি বল, শুভ সকাল।’ তুলি কয়েকবার কান খাড়া করে শোনে। তারপর একবার বলে, ‘ছুবো ছকাল’।
মৃন্ময় হাসে। কবিতাকে ডেকে শোনায়, ‘দেখো তুলি কী বলছে! এই তুলি বল তো আবার, বল তো।’ তুলি আর বলে না। নখ দিয়ে খাঁচার ছাদে উল্টো করে ঝুলে বলে, ‘টুলি টুলি টুলি।’
মৃন্ময়কে নিয়ে হঠাৎ চিন্তা হচ্ছে কবিতার। অফিসের কাজে ঢাকার বাইরে গেলে ফেরার কোনো ঠিক থাকে না মৃন্ময়ের। দুদিনের কথা বলে গেলে চার দিন পার হয়। যেদিন ফেরার কথা সেদিন সকালে ফোন করে বলে, ‘কাজটা শেষ হলো না কবিতা। আজ দিনটিও বুঝি থাকতে হচ্ছে।’ এ শুনতে শুনতে ধাতস্থ হয়ে গেছে কবিতার। এবার কী হবে, এই ভেবে কবিতার মনটা কেমন বিষণ্ন হয়ে উঠছে। যদিও মৃন্ময় বলে গেছে এবার আর দেরি হবে না। তারপরও মৃন্ময় যদি ফিরতে না পারে? তাহলে? এবার কি তাহলে পহেলা বৈশাখ একসঙ্গে করা হবে না ওদের?
মুঠোফোনটা ডাইনিং টেবিলের ওপরে বাজছে। পাঞ্জাবিটা হাতে নিয়ে কবিতা দৌড়ে গেল। মৃন্ময়ের কল। ফোনটা ধরল।
‘হ্যালো।’ ওপাশ থেকে একটা উদ্বিগ্ন স্বর ভেসে এলো। কিন্তু এ তো মৃন্ময়ের গলা নয়।
‘হ্যালো, শুনছেন!’
কবিতা কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, কে আপনি?
‘আপনি কবিতা বলছেন?’
‘হ্যাঁ, মৃন্ময় কোথায়? আপনি কে?’
‘আমাকে আপনি চিনবেন না। মৃন্ময় কে হয় আপনার?’
‘কেন, আমার স্বামী। কী হয়েছে?’
‘আপনার স্বামীর তো খুবই খারাপ অবস্থা। হাসপাতালে আছে।’
কবিতার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। পাঞ্জাবিটা হাত থেকে পড়ে গেল। ‘হাসপাতালে? হাসপাতালে কেন? কী হয়েছে মৃন্ময়ের?’
‘অ্যাক্সিডেন্ট করেছে। হাসপাতালে এনেছি। মাথায় খুব আঘাত পেয়েছে। ডাক্তার বলল কিছু দামি ইনজেকশন কিনতে হবে। টাকার প্রয়োজন। আপনি এখনই কিছু টাকা পাঠান। আমি আপনাকে বিকাশ নম্বর এসএমএস করে দিচ্ছি। জলদি টাকাটা পাঠান। তা না হলে আপনার স্বামীকে বাঁচানো যাবে না।’
কবিতা পাথরের মতো হয়ে গেল। তার দুচোখ জলে ঝাপসা হয়ে এসেছে। সে কী শুনছে এসব? বিশ^^াস করতে পারছে না।
ওপাশ থেকে উদ্বিগ্ন গলাটি আবারও বলল, ‘হ্যালো, হ্যালো। শুনতে পাচ্ছেন? কী বলেছি বুঝেছেন? স্বামীকে বাঁচাতে হলে এখনই টাকা পাঠান।’
কবিতা হাতের তেলোয় চোখটা মুছে ধরা গলায় বলল, আচ্ছা নম্বরটি দিন তাহলে।
কবিতার কাছে সবসময়ই বিকাশে কিছু জমা থাকে। বিপদ তো আর বলে কয়ে আসে না। তখন চাইলে ধারও পাওয়া যায় না। সে লোকটার পাঠানো নম্বরটিতে দশ হাজার টাকা সেন্ড মানি করে ফের কল করলÑ
‘হ্যালো, টাকাটা পেয়েছেন ভাই? দেখবেন ওর যেন চিকিৎসায় কমতি না হয়।’
উদ্বিগ্ন কণ্ঠটি এবার আরও ব্যস্ত হয়ে গেল। ‘ঠিক আছে, ঠিক আছে, দেখছি।’ বলেই ফোনটি রেখে দিল।
কবিতার হঠাৎ মনে পড়ল, মৃন্ময়কে ওরা কোন হাসপাতালে নিয়েছে, সেটাই তো জানা হলো না। সে আবারও কল করল। ফোনটি বন্ধ বলছে। এই কিছুক্ষণ আগেই তো সে কথা বলল। সে কয়েকবার চেষ্টা করল। মৃন্ময়ের ফোনটি আর খোলা পাওয়া যাচ্ছে না। যে নম্বরে বিকাশ করেছে সেটিও বন্ধ বলছে।
ঘড়ি তখন রাত দশটার ঘরে। কবিতার গা-হাত-পা সব ঠান্ডা হয়ে আসছে। সে একা এখন কোথায় যাবে? কোথায় খবর নেবে মৃন্ময়ের? কাকে ফোন করবে, কিছু ভেবে উঠতে পারছে না। নিজেকে বড় অসহায় মনে হচ্ছে তার। মুঠোফোনটায় সে চেষ্টা করেই যাচ্ছে দুঘণ্টা ধরে। অনবরত বন্ধই বলে যাচ্ছে।
হঠাৎ ডোর বেলটি টিংটাং করে বেজে উঠল। এত রাতে কে এলো! কবিতা ভয়ে ভয়ে দরজা খুলল।
হঠাৎ তার মাথার ওপরের সব ঝড় যেন কেটে গেল। সে বিশ^^াসই করতে পারছে না, মৃন্ময় দাঁড়িয়ে আছে দরজায়। কাঁদতে কাঁদতে কবিতার চোখমুখ ফুলে গেছে। সে ভাষা হারিয়ে ফেলেছে।
মৃন্ময় কবিতার এই অবস্থা দেখে বলল, ‘কী হয়েছে কবিতা? তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেন?’
কবিতা মৃন্ময়কে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘তুমি ঠিক আছ তো মৃন্ময়?’
পরে সে মৃন্ময়কে সব খুলে বলল। মৃন্ময় জানাল, ফেরিতে করে পদ্মা পার হওয়ার সময় তার মুঠোফোনটি হারিয়ে গেছে।