সত্যজিৎ রায় : জয় জন্মশতবর্ষ

আলোর রেখা

বিশ^জিত রায়সত্যজিৎ রায়। চলচ্চিত্র অঙ্গনের প্রবাদপ্রতিম পুরুষ। যার হাত ধরে ভারতীয় উপমহাদেশের বাংলা চলচ্চিত্র আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমাদৃত হয়েছে। লাভ করেছে

2021-05-07T00:00:00+00:00
2021-05-07T00:00:00+00:00
 
  সোমবার, ৮ জুন ২০২৬,
২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
সোমবার, ৮ জুন ২০২৬
আলোর রেখা
সত্যজিৎ রায় : জয় জন্মশতবর্ষ
প্রকাশ: শুক্রবার, ৭ মে, ২০২১, ১২:০০ এএম   (ভিজিট : ৩৩০)
বিশ^জিত রায়
সত্যজিৎ রায়। চলচ্চিত্র অঙ্গনের প্রবাদপ্রতিম পুরুষ। যার হাত ধরে ভারতীয় উপমহাদেশের বাংলা চলচ্চিত্র আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমাদৃত হয়েছে। লাভ করেছে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র পুরস্কার। ১৯২১ সালের ২ মে চলচ্চিত্র নির্মাণের নন্দিত এই মানুষটির জন্মশতবার্ষিকী পূরণ হয়েছে। শত বছরের কোঠায় অবস্থান করা প্রয়াত সত্যজিৎ রায় দেহগত প্রস্থানে পরলোকে চলে গেছেন। কিন্তু বাংলা চলচ্চিত্রে আজও তিনি দ্যুতি ছড়াচ্ছেন আপন আলোয়। তার সৃষ্টির মাঝেই তিনি বিখ্যাত হয়ে বেঁচে আছেন, থাকবেন সব সময়। পরকালের অদৃশ্য অঙ্গনে নিজেকে সরিয়েও দখল করে নিয়েছেন ইহজগতের শ্রেষ্ঠতর সিংহাসনটি। প্রথিতযশা চলচ্চিত্রকার হিসেবে তিনি আজও অমলিন চলচ্চিত্র পর্দায়। তার কালজয়ী কৃতিত্ব কখনও মুছে যাওয়ার নয়। যত দিন যাবে কৃতিত্বের খাতায় ততই ঔজ্জ্বল্য ছড়াবেন বিংশ শতাব্দীর এই সুখ্যাত মানুষটি।
যুববয়সেই গুণী এ চলচ্চিত্রকারের নামটির সঙ্গে পরিচয়। বাংলা সিনেমার একজন অন্ধশ্রোতা হিসেবে সময়ের সেরা নায়ক, গায়ক, নায়িকা, গায়িকাসহ চলচ্চিত্র নির্মাতাদের নাম-পরিচয় জানাবোঝার মাঝে সত্যজিৎ রায় থাকবেন না তা কি হয়? কিশোর বয়সে যখন সাদাকালো ভিডিও পর্দায় চারকোনা মোটা ক্যাসেটের বাংলা ছবি দেখতাম তখন ভালো নায়ক-নায়িকার সঙ্গে নির্মাতা-পরিচালকের নামটাও জেনে নিতাম। যদিও সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্র তখন ছিল না, তারপরও গুণী চলচ্চিত্রকার হিসেবে তার নামটা ঠোঁটে গাঁথা থাকত। আমাদের দেখা-বোঝার সময়ে চলচ্চিত্রের এই কালজয়ী নির্মাতা জীবনের শেষপ্রান্তে অবস্থান করায় আমরা তার সদ্য সৃষ্টির সেরাটা উপভোগ করতে পারিনি ঠিক, তবে জানা-বোঝার মাঝেই তিনি দখল করে নিয়েছেন সকলের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, সম্মান। এই জায়গা থেকেই লেখার মাধ্যমে তার প্রতি প্রণতি নিবেদন করছি। জয় জন্মশতবার্ষিকী সত্যজিৎ রায়।
সত্যজিৎ রায় ছিলেন অসাধারণ চলচ্চিত্র নির্মাতা। তার চলচ্চিত্র কথা বলেছে শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে। বিকৃত সভ্যতার সঙ্কটের কথাও উঠে এসেছে তার চলচ্চিত্রে। আছে মানবতা ও ধর্মান্ধতার চিত্রও। সত্যজিৎ রায়কে নিয়ে লেখা প্রবন্ধ-নিবন্ধে এমনটাই জানা হয়েছে। চলচ্চিত্র নির্মাণে নজির স্থাপন করা সত্যজিৎ রায়কে নিয়ে বিশ^^বরেণ্য জাপানি নির্মাতা আকিরা কুরোসাওয়া বলেছেন, ‘চলচ্চিত্রে মানব জাতির যে অভিনব উপস্থাপন সত্যজিৎ দেখিয়েছেন, তা এককথায় অনবদ্য। ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে তিনি একজন বড়মাপের মানুষ।
তার ছবি না দেখার অর্থ হলো পৃথিবীতে বাস করেও চাঁদ কিংবা সূর্যের উপস্থিতি সম্পর্কে অবহিত না থাকা!’ সত্যজিৎ নির্মিত ‘পথের পাঁচালী’কে বহমান এক নদীর সঙ্গে তুলনা করে এই নির্মাতা বলেন, ‘এটি এমনই এক ছবি যা দেখলে এক অদ্ভুত প্রশান্তি ও ব্যাপকতার মধ্যে হারিয়ে যেতে হবে। এমন ছিমছাম পদ্ধতিতে বিশালতাকে ধরতে পারা কেবল সত্যজিতের পক্ষেই সম্ভব।’ এ ছাড়া মার্কিন চলচ্চিত্রকার মার্টিন স্করসেসির মতে, সত্যজিৎ হলেন পশ্চিমার চোখে ভারত ও ভারতীয় সংস্কৃতির রূপকার।
বিশে^^র দরবারে ভারতীয় গ্রামীণ জীবন এতটা মূর্ত হয়ে ওঠেনি সত্যজিতের আগে। সেই সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্র প্রথম বাংলা ও ভারতীয় চলচ্চিত্র হিসেবে বিশ^^ চলচ্চিত্র ভুবনে ঠাঁই করে নেয়। ১৯৫৬ সালে সত্যজিৎ নির্মিত ‘পথের পাঁচালী’ কান চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়ার পাশাপাশি ‘মানবিক দলিল’ হিসেবে খ্যাতি পায়। শুধু ‘পথের পাঁচালী’ই ১১টি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এনে দিয়েছিল সত্যজিৎ রায়কে।
সত্যজিৎ রায় শুধু চলচ্চিত্রকার হিসেবেই গুণী ছিলেন না, তিনি একাধারে লেখক, চিত্রনাট্যকার, সংগীত পরিচালক, প্রচ্ছদশিল্পী, ক্যালিগ্রাফার, অক্ষরশিল্পী হিসেবেও চমৎকার ছিলেন। সত্যজিতের সর্বময় গুণের কথা স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তারই চলচ্চিত্র নায়িকা ববিতা এক নিবন্ধে বলেছেন, ‘আমার কাছে সত্যজিৎ রায় এক বিস্ময়ের নাম। নির্মাতা, শিল্পনির্দেশক, সংগীত পরিচালক, লেখকÑ সব পরিচয়ে অনবদ্য তিনি। চলচ্চিত্র পরিচালনায় তার অসাধারণ নৈপুণ্য এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি বাংলা চলচ্চিত্রে নতুন মাত্রা তৈরি করেছিল। তিনি তার ছবির মাধ্যমে বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতিকে বিশে^^র দরবারে তুলে ধরেছিলেন।’
অনবদ্য অসাধারণ এই নির্মাতার পূর্বপুরুষের ভিটেবাড়ি এই বাংলাদেশে। কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী  উপজেলা মসুয়া গ্রামে। তার দাদা উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী প্রখ্যাত শিশুসাহিত্যিক, লেখক, চিত্রকর ও দার্শনিক ছিলেন। সত্যজিৎ রায় ১৯২১ সালের ২ মে সুকুমার রায় ও সুপ্রভা দেবীর ক্রোড়ে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৯২ সালের ২৩ এপ্রিল মৃত্যুবরণ করেন তিনি। তার জন্মের তিন বছরের মাথায় বাবা মারা যান। মায়ের সান্নিধ্যে বড় হয়ে ওঠেন সত্যজিৎ। উত্তর কলকাতার ১০০ নম্বর গড়পাড় রোডে কাটে তার শৈশবের প্রথম পাঁচ বছর। এরপর চলে যান মামার বাড়ি দক্ষিণ কলকাতার বকুল বাগানে। আট বছর বয়সে ভর্তি হন বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট স্কুলে। ১৯৪০ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক সম্পন্ন করার পর মায়ের ইচ্ছায় শান্তিনিকেতনে বিশ^^ভারতী বিশ^^বিদ্যালয়ে চারুকলা বিষয়ে লেখাপড়া করেন। শান্তিনিকেতন থেকে ১৯৪৩ সালে কলকাতায় ফিরে এসে সত্যজিৎ ৮০ টাকা বেতনে ‘জুনিয়র ভিজুয়ালাইজার’ হিসেবে যোগ দেন ব্রিটিশ বিজ্ঞাপন সংস্থা ডি জে কিমারে। সেখানে তিনি বইয়ের প্রচ্ছদও ডিজাইন করতেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যÑ জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’ ও ‘রূপসী বাংলা’, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘চাঁদের পাহাড়’ এবং জহরলাল নেহরুর ‘ডিসকভারি অব ইন্ডিয়া’ ইত্যাদি। কিছুদিন পর লন্ডন সফরের মধ্য দিয়ে শুরু হয় সত্যজিতের চলচ্চিত্রযাত্রা। ১৯৫২ সালে বিভূতিভূষণের ‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করেন এবং ১৯৫৫ সালে ‘পথের পাঁচালী’ মুক্তি পেলে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক মহলে তা ব্যাপক সমাদৃত হয়। এরপর থেকে আর পিছু তাকাতে হয়নি তাকে। ধারাবাহিক সফলতা এসে যুক্ত হয়েছে তার জীবনে। সত্যজিৎ রায় মোট ৩২টি কাহিনিচিত্র এবং চারটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন। ১৯৫৫ সাল থেকে শুরু করে নানা সম্মাননা ও পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে ১৯৯১ সালে পান চলচ্চিত্রের সর্বোচ্চ সম্মান অস্কার।
সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালী থেকে শুরু করে ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’, ‘অপুর সংসার’, ‘অপরাজিত’, ‘চারুলতা’ কালজয়ী চলচ্চিত্র হিসেবে দর্শকশ্রোতা ও সিনেমাপ্রেমী মানুষদের আকৃষ্ট করবে যুগ-যুগান্তর। এই সৃষ্টির মাধ্যমে খ্যাতির চূড়ায় অবস্থান করা সত্যজিৎ রায় তাই এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমার নিজের অনুভূতি হচ্ছে, মানুষই ঈশ^^রকে সৃষ্টি করেছে। অবশ্য প্রাণের শুরুর ব্যাপারটা নিয়ে রহস্য আছেই, কিন্তু আমার মনে হয় ঈশ^^র তেমন কিছু একটা ব্যাপার নয়Ñ যাতে আমি বিশ^^াস করতে পারি।’ নির্দিষ্ট সীমানা ছাড়িয়ে কেউ জগৎ জয় করে ফেললে এ ধরনের বাক্য আওড়ানো অত্যুক্তি বলে ধরা যাবে কি?
বাংলা চলচ্চিত্রের আকাশে ধ্রুবতারা হয়ে জ্বলা সত্যজিৎ রায় আজ এ পৃথিবীতে নেই। পৃথিবীর সকল কর্ম গুছিয়ে চলে গেছেন অনন্ত অগোচরে। সেখান থেকে ফেরাটা যেমন অসম্ভব, তেমনি সেখান থেকে তার সুকর্মগুলো স্মরণ করিয়ে দেওয়াটাও অসম্ভব। তাই বলে কি চলচ্চিত্রের কর্মচারু পুরুষ সত্যজিৎ রায় আমাদের
ভাবনার অন্তরালে হারিয়ে যাবেন? না, কখনও না। তার সুচারু নির্মাণশৈলী ও কর্মময় বর্ণাঢ্য জীবন পৃথিবীর স্মরণযোগ্য বাঁকে তৈরি করেছে শক্ত স্মৃতিচিহ্ন। সেই চিহ্নে চোখ বুলিয়ে অগণিত শ্রোতা যুগ যুগ ধরে সত্যজিৎ রায়ের গুণকীর্তন করেই যাবে। যে জায়গা থেকে কখনও হারিয়ে যাবেন না তিনি। দেহগত প্রস্থান হলেও তার কর্মরত অতীত জীবন তাকে স্মরণ করিয়ে দেবে বারবার। এ জন্য তাকে শতবর্ষী প্রণাম। পরপারে ভালো থাকুন। অক্ষয় হোক সত্যজিৎ রায়ের কর্মখ্যাতি।
 ষ প্রাবন্ধিক

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: