মানব ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো সাহিত্যের মাধ্যমে উপলব্ধি করা যায়। আমরা সাহিত্যের মাধ্যমে বিভিন্ন যুগের মানুষের অভিজ্ঞতা বোঝার চেষ্টা করি। প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত বিশ্ববাসীকে প্লেগ, কলেরা, করোনাভাইরাসের মতো মহামারির মোকাবিলা করে টিকে থাকতে হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ হোমারের মহাকাব্য ইলিয়াড (খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম শতাব্দী) শুরু হয়েছে ট্রয় নগরীতে গ্রিক সেনা শিবিরকে তছনছ করে দেওয়া প্লেগ মহামারি দিয়ে।
এ ছাড়া বাইবেলের এক্সোডাসে মিসরে হয়ে যাওয়া ১০টি প্লেগের বর্ণনা পাওয়া যায়। এই উভয় রচনায়, রোগকে একটি ঐশ্বরিক শাস্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে মহামারি সাহিত্যে অন্যান্য বিষয় নিয়েও আলোকপাত করা হয়। এ ছাড়া বিশ্বজুড়ে ঘটে যাওয়া অর্থনৈতিক মন্দা নিয়েও বহু সাহিত্য রচনা করা হয়েছে। এসব সাহিত্যে মূলত মানুষের অর্থনৈতিক, সামাজিক জীবনযাপনের কাহিনি প্রতিফলিত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে কোভিড-১৯ মহামারি এবং গত শতাব্দীর আমেরিকার গ্রেট ডিপ্রেশন বা মহামন্দা নিয়ে লেখা সাহিত্যগুলো আমাদের সামসময়িক মানুষের জীবন বুঝতে সাহায্য করবে।
বিশ্বজুড়ে কোভিড-১৯ মহামারি ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে, এই রোগটি কীভাবে আমাদের প্রভাবিত করেছে এবং আমাদের পূর্বসূরিরা একই রকম কঠিন মহামারি কীভাবে মোকাবিলা করেছে তা বোঝার চেষ্টা করার জন্য অনেক লোক অতীতের দিকে তাকিয়েছিলেন। ২০২০ সালের শুরুর দিকে অসংখ্য মিডিয়ায় ১৯১৮-১৯ সালের স্প্যানিশ ফ্লু মহামারি সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য প্রকাশ করা হয়। করোনাভাইরাসের সময়ের সঙ্গে সেই সময়ের তুলনা করা হয়। সে সময়ের সাহিত্যগুলো নিয়েও মানুষের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়। সাহিত্যের মাধ্যমে মানুষ সে সময়ের সামগ্রিক পরিস্থিতি উপলব্ধি করতে চেয়েছে।
মহামারি নিয়ে লেখা সাহিত্যে সমসাময়িক মানুষের জীবন, অর্থনীতি নিয়ে অনেক কিছুই জানা যায়। উদাহরণস্বরূপ ১৬৬৫ সালের লন্ডনের গ্রেট প্লেগের ওপর পার্সিভাল হান্টের ১৯৫৮ সালের প্রবন্ধটি রোগের অগ্রগতি এবং দৈনন্দিন জীবনে এর প্রভাব সম্পর্কে বিশদ বিবরণের জন্য স্যামুয়েল পেপিসের ডায়েরির (১৬৬০-৬৯) বিবরণের ওপর নির্ভর করেছিল।
প্যান্ডেমিক সাহিত্যগুলোতে বিভিন্ন জনপদের সম্মিলিত ভীতি এবং সাহসিকতার দেখা পাওয়া যায়। নতুন মহামারি আবিভর্‚ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রায়শই মহামারি নিয়ে সাহিত্য লিখতে লেখকদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়। ১৭২২ সালে ফ্রান্সে যখন প্লেগ দেখা দেয়, তখন ইংরেজ লেখক ড্যানিয়েল ডিফো ‘এ জার্নাল অব দ্য প্লেগ ইয়ার’ নামে একটি উপন্যাস লিখেছিলেন। সেই উপন্যাসটি ছিল ১৬৬৫ সালের লন্ডনের প্লেগের সময়কার একটি উপন্যাস। কোভিড-১৯ নিয়েও এখনকার লেখকরা অনেক বই লিখেছেন। ভবিষ্যতে আরও লিখবেন। নিচে মহামারি এবং মহামন্দা নিয়ে লেখা সর্বকালের সেরা কয়েকটি বই এক নজরে দেখে নেওয়া যেতে পারে।
১. শাটডাউন : হাউ কোভিড শক দ্য ওয়ার্ল্ডস ইকোনমি
করোনাভাইরাসের আবির্ভাবে বিশ্বজুড়ে যে শাটডাউন দেওয়া হয়েছিল সেটি অর্থনীতিতে কী প্রভাব ফেলেছে তা এই বইতে তুলে ধরেছেন ইংরেজ ইতিহাসবিদ অ্যাডাম টুজ। বইটি ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত হয়।
২. এ ডিকেড আফটার দ্য গ্লোবাল রিসেশন
২০০৯ সালের বিশ্বমন্দার দশম বার্ষিকী উপলক্ষে বইটি প্রকাশ করা হয়েছে। বইটির সম্পাদক ছিলেন এম. আয়হান কোস এবং ফ্রানজিস্কা ওনসর্গ।
৩. নেভিগেটিং পলিসি অ্যান্ড প্র্যাকটিস ইন দ্য গ্রেট রিসেশন
এটি একটি কাল্পনিক আখ্যান। একটি ছোট অলাভজনক সংস্থার সাহসী নির্বাহী পরিচালক মার্থা হোয়াইট বইটির কেন্দ্রীয় চরিত্র। মহামন্দার সময় এবং পরবর্তী বছরগুলোতে কীভাবে তার নেতৃত্বে সংস্থাটি পরিচালিত হয় তাই এই বইতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ২০১৮ সালে প্রকাশিত বইটি লিখেছেন স্টেসি বোরাস্কি এবং মিগুয়েল ফার্গুসন।
৪. ফোরটিন ডেজ : অ্যান আনঅথরাইজড গ্যাদারিং
করোনাভাইরাস মহামারির সময় লেখকদের আর্থিক সাহায্য করার জন্য সম্মিলিতভাবে লেখা একটি প্যান্ডেমিক নভেল ‘ফোরটিন ডেজ : অ্যান আনঅথরাইজড গ্যাদারিং’। যুক্তরাষ্ট্রের দ্য অথারস গিল্ড ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে বইটি লেখা হয়েছে।
২০২০ সালে ম্যানহাটানের ছাদে এই উপন্যাসের কাহিনির শুরু। সে সময় বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে। আর ধনীরা প্রাণভয়ে শহর ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে। এ রকম সময়ে বাসার ছাদে উঠে প্রতিবেশীরা একে অপরের সঙ্গে নিজেদের ব্যক্তিগত গল্প বলেন, এ ধরনের প্রেক্ষাপটে উপন্যাসটি লেখা হয়েছে।
জন গ্রিশাম, সেলেস্তে এনজি, ডায়ানা গ্যাবাল্ডন, ডেভ এগারস, টেস গ্যারিটসেন, এমা ডনাহিউ, অ্যাঞ্জি ক্রুজ, ইসমাইল রিড, মোনিক ট্রং, হ্যাম্পটন সাইডস, মেরি পোপ অসবর্নের মতো লেখকরা একত্রে এই উপন্যাসটি লিখছেন।
বুকারজয়ী কানাডার উপন্যাসিক, কবি মার্গারেট অ্যাটউড ফোরটিন ডেজ : অ্যান আনঅথরাইজড গ্যাদারিং উপন্যাসটি সম্পাদনা করছেন। এতগুলো লেখককে একত্রিত করতেও সাহায্য করেছেন তিনি। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত হয় এই প্যান্ডেমিক নভেলটি।
৫. দ্য আদার হাফ অব ম্যাক্রোইকোনোমিকস অ্যান্ড দ্য ফেট অব গ্লোবালাইজেশন
২০০৮-পরবর্তী মহামন্দা বা এর তীব্রতার মাত্রা সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করতে সরকার, একাডেমিয়া এবং বেসরকারি খাতের সিংহভাগ অর্থনীতিবিদের ব্যর্থতা এই পেশার জন্য গুরুতর বিশ্বাসযোগ্যতার সমস্যা উত্থাপন করেছে।
‘দ্য আদার হাফ অব ম্যাক্রোইকোনোমিকস অ্যান্ড দ্য ফেট অব গ্লোবালাইজেশন’ বইটি ব্যাখ্যা করে যে অর্থনীতিতে কী অনুপস্থিত ছিল এবং আজকের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলোর সঙ্গে পেশাটিকে প্রাসঙ্গিক করতে কী পরিবর্তন প্রয়োজন। উন্নত দেশগুলো স্থবিরতা এবং আয় বৈষম্যের মতো যে সমস্যাগুলোর সম্মুখীন হচ্ছে তা কাটিয়ে উঠতে নীতিনির্ধারকদের জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। ২০১৮ সালে প্রকাশিত বইটি লিখছেন রিচার্ড কু।
৬. দ্য ফরগটেন ম্যান : এ নিউ হিস্ট্রি অব দ্য গ্রেট ডিপ্রেশন
মার্কিন লেখক অ্যামিটি শ্লেসের লেখা বইটি ২০০৭ সালে হার্পারকলিন্স থেকে প্রকাশিত হয়। বইটি সাধারণভাবে মুক্ত বাজারের দৃষ্টিকোণ থেকে গ্রেট ডিপ্রেশনের ঘটনাগুলোর পুনঃবিশ্লেষণ করে।
৭. হাউ টু সারভাইভ দ্য করোনাভাইরাস রিসেশন
অর্থনৈতিক এবং স্বাস্থ্য উভয়ের দৃষ্টিকোণ থেকে আপনি কীভাবে করোনভাইরাসের ফলে সৃষ্ট মন্দা থেকে বাঁচতে পারেন তা বর্ণনা করা হয়েছে এই বইটিতে। লেখক রিউহো ওকাওয়া বলতে চেয়েছেন আপনার আধ্যাত্মিক স্বাস্থ্য এবং ইম্যুনিটি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার মধ্যে একটি দৃঢ় সম্পর্ক রয়েছে। এই বইতে একটি অত্যন্ত কার্যকরী ধ্যানের মাধ্যমে আপনি সত্যিকার অর্থে কীভাবে আপনার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে শক্তিশালী করতে পারেন তা তুলে ধরা হয়েছে।
৮. অব মাইস অ্যান্ড মেন
সাহিত্যে নোবেলজয়ী মার্কিন লেখক জন স্টাইনবেক অসাধারণ একটি নভেলা ‘অব মাইস অ্যান্ড মেন’। গত শতাব্দীর ত্রিশের দশকের আমেরিকান মহামন্দা বা গ্রেট ডিপ্রেশনের সময়ের জীবনকাল তুলে ধরা হয়েছে এই বইতে। ১৯২৯ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ এক দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক মন্দা সংঘটিত হয়েছিল। দেশটির শেয়ারবাজারে নেমেছিল ভয়াবহ ধস, যার প্রভাব পড়েছিল মার্কিনিদের ব্যক্তিগত জীবনে। ভয়াবহ এই মহামন্দার প্রভাব আমেরিকা ছাড়িয়ে পাশর্^বর্তী অঞ্চল ও ইউরোপেও ছড়িয়ে পড়েছিল। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৩৭ সালে হৃদয়স্পর্শী এই নভেলা লেখেন জন স্টাইনবেক।
৯. নাইটস অব প্লেগ
তুরস্কের নোবেলজয়ী লেখক ওরহান পামুকের লেখা ‘নাইটস অব প্লেগ’ উপন্যাসটি ২০২১ সালের মার্চে প্রকাশিত হয়। বিশ্ববাসী করোনাভাইরাস নামক অতিমারির বিরুদ্ধে যখন লড়াই করছে সে সময়ে ঐতিহাসিক আরেক অতিমারি প্লেগ নিয়ে উপন্যাসটি লিখেছেন তিনি। এই উপন্যাসের প্লট নিয়ে ৪০ বছর ধরে ভেবেছিলেন তিনি। অবশেষে করোনাভাইরাসের সময় এটি প্রকাশের উপযুক্ত সময় বলে মনে করেছেন পামুক।
নাইটস অব প্লেগ ঐতিহাসিক উপন্যাস। অটোমান সাম্রাজ্যের কাল্পনিক দ্বীপ মিঙ্গারের কথা এখানে বলা হয়েছে। ওই দ্বীপের গভর্নর, একজন ডাক্তার এবং আর্মির একজন মেজরের প্লেগের বিরুদ্ধে লড়াই করার কাহিনি এতে বর্ণনা করা হয়েছে।
১০. দ্য প্লেগ
নোবেলজয়ী ফরাসি লেখক আলবেয়ার কাম্যুর কালজয়ী উপন্যাস দ্য প্লেগ। ভ‚মধ্যসাগর তীরবর্তী আলজেরিয়ার শহর ওরানকে ঘিরে লেখা হয়েছে এই উপন্যাসের কাহিনি। ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে আলজেরিয়ার ওরানে বুবোনিক প্লেগ ছড়িয়ে পড়েছে। আর সেই মহামারির সঙ্গে লড়ছে মানুষ, এমন এক কাল্পনিক কাহিনির প্রেক্ষাপটে লেখা উপন্যাস দ্য প্লেগ। ১৯৪৭ সালের জুনে বইটি প্রকাশিত হয়।
এদিকে ২০২০ সালে বিশ্বজুড়ে যখন করোনাভাইরাস মহামারি ছড়িয়ে পড়ে, সে সময় কাম্যুর প্লেগ উপন্যাসটি নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়। ৭৩ বছর আগে প্রকাশিত বইটির সঙ্গে তৎকালীন পরিস্থিতি যাচাই করার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে বিশ্ববাসী। দ্য প্লেগের মধ্যে তারা করোনাভাইরাস মহামারিকে খোঁজার চেষ্টা করেন।
দ্য প্লেগ উপন্যাসে আলবেয়ার ক্যামু বোঝাতে চেয়েছেন দুর্যোগের সময় মানুষের আসল পরিচয় পাওয়া যায়। একটি কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রে এই উপন্যাসটিকে আরও নানাভাবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ আছে। উপন্যাসের শেষে কাম্যু লিখেছেন, পাঠক যেভাবেই এই প্লেগের জীবাণুর অর্থ করুক না কেন, এটির কোনো বিনাশ নেই, এটি কখনোই পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় না।