মন্দাকালে ইসলামের অর্থনৈতিক ভাবনা

মুফতি আবদুল হাকীম ওমর

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংখ্যা

পুরো বিশ্বেই ধেয়ে আসছে নানামুখী সংকট। করোনা মহামারি, যুদ্ধ-সংঘাত, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ভূমিকম্প একের পর এক আঘাত হানছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে।

2023-03-15T16:20:29+00:00
2023-03-15T16:20:29+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬,
১১ আষাঢ় ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংখ্যা
মন্দাকালে ইসলামের অর্থনৈতিক ভাবনা
মুফতি আবদুল হাকীম ওমর
প্রকাশ: বুধবার, ১৫ মার্চ, ২০২৩, ৪:২০ পিএম 
পুরো বিশ্বেই ধেয়ে আসছে নানামুখী সংকট। করোনা মহামারি, যুদ্ধ-সংঘাত, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ভূমিকম্প একের পর এক আঘাত হানছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। যার প্রভাব পড়ছে অন্যান্য দেশেও। সব মিলিয়ে এ বছর বিশ্ব অর্থনীতি খারাপ সময় পার করবে এমন পূর্বাভাস আগেই দিয়েছে বিভিন্ন গবেষণা সংস্থা। কিন্তু সংকট কতটা গভীর হবে সেটা নিয়েই উদ্বেগ ছিল সবার। কারণ পুরো বিশ্বের অর্থনীতি ভয়াবহ মন্দার দিকে ধাবিত হচ্ছে। 

বিশেষ করে উন্নত বিশ্বের এই মন্দার ধাক্কা উন্নয়নশীল বিশ্বেও পড়ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেছেন, নতুন বছরেই মন্দার কবলে পড়বে বিশ্বের অন্তত এক-তৃতীয়াংশ দেশ। যার প্রভাব পড়বে সারা বিশ্বে। যেসব দেশ মন্দার কবলে পড়বে না, সেসব দেশের সাধারণ মানুষও এর ধাক্কা অনুভব করবে। 

চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে আমাদের দেশেও। দুশ্চিন্তা বেড়েছে ক্ষুদ্র আয়ের মানুষ থেকে শীর্ষ ব্যাবসায়ী-উদ্যোক্তা পর্যায়েও। দুশ্চিন্তা ও অস্থিরতায় দিন কাটাচ্ছে মানুষ। সময় এসেছে ইসলামের আলোকে মন্দা মোকাবিলা শিক্ষা ও প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা করার। মানুষের ভেতর ধর্মানুভ‚তি স্বভাবজাত। তাই ইসলামের অর্থনৈতিক অধ্যায় এ সম্পর্কে কী বলে তা আলোচনা করা সময়ের দাবি। 

ইসলাম সবসময় মানুষকে আয় ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষার কথা বলে। চাই সেটা ব্যক্তিগত হোক, পারিবারিক হোক কিংবা রাষ্ট্রীয়। আরবিতে অর্থনীতি বোঝাতে ‘ইকতিসাদ’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়, যার অর্থ মধ্যপন্থা অবলম্বন করা। এ নামকরণ থেকেই আয়-ব্যয় সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট হয়। আমাদের দিকে ধেয়ে আসা মন্দা ও দুর্ভিক্ষ মোকাবিলায় এটা যে প্রাথামিক ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ, তাতে সবাই একমত। পাশাপাশি মন্দা মোকাবিলায় আমাদের সামগ্রিক অর্থনৈতিক চিন্তাভাবনাও যেন আল্লাহ তায়ালার হুকুম ও রাসুল (সা.)-এর আদর্শ অনুযায়ী হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা কর্তব্য।

অর্থনীতির ক্ষেত্রে ইসলামের মূল নির্দেশনা হচ্ছে আয় বুঝে ব্যয় করা। রাষ্ট্রের সব নাগরিক ও দায়িত্বশীল ব্যক্তির কর্তব্য আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা। অন্যথায় ব্যক্তিজীবনে যেমন বরকতহীনতা দেখা দেবে, তেমনি রাষ্ট্র পড়বে ক্ষতি ও হুমকির মুখে। তাই জাতীয় স্বার্থেই আমাদের আয় বুঝে ব্যয়ের মানসিকতা ব্যাপক করতে হবে। আয়-ব্যয়ের সামঞ্জস্যতা না থাকলে দরিদ্রতা এগিয়ে আসে। অনেক সময় ঋণগ্রস্ত হয়ে বাস্তুভিটাও হারিয়ে যেতে পারে। আয় বুঝে ব্যয় করার মাধ্যমে আয়-ব্যয়ের সামঞ্জস্যতা থাকলে সাধারণত অভাব আসে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি ব্যয়ের ক্ষেত্রে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করে, সে কখনো অভাবগ্রস্ত হয় না’ (মুসনাদে আহমাদ : ৪২৬৯)। 

আমরা আসন্ন মন্দা ও দুর্ভিক্ষ মোকাবিলায় পূর্বসতর্কতার শিক্ষা পাই পবিত্র কুরআন থেকে। প্রাচীন মিসরে নবী ইউসুফ (আ.)-কে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়ে এবং নির্দিষ্ট মেয়াদি অর্থব্যবস্থা সংরক্ষণের ঘটনা বর্ণনা করে আল্লাহ আমাদের সে শিক্ষাই দিয়েছেন। তৎকালীন মিসরের বাদশাহ এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলেন। কুরআনের ভাষায়, ‘বাদশাহ বলল, আমি স্বপ্নে দেখলাম, সাতটি মোটাতাজা গাভি; তাদের সাতটি শীর্ণ গাভি খেয়ে যাচ্ছে এবং সাতটি সবুজ শীষ ও অন্যগুলো শুষ্ক’ (সুরা ইউসুফ : ৪৩)। 

ইউসুফ (আ.)-কে আল্লাহ স্বপ্নের ব্যাখার ইলম শিক্ষা দিয়েছিলেন। স্বপ্নের ব্যাখ্যার জন্য ইউসুফ (আ.)-কে রাজদরবারে তলব করা হলো। তিনি বাদশাহর মুখের স্বপ্নের বিবরণ শুনেই বুঝে ফেললেন এবং আসন্ন দুর্ভিক্ষের কথা জানালেন। দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সচল রাখতে ভবিষ্যৎ বাজেট পরিকল্পনার একটি নকশা করে দিলেন। এ ঘটনায় খুশি হয়ে বাদশাহ তাকে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব দেন। পবিত্র কুরআনের সুরা ইউসুফে এ ঘটনা বিস্তারিত বর্ণিত হয়েছে।

মন্দাকালে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ যাপিত জীবনে অপচয় ও অপব্যয় এড়িয়ে চলা। একজন সচেতন মুসলিম হিসেবে সব ধরনের অপচয় ও অপব্যয় থেকে বেঁচে থাকার অর্থ হচ্ছে আল্লাহর নির্দেশ মান্য করা। পবিত্র কুরআনে অপচয়কারীকে ‘শয়তানের ভাই’ বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। বৈধ কাজে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যয় করাকেই ইসলামে ইসরাফ বা অপচয় বলা হয়। আর অবৈধ কাজে ব্যয় করা হলো তাবযির বা অপব্যয়। দুটোই ইসলামে দোষণীয় ও নিষিদ্ধ। 

আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা আহার করবে ও পান করবে। কিন্তু অপচয় করবে না। তিনি অপচয়কারীকে পছন্দ করেন না’ (সুরা আরাফ : ৩১)। আরও বলেন, ‘তোমরা কিছুতেই অপব্যয় করবে না। যারা অপব্যয় করে তারা শয়তানের ভাই, আর শয়তান তার প্রতিপালকের প্রতি অতিশয় অকৃতজ্ঞ’ (সুরা ইসরা : ২৬-২৭)। আসন্ন মন্দা মোকাবিলা করতে সব ধরনের অপচয় ও অপব্যয়মূলক ব্যয় বন্ধ করা নিশ্চিত করতে হবে। ব্যক্তিজীবনে তো বটেই, পারিবারিক ও রাষ্ট্র্রীয় পর্যায়েও সব ধরনের অপচয় থেকে বেঁচে থাকতে হবে।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অস্থিরতা সৃষ্টির অন্যতম একটি কারণ দুর্নীতি; যা রাষ্ট্রে অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি করে এবং অর্থনৈতিক স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ ক্ষুণ্ন করে। তাই সর্বতোভাবে দুর্নীতি দমন করতে হবে। আল্লাহর দরবারে ইবাদত কবুল হওয়ার জন্য ঈমান-ইখলাসের পাশাপাশি লেনদেনে স্বচ্ছতা জরুরি। দুর্নীতি ও আর্থিক পাপের মাধ্যমে ইবাদত বিনষ্ট হয়। যেমন অন্যায়ভাবে অন্যের সম্পদ গ্রাস করা বা জবর দখল করা, এতিমের মাল ভক্ষণ করা, ঋণ পরিশোধ না করা, অন্যের প্রাপ্ত অধিকার প্রদান না করা, চুরি বা সন্ত্রাসী করে অন্যের মাল ভোগ করা, সরকারি সম্পদের যথার্থ ব্যবহার না করা ইত্যাদি। 

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমরা কি জান প্রকৃত দরিদ্র কে?’ সাহাবায়ে কেরাম বললেন, আমাদের মধ্যে দরিদ্র ওই ব্যক্তি যার কোনো অর্থ ও সম্পদ নেই। রাসুল (সা.) বললেন, ‘আমার উম্মতের মধ্যে দরিদ্র ওই ব্যক্তি যে কেয়ামতের দিন নামাজ, রোজা, জাকাত নিয়ে আসবে। সে আরও নিয়ে আসবে অন্যকে এই পরিমাণ গালি দিয়েছে, এই পরিমাণ মিথ্যা অপবাদ দিয়েছে, এই পরিমাণ সম্পদ খেয়েছে, এই পরিমাণ রক্ত প্রবাহিত করেছে, অন্যকে এই পরিমাণ প্রহার করেছে। তার নেকি থেকে এই পরিমাণ ক্ষতিগ্রস্তকে প্রদান করতে হবে। তার দায় শেষ হওয়ার আগেই তার নেকি শেষ হয়ে যাবে। তখন ক্ষতিগ্রস্তদের পাপ থেকে এই পরিমাণ নিয়ে তার ওপর নিক্ষেপ করা হবে। অবশেষে সে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে’ (মুসলিম : ৬৭৪৪)।

সমাজের সব মানুষ সমান অর্থসম্পন্ন হয় না। সমাজের কেউ ধনী হয়, কেউ গরিব হয়। উভয় শ্রেণির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার জন্য ইসলাম দিয়েছে জাকাত ব্যবস্থা। তাই জাকাত ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি। ইসলামের অন্যতম মৌলিক আর্থিক ইবাদত জাকাত। সম্পদশালী মুসলিম নর-নারী বছরান্তে তার সম্পদের ৪০ ভাগের একভাগ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য প্রদান করতে হয়। পৃথিবীর সব মানুষের মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য যা দরকার আল্লাহ তা সৃষ্টি করেছেন। সুষম বণ্টনের অভাবে ধনী ও গরিবের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি হয়। জাকাত এই বৈষম্য দূর করে সুষম বণ্টনের মাধ্যমে সামঞ্জস্যপূর্ণ অর্থব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করে। জাকাত প্রদান করা বাধ্যতামূলক করে সে অর্থ গরিব, অসহায় ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর হাতে পৌঁছে দিলে একদিকে জাকাত আয়ের একটি উৎস হবে, অন্যদিকে ক্রমান্বয়ে দারিদ্র্যের হার কমতে থাকবে।

সর্বোপরি মন্দা মোকাবিলায় বাহ্যিক উপায় উপকরণ গ্রহণের পাশাপাশি প্রত্যেকে আল্লাহর কাছে দোয়া করা। রোনাজারি করে আল্লাহর কাছে সংকট থেকে নাজাত কামনা করা।  কোরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে- ‘আপনি বলুন, কে তোমাদের স্থল ও জলের অন্ধকার থেকে উদ্ধার করেন, যখন তোমরা তাকে বিনীতভাবে ও গোপনে আহ্বান করো যে, যদি আপনি আমাদেরকে এ থেকে উদ্ধার করেন, তবে আমরা অবশ্যই কৃতজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব। 

আপনি বলে দিন, আল্লাহ তোমাদের তা থেকে মুক্তি দেন এবং সব দুঃখ ও বিপদ থেকে। তথাপি তোমরা শিরক করো’ (সুরা আনআম : ৬৩-৬৪)। অন্য আয়াতে এরশাদ হয়েছে- ‘অতঃপর আমি তার আহ্বানে সাড়া দিলাম এবং তাকে দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দিলাম। আমি এমনিভাবে ঈমানদারদের মুক্তি দিয়ে থাকি’ (সুরা আম্বিয়া : ৮৮)। দোয়া করার আগে আমরা দুই রাকাত সালাতুল হাজত পড়ে নিতে পারি। সুনানে আবু দাউদের এক হাদিসে এসেছে, রাসুল (সা.)-এর সামনে যখন গুরুতর কোনো বিষয় আসত, তিনি নামাজে দাঁড়িয়ে যেতেন (আবু দাউদ : ১৩১৯)। মহান আল্লাহ সবাইকে বোঝার ও আমল করার তওফিক দিন। পাশাপাশি মিনতি জানাই, আমাদের সব ধরনের বিপদ, খরা ও জরা থেকে হেফাজত করুন এবং তার নির্দেশ মতো জীবন সাজানোর তওফিক দিন।

লেখক : শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক।



Loading...
Loading...
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংখ্যা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: