বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। আয়তনের দিক থেকে ৯৪তম এবং জনসংখ্যার দিক দিয়ে অষ্টম বৃহত্তম দেশ। ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও পুষ্টিহীনতা আমাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। ১৯৭২ সালে যখন আমাদের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে ৭ কোটি তখনও আমাদের খাদ্য ঘাটতি ছিল প্রায় ৫০ লাখ মেট্রিকটন। আজকে ২০২৩ সালে আমাদের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ১৭ কোটি। কিন্তু আজ আমাদের খাদ্য ঘাটতি নেই, বিশেষ করে চালে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ। শুধু চালই নয়, গত ৫০ বছরে এ দেশের কৃষিতে ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। আমাদের প্রধান ফসলগুলোযেমন-ধান, পাট, সবজি, আলু, আম, কাঁঠাল, পেয়ারা, কলা ইত্যাদিতে আমরা পৃথিবীর প্রথম ১০টি দেশের একটি। তা ছাড়া মৎস্য উৎপাদনে আমরা তৃতীয় বৃহত্তম উৎপাদক।
জিডিপিতে কৃষির অবদান প্রায় ১২ শতাংশ হলেও জাতীয় অর্থনীতিতে কৃষির ভূমিকা অনস্বীকার্য। এখনও ৪০ শতাংশের বেশি জনগণ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। গ্রামীণ অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তিই হলো কৃষি। বিগত ৫০ বছরে আমাদের কৃষির সাফল্যের মূলে হচ্ছে কৃষিতে আধুনিকায়ন, কৃষিতে সেচ সুবিধা বৃদ্ধি, কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণ, রাসায়নিক সারের ব্যবহার বৃদ্ধি, নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং তা কৃষক পর্যায়ে সম্প্রসারণ, কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কৃষিবান্ধব নীতিমালা, উৎপাদন বৃদ্ধিতে সরকারি ভর্তুকি বৃদ্ধিকরণ, উৎসাহী এবং কর্মঠ কৃষক, মানসম্পন্ন বীজের ব্যবহার বৃদ্ধিসহ সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ। বিগত ৫০ বছর সরকারি এবং বেসরকারি খাতের গৃহীত কর্মসূচির ফলে আজকে আমাদের কৃষিতে প্রভূত উন্নতিসাধিত হয়েছে। আমাদের কৃষিতে উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও একদিকে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, অন্যদিকে ক্রমহ্রাসমান ভূমি, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন, রোগ, পোকামাকড় ইত্যাদির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের ২০৫০ সালের মধ্যে উৎপাদন দ্বিগুণ করতে হবে। যা আমাদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য নিম্নলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে।
# ক্রমহ্রাসমান কৃষিজমিতে উৎপাদন বাড়িয়ে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
# ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা মেটাতে উৎপাদনশীলতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। জমির উর্বরাশক্তি সংরক্ষণের মাধ্যমে উৎপাদন নিশ্চিত করতে কর্মসূচি গ্রহণ করা।
# শস্য বহুমুখীকরণের মাধ্যমে জমির স্বাস্থ্য সুরক্ষাসহ ভোক্তার চাহিদা পূরণে কর্মসূচি গ্রহণ করা।
# আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে আনতে ভোজ্য তেল জাতীয় ফসল সরিষা, সূর্যমুখী, তিল এবং মসলা জাতীয় ফসল পেঁয়াজ, রসুন, আদা ইত্যাদির চাষ উৎসাহিত করা ।
# নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহ নিশ্চিত করতে কৃষক প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামো সুবিধা বৃদ্ধি করা পতিত জমি এবং এক ফসলি জমিতে শস্য নিবিড়তা বৃদ্ধি করে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধিতে কার্যকরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা ।
# নিরাপদ এবং পুষ্টিকর খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিতকরণে তদারকি জোরদার করাসহ উত্তম কৃষিচর্চাকে (GAP) উৎসাহিত করা ।
# ফসলের অপচয় রোধকল্পে আধুনিক পোস্ট হারভেস্ট প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ করা।
# ফসলের উপযুক্ত মূল্য নিশ্চিতকরণে বাজারব্যবস্থার উন্নতিকরণ এবং ফসল সংরক্ষণ সুবিধা বৃদ্ধিসহ কৃষিপণ্য পরিবহন ব্যবস্থা উন্নত করা।
# কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে উৎসাহিত করতে বিশেষ প্রণোদনা প্রদান করা।
জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব হতে কৃষিকে রক্ষার্থে প্রতিঘাত সহিষ্ণু প্রযুক্তি উদ্ভাবনে গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা।
# কৃষিপণ্য রফতানিকে উৎসাহিত করা এবং অ্যাক্রিডিটেড (Accredited) ল্যাব স্থাপনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
# পোস্ট হারভেস্ট ম্যানেজমেন্ট, সংরক্ষণ, পরিবহন ইত্যাদি খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে উৎসাহিত করা।
# কৃষিকে আধুনিকায়ন, বাণিজ্যিকীকরণ ও যান্ত্রিকীকরণে উৎসাহিত করা।
# প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের জন্য শস্য বীমা চালু করা।
কৃষিকে লাভজনক করতে এবং কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণে সমবায়ভিত্তিক কৃষি কমিউনিটি অ্যাপ্রোচকে উৎসাহিত করা।
# জৈবসার ও জৈব বালাইনাশক ব্যবহারে কৃষককে উৎসাহিত করা।
# আগামীদিনের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে কৃষি গবেষণার অত্যাধুনিক প্রযুক্তি বিশেষ করে বায়োফর্টিফিকেশন, জিন অ্যাডিটিং, বায়োটেকনোলজি, ন্যানোটেকনোলজি ইত্যাদি গবেষণাকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
# বাণিজ্যিক কৃষি বাস্তবায়নে উদ্যোক্তাদের সহজশর্তে কৃষি ঋণপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা।
# সরকারের ধান, গম ও পাট সংগ্রহ নীতিমালা/পদ্ধতি সহজীকরণ করে কৃষকের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্ত নিশ্চিত করা।
# দেশে উন্নতজাতের পাটবীজের উৎপাদন বৃদ্ধি করে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে আনা।
আমাদের কৃষির সাফল্য আজ সর্বজনস্বীকৃত। খাদ্য ঘাটতির বাংলাদেশ আজ খাদ্যে উদ্বৃত্ত বাংলাদেশ। আমাদের কৃষ্টি, আমাদের সংস্কৃতি কৃষিনির্ভর। কৃষি আজ আমাদের অহংকার, আমাদের গর্ব। আগামীদিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তাই কৃষিকে দিতে হবে সর্বাধিক গুরুত্ব। সরকারি নীতিমালা, বাজেটসহ জাতীয় অর্থনীতির প্রতিটি স্তরেই কৃষিকে প্রাধান্য দিতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে আমাদের খাদ্য আমাদেরই উৎপাদন করতে হবে। তাই কৃষি ও কৃষকের জন্য সব রকম সহযোগিতা বৃদ্ধি করতে হবে।
সাবেক সচিব, কৃষি মন্ত্রণালয়। উপদেষ্টা, বাংলাদেশ সীড অ্যাসোসিয়েশন