কিছুটা দক্ষিণ-পূর্ব আবার সুদূর পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে একটা ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে। আর তা হলো, গণতন্ত্র ও উন্নয়নের মধ্যে বাণিজ্য বন্ধের দাবি ভুল। কিন্তু আমরা বাংলাদেশের অর্থনীতির যে বাস্তবতা দেখি তা হলো, কাঠামোগত ত্রুটির সংকট। একটু গভীরভাবে বিবেচনা করলে দেখা যায় আমাদের এখানে আসলে অবস্থাটা কী হয়েছিল? যা হয়েছিল তা হলো, অর্থনীতির মেরুদণ্ড কাঁপিয়ে দিয়েছে। প্রচলিত নিয়মে অর্থনীতির তিনটি ইউনিট থাকে। একটি হচ্ছে পরিবার, দ্বিতীয়টি হচ্ছে সংস্থা আর তৃতীয় হচ্ছে রাষ্ট্র।
রাশিয়া-ইউক্রেন দ্বন্দ্ব শুরু হয় কোভিড-১৯ মহামারি সম্পূর্ণ শেষ হওয়ার আগেই। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যায়। জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় বেড়েই চলেছে। এতে মানুষের মনে ভয় জাগাচ্ছে। আশঙ্কা রয়েছে দেশের অর্থনীতি ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাওয়া। সম্ভবত স্ট্রেস অবস্থায় পা রাখবে। সেই চাপ মূলত সংকটের দিকে নিয়ে যাবে।
করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার কারণে সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে ব্যাপক ব্যবধান তৈরি হয়। চাহিদার ব্যাপক পতনের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি মন্দায় পড়ে। সরবরাহ এখনও পুরোপুরিভাবে শৃঙ্খলায় আসেনি। যে কারণে পণ্য ও সেবার দাম বৃদ্ধি পেতে থাকে।
বাংলাদেশে কী হয়েছে তা একটু দেখে আসি। ইউক্রেন সংঘাতের ছয় মাস থেকেই বাংলাদেশে মজুদ কমতে শুরু করে। কমে যায় বৈদেশিক মুদ্রা। রেমিট্যান্সের ওপর দারুণভাবে প্রভাব পড়ে। গত বছরের জানুয়ারি মাসে বৈদেশিক মুদ্রার পরিমাণ ছিল ৪৫ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলার। চলতি বছরের জানুয়ারিতে তা কমে দাঁড়ায় ৩৩ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলার। এই বৈদেশিক মুদ্রার কমে যাওয়া বন্ধ করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়। কিন্তু তা আর সামাল দেওয়া সম্ভব হয়নি। যে রিজার্ভ ছিল তাতে সাড়ে তিন মাসের আমদানি ব্যয় করা সম্ভব।
মধ্যবিত্তদের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। আর নিম্ন ও বাঁধাধরা আয়ের পরিবারগুলো দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উল্লেখযোগ্য হারে মজুরি কমে যাওয়ার কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় অস্বস্তির মধ্যে পড়ে যায়। বিশেষ করে যারা অনানুষ্ঠনিক খাতে রয়েছে।
গত অর্থবছরে বাংলাদেশে মজুরি বৃদ্ধি সাত বছরের সর্বনিম্ন নেমে এসেছে। আর প্রকৃত মজুরি কমে যাওয়ায় বেশিরভাগ মানুষ তাদের যা কিছু সঞ্চয় ছিল, তা-ও ভেঙে ফেলেছে। সঞ্চয় ভেঙে সংসার চালাচ্ছে। কেউ কেউ আবার দৈনন্দিন খরচের জন্য ধারদেনা করছে। এক পর্যায়ে অনেকে ঋণ চাওয়ার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলতে পারে। তাদের দারিদ্র্যসীমার নিচে ঠেলে দিতে পারে।
অর্থনীতি নতুনভাবে চালু হলেও বাংলাদেশে নতুন দরিদ্র সংখ্যা কিন্তু কমেনি। মুদ্রাস্ফীতিজনিত কারণে অনেকেই প্রয়োজন অনুযায়ী খাবার কিনতে পারছে না। খাদ্য গ্রহণ কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। এমনকি পুষ্টি গ্রহণের ক্ষেত্রে একই পথ অনুসরণ করেছে। কেউ কেউ খাদ্যবহির্ভূত ব্যয় কমিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছেন। বিশেষ করে চিকিৎসা আর শিক্ষায় ব্যয় কমিয়ে ফেলেছেন।
বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ-এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু কৃষির উপকরণের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। যে কারণে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কমে গেছে। আর প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে আগামী বছর কৃষি উৎপাদন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
সরকারের পরিসংখ্যান অনুয়ায়ী দারিদ্র্যের হার প্রাক-কোভিডের ২০ শতাংশ থেকে ২৯ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে। কিন্তু দারিদ্র্যের এই বৃদ্ধি ও মধ্যবিত্তের পতন অর্থনৈতিক মন্দার দৃশ্যমান অংশ মাত্র। আসলে উদ্বেগের বিষয় হলো, স্বল্পমেয়াদে সংকট ব্যবস্থাপনা। আর মধ্যমেয়াদে পুনরুদ্ধার ব্যবস্থাপনার অগ্রগতির অভাব।
আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের অবমূল্যায়ন ও পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে ব্যবসায়ীরা ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। দাম বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কোম্পানিগুলোর ব্যাংক ঋণের পরিমাণ বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ১৩ দশমিক ৯৭ শতাংশে পৌঁছেছে, যা প্রথমবারের মতো কয়েক বছরের লক্ষ্য অতিক্রম করেছে। কয়েক বছরে লক্ষ্য ছিল ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ। আর যা একই সময়ের মধ্যে ১০ দশমিক ১১ শতাংশ ছিল। অন্যদিকে ব্যাংকিং খাতে আমানতের প্রবৃদ্ধি প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। গত অর্থবছরের জুলাই থেকে অক্টোবরের তুলনায় চলতি অর্থবছরের একই সময়ে আমানত কমেছে ১৮ হাজার ৯৮২ কোটি টাকা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্থির সর্বোচ্চ সুদের হার ৯ শতাংশ থাকা সত্ত্বেও সেই হারে সাত দিনের মেয়াদি আমানত মুদ্রাবাজারে পাওয়া যায় না। ব্যাংকগুলোর তাদের ক্যাশ ডিপোজিট রিজার্ভ অনুপাতও বেশি। আর বিধিবদ্ধ আমানত অনুপাত বজায় রাখার জন্য উচ্চহারে তারল্য ধার করতে বাধ্য হয়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যার ফলে মুদ্রাবাজারের ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকের ওপর নিয়ন্ত্রণ আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
পুনরুদ্ধারের অনেক পথ থাকা সত্ত্বেও বড় খেলাপি ঋণের ব্যাপারে তেমন কোনো অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়নি। গত ১০ মাসে দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে তিনগুণের বেশি। চলতি অর্থবছরে অর্থাৎ ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রথম তিন মাসে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা। ২০১২ সালে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৪২ হাজার ৭২৫ কোটি টাকা।
বাণিজ্য দুর্বলতা আর অন্যান্য চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে হয়, উন্নত দেশগুলো মুদ্রাস্ফীতি লাগাম টেনে ধরার জন্য সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে। অর্থনীতিগুলো মন্দার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় মন্দার আশঙ্কা করছেন রফতানিকারকরা। একই সময়ে গত অর্থবছরের নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি প্রত্যক্ষ করার পর রেমিট্যান্সের প্রবাহ আশাব্যঞ্জক নয়। ফলে সার্বিক ভারসাম্যসহ ৫ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন চলতি হিসাবের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
বছরের পর বছর বলা হচ্ছে, নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচিকে জীবিকার সংকট কাটিয়ে ওঠার জন্য একটি সমন্বিত প্রশাসনিক ছাতার আওতায় আনা উচিত। যারা সফলভাবে জাতীয় পরিচয়পত্র কার্ড করেছেন তাদের একটি জাতীয় জনসংখ্যা ডাটাবেজ তৈরি করা বাধ্যতামূলক হবে। আর এই ডাটাবেজ ধরে যেন কর্মসূচিগুলো সম্মিলিতভাবে ব্যাপকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা যায়।
বর্তমানে অর্থনীতি দীর্ঘ নিম্নমুখী চাপের মধ্যে রয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী নিম্নমুখী ঝুঁকি মোকাবিলা করতে চ্যালেঞ্জগুলোর গুরুত্ব স্বীকার করতে হবে। আত্মতুষ্টি থেকে দূরে যেতে হবে। চাপের পয়েন্টগুলো চিহ্নিত করতে হবে। কার্যকর ও বাস্তবায়নযোগ্য কৌশল তৈরি করতে হবে।
সংকেত যেতে হবে দীর্ঘস্থায়ী নিম্নমুখী চাপ মোকাবিলার জন্য। প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। সিদ্ধান্তটি হবে সম্পূর্ণরূপে রাজনৈতিক। তবে রাজনৈতিক নিষ্পত্তিতে একটি ভুল পদক্ষেপ সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।
বাংলাদেশ তার বর্তমান উন্নয়নের গতিপথে নেতৃত্বাধীন মডেলের ওপর নির্ভর করে চলতে থাকলে আগামী ভবিষ্যতে মন্থর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাক্ষী হতে পারে। এই ধরনের পথ ক্রমবর্ধমান বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে তুলবে। প্রবৃদ্ধি মূলত ভোগের দ্বারা পরিচালিত হয়েছে। সঞ্চয় ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির কারণে নয়। এটা উন্নয়নের টেকসই পথ নয়।
প্রবৃদ্ধির পেছনে চালিকাশক্তি হলো অভিবাসী শ্রমিকরা। যেখানে প্রান্তিক এলাকার মহিলা ও কৃষকদের বেশি মাত্রায় অংশগ্রহণ রয়েছে। যারা তাদের সবুজ ফসলের জমিতে অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছে।
ভোগ নেতৃত্বাধীন বৃদ্ধি সার্বিক চাহিদা বাড়ানোর জন্য উচ্চ ভোক্তাব্যয়ের ওপর নির্ভর করে। অন্যদিকে বিনিয়োগ নেতৃত্বাধীন বৃদ্ধি নতুন উৎপাদন ক্ষমতা তৈরি করে। এটি কর্মসংস্থান ও উচ্চ চাহিদা তৈরি করে। যদি উন্নয়নশীল দেশ একটি ভোগভিত্তিক হয়ে ওঠে আর আমদানি চাহিদা খুব বেশি হয় তা হলে কর্মসংস্থানের বৃদ্ধির বিষয়টি ধীর হয়ে যায়। শ্রমশক্তির বেশিরভাগ অনানুষ্ঠনিক খাতের ওপর নির্ভর করে। যার বাইরের ধাক্কা সহ্য করার ক্ষমতা কম। শেষমেশ এই ধরনের আমদানির চাপ দেশের পেমেন্টের ভারসাম্যে সমস্যা সৃষ্টি করে। যেমনটি হয়েছে বাংলাদেশে।
কৃষি উৎপাদনশীলতা কমে গেছে। কারণ জমির মালিকরা বেশিরভাগ কৃষক ছাড়া চাষাবাদ করছে না। বরং বন্ধক রাখছে। কারণ জমিকে মূল্য ও মর্যাদার ভান্ডার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ফসলের জমির সঙ্গে জড়িত ক্ষুদ্র মালিকরা জমি কিনতে পারে না। আর জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে জমি সংকুচিত হচ্ছে বা কয়েক ভাগে বিভক্ত হচ্ছে।
প্রচলিত ভূমি সংস্কার ও ক্ষুদ্র কৃষকনীতি ছোট আকারের অস্বস্তি। সম্মিলিত চাষে যাওয়ার বিষয়টি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। দেশে উৎপাদনে নেতিবাচক কর্মসংস্থান সৃষ্টির সঙ্গে অকালেই শিল্পমুক্তকরণ শুরু হয়েছে। শিল্পায়নের ফলে অনানুষ্ঠানিকীকরণ হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে বৃদ্ধির জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। পরিবতর্নশীল পথ হিসেবে শিল্পায়নের জন্য একটি কৌশলগত দিকনির্দেশনা প্রয়োজন। এতে উৎপাদনে কর্মসংস্থানের স্তর ও ভাগ জিডিপিতে মূল্য সংযোজন বৃদ্ধি করবে।
কোভিড-১৯ মহামারি বাংলাদেশি সমাজের কাঠামোতে তার অর্থনীতির সংকোচনের বাইরে ফাটল প্রকাশ করেছে। স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মতো জনসাধারণের পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত ত্রুটিগুলো সমাজকে আরও মেরুকরণ করেছে। এসব ফাটল এড়াতে সর্বজনীন একটি কৌশল প্রয়োজন।
শিক্ষক : ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়