এ বছর জানুয়ারিতে দাভোসে বসেছিল ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বার্ষিক সম্মেলন। উদ্বোধনী দিনে যুক্তরাজ্যভিত্তিক বেসরকারি সাহায্য সংস্থা অক্সফাম একটি প্রতিবেদন হাজির করে। এর নাম দেওয়া হয়েছিল ‘সারভাইভাল অব দ্য ফিটেস্ট’। এই শিরোনাম আমাদের সামনে এক নির্মম সত্যকে প্রকাশ্যে আনে। সত্যটি হলো, এই পৃথিবীতে কেবল মুষ্টিমেয় ধনী মানুষের টিকে থাকার বাস্তবতা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে দিনকে দিন। বাকি সবার জন্য হাজির হচ্ছে বিলুপ্ত হওয়ার বাস্তবতা। এই বাকি সবাই বলতে কেবল মনুষ্যপ্রজাতি নয় কিন্তু। হিউম্যান-সেন্ট্রিক ইতিহাস-বাস্তবতার বাইরে এসে এই সবাই বলতে আমি পৃথিবীর লাখো কোটি বৈচিত্র্যময় প্রাণের কথা বলছি। এদের সবার ধ্বংস হওয়ার বাস্তবতা তৈরি করছে বিশ্ব জুড়ে আধিপত্যকারী রাক্ষস পুঁজি। পৃথিবীটাকেই গিলে খেতে বসেছে নব্য রাক্ষসরা।
অক্সফামের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০ সালের পর সারা বিশ্বে যত সম্পদ তৈরি হয়েছে, তার দুই-তৃতীয়াংশই গেছে বিশ্বের শীর্ষ ১ শতাংশ ধনীর পকেটে। অবশিষ্ট এক-তৃতীয়াংশ সম্পদ বণ্টিত হয়েছে বিশ্বের বাকি ৯৯ শতাংশ মানুষের মধ্যে। এখানেই শেষ নয়। বিগত এক দশকে সৃষ্ট সম্পদের অর্ধেকের মালিক হয়েছেন শীর্ষ ১ শতাংশ ধনী। একদিকে সম্পদ যখন মুষ্টিমেয় মানুষের কুক্ষিগত হতে থাকে, একই সেই কারণে এর বিপরীতে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বঞ্চনা আর দারিদ্র্যও বাড়তে থাকে। অক্সফামের হিসাবে, বিশ্বে তৈরি হওয়া সম্পদ থেকে সমাজের নিচের দিকের ৯০ শতাংশ মানুষের ১ ডলার আয়ের বিপরীতে বিলিয়নিয়ারদের আয় ১৭ লাখ ডলার।
২০২০ সালে করোনা অতিমারিকে ব্যবসার উপাদান বানিয়ে দানবীয় পুঁজির প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো ফুলেফেঁপে উঠেছিল। আর ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধের সুযোগ নিয়ে মুনাফার পাহাড় গড়েছে জ্বালানি ও তেল উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলো। অক্সফামের হিসাবে গত বছর ৯৫টি খাদ্য ও জ্বালানি কোম্পানি স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে দ্বিগুণ মুনাফা করেছে। গত বছর তাদের সম্মিলিত মুনাফার পরিমাণ দাঁড়ায় ৩০৬ বিলিয়ন বা ৩০ হাজার ৬০০ কোটি ডলার। এর মধ্যে ২৫ হাজার ৭০০ কোটি ডলার তারা শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে লভ্যাংশ হিসাবে বিতরণ করেছে। এখানে যুদ্ধজনিত রক্তপাতকে মুনাফার উপাদান করা হয়েছে।
তো কয়েকজন মানুষের এসব মুনাফাবাজি আর ফুলেফেঁপে ওঠার বাস্তবতার বিপরীতেই রয়েছে বিশ্ব জুড়ে কোটি কোটি মানুষের বঞ্চনা আর বিপন্নতার আখ্যান। মহামারি আর যুদ্ধ যেমন করে মুষ্টিমেয় মানুষকে আঙুল ফুলে কলাগাছ বানাতে পেরেছে, তেমনি করেই বিশ্বব্যাপী হাজির করতে সক্ষম হয়েছে মন্দামুখী পরিস্থিতি। আমরা কি মন্দার মধ্যে রয়েছি? মন্দায় যাচ্ছি? অর্থনীতির একাডেমিক আলাপ যা-ই বলুক না কেন, বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি যে ভয়াবহ সংকট অতিক্রম করছে, তা বুঝতে বাকি নেই কারও। নব্য উদারবাদী বাজারের অপরিহার্য অঙ্গপ্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) গত বছর অক্টোবরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে আভাস দিয়েছে বাংলাদেশসহ বিশ্বের সব দেশের অর্থনীতিতে মন্দা আসন্ন। রেকর্ড মুদ্রাস্ফীতি, কঠোর নীতি, ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসন আর নিরন্তর কোভিড অতিমারি মিলিয়ে বিশ্বজুড়ে ক্ষুধার্ত মানুষ বাড়িয়েছে। বাড়িয়েছে স্বল্পোন্নত দেশের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়। বিশ্বের ৩ বৃহৎ অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও চীনও এই মন্দার অভিঘাতে ভুগবে বলে আভাস দেওয়া হয়েছে প্রতিবেদনে। আরও খারাপ কিছুরও আভাস দিয়েছে ওই রিপোর্ট। তারা বলছে, গত ২০২১-২২ অর্থবছরে যেখানে ৩.২ শতাংশ বৈশি^ক প্রবৃদ্ধি হয়েছিল, ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা কমে ২.৭ শতাংশ হতে পারে।
আফ্রিকার সিয়েরা লিয়ন, সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক, কঙ্গো, শাদ, হাইতির ক্ষুধার কথা বাদই থাক। ওরা তো না-মানুষ পর্যায়ের, রোমান আইনের সেই হোমো-সাকের কিংবা অভিশপ্ত; যাদের মানুষ বিবেচনা করা হতো না। চাইলেই হত্যা করা যেত, তবে পুণ্যকাজে বলি দেওয়া যেত না। এশিয়ার ইয়েমেন, আফগানিস্তানসহ ক্ষুধার সংকট অতীতের থেকেও বেশি করে জেঁকে বসেছে খোদ পাশ্চাত্য দুনিয়াতেও। ইউরোপের মানুষ শীতে কাঁপছে, শীত কাপড়ের অভাবে। খোদ যুক্তরাজ্যে ২-৩টির বেশি টমেটো কিনতে পারছে না মানুষ। না খেয়ে থাকা মানুষের সংখ্যা বাড়ছে সেখানে ক্রমাগত। পাকিস্তান-শ্রীলঙ্কার কথা বাদই দিলাম। আর আমাদের এই বাংলাদেশেও মূল্যস্ফীতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে জীবনযাত্রা দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়াচ্ছে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্যও। খাবার জোটাতে না পেরে আফগানদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিক্রির মতো খবরও পড়তে হয়েছে আমাদের।
জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত ১৯৩টি দেশ ২০৩০ সালের মধ্যে ক্ষুধামুক্ত বিশ্ব গড়ার অঙ্গীকার করে একটি চুক্তি সই করেছে। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছে : ‘ক্ষুধামুক্ত বিশ্ব, খাদ্য নিরাপত্তা অর্জন ও পুষ্টিমান উন্নত করা এবং টেকসই কৃষির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। জাতিসংঘ বলছে, ২০১৫ সালে এই লক্ষ্য নির্ধারণের পর থেকে ধারাবাহিকভাবে ক্ষুধা বাড়ছে। সুতরাং বিশ্ব ক্ষুধামুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে যথাযথ পথে নেই। সাম্প্রতিক পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা ৮৪ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। ২০২১ সালের জুলাই মাসে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির নির্বাহী পরিচালক ডেভিড ব্যাসলে জানান, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বকে ক্ষুধামুক্ত করতে প্রতি বছর ৪০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে হবে। এদিকে সুইডেনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১ সালে বৈশ্বিক সামরিক ব্যয় প্রথমবারের মতো ২ ট্রিলিয়নের মাইলফলক পেরিয়ে ২১১৩ বিলিয়নে গিয়ে ঠেকেছে, যা ২০২০-এর তুলনায় ০.৭ শতাংশ বেশি। ২০২২ সালের পরিসংখ্যান এখনও প্রকাশ হয়নি। নিঃসন্দেহে ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে সেই ব্যয় আরও বেড়েছে। এখন বিশ্ব এক বছরে (২০২১ সালে) সামরিক খাতে যদি ২ হাজার ১১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ করে আর ২০৩০ পর্যন্ত প্রতি বছর ৪০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে যদি ক্ষুধামুক্তি সম্ভব হয়, তা হলে হিসাব কষে দেখা যাচ্ছে, সারা বিশ্ব সামরিক খাতে যা খরচ করছে তার মাত্র ১.৯ শতাংশ খরচ করে বিশ্বকে ক্ষুধামুক্ত করা সম্ভব। কিন্তু সে কাজ কে করবে? যুক্তরাজ্যে মানুষ যখন না খেয়ে থাকছে, সেখানকার নীতিনির্ধারকরা তখন ইউক্রেনকে ক্রমাগত অস্ত্র-অর্থ সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে যুদ্ধকে জিইয়ে রাখতে।
আসলে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির জন্য অতিমারি আর যুদ্ধকে দায়ী করা হলেও আমাদের বিদ্যমান পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থাই বরং অতিমারি আর যুদ্ধের জন্য দায়ী। প্রথমে আসি করোনাভাইরাসের কথায়। ঠিক কোথায় থেকে ভাইরাসটি চীনের উহানে এসেছিল, তা এখনও সুনিশ্চিত নয়। তবে একটি বন্য প্রাণীকে এর সম্ভাব্য উৎস হিসেবে বিবেচনা করেছেন বিজ্ঞানীরা। এটি হলো প্যাঙ্গোলিন। বাংলাদেশে একে সম্ভবত বনরুই নামে ডাকা হয়। বিজ্ঞানীদের একাংশ বলছিলেন, চীনের বাজারে চোরাই পথে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করা এই প্রাণীটির দেহে এমন একটি ভাইরাস পাওয়া গেছে, যা কোভিড নাইনটিনের সঙ্গে ‘ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।’ বিজ্ঞানীদের এই অনুমান যদি সত্যি হয়, তা হলে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাকে নিছক প্রাকৃতিক ব্যাপার হিসেবে চিন্তা করার সুযোগ থাকে না। বলতে হয়, একটি অবৈধ বন্য প্রাণীর মাংসের বাজার সিন্ডিকেট এই ভাইরাসকে আমাদের পরিসরে মহামারি আকারে হাজির করেছে। করোনা ছড়িয়ে পড়ার প্রথম দিকে বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, প্যাঙ্গোলিন হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি চোরাইপথে পাচার হওয়া স্তন্যপায়ী প্রাণী। খবরে দেখেছি, বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন যে, বন্য প্রাণীর শরীর থেকে রোগজীবাণু আমাদের শরীরে ভর করার চরম ঝুঁকি থাকে। প্রাণসংরক্ষণবাদীরা বন্য প্রাণীর কেনাবেচা বন্ধ করতে বলছেন। তবে বাজার তো থামবে না। কেনাবেচাই তার টিকে থাকার শর্ত। টেকার স্বার্থেই সে এসব জীবাণুবাহী প্রাণীর মাংস বিক্রির বৈধ/অবৈধ নেটওয়ার্ক নিরন্তর রাখে। আর বাজারব্যবস্থার দায় এসে পড়ে মনুষ্য প্রজাতির ওপর। নব্য উদারবাদী উৎপাদন ও বাজারব্যবস্থা কী করে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার নেপথ্য ভূমিকা পালন করে, তা নিয়ে জীববিজ্ঞানী রব ওয়ালেস বলেন, ভাইরাসগুলোর ব্যাপক ছড়িয়ে পড়ার কেন্দ্রে রয়েছে খাদ্য উৎপাদন ও বহুজাতিক করপোরেশনগুলোর মুনাফামুখিতা। এদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বরফখণ্ড গলে মাটির নিচ থেকে বহু অজানা ভাইরাস বের হয়ে আসছে বলেও খবর দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। যে জলবায়ু পরিবর্তন পুঁজিবাদী মুনাফাবাজিরই ফল, বৈজ্ঞানিকভাবে এটি প্রমাণিত।
ইউক্রেন যুদ্ধ নামে ডাকা হচ্ছে, সেটাও আসলে মুনাফাবাজি আর দখলদারিত্বের দ্বিপক্ষীয় লড়াই। গত বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে রুশ বাহিনীর অভিযানের মধ্য দিয়ে যে যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল, তার ফল নির্ধারিত হয়নি এক বছরেও। পরিস্থিতি বলছে, এই যুদ্ধের জয়-পরাজয় নির্ধারিত হওয়ার মতো বাস্তবতা তৈরি হয়নি। আবার যুদ্ধ থামার কোনো লক্ষণও নেই। বরং যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর বিপরীতে রাশিয়া-চীনের অবস্থান সংঘাত জোরালো হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তাতে কী? মার্কিন অস্ত্র ব্যবসার প্রসার হয়েছে এই যুদ্ধের মধ্য দিয়ে। রুশবিরোধী নিষেধাজ্ঞার কারণেও ইউরোপে তাদের ব্যবসার পরিসর ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়েছে। আর অঞ্চলগত কর্তৃত্বের প্রশ্নতো রয়েছেই। সব মিলিয়ে লাভ আর লাভ। যুক্তরাষ্ট্র তাই কোনোভাবেই চায় না, এই যুদ্ধ বন্ধ হোক। শান্তি আলোচনা থেকে কিয়েভকে বিচ্ছিন্ন রাখার মার্কিন রাজনীতি প্রকাশ্যেও এসেছে বেশ কয়েকবার। ওদিকে রুশ একনায়ক পুতিনের তো পোয়াবারো। তার তো কোনো জবাবদিহিও নেই। নিরঙ্কুশ ক্ষমতাতন্ত্রের ইন্দ্রজালে থাকা পুতিন তাই পরোক্ষে বলেই রেখেছেন, যুদ্ধে যদি ইউক্রেন পশ্চিমা অস্ত্রে জিততে নেয়, তো পারমাণবিক বোমা ব্যবহার করে ‘অস্তিত্ব রক্ষা’ করবে ক্রেমলিন।
ইউক্রেন যুদ্ধের বর্ষপূর্তির আগ মুহূর্তে এসে রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের পরমাণু অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের নিউ স্টার্ট চুক্তি স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন পরমাণু কর্মসূচি আরও বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। বিপরীতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর প্রতি ইঞ্চি ভূখণ্ড দখলে রাখার অঙ্গীকার করেছেন। সব মিলিয়ে উত্তেজনা ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, যুদ্ধ ক্ষেত্রে রুশ জয় ঠেকিয়ে রেখেছে পশ্চিমাদের দেওয়া আধুনিক অস্ত্র। এই অস্ত্র যদি রাশিয়াকে আরও দুর্বল করে, তা হলে পরমাণু যুদ্ধের ঝুঁকি বেড়ে যাবে। কেননা পুতিন আগেই বলে রেখেছেন, অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়লে তারা পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারে পিছপা হবেন না। যুদ্ধের বর্ষপূর্তির আগের দিন পুতিন আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছেন। মার্কিন সাংবাদিক নরম্যান সলোম্যান বিকল্প ধারার সংবাদমাধ্যম জিনেটে লেখা এক নিবন্ধে বলছেন, ইতিমধ্যেই রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে মোতায়েনকৃত ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র একটা পরমাণু যুদ্ধের সূচনা ঘটাতে পারে। এদিকে আরেক বিকল্প ধারার মার্কিন সংবাদমাধ্যম ডেমোক্র্যাসি নাউকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে পরমাণু অস্ত্র বিলোপে কাজ করা শান্তিতে নোবেলজয়ী চিন্তাবিদ ড. ইরা হেলফ্যান্ড এমন বলেছেন, পরমাণু অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে তার ব্যবহারও ঠেকানো যাবে না।
পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার না করা হলেই পৃথিবী বেঁচে যাবে, এমন কিন্তু নয়। এই নিবন্ধ যখন লিখছি, ততক্ষণে জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য মতে করোনা অতিমারিতে প্রাণ গেছে ৬৮ লাখেরও বেশি মানুষের। কোটি কোটি মানুষ মরছে ক্ষুধা-অপুষ্টিতে। ইউক্রেন যুদ্ধেও মরছে হাজার হাজার বেসামরিক। সেনারা তো দেশপ্রেমের দিনমজুর, তাদের কথা থাক। অথচ এই অতিমারি, যুদ্ধ আর ক্ষুধাকে উপজীব্য করেই সম্পদের পাহাড় গড়ছে মুষ্টিমেয় পুঁজিপতি। এই যে কোটি কোটি মানুষকে ক্ষুধার্ত রেখে, যুদ্ধবাজির মারণাস্ত্রে হাজার হাজার মানুষের রক্তগঙ্গা বইয়ে দিয়ে হলেও পুঁজি চায় বেচাবিক্রি, চায় মুনাফা। পুঁজি সবকিছুকেই বিক্রয়যোগ্য পণ্যে রূপান্তর করে। এমনকি আমাদের এই পৃথিবীটাকেও। পুঁজি আসলে তাই আধুনিক যুগের রাক্ষস। আমাদের কল্পনার রাক্ষস যেমন বহুরূপী, আস্ত আস্ত মানুষ খেয়ে ফেলে, সব খেয়ে শেষ করে ফেলতে পারে, ধ্বংস করতে পারে গোটা একটা অঞ্চল, পুঁজিবাদী অর্থনীতিও সেই একই জিনিস। যুদ্ধাস্ত্রের উন্নয়ন, পশু-পাখির মাংস খেয়ে খেয়ে তাদের প্রজাতিগতভাবে ধ্বংসের বন্দোবস্ত আর বিশ্বব্যাপী জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক মুনাফাবাজির মধ্য দিয়ে তারা পৃথিবীটাকেই ধ্বংসের প্রায় কাছাকাছি নিয়ে গেছে। দুনিয়াজুড়ে অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, ভয়ংকর সব ঝড় কিংবা তুষারপাত দাবানল মানুষকে বিপন্ন করে তুলেছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি মানবতার জন্য লাল সংকেত আকারে হাজির হয়েছে বহু আগেই।
পুঁজি কখনো নজরদারি পুঁজিবাদ হয়ে, কখনো ক্রোনি পুঁজিবাদ হয়ে, কখনো তার নব্য উদারবাদী ঢঙে বিশ্বজুড়ে এই বহুরূপী রাক্ষসতন্ত্র জারি রেখেছে। আর পুঁজির পাহারাদার মুষ্টিমেয় মানুষ করে রেখেছে সামগ্রিক আত্মঘাতী বন্দোবস্ত। আত্মঘাতী কেননা পৃথিবীকে ধ্বংস করে নিজেরা টিকে থাকা যাবে না। মঙ্গলে বসতি গড়ার সুযোগ কিন্তু খুব কম মানুষেরই হতে পারে!