ফরাসি ভাষায় (আমার নিজের স্লোভেন এবং অন্যান্য ভাষায়) ‘ভবিষ্যৎ’ বা Future-এর জন্য দুটি শব্দ রয়েছে Futur এবং ধাবহরৎ, যা ইংরেজিতে সঠিকভাবে অনুবাদ করা যায় না। Futur বর্তমানের চলমান অংশ হিসেবে আসন্ন ভবিষ্যৎকে বোঝায়, যেমন- ইতিমধ্যেই বিদ্যমান প্রবণতাগুলোর সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন।
অন্যদিকে ধাবহরৎ সম্পূর্ণ পরিবর্তন নির্দেশ করে, যেখানে থাকে বর্তমানের সঙ্গে এক ধরনের বিচ্ছিন্নতা। Avenir এসেছে Avenir শব্দ থেকে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ট্রাম্প যদি ২০২০ সালের নির্বাচনে বাইডেনের বিরুদ্ধে জিততেন, তবে তিনি (নির্বাচনের আগেই) ভবিষ্যতের রাষ্ট্রপতি হতেন, আসন্ন রাষ্ট্রপতি নয়।
সমসাময়িক এপোক্যালিপ্টিক পরিস্থিতিতে, Futur-এর চূড়ান্ত পরিণতি (যাকে দার্শনিক জ্যাঁ-পিয়েরে ডুপুই বলেছেন ডিস্টোপিয়ান ফিক্সড পয়েন্ট বা সন্ধিক্ষণ) হচ্ছে পারমাণবিক যুদ্ধ, পরিবেশগত ভাঙন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা। এমনকি এটি যদি অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত হয়েও যায়, এই সন্ধিক্ষণ হলো এক ধরনের ভার্চুয়াল ‘আকর্ষক’ যার দিকে আমাদের বাস্তবতা বিরাজমান।
ভবিষ্যৎ বিপর্যয় মোকাবিলার উপায় হলো কিছু কাজের মাধ্যমে এই সন্ধিক্ষণের দিকে আমাদের প্রবাহকে বাধা দেওয়া। আমরা এখানে দেখতে পাচ্ছি যে ‘ভবিষ্যৎ বলে কিছু নেই’ স্লোগানটি কতটা অস্পষ্ট : গভীরভাবে দেখলে এটি আসলে পরিবর্তনের অসম্ভাব্যতাকে চিহ্নিত করে না বরং আমাদের কিসের জন্য প্রচেষ্টা করা উচিত তা ইঙ্গিত করে- সেই ‘ভবিষ্যৎ’-এর বিপর্যয়কে ভাঙতে হবে, যা এবং এর মাধ্যমে নতুন কিছু আসার জন্য জায়গা দিতে হবে।
সর্বপ্রথম বিপর্যয়কে আমাদের ভাগ্য হিসেবে মেনে নেওয়া উচিত এবং তারপর এর মধ্যে নিজেদের অভিক্ষেপ করে, আমাদের উচিত এর অতীতে (ভবিষ্যতের অতীত) বিপরীত সম্ভাবনাগুলো সন্নিবেশ করা, যার ওপর আমরা আজ কাজ করতে পারি।
ডুপুইয়ের বক্তব্য হলো, যদি আমরা একটি বিপর্যয়ের হুমকিকে সঠিকভাবে মোকাবিলা করতে চাই, তবে আমাদের সময়ের একটি নতুন ধারণা প্রবর্তন করতে হবে, ‘টাইম অব এ প্রজেক্ট’, যা অতীত এবং ভবিষ্যতের মধ্যে একটি নিবন্ধ সার্কিটের মতো : অতীতে আমাদের আকস্মিক ক্রিয়াকলাপ থেকেই ভবিষ্যতের জন্ম, যখন আমরা যেভাবে কাজ করি তা আমাদের ভবিষ্যতের প্রত্যাশা এবং এই প্রত্যাশার প্রতি আমাদের প্রতিক্রিয়া দ্বারা নির্ধারিত হয়।
আমাদের প্রথমে বিপর্যয়কে আমাদের ভাগ্য হিসেবে, অনিবার্য হিসেবে উপলব্ধি করা উচিত এবং তারপর, এর মধ্যে নিজেদের উপস্থাপন করে, এর দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে, আমাদের উচিত এর অতীত (ভবিষ্যতের অতীত) বিপরীত সম্ভাবনার মধ্যে সন্নিবেশ করা (যদি আমরা তা করতে চাই এবং আমরা এখন যে বিপর্যয়ের মধ্যে আছি তা না ঘটত!) যার ওপর আমরা আজ কাজ করতে পারি।
এখনই বলা যাচ্ছে না থিওডর অ্যাডর্নো এবং ম্যাক্স হরখাইমার কি তাদের ডায়ালেক্টিক অব এনলাইটমেন্ট এ রকমটাই করেছিলেন না? যদিও ঐতিহ্যগত মার্কসবাদ আমাদের নিজেদের নিয়োজিত করতে এবং প্রয়োজনীয়তা (কমিউনিজম) নিয়ে আসার জন্য কাজ করার নির্দেশ দিয়েছিল, তখন অ্যাডর্নো এবং হরখাইমার আমাদের বর্তমান এই ফলাফলের বিরুদ্ধে কাজ করতে অনুরোধ করে চ‚ড়ান্ত ধ্বংসাত্মক পরিণতির (সম্পূর্ণ প্রযুক্তিগত কারসাজির ‘শাসিত সমাজের’ আবির্ভাব) মধ্যে নিজেদের প্রক্ষেপিত করেছিলেন।
অদ্ভুতভাবে ১৯৯০ সালে কমিউনিজমের পতনের জন্যও কি একই কথা প্রযোজ্য নয়? আজকের দৃষ্টিকোণ থেকে, ডান থেকে বাম, আলেকজান্ডার সোলঝেনিটসিন থেকে কর্নেলিয়াস ক্যাস্টোরিয়াডিস পর্যন্ত ‘হতাশাবাদীদের’ উপহাস করা সহজ, যারা গণতান্ত্রিক পশ্চিমের অন্ধত্ব এবং আপস এর নৈতিক-রাজনৈতিক শক্তি এবং কমিউনিস্ট হুমকি মোকাবিলা করার সাহসের অভাবকে নিন্দা করেছিলেন। তারা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, শীতল যুদ্ধে ইতিমধ্যে পশ্চিমারা হেরে গেছে, কমিউনিস্ট বøক জিতেছে, পশ্চিমের পতন আসন্ন।
কিন্তু তাদের মনোভাবই কমিউনিজমের পতন ঘটাতে সবচেয়ে বেশি কাজ করেছিল। ডুপুইয়ের ভাষায়, রৈখিক ঐতিহাসিক বিবর্তনের সম্ভাবনার স্তরে তাদের অত্যন্ত ‘হতাশাবাদী’ ভবিষ্যদ্বাণী, এটিকে প্রতিহত করার জন্য তারা একত্রিত হয়েছিল।
এই প্রক্রিয়ায় একজনের উচিত সাধারণ জায়গাটিকে উল্টে দেওয়া, যখন আমরা একটি বর্তমান কিন্তু ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ায় নিযুক্ত থাকি, তখন আমরা একে সম্ভাবনায় পরিপূর্ণ স্থান হিসেবে উপলব্ধি করি এবং নিজেদের তাদের মধ্যে বেছে নেওয়ার জন্য স্বাধীন এজেন্ট নির্ধারণ করি, অন্যদিকে পূর্ববর্তী দৃষ্টিকোণ থেকে একই প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণরূপে নির্ধারিত এবং প্রয়োজনীয় প্রদর্শিত হয়। এর বিপরীতে বর্তমানের নিযুক্ত এজেন্টরা যারা নিজেদের ভাগ্যের মধ্যে আটকা পড়েছে বলে মনে করে, যারা পরবর্তী পর্যবেক্ষণের দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবে, আমরা অতীতের বিকল্পগুলো বা ঘটনাগুলো ভিন্ন পথে নেওয়ার সম্ভাবনাগুলো বুঝতে পারি।
অতীত পূর্ববর্তী পুনঃব্যাখ্যার জন্য উন্মুক্ত, যেখানে ভবিষ্যৎ একপ্রকার নিরুদ্ধ যেহেতু আমরা একটি নির্ধারক মহাবিশে^ বাস করি। এর মানে এই নয় যে, আমরা ভবিষ্যৎ পরিবর্তন করতে পারব না; এর মানে শুধু এই যে, আমাদের ভবিষ্যৎ পরিবর্তন করতে হলে প্রথমে আমাদের অতীত পরিবর্তন করতে হবে।
অন্যভাবে বলতে গেলে, অতীত পূর্ববর্তী পুনঃব্যাখ্যার জন্য উন্মুক্ত, যেহেতু আমরা একটি সীমানা নির্দেশক মহাবিশে^ বসবাস করি, শুধু তাই ভবিষ্যৎ বন্ধ হয়ে আছে। এর মানে এই নয় যে, আমরা ভবিষ্যৎ পরিবর্তন করতে পারব না; এর মানে শুধু এই যে, আমাদের ভবিষ্যৎ পরিবর্তন করার জন্য, আমাদের প্রথমে (‘বুঝতে’ নয়) আমাদের অতীতকে পরিবর্তন করতে হবে, এমনভাবে একে পুনঃব্যাখ্যা করতে হবে, যাতে এটি একটি ভিন্ন ভবিষ্যতের দিকে উন্মোচিত হয়, যা এর অতীতের প্রধান দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা নিহিত।
তবে কি একটি নতুন বিশ^যুদ্ধ হবে? এর উত্তর শুধু আপাতবিরোধী হবে। যদি একটি নতুন যুদ্ধ হয়, এটি একটি প্রয়োজনীয় যুদ্ধ হবে : ‘যদি অসামান্য কোনো ঘটনা ঘটে, কোনো বিপর্যয়, তখন যুদ্ধ নাও হতে পারে, যেহেতু এখন পর্যন্ত এটা ঘটেনি। তাই তা অবশ্যম্ভাবী নয়। এটাই আসলে ঘটনার বাস্তবীকরণ- ঘটনা ঘটতেও পারে যা পূর্ববর্তীভাবে এর প্রয়োজনীয়তা তৈরি করে।’ একবার সম্পূর্ণ সামরিক দ্বন্দ্ব বিস্ফোরিত হলে (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে, চীন এবং তাইওয়ানের মধ্যে, রাশিয়া এবং ন্যাটোর মধ্যে...), এটি প্রয়োজনীয় যুদ্ধ হিসেবে উপস্থিত হবে। অর্থাৎ আমরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে তখন অতীতকে পড়ব যে এর কারণগুলো একটি সিরিজ হিসেবে বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল। যদি এটি না ঘটে, তা হলে আমরা এটিকে পড়ব যেভাবে আমরা আজকের স্নায়ুযুদ্ধকে পড়ি : বিপজ্জনক মুহূর্তের একটি সিরিজ হিসেবে যেখানে বিপর্যয় এড়ানো হয়েছিল। কারণ উভয় পক্ষই বিশ^ব্যাপী সংঘাতের মারাত্মক পরিণতি সম্পর্কে সচেতন ছিল।
১৯৫৩ সালে যখন চীনের প্রধানমন্ত্রী ঝাউ এনলাই কোরিয়ান যুদ্ধের অবসান ঘটাতে শান্তি আলোচনার জন্য জেনেভায় ছিলেন, একজন ফরাসি সাংবাদিক তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে তিনি ফরাসি বিপ্লব সম্পর্কে কী ভাবছেন। জানা যায় ঝাউ উত্তরে বলেছিলেন, ‘এটা এখনই বলা খুব তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে।’ একদিক দিয়ে তিনি ঠিকই ছিলেন, ১৯৯০-এর দশকে পূর্ব ইউরোপীয় ‘জনগণের গণতন্ত্র’ ভেঙে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, ফরাসি বিপ্লবের ঐতিহাসিক স্থানের জন্য সংগ্রাম আবার জ্বলে ওঠে।
উদারপন্থি সংশোধনবাদীরা এই ধারণাটি আরোপ করার চেষ্টা করেছিল যে, ১৯৮৯ সালে কমিউনিজমের মৃত্যু ঠিক সঠিক মুহূর্তে ঘটেছিল : জ্যাকবিনদের সঙ্গে শুরু হওয়া সেই যুগের বিপ্লবী আদর্শের চ‚ড়ান্ত ব্যর্থতার সমাপ্তি, যা ১৭৮৯ সালে শুরু হয়েছিল। অতীতের জন্য যুদ্ধ আজও চলছে : যদি আমূল মুক্তির রাজনীতির একটি নতুন স্থান আবিভর্‚ত হয়, তবে ফরাসি বিপ্লব কেবল ইতিহাসের অচলাবস্থা ছিল না। এই অর্থে যে, ভবিষ্যৎকে বর্তমান হিসেবে উপস্থাপন না করা পর্যন্ত একজনকে একই সঙ্গে বিপর্যয় এবং অগ্রহণযোগ্য স্থানের অন্তর্ভুক্ত হিসেবে ভাবতে হবে- কোনো বিচ্ছিন্ন সম্ভাবনা হিসেবে নয় বরং রাষ্ট্রগুলোর এক বা অন্য একটি সংমিশ্রণ হিসেবে, যা নিজেকে প্রকাশ করবে। অতীতের আরোহী যখন প্রয়োজন সেই মুহূর্তে বর্তমানকে বেছে নেবে।
এমন নয় যে, আমাদের দুটি সম্ভাবনা রয়েছে (একদিকে সামরিক, পরিবেশগত, সামাজিক বিপর্যয় বা অন্যদিকে পুনরুদ্ধার)- এই সূত্রটি খুব সহজ। আমাদের যা আছে তা হলো দুটি superposed necessities উপরিপন্ন প্রয়োজনীয়তা। আমাদের দুর্দশায়, এটি প্রয়োজনীয় যে একটি বিশ্বব্যাপী বিপর্যয় ঘটবে, সমসাময়িক ইতিহাস এটির দিকে অগ্রসর হবে এবং এটি প্রতিরোধ করার জন্য আমাদের পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। এই দুটি সুপারপোজড প্রয়োজনীয়তার একটি পতনে, তাদের মধ্যে শুধু একটি নিজেকে বাস্তবায়ন করবে, যাতে যেকোনো ক্ষেত্রে আমাদের ইতিহাসের প্রয়োজন হবে। পারমাণবিক যুদ্ধের সম্ভাবনার সঙ্গে এটি ঠিক একই রকম। কয়েক বছর আগে অ্যালাইন বাদিউ লিখেছিলেন যে, ভবিষ্যতের যুদ্ধের রূপরেখা ইতিমধ্যেই আঁকা হয়েছে-
একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের পশ্চিমা-জাপানি চক্র, অন্যদিকে চীন ও রাশিয়া, সর্বত্র পারমাণবিক অস্ত্র। আমরা লেনিনের উক্তিটি স্মরণ না করে পারি না : ‘হয় বিপ্লব যুদ্ধকে প্রতিরোধ করবে না হয় যুদ্ধ বিপ্লবের সূত্রপাত করবে।’ এভাবে আমরা আসন্ন রাজনৈতিক কাজের সর্বাধিক উচ্চাকাক্সক্ষাকে সংজ্ঞায়িত করতে পারি : ইতিহাসে প্রথমবারের মতো, বিপ্লব যুদ্ধকে প্রতিরোধ করবে- এই প্রথম অনুমানটি নিজেদের উপলব্ধি করা উচিত, দ্বিতীয়টি নয় যে- যুদ্ধ বিপ্লবকে ট্রিগার করবে। কার্যকরভাবে দ্বিতীয় হাইপোথিসিস, যা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রাশিয়ায় এবং দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে চীনে বাস্তবায়ন হয়েছিল। কিন্তু কিসের বিনিময়ে! আর এর দীর্ঘমেয়াদি পরিণতিই বা কী!
আনুষ্ঠানিকভাবে বলা হয় পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করার জন্য বানানো হয় না- এখানে আমরা পারমাণবিক অস্ত্রের এক নোংরা অস্পষ্টতার ওপর হোঁচট খেয়েছি। যা হোক, যেমন- আলেকজান্ডার ডুগিন (পুতিনের আদালতের দার্শনিক) একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, অস্ত্রগুলো আসলে ব্যবহার করার জন্যই তৈরি করা হয়। পারমাণবিক হুমকিগুলো কতটা বিশ্বাসযোগ্য সে সম্পর্কে একটি বড় অনিশ্চয়তা রয়েছে, ডুপুইয়ের রেটোরিকাল প্রশ্নটি এমন যে : ‘বিশ্বাসযোগ্য হওয়ার জন্য একজনকে কি পাগল হতে হবে বা পাগল হওয়ার ভান করতে হবে?’ এবং এখানে এটি যোগ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যে প্রতিনিয়ত একটি হুমকির মধ্যে বসবাস করাটাই প্রকৃত বিপর্যয়।
আমাদের দুর্দশায় এটি প্রয়োজনীয় যে একটি বিশ্বব্যাপী বিপর্যয় ঘটবে, সমসাময়িক ইতিহাস এটির দিকে অগ্রসর হবে এবং এটি প্রতিরোধ করার জন্য আমাদের পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন হবে। একটি পারমাণবিক প্রতিযোগিতার প্রতিটি পক্ষ অবশ্যই দাবি করে যে, তারা শান্তি চায় এবং অন্যদের দ্বারা উত্থাপিত হুমকির প্রতিই প্রতিক্রিয়া দেখায়- সত্য, তবে এর অর্থ হলো উন্মাদনা পুরো সিস্টেমের মধ্যেই রয়েছে, যে দুষ্টচক্রে আমরা ধরা পড়েছি। আমরা জেনে-বুঝেই এই প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করি। গঠনটি এখানে অনুমিত বিশ্বসের অনুরূপ : সব স্বতন্ত্র অংশগ্রহণকারী যুক্তিযুক্তভাবে কাজ করে, অন্যের প্রতি অযৌক্তিকতাকে দায়ী করে যারা ঠিক একইভাবে আচরণ করে।
আমরা এমনিতেই নানা ধরনের হুমকির মধ্যে রয়েছি। তার মধ্যে এই মহামারি যে নতুন হুমকি হিসেবে আবিভর্‚ত হয়েছে, তা কি ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে না? আমাদের এখন দরকার সামগ্রিক গতিশীলতা। নাৎসি বাহিনী যে গতিশীলতাকে বলত ‘টোটালে মোবিলমেচাং’, ইংরেজিতে টোটাল মোবিলাইজেশন। যদিও বর্তমান অবস্থা পুরোপুরি নাৎসিদের বিপরীত। জে জি ফিৎচ সম্ভবত প্রথম ব্যক্তি, যিনি তার ‘দ্য ক্লোজড কমার্শিয়াল স্টেট’ বইয়ে এ সম্পর্কে নির্দেশনা দেন। বইটিতে অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে সর্বগ্রাসী একনায়কত্বকে খারিজ করা হয়েছে। আর সে জন্যই সম্ভবত কার্ল পপার ফিৎচকে মুক্ত সমাজের শত্রু হিসেবে গণ্য করেছেন।
দিয়েগো ফুসারো ফিৎচের বই সম্পর্কে বলেছেন যে এই বই একদিকে উদার স্বাধীনতার কথা বলে আবার নয়া উদারতাবাদের সমালোচনাও করে। সংক্ষেপে এটুকু বলা যায়, ফিৎচের রাষ্ট্রটি কেবল বাজার করে আর তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য একের পর এক শর্ত দেয়। ফিৎচের সমালোচনা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতামতের ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং আদর্শবাদ এবং গোঁড়ামিবাদের মধ্যে তিনি যে দার্শনিকতাবিরোধী ছিলেন, সে সম্পর্কে সরাসরি সমালোচনা। ফিৎচের বইয়ে আরও আছে বৈষম্যপূর্ণ উদার স্বাধীনতা, সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বাধীনতাহীনতা এবং বিশ্বের মোড়লরাষ্ট্রদের নৃশংস প্রতিযোগিতা। ফিৎচ তার বইয়ে যেসব প্রস্তাব দিয়েছেন, সেগুলোর সঙ্গে আমরা একমত না-ও হতে পারি। কিন্তু রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্তর্নিহিত সমস্যা সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি অবশ্যই আমলযোগ্য।
বিশ্বায়নের অন্য দিকটি হলো নতুন অদৃশ্য দেয়ালের উত্থান। আমাদের বেকার আছে, আমাদের অনিশ্চিত শ্রমিক আছে, এমনকি স্লোভেনিয়াতেও। আমি কোথাও পড়েছি যে প্রায় অর্ধেক শ্রমিক ইতিমধ্যে অনিশ্চিতভাবে কাজ করে। আপনি ব্যর্থ দেশ, আপনি যারা বস্তিতে বসবাস, যারা বাদ আছে সুতরাং এটি আর পুরোনো স্পষ্ট শ্রেণিগত পার্থক্য নয়। মৌলিক নিরাপত্তা, পূর্ণ নাগরিক অধিকার ইত্যাদি উপভোগ করছে এবং যারা বাইরে আছে তাদের মধ্যে এটি অনেক বেশি অস্পষ্ট পার্থক্য। আরও বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত কার্যকর করার জন্য আমাদের কিছু ট্রান্সন্যাশনাল পাওয়ার দরকার। বাস্তুবিদ্যা সংরক্ষণ করা যাবে না এবং এ ধরনের প্রক্রিয়া ছাড়া মাইগ্রেশন কেস সংরক্ষণ করা যাবে না।
পশ্চিমা দুর্বল শ্রমিক শ্রেণি এবং মধ্যবিত্তরাও অন্যান্য মহাদেশের দরিদ্র জনগণের সংগ্রামে যোগ দেবেন খুব শিগগিরই। এটি খুবই একটি গুরুত্বপূর্ণ জিজ্ঞাসা, যা বেশিরভাগ বামরা এড়িয়ে যায়। কারণ সাধারণ মানুষ যারা অভিবাসীদের ভয় পায়, তাদের একটা কথা আছে। যদি ইউরোপ সম্পূর্ণরূপে অভিবাসীদের জন্য নিজেকে উন্মুক্ত করে, তবে ধনীরা নয়, যারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে তারাই কম চাকরি পাবে, সম্ভবত কম বেতন পাবে। সুতরাং আমরা কল্পনা করতে পারি যা একমাত্র সমাধান খুঁজে বের করা, এটি পরিষ্কার করা বা এক ধরনের ভাগ করা সংগ্রামকে প্রকাশ করা, যাতে সমস্যাটি কেবল মানবতাবাদের নয়, আমরা কি শরণার্থীদের গ্রহণ করব নাকি করব না? কিন্তু সমস্যা হলো ইউরোপে একটা নির্দিষ্ট ক্ষোভ আছে, যেমন কল্যাণ রাষ্ট্রের পতন। ইউরোপের সেই অসন্তুষ্ট মানুষগুলো যা তাদের বিরক্ত করে, তা একই সংকটের অংশ : বিশ্বব্যাপী পুঁজিবাদের ভারসাম্যহীনতা।
এটি গুরুত্বপূর্ণ যে আমরা কোনো না কোনোভাবে আমাদের সংগ্রামকে তাদের সংগ্রামের সঙ্গে সংযুক্ত করি। আমরা যদি এটা মেনে না নিই, যদি আমরা এই স্তরে থেকে যাই- উদ্বাস্তুরা এখানে আসছে, তারা বোঝা এবং আরও অনেক কিছু- আমরা হারিয়ে যাব। আমাদের খুব শক্তিশালী সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম ট্রান্সন্যাশনাল অর্গানিজমের প্রয়োজন। রাশিয়া এবং চীন কি অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের একটি ভিন্ন মডেলের প্রতিনিধিত্ব করে যা একটি বিকল্প এবং এর দ্বারা পশ্চিমাদের বিরোধিতা করতে পারে।
এটি একটি বিকল্পের পক্ষে দাঁড়ায়, তবে কেবল একটি প্রোটো-ফ্যাসিস্ট কর্তৃত্ববাদী পুঁজিবাদের বিকল্প। আমি এটা খুব ভালো করেই জানি, আমি চীনে ছিলাম, আমি তাদের সঙ্গে তর্ক করেছি এবং কমিউনিস্ট শাসনের আপাতদৃষ্টিতে সূ² কনফুসিয়ান ন্যায্যতা আর তাদের বক্তব্য সবসময় একই : ‘আমরা গণতন্ত্রের সামর্থ্য রাখতে পারি না’। তারা সর্বদা সচেতন না হয়ে এই ফ্যাসিবাদী শব্দগুলো ব্যবহার করে। আমাদের কিছু করপোরেট স্থিতিশীলতা দরকার যেখানে প্রত্যেকে তার নিজের জায়গায় থাকে, সেখানে অবশ্যই সংহতি প্রদানের আদেশ থাকতে হবে। সুতরাং তারা একটি রক্ষণশীল আধুনিকীকরণ চায় এবং দুর্ভাগ্যবশত পুঁজিবাদ এই দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
নতুন কিছু আসবে : সমাজতান্ত্রিক যুগোস্লাভিয়ায় আমার যৌবন স্মৃতি থেকে টয়লেট পেপারের সঙ্গে একটি অদ্ভুত ঘটনার কথা মনে পড়ে। হঠাৎ করেই গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, দোকানে পর্যাপ্ত টয়লেট পেপার নেই। কর্তৃপক্ষ অবিলম্বে আশ্বাস জারি করে যে, স্বাভাবিক ব্যবহারের জন্য পর্যাপ্ত টয়লেট পেপার আছে এবং আশ্চর্যজনকভাবে লোকেরা বেশিরভাগই বিশ^াস করেছিল যে এটি সত্য কথা। যা হোক, একজন গড় ভোক্তা নিম্নলিখিত উপায়ে যুক্তি দিয়েছেন, আমি জানি পর্যাপ্ত টয়লেট পেপার রয়েছে এবং গুজবটি মিথ্যা, তবে কিছু লোক যদি এই গুজবটিকে গুরুত্বসহকারে নেয় এবং আতঙ্কিত হয়ে টয়লেট পেপারের অতিরিক্ত মজুদ কিনতে শুরু করে তবে কী হবে? এভাবে টয়লেট পেপারের প্রকৃত অভাব তৈরি হবে? তাই আমি নিজে গিয়ে আমার জন্য কিনে মজুদ করে রাখব।
এটা বিশ্বাস করারও প্রয়োজন নেই যে অন্য কেউ গুজবটিকে গুরুত্বসহকারে নিয়েছে- এটি অনুমান করাই যথেষ্ট যে অন্য কেউ বিশ্বাস করেন যে গুজবটিকে গুরুত্বসহকারে গ্রহণকারী লোক রয়েছে। ফলাফল একই, দোকানে টয়লেট পেপারের প্রকৃত অভাব পড়েছে। অদ্ভুত না হলেও কিছু গবেষক এখন বড় বড় প্রশ্নগুলোর জন্য নতুন পরামর্শ দিচ্ছেন, যদি বুদ্ধিমান বহির্জাগতিক প্রাণীরা ইতিমধ্যেই পৃথিবী পরিদর্শন করে থাকে, তা হলে তারা কেন আমাদের, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা করেনি? উত্তর হলো- হতে পারে তারা কিছু সময়ের জন্য আমাদের ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে কিন্তু আমাদের ব্যাপারে কোনো বিশেষ আগ্রহ খুঁজে পায়নি? আমরা একটি অপেক্ষাকৃত ছোট গ্রহের প্রভাবশালী প্রজাতি যারা তাদের সভ্যতাকে বহু ধরনের আত্মধ্বংসের দিকে বিকশিত করছি (বিধ্বস্ত পরিবেশগত ভারসাম্য, পারমাণবিক আত্মবিনাশ ইত্যাদি), এমনকি আজকের রাজনৈতিকভাবে সঠিক ‘বাম’-এর মতো সাধারণ গাধা যাদের কথা না বললেই নয়, যারা বৃহৎ সামাজিক সংহতির জন্য কাজ না করে তার সম্ভাব্য মিত্রদের ছদ্ম-নৈতিক বিশুদ্ধতার পরিমাপ করে, সর্বত্র যৌনতা এবং বর্ণবাদ দেখে এবং এভাবে সর্বত্র নতুন শত্রু তৈরি করে।
একই যুক্তিতে, বার্নি স্যান্ডার্স ডেমোক্র্যাটদের ২০২২ সালের নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে শুধু গর্ভপাতের অধিকারের দিকে মনোনিবেশ করা উচিত নয় বলে সতর্ক করে দিয়েছিলেন; বলেছিলেন, তাদের এমন একটি এজেন্ডা গ্রহণ করতে হবে যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান করবে এবং শ্রমিক শ্রেণিকে সমর্থন করবে। যদিও স্যান্ডার্সের আজীবন ১০০ শতাংশ প্রো-চয়েস ভোটিং রেকর্ড রয়েছে, তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে ডেমোক্র্যাটদেরও রিপাবলিকানদের ‘শ্রমিকবিরোধী’ দৃষ্টিভঙ্গি এবং তাদের নীতিগুলো শ্রমিক শ্রেণিকে আঘাত করতে পারে এমন উপায়গুলোর মোকাবিলায় মনোনিবেশ করতে হবে। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে উদারপন্থিরা অবিলম্বে পাল্টা আক্রমণ করে, তাকে নারীবাদবিরোধী বলে অভিযুক্ত করে।
একই যুক্তিতে নৈতিক বর্ণচ্ছটার বিপরীত দিক থেকে একটি অদ্ভুত সত্য লক্ষ করা যায় : স্বল্প সময়ের ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার লিজ ট্রাস তার অর্থনৈতিক রাজনীতিতে শ্রমিক শ্রেণির অনুরোধ উপেক্ষা করার পন্থা অনুসরণ করেছিলেন যা তিনি বাজারের চাহিদা হিসেবে উপলব্ধি করেন- কিন্তু তার পতনের কারণ হলো এই একই বাজার শক্তি (স্টক এক্সচেঞ্জ, বড় করপোরেশন) যারা তার প্রস্তাবে আতঙ্কের সঙ্গে প্রতিক্রিয়া জানায়। যদি প্রয়োজন হয়, আরও একটি প্রমাণ, যে কেন্দ্র নিয়ন্ত্রিত বাম রাজনীতি (বিল এবং হিলারি ক্লিনটন, কেয়ার স্টারমারের) পুঁজির স্বার্থকে নতুন পপুলিস্ট ডানের চেয়ে অনেক বেশি পর্যাপ্ত উপায়ে উপস্থাপন করেছিল।
এভাবে এলিয়েনরা নিশ্চিতভাবে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হবে যে আমাদের রোগে দূষিত না হওয়ার জন্য আমাদের উপেক্ষা করাটাই তাদের জন্য অনেক বেশি নিরাপদ। আমরা যদি নতুন কিছু নিয়ে আসতে চাই, তা হলে আমাদের হয়তো তাদের দৃষ্টি আকর্ষণের দাবিদার হতে হবে।
প্রতিক্রিয়ার আরেকটা রূপ হলো পরিস্থিতি যখন প্রকৃতপক্ষেই আতঙ্কজনক, তখন আতঙ্কের অনুপস্থিতি। গত কয়েক বছরে সার্স ও ইবোলা মহামারির পর আমাদের বারবার বলা হয়েছিল যে ধেয়ে আসছে এর চেয়েও ভয়ংকর নতুন মহামারি। সেটা যে আসছেই তা ছিল প্রশ্নাতীত, শুধু প্রশ্ন ছিল, কবে আসবে? আমরা এই অশনিসংকেত সম্পূর্ণভাবে বিশ্বাস করা সত্ত্বেও কোনোরকম গুরুত্ব দিইনি, কোনো প্রস্তুতি নিতেও নিরুৎসুক ছিলাম। গুরুত্ব দিয়েছি কেবল ‘কনটাজিওন’ নামক চলচ্চিত্রে।
এই দুই বিপরীতধর্মী প্রতিক্রিয়া থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, প্রকৃত বিপদের সঙ্গে মোকাবিলা করার বেলায় আতঙ্কগ্রস্ত হওয়ার কোনো মানে নেই। আমরা যখন বিপদে আতঙ্কগ্রস্ত হই, পরিস্থিতিকে তখন যথাযথ গুরুত্ব না দিয়ে বরং একে খেলোই করে ফেলি। ভেবে দেখুন যে, একটা প্রাণঘাতী মহামারির মধ্যে টয়লেট পেপার নিয়ে মাথা ঘামানো কতটা হাস্যকর! তা হলে এই মহামারি ধরনের বিপর্যয়ের যথাযথ প্রতিক্রিয়া আসলে কী হতে পারে? আমাদের কী শিক্ষা নেওয়া উচিত? কীভাবে এই সংকটকে মোকাবিলা করা উচিত?
যখন বলা হচ্ছে যে, এই মহামারি সাম্যবাদকে একটা নতুন জীবন দিতে পারে, কথাটাকে প্রত্যাশিতভাবেই কটাক্ষ করা হয়েছে। অথচ আমরা দেখছি সংকট নিরসনে চীনের কঠোর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ অন্তত ইতালিতে এখন যা চলছে তার চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর হয়েছে। তবে অন্যদিকে ক্ষমতায় আসীন কমিউনিস্টদের সনাতন কর্তৃত্ববাদিতার সীমাবদ্ধতাও দৃশ্যমান। এর একটা উদাহরণ হলো যে ক্ষমতাধরদের (সেই সঙ্গে জনসাধারণকে) দুঃসংবাদ দেওয়ার বিষয়ে শঙ্কা এতটাই প্রবল ছিল যে শুরুর দিকে এই ভাইরাস নিয়ে রিপোর্ট করার কারণে সাংবাদিকদের গ্রেফতার হতে হয়েছিল। এখন সংক্রমণ যখন কমে আসছে, আবারও এ রকম ঘটনা ঘটছে বলে শোনা যাচ্ছে।
করোভাইরাস সৃষ্ট অচলাবস্থা থেকে চীনকে আবার কর্মমুখর করে তুলতে গিয়ে একটি পুরোনো অভিলাষ মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে : উপাত্ত এদিক-ওদিক করে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা যা দেখতে চান, তা-ই দেখিয়ে দেওয়া। চীনের পূর্ব উপক‚লীয় শিল্পপ্রধান ঝেইজিয়াং প্রদেশে বিদ্যুতের ব্যবহার এর উদাহরণ। অন্তত তিনটি শহরে স্থানীয় শিল্প-কারখানাগুলোকে বিদ্যুৎ ব্যবহারের উপাত্ত দিয়ে প্রমাণ করা যে, উৎপাদন আবার শুরু হয়ে গেছে। এর কারণে কিছু কারখানা খালি প্লান্টে অকারণ যন্ত্রপাতি চালাতে বাধ্য হয়েছে।
তাই পুরোনো এবং নতুন পরাশক্তিদের কিছু শিষ্টাচার শেখানোর অবশ্যই সময় এসেছে, কিন্তু তা কে করবে? স্পষ্টতই শুধু একটি ট্রান্সন্যাশনাল সত্তা এটি পরিচালনা করতে পারে; যেমনটা ২০০ বছরেরও বেশি আগে, ইমানুয়েল কান্ট বিশ^সমাজের উত্থানের ভিত্তিতে একটি আন্তর্জাতিক আইনি আদেশের প্রয়োজনীয়তা দেখেছিলেন। চিরস্থায়ী শান্তির জন্য তার প্রকল্পে তিনি লিখেছেন : ‘যেহেতু পৃথিবীর জনগণের সংকীর্ণ বা বৃহত্তর সম্প্রদায় এতদূর বিকশিত হয়েছে যে, সারা বিশ্বে এক জায়গায় অধিকার লঙ্ঘন অনুভ‚ত হয়, তাই বিশ^ নাগরিকত্বের একটি আইনের ধারণা উচ্চ-প্রবাহিত বা অতিরঞ্জিত ধারণা নেই।’
যা হোক, এটি আমাদের যুক্তিযুক্তভাবে নতুন এক বিশ্বব্যবস্থার সামনে দাঁড় করায় যেখানে ‘প্রধান দ্ব›দ্ব’ : বিশ্বব্যাপী পুঁজিবাদী অর্থনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি বৈশ্বিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি করার অসম্ভবতা। যদিও কাঠামোগত কারণে এবং শুধু অভিজ্ঞতাগত সীমাবদ্ধতার কারণে, বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্র বা প্রতিনিধিত্বশীল বিশ্ব সরকার হতে পারে না। বিশ্বব্যাপী নির্বাচনের মাধ্যমে বৈশ্বিক উদার গণতন্ত্র হিসেবে বিশ্বব্যাপী বাজার অর্থনীতি সরাসরি সংগঠিত না হলে কী হবে?
আজ আমাদের বিশ্বায়নের যুগে, আমরা এই ‘প্রধান দ্বন্দ্বের’ মূল্য দিচ্ছি। রাজনীতিতে, যুগে যুগে স্থিরকরণ এবং বিশেষ করে উল্লেখযোগ্য জাতিগত, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়, প্রতিশোধ নিয়ে ফিরে এসেছে। আমাদের আজকের দুর্দশা এই উত্তেজনা দ্বারা সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে : পণ্যের বৈশি^ক অবাধ সঞ্চালন সামাজিক ক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান বিচ্ছেদ দ্বারা অনুষঙ্গী। বার্লিন প্রাচীরের পতন এবং বিশ^বাজারের উত্থানের পর থেকে, মানুষ এবং তাদের সংস্কৃতিকে আলাদা করে সর্বত্র নতুন প্রাচীরের উত্থান শুরু হয়েছে। এই উত্তেজনা নিরসনের ওপরই হয়তো মানবতার টিকে থাকা নির্ভর করে।
স্লাভয় জিজেক একজন স্লোভেনীয় দার্শনিক ও সমাজবিজ্ঞানী। তিনি ল্যুবলিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর সোসিওলজি অ্যান্ড ফিলসফির অধ্যাপক এবং লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্কবেক ইনস্টিটিউট ফর দ্য হিউম্যানিটিজের আন্তর্জাতিক পরিচালক। মহাদেশীয় দর্শন, রাকনৈতিক তত্ত্ব, মনোসমীক্ষণ, চলচ্চিত্র সমালোচনা, মার্কসবাদ, হেগেলবাদ, ধর্মতত্ত্বসহ সমসাময়িক বিষয়ে তার আলোচনা বিখ্যাত।
রাশিয়া এবং ইউক্রেনের যুদ্ধ-পরবর্তী পৃথিবী, আমেরিকার নির্বাচনি ব্যবস্থা, হতাশাবাদের উত্থানসহ ভবিষ্যতের সূচনা নিয়ে তার এই লেখা। তার মতে, যদি আমরা বিপর্যয়কালীন হুমকির সঠিকভাবে মোকাবিলা করতে চাই তবে আমাদের অবশ্যই সময়ের একটি নতুন ধারণা গ্রহণ করতে হবে। ১৭ জানুয়ারি ২০২৩ জ্যাকোবিন ম্যাগাজিনে জিজেকের লেখা সময়ের আলোর জন্য অনুবাদ করেছেন জায়েদ উল এহসান।
Jayed Ul Ehsan
Senior Lecturer
Department of English Language and Literature
Central Women's University.