রাজবাড়ী সদর উপজেলার বাণীবহ ইউনিয়নের শিবরামপুর গ্রামের করবাড়ির শতবর্ষী গাছগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে হাজারো অতিথি পাখি। দেখে মনে হয় এ যেন এক পাখির রাজ্য।
ধূসর পালকের বড় আকারের শামুকখোল পাখির কিচিরমিচির ও ডানার ঝাপটানিতে মুখরিত এখন পুরো গ্রাম। যা দেখতে প্রতিদিনই জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসছেন ভ্রমণ পিপাসুরা। আর এ সুন্দর দৃশ্য ধারণ করছেন ক্যামেরায়। লম্বা পা ও ঠোঁটের হালকা ধূসর বর্ণের দেখতে পাখিগুলো প্রাণবন্ত করে তুলেছে পুরো এলাকার পরিবেশ।
জানা গেছে, প্রতিবছরের মতো এবারও শীতপ্রবণ দূর দেশ থেকে উষ্ণতা ও খাদ্যের খোঁজে উড়ে এসেছে এসব অতিথি পাখি। এসব পাখিগুলোর মধ্যে অধিকাংশ শামুকখোল বা ওপেন বিল স্টর্ক, পানকৌড়ি ও সারস পাখি। যাদের কেউ আসে সাইবেরিয়া থেকে, কেউ বা হিমালয়ের পাদদেশীয় অঞ্চল থেকে।
এই অতিথি পাখির প্রধান খাদ্য শামুক। প্রতিদিন সকালে পাখিগুলো আশপাশের জলাশয়, বিল ও পুকুরে যায় খাবারের সন্ধ্যানে। খাবার নিয়ে নীড়ে ফিরে সন্ধ্যায়। ততক্ষণ ডিম ও বাচ্চা পাহারায় থাকে অন্যপাখি। সকালে সূর্যের আলো ফুটতেই শুরু হয় তাদের কিচিরমিচির, আর বিকেলে আকাশজুড়ে তাদের উড়াউড়ি যেন এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্য।
রূপবৈচিত্র্যের এই বাংলাদেশে শীতের আগমনের আগেই অতিথি পাখিদের আগমন ঘটে। সারাটা দিন পাখির কলতান আর ডানার ঝাপটায় মুখর থাকে পুরো এলাকা। শিশু, কিশোর থেকে শুরু করে বয়স্ক সব বয়সী মানুষই মুগ্ধ হয়ে উপভোগ করেন এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হাজার হাজার পাখির কূজনে মুখর চারপাশ। প্রতিবছরের ন্যায় এবারও উষ্ণতা ও খাদ্যের খোঁজে হাজার হাজার অতিথি পাখি জড়ো হয়েছে শিবরামপুর গ্রামের কর বাড়ির বাগানে। প্রায় ৪-৫ মাস ধরে তারা এখানে রয়েছে।
দিনকে দিন এদের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। প্রায় প্রতিটি বাসায় রয়েছে ডিমসহ পাখির বাচ্চা। কর বাড়ির পুকুরের চারপাশ গাছ-গাছালিতে ঘেরা। এসব গাছের ডালে ডালে বাসা বেঁধেছে এসব অতিথি পাখি। সাদা রঙের এ পাখিরা কিচিরমিচির করে গাছের এপাশ-ওপাশ উড়ছে। কখনও ডালে বসে, কখনও বা উড়ে চলে যায়।
প্রতিদিন সকালে খাবারের উদ্দেশ্যে এরা দলবেঁধে বেড়িয়ে পড়ে। আবার সন্ধ্যে নামার আগে দলবেঁধে নীড়ে ফিরে আসে। হাজার হাজার পাখির এমন আচরণ নৈসর্গিক দৃশ্য হয়ে ওঠে। তাদের দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করছেন স্থানীয় মানুষ।
পাখি দেখতে প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন আসেন। কেউ ছবি তোলেন, কেউ কিচিরমিচির শব্দ রেকর্ড করেন। পাখির এ আগমনে প্রকৃতির রূপবৈচিত্র্যে যোগ হয়েছে নতুন মাত্রা। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে কলকাকলি। এ যেন প্রকৃতির ভিন্ন রকম উৎসব! পুরো এলাকায় এর আবহ।
অতিথি পাখি দেখতে আসা কয়েকজন জানান, বিগত কয়েক বছর ধরে শীতের শুরুতেই পাখিরা আসতে শুরু করে এবং পুরো শীতকাল জুড়ে থাকে তাদের প্রাণবন্ত উপস্থিতি। সত্যিই, করবাড়ির এই পাখিবাস এখন এক অনন্য “অতিথি পাখির স্বর্গরাজ্য”।
কর বাড়ির কর্তা মুকুল কর বলেন, ‘দুই থেকে তিন বছর ধরে আমাদের বাড়ির বাগানে অতিথি পাখি আসছে। এবছর ১০ থেকে ১৫ হাজার পাখি এসে বসবাস করছে। তার ডিম পাড়ছে, বাচ্চা ফুটাচ্ছে। রাতভর কিচিরমিচির শব্দ আমাদের এখন অভ্যাস হয়ে গেছে। অনেকেই এসে পাখি গুলো শিকার করতে চাই। আমরা তাদেরকে বাঁধা দেই। বিভিন্ন দূরদূরান্ত থেকে পাখি দেখতে আমাদের বাড়িতে ছুটে আসছে। বিষয়টি আমাদের কাছে দারুণ লাগছে।’
রাজবাড়ী সরকারি আদর্শ মহিলা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ নুরুজ্জামান বলেন, ‘পরিযায়ী পাখি শীতপ্রধান দেশগুলো থেকে বাংলাদেশে আসে। খাবার সংকট, বংশবৃদ্ধি ও পরিবেশগত সমস্যার কারণে তারা এ দেশে আসে। বংশবৃদ্ধি হয়ে গেলে তারা উপযুক্ত আবহাওয়ায় ফিরে যায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘বালিহাঁসসহ নানা ধরনের পাখি আসে। এরা দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে মাইগ্রেট করে। এরা শামুক, ছোট মাছ, পোকামাকড় খেয়ে জীবন ধারণ করে। এসব পাখি পরিবেশের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এরা মলত্যাগ করলেও মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি পায়।’
রাজবাড়ী সামাজিক বনায়ন ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মীর সায়েদুর রহমান বলেন, ‘পাখিগুলো নিয়মিত নজরদারির মধ্যে রয়েছে। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং কোনো দুষ্কৃতিকারীরা যেন এ অতিথি পাখিকে ক্ষতি করতে না পারে সেজন্য টহল কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। পাখির নিরাপত্তায় প্রতিদিন অফিসের একজন স্টাফ বিকেল ৪ টা থেকে রাত ৮ টা পর্যন্ত ওখানে দ্বায়িত্ব পালন করছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এছাড়া বিষয়টি জেলা প্রশাসন এবং বিভাগীয় বন কর্মকর্তাদের অবগত করা হয়েছে। জনসচেতনতা তৈরিতে ওই এলাকায় মাইকিংসহ সাইনবোর্ড স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসক সুলতানা আক্তার বলেন, ‘সদর উপজেলার বাণীবহ ইউনিয়নে একটি বাড়িতে প্রায় ৭ থেকে ৮ মাস ধরে অতিথি পাখি অবস্থান করছে। পাখি গুলো সংরক্ষণের জন্য ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য বন বিভাগকে বিষয়টি অবগত করা হয়েছে।’
সময়ের আলো/কেএইচও