মেশিনের অভাবে থমকে গেছে নাসরিনের জীবিকার চাকা

নাটোর প্রতিনিধি

সারাদেশ

পঁয়ত্রিশ বছর বয়সি শারীরিক প্রতিবন্ধী নাসরিন আক্তার। গেল সাত বছর আগে অসুস্থতাজনিত কারণে হন প্রতিবন্ধী। এমন অবস্থার পাঁচ বছরের মাথায়

2025-10-29T18:43:42+00:00
2025-10-29T18:43:42+00:00
 
  বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬,
১৭ আষাঢ় ১৪৩৩
বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
মেশিনের অভাবে থমকে গেছে নাসরিনের জীবিকার চাকা
নাটোর প্রতিনিধি
প্রকাশ: বুধবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৫, ৬:৪৩ পিএম 
প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন নাসরিন আক্তার। ছবি : সময়ের আলো
পঁয়ত্রিশ বছর বয়সি শারীরিক প্রতিবন্ধী নাসরিন আক্তার। গেল সাত বছর আগে অসুস্থতাজনিত কারণে হন প্রতিবন্ধী। এমন অবস্থার পাঁচ বছরের মাথায় মারা যান দিনমজুর স্বামীও। 

স্বামীর বিদায়ে শ্বশুর বাড়িতেও জায়গা হয়নি তার। এমন পরিস্থিতিতে মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে নাসরিনের। ১৮ বছরের আতিশ ইসলামকে নিয়ে শূন্যহাতে ফিরেছেন কৃষক বাবার বাড়িতে।  

নাসরিন নাটোর সদর উপজেলার বড় হরিশপুর এলাকার কামার দিয়ার গ্রামের ইসমাইল হোসেনের মেয়ে। অভাবের সংসারে ইসমাইলের এক ছেলে ও দুই মেয়ে। নিজ নিজ সংসার নিয়ে ব্যস্ত সবাই। কিন্তু স্বামীর মৃত্যুর পরে ফের বাড়িতে ফিরে আসায় বৃদ্ধ বয়সে অথৈ সাগরে পড়েছেন ইসমাইল হোসেন।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, নাসরিন আক্তার নাটোর উত্তর বড়গাছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ৮ম শ্রেণি পাস করেন। পরে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হন শের-ই-বাংলা উচ্চ-বিদ্যালয়ে। সেখানে ১০ম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় প্রায় ২২ বছর আগে শহরের কানাইখালি মহল্লায় তাইজুল ইসলামের ছেলে দিনমজুর মিঠু ইসলামের সঙ্গে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয় নাসরিনের।

সংসার জীবনে বিয়ের দুই বছরের মাথায় পুত্র সন্তানের মা হন নাসরিন। সন্তানের নাম আতিশ ইসলাম (২০)। তিনি স্থানীয় কলেজে পড়ালেখা করেন। এক সন্তান ও স্বামী-স্ত্রী নিয়ে তাদের সংসার ভালই চলছিল। হঠাৎ নাসরিন ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত হন। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে চিকিৎসা নিয়েও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি। অসুস্থতায় ডান পায়ে অপারেশন করলেও হঠাৎ প্রতিবন্ধী হয়ে যান।

এরপর স্বামীও ২ বছর আগে স্ট্রোক করে মারা যাওয়ায় নাসরিন আক্তারের শ্বশুর বাড়িতে ঠাঁই হয়নি। সন্তানসহ বৃদ্ধ বাবা ইসমাইল হোসেনের বাড়িতে তাকে আশ্রয় নিতে হয়েছে। এতে অভাবের সংসারে বৃদ্ধ বাবার উপর বাড়তি চাপ 'এ যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা'। তখন উপায় না পেয়ে প্রতিবন্ধী নাসরিন স্থানীয় মহিলা বিষয়ক কার্যালয়ে দর্জি ও অ্যামব্রয়ডারি বিষয়ে ট্রেডে প্রশিক্ষণ নেন। কিন্তু সেলাই মেশিনের অভাবে কাজ করতে পারছেন না। ফলে তার প্রশিক্ষণ যেন বৃথা হতে বসেছে।

এ বিষয় নাসরিন আক্তার বলেন, প্রতিবন্ধী মানুষকে এই সমাজের লোক ভালোভাবে দেখে না। আগের স্বাভাবিক জীবনে সাদামাটা চোখে দেখা হতো। এখন প্রতিবন্ধী জীবনে মানুষ আমাকে রঙিন চশমায় দেখে। পেছনে লোকে অনেকই কিছুই বলে। এসব নিয়ে মন খারাপ করে লাভ নাই। আর পেছনে লোকে কি বললো তাতে কিছু যায় আসে না। তাই ঘরে বসে না থেকে মহিলা বিষয়ক অধিদফতরে প্রশক্ষিণের মাধ্যমে নিজেকে দক্ষ সম্পদ হিসাবে গড়া যায়, সেইদিকে ছুটছি।

এদিকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে দর্জি ও অ্যামব্রয়ডারি বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিলেও অর্থাভাবে সেলাই মেশিন কিনতে না পারায় আত্মকর্মসংস্থানে থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। যদি কেউ একটা সেলাই মেশিনের ব্যবস্থা করতেন এতে তিনি এবং তার কলেজ পড়ুয়া সন্তান উপকৃত হবেন বলে এমনটাই প্রত্যাশা।

                           আরও পড়ুন

নাসরিন আক্তারের বান্ধবী শহরের বঙ্গজল এলাকার স্নিগ্ধা বলেন, দুজন এক সাথে পড়া-লেখা এবং বড় হওয়ার পর বিয়ে হয়ে আলাদা হয়ে গেছি। আমার স্বামীর মৃত্যুর পর তাকে শ্বশুরবাড়ি থেকে বিতাড়িত করেছে জেনে দর্জি ও অ্যামব্রয়ডারি প্রশিক্ষণ নিতে বলি। কাজ শিখে সেলাইমেশিন না থাকায় আমার বাসায় এসে কাজ করে। এতে তার দূর থেকে এসে সেলাই কাজ করা কষ্ট, তাও আবার সে প্রতিবন্ধী। 

অন্য আরেক প্রশিক্ষণার্থী বলেন, এসব শিখলে নিজেদের হাত খরচের টাকাটাও পাওয়া যায়। আবার কাজও শিখা যায়, তাই কাজগুলো শিখছি। আমরা ভাতাও পাচ্ছি কাজ শেখার জন্য।

মহিলা অধিদপ্তরের নাটোর জেলা মহিলা বিষিয়ক কর্মকর্তা নীলা হাফিয়া বলনে, দর্জি বিজ্ঞান, বিউটিফিকিশেন, নার্সারি, মোমবাতি ও শপিং ব্যাগ তৈরি প্রশিক্ষণ মোট ৫টি ট্রেড চলমান রয়েছে। এসব ট্রেডে প্রশক্ষিণরে জন্য দৈনিক ১০০ টাকা ভাতা পাচ্ছে। প্রতি ৩ মাস পরপর নতুন করে ভর্তি নেয়া হয়। জীবিকায়ন প্রকল্পে গত ২০১৪ সালে ১৪ অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ১ অক্টোবর অষ্টম শ্রেণি থেকে এইচএসসি পাস পর্যন্ত নাটোরে ৪ হাজার ৮০০ প্রশিক্ষণার্থী নারী ৫টি বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছেন।

এ বিষয়ে নাটোর জেলা সমাজসেবা উপ-পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সরকার প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ক্ষমতায়ন এবং সুস্থভাবে জীবন যাপনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সমাজ কার্যালয়ের মাধ্যমে বয়স্ক, অসচ্ছল, প্রতিবন্ধী, বিধবা, হিজড়া, বেদে বয়স্ক এই ৬ ধরনের ব্যক্তিদের ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে ৯০০ টাকা হারে প্রতি মাসে ভাতা দেওয়া হয়। এর মধ্যে জেলায় ৪৮ হাজার ৮২৪ জন শুধু প্রতিবন্ধীকে প্রতিবছর ৫২ কোটি ৭২লাখ ৯৯ হাজার ২০০ ভাতা দেওয়া হচ্ছে। 

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের নাটোর জেলা পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শ্যামা বসাক বলেন, প্রতিবন্ধীরা সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী। নারী প্রতিবন্ধী হলে তারা আরও বেশি অবহেলিত ও বঞ্চনার শিকার হন। এই প্রকল্পের মাধ্যমে নারী প্রতিবন্ধীদের অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।

প্রতিবন্ধী সংগঠন নন্দন জেলা কমিটির আহ্বায়ক আব্দুল বলেন, জেলায় প্রায় পঞ্চাশ হাজারের বেশি আমরা প্রতিবন্ধী ব্যক্তি রয়েছে। আমরা তাদের প্রাপ্ত অধিকার নিয়ে কাজ করি, এই জনগোষ্ঠীগুলোকে এগিয়ে নেওয়ার রাষ্ট্রের যে সাংবিধানিক দায়িত্ব রয়েছে সমাজের অন্য জনগোষ্ঠীর মানুষের সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে। যাতে অন্যদের মত আমাদেরকে আলাদা করে না ভাবা হয়। 

নাটোরের সিনিয়র সাংবাদিক ও সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) এর সভাপতি রেজাউল করিম রেজা বলেন, প্রতিবন্ধীদের মানবাধিকার নিশ্চিত করা আমাদের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। তারা নানা বৈষম্যের শিকার, বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলে। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের কার্যক্রমের মাধ্যমে তাদের উন্নয়নের আলো পৌঁছে দিতে।

সময়ের আলো/এআর


  বিষয়:   মেশিন  অভাব  জীবিকা  প্রতিবন্ধী  দিনমজুর 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: