বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে প্রধানমন্ত্রী পদটি সাধারণত রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব, কূটনীতি ও জনসেবার প্রতীক। কিন্তু কখনো কখনো এই উচ্চপদও রাজনৈতিক ঝড়-তুফান থেকে রক্ষা করতে পারেনি তার অধিকারীদের। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তির পরিণতি হয়েছে ফাঁসির দড়িতে।
ইতিহাসের এমন অধ্যায়গুলো কেবল রাজনৈতিক প্রতিহিংসার গল্পই নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী পদে থাকা ব্যক্তির নৃশংস রূপও তুলে ধরে।
ভুট্টো : পাকিস্তানের ক্ষমতা-রাজনীতির সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি
১৯৭০-এর দশকে পাকিস্তানের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন জুলফিকার আলী ভুট্টো। ১৯৭৩ সালে দেশটির প্রথম গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রণয়ন, পররাষ্ট্রনীতিতে দৃঢ় অবস্থান এবং জাতীয় আত্মমর্যাদার প্রশ্নে আপসহীন ভূমিকায় তিনি জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠেছিলেন। কিন্তু একই রাজনীতি তাকে টেনে নিয়ে যায় বিভক্তির অন্ধকার গহ্বরে। ১৯৭৭ সালে সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ভুট্টোর বিরুদ্ধে প্রতিপক্ষ হত্যার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়। আন্তর্জাতিক মহল বিচারকে প্রশ্নবিদ্ধ বললেও ১৯৭৯ সালে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়ানো ভুট্টো পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অমর প্রতীক—গণতন্ত্র বনাম সামরিক শক্তির সংঘাতের রক্তাক্ত স্মারক।
তোজো : যুদ্ধাপরাধের দায়ে পতন
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আক্রমণাত্মক সামরিক নীতির প্রধান স্থপতি ছিলেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী হিদেকি তোজো। ১৯৪১ সালে পার্ল হারবারে আক্রমণ থেকে শুরু করে এশিয়া–প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে জাপানের সম্প্রসারণবাদী পরিকল্পনায় তিনি ছিলেন মুখ্য ভূমিকা পালনকারী। যুদ্ধ শেষে টোকিও ট্রাইব্যুনালের বিচারে তোজোকে ‘Class A War Criminal’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ১৯৪৮ সালে তাকে ফাঁসি দেওয়া হয়। তোজোর মৃত্যুদণ্ড ছিল যুদ্ধোত্তর বিশ্বের এক প্রতীকী বার্তা। রাষ্ট্রশক্তির নামে সংঘটিত অপরাধের জন্যও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে।
বিপ্লবের উন্মত্ততায় মৃত্যুর মুখে ফরাসি নেতা
আধুনিক অর্থে প্রধানমন্ত্রী না হলেও ফরাসি বিপ্লবের সময় লুই অঁতোয়ান দে সাঁ-জ্যুঁস্ট ছিলেন রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব। বিপ্লবের উগ্র ধারার প্রতিনিধি এই তরুণ নেতা শেষ পর্যন্ত নিজেই সেই গিলোটিনের নিচে নেমে আসেন, যেটি ব্যবহার করে তিনি ‘গণশত্রুদের’ শাস্তি দিয়েছিলেন।
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে চব্বিশের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। মানবতাবিরোধী অপরাধে শেখ হাসিনার রায় আজ। আন্দোলন চলাকালে সরাসরি ছাত্র-জনতাকে গুলির নির্দেশ দেন তিনি। জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন এর তথ্যানুসারে প্রায় ১৪০০ জন নিহত হয়েছেন, এছাড়া আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন আরও প্রায় ১৫ হাজার। শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খানের সর্বোচ্চ শাস্তি প্রার্থনা করেছেন প্রসিকিউররা। রায় শুরুর বিচারক বেঞ্চ বসবে সকাল ১১টা থেকে।
নারী হিসেবে শেখ হাসিনাকে কোনো সহানুভূতি দেখানো হবে না বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামিম। এমনকি কোনো বিশেষ সুবিধা পাওয়ারও সম্ভাবনা নেই বলেই তিনি মন্তব্য করেছেন। শেখ হাসিনাকে দেশের সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে রায়ে ফাঁসির দণ্ড প্রদান করা হলে, নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনিই প্রথম হবেন। যদিও শেখ হাসিনা পলাতক অবস্থায় রয়েছে, তবে দেশের মানুষ চায় দ্রুততার সঙ্গে তার রায় কার্যকর করার। সরকারের কাছে তার ফাঁসির আবেদনও করছেন অনেকে।
/ইউএমএইচ