কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার শিক্ষা খাতে দীর্ঘদিনের শিক্ষক সংকট এখন গভীর সংকটে রূপ নিয়েছে। প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও মাদরাসা তিন স্তরেই জনবল শূন্যতা ও প্রশাসনিক দুর্বলতা মিলিয়ে পুরো শিক্ষাব্যবস্থায় নেমে এসেছে অচলাবস্থার মতো পরিস্থিতি। পাঠদানের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হচ্ছে, তদারকি কমে গেছে, আর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরীক্ষার ফলাফল ধারাবাহিকভাবে নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে।
উপজেলার ১৩৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৪৪টিতে নেই প্রধান শিক্ষক। সহকারী শিক্ষক পদেও শূন্যপদ ৪২টি। শিক্ষক নিয়োগ না হওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠানে একজন শিক্ষককেই একাধিক শ্রেণির দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। এতে ক্লাস নেওয়ার গতি কমে যাচ্ছে এবং শেখার মান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এই সংকটের বিষয়ে করতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সাথী রানী দেবনাথ সময়ের আলোকে বলেন, প্রধান শিক্ষক না থাকায় আমাকে একাধারে শিক্ষকতা ও প্রশাসনিক কাজ দুইটাই করতে হয়। এতে ক্লাসে পুরো মনোযোগ দেওয়া যায় না, যার কারণে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মারাত্মকভাবে।
প্রাথমিক শিক্ষা অফিসেও জনবল সংকট প্রকট। নেই একজন সহকারী শিক্ষা অফিসার। পাশাপাশি নেই পিয়ন, হিসাবরক্ষক ও এলডিএ। ফলে নথিপত্র, পরিদর্শন, প্রশিক্ষণ কার্যক্রমসহ অফিসের নিয়মিত কাজ ব্যাহত হচ্ছে।
মাঠ পর্যায়ে নজরদারি কমে যাওয়ায় বিদ্যালয়গুলোর অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা আরও প্রকট হয়ে উঠছে। মাধ্যমিক স্তরেও পরিস্থিতি সন্তোষজনক নয়। উপজেলার ৩৫টি উচ্চ বিদ্যালয়ের মধ্যে ১০টিতে প্রধান শিক্ষক নেই। প্রশাসনিক শূন্যতার কারণে এসব বিদ্যালয়ের কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে ভারপ্রাপ্তদের ওপর নির্ভরশীল। এ ছাড়া মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসেও নেই সহকারী মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার, যার ফলে বিদ্যালয় তদারকি, পাঠ্যসূচি বাস্তবায়ন এবং ফলাফল বিশ্লেষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো পুরোপুরি ব্যাহত হচ্ছে।
শিক্ষার এ বিপর্যস্ত অবস্থার বিষয়ে অম্বরপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মজিবুর রহমান সময়ের আলোকে জানান, প্রধান শিক্ষক না থাকায় বাড়তি চাপ নিতে হচ্ছে। ঠিকমতো ক্লাস নিতে পারছি না। প্রশাসনিক কাজে ব্যস্ততা ও অতিরিক্ত দায়িত্বে হিমশিম অবস্থা বর্তমানে।
অপরদিকে মাদরাসা স্তরেও একই চিত্র। উপজেলার ২৭টি মাদরাসার মধ্যে ৪টিতে নেই সুপার। প্রয়োজনীয় শিক্ষক সংকট, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও তদারকির সীমাবদ্ধতার কারণে মাদরাসা শিক্ষার মানও ক্রমশ নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, জনবল শূন্যতার কারণে নিয়মিত পাঠদান, মূল্যায়ন, ক্লাস-পরিকল্পনা এবং শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি নিরীক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছে। অভিভাবকরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, শিক্ষক সংকটের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব তাদের সন্তানদের শেখার পরিবেশ পুরোপুরি নষ্ট করে দিচ্ছে।
এদিকে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চান্দিনায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পরীক্ষার ফলাফল ধারাবাহিকভাবে নিম্নমুখী। শিক্ষক সংকট, তদারকির অভাব এবং প্রশাসনিক দুর্বলতাকে ফলাফল খারাপ হওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। শিক্ষাবিদদের মতে, জরুরি ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ, শূন্যপদ পূরণ, প্রশাসনিক কাঠামো শক্তিশালীকরণ এবং তদারকির পরিধি বাড়াতে না পারলে চান্দিনার শিক্ষাব্যবস্থা আরও পিছিয়ে পড়বে।
এ বিষয়ে কুমিল্লা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার তাপস কুমার পাল সময়ের আলোকে জানান, শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টি অধিদফতর থেকে হয়। সার্কুলেশন হয়েছে, লিখিত ও ভাইবা শেষে শূন্যপদে নিয়োগ হবে। প্রধান শিক্ষকের প্রমোশন পিএসসি থেকে অনুমোদন লাগে। আর সারা বাংলাদেশের শিক্ষা অফিসগুলোতে শূন্য পদ রয়েছে। আমরা চাহিদা পাঠিয়েছি। আশা করছি, দ্রুত সমাধান হবে।
সময়ের আলো/এআর