কক্সবাজারে ডেঙ্গুর ভয়াল থাবা

ইমরান হোসাইন, কক্সবাজার

সারাদেশ

কক্সবাজারের রামু উপজেলার হিমছড়ির পাহাড়ি গ্রামে বসবাস করেন ১৬ বছর বয়সি জেসমিন আক্তার। কয়েক দিন আগে হঠাৎ জ্বরে আক্রান্ত হলে

2025-11-28T23:43:58+00:00
2025-11-28T23:44:07+00:00
 
  বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬,
১৭ আষাঢ় ১৪৩৩
বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
কক্সবাজারে ডেঙ্গুর ভয়াল থাবা
ইমরান হোসাইন, কক্সবাজার
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৮ নভেম্বর, ২০২৫, ১১:৪৩ পিএম  আপডেট: ২৮.১১.২০২৫ ১১:৪৪ পিএম
প্রতীকী ছবি
কক্সবাজারের রামু উপজেলার হিমছড়ির পাহাড়ি গ্রামে বসবাস করেন ১৬ বছর বয়সি জেসমিন আক্তার। কয়েক দিন আগে হঠাৎ জ্বরে আক্রান্ত হলে তাকে স্থানীয় চিকিৎসকের কাছে নেওয়া হয়। কিন্তু সেখানে যথাযথ চিকিৎসা পায়নি জেসমিন। অবস্থার অবনতি হলে তাকে প্রথমে স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, পরে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের ডেঙ্গু ব্লকে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকদের ভাষায়, তিনি এখন উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজনীয় পর্যায়ে। কিন্তু তার পরিবারে সেই সামর্থ্য নেই। তাই সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসাই একমাত্র ভরসা। জেসমিনের গল্প নতুন নয়। এটাই এখন কক্সবাজারের হাজারো মানুষের প্রতিচ্ছবি। 

রামু, উখিয়া, টেকনাফ, ঈদগাঁও, চকরিয়া—কোনো উপজেলাই ডেঙ্গুর প্রকোপ থেকে মুক্ত নয়। বিশেষ করে রোহিঙ্গা ক্যাম্পসংলগ্ন ঘনবসতি ও সীমান্তঘেঁষা এলাকায় পরিস্থিতি ভয়াবহ। স্থানীয় স্বাস্থ্যবিদদের ভাষ্য, ডেঙ্গু কক্সবাজারে আর মৌসুমি রোগ নয়, এটি এখন বছরব্যাপী চলমান স্থায়ী মহামারি। 

নাইক্ষ্যংছড়ির আলিক্ষাং থেকে রোগী নিয়ে আসা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, পাহাড়ি এলাকা এখন মশার দখলে। সন্ধ্যার পর ঘরে থাকা দায়। মশার ঝাঁক ঘরে ঢুকে রক্ত শুষে নিচ্ছে, রোগ বাঁধিয়ে দিচ্ছে।

কেন বাড়ছে ডেঙ্গু : বিশেষজ্ঞদের মতে, কক্সবাজারে ডেঙ্গু বিস্তারের চারটি প্রধান কারণ—১. নির্বিচারে পাহাড় কাটা, বন উজাড় ও বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস ২. স্থানীয় প্রশাসনের ফগিং ও লার্ভানাশক কর্মসূচি কার্যত বন্ধ ৩. রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ঘনবসতি ডেঙ্গুর হটস্পট ৪. স্বাস্থ্য খাতের দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও জনবল সংকট।

এদিকে কক্সবাজার পৌরসভা এলাকায় মশা পরিস্থিতি আরও নাজুক। বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, আগে মাঝেমধ্যে ফগিং করা হলেও এখন তা প্রায় দেখা যায় না। নালা-নর্দমা নিয়মিত পরিষ্কার না হওয়ায় পানি জমে থাকে, যার ফলে মশার প্রজনন বাড়ছে। পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা রাছেল চৌধুরী অবশ্য দাবি করেন, ছয়টি ফগার মেশিন দিয়ে দুটি গাড়িযোগে নিয়মিত ফগিং চলছে। কিন্তু বাসিন্দাদের অভিযোগ ও প্রশাসনের বক্তব্যের মধ্যে স্পষ্ট অমিল থেকেই যাচ্ছে।


হাসপাতালে রোগীর চাপ : কক্সবাজার সদর হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ২৬ নভেম্বর পর্যন্ত ভর্তি হয়েছেন ২৯১ জন ডেঙ্গু রোগী। যার মধ্যে পুরুষ ১৪৫, নারী ১০৩ ও শিশু ৪৩ জন। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত মোট আক্রান্ত ৮২৯ জন। স্বাস্থ্যকর্মীদের দাবি, সরকারি পরিসংখ্যানে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের রোগীর সংখ্যা যুক্ত না হওয়ায় প্রকৃত সংক্রমণ আরও অনেক বেশি। বার্ষিক তুলনায়ও বাড়ছে ডেঙ্গু সংক্রমণ—২০২৩ সালে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৪৬৮ জন, ২০২৪ সালে ছিল ৩ হাজার ৬৭৪ জন আক্রান্ত। এ ছাড়া ২০২৪ সালে রোহিঙ্গা মৃত্যুর সংখ্যা ৬ জন ও স্থানীয় একজন, ২০২৫ সালে এখন পর্যন্ত রোহিঙ্গা মৃত্যুর সংখ্যা একজন। চলতি মাসের সংক্রমণ গত মাসের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. সুবক্তগীন মাহমুদ সোহেল বলেন, এডিস মশা নিজেদের চরিত্র পাল্টে ফেলেছে। আগে যেটা মৌসুমি রোগ ছিল, এখন সারা বছরই চলছে। আমরা আলাদা ব্লক করেছি, প্রয়োজনে আইসিইউ দিচ্ছি। কিন্তু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তেই থাকছে।

স্বাস্থ্যকর্মীদের অভিযোগ, মানুষ এখনও জানে না কীভাবে ডেঙ্গু ছড়ায়। প্রতিরোধ না হলে চিকিৎসা দিয়েও প্রাণহানি ঠেকানো কঠিন।

ডেঙ্গু কক্সবাজারের নতুন জনস্বাস্থ্য সংকট : সচেতন নাগরিকদের মতে, ডেঙ্গু এখন কক্সবাজারের করোনা পরবর্তী সবচেয়ে বড় জনস্বাস্থ্য সংকট। এই সংকট শুধু রোগ নয়; এটি পরিবেশ ধ্বংস, অবহেলিত স্বাস্থ্যব্যবস্থা, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ঘনবসতি ও নগর ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তা হলে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়বে ঘর থেকে ঘরে, পাহাড় থেকে শহরে, ক্যাম্প থেকে পুরো জেলায়। প্রতিটি পরিবারের ওপর রেখে যাবে আতঙ্কের দাগ।

একটি রোগ নয়, সম্পূর্ণ ব্যবস্থার ভাঙন : কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্য সচিব এইচএম নজরুল ইসলাম বলেন, ডেঙ্গু কি আমাদের হারিয়ে দেবে, নাকি স্থানীয় প্রশাসনের ঘুম ভাঙাতে পারবে? এই সংকট শুধু রোগের নয়; পরিবেশ, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, স্থানীয় প্রশাসন, নগর ব্যবস্থাপনা সবকিছুর সম্মিলিত দুর্বলতার প্রতিচ্ছবি। যদি এখনই পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে প্রতিদিনের এই জ্বর শুধু বাড়বে। আর আক্রান্ত হবে কক্সবাজারের প্রতিটি ঘর, প্রতিটি পাহাড় ও প্রতিটি গ্রাম।

এফআর



  বিষয়:   কক্সবাজার  ডেঙ্গুর ভয়াল থাবা  রামু উপজেলা  হিমছড়ি 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: