‘কার্তিকের নবান্নের দেশে’ জীবনানন্দ দাশের কবিতার সঙ্গে সুর মিলিয়ে এখন চারদিকে তাকালেই চোখে পড়ে শুধু সোনালি ধানের গালিচা। মাঠজুড়ে বিস্তৃত ধানের শীষ যেন রোদ মেখে হাসছে। কোথাও এখনো খাড়া হয়ে আছে, কোথাও আবার হেলে পড়েছে পাকা শীষের গোছা। সারাটা মাঠ যেন নিজের মতো করে হেসে–খেলে কাটাচ্ছে হেমন্তের সময়। সড়কের পাশে, গ্রামের ভেতর যেদিকেই যাওয়া যায়, দেখা মিলে সোনালি ধানের অনবদ্য দৃশ্য।
মাঠগুলো এখন অনেকটা কবি জীবনানন্দ দাশের সেই চিরচেনা অনুভূতির মতো-
‘শুয়েছে ভোরের রোদ ধানের উপরে মাথা পেতে
অলস গেঁয়োর মতো এইখানে কার্তিকের খেতে
মাঠের ঘাসের গন্ধ বুকে তার—চোখে তার শিশিরের ঘ্রাণ
তাহার আস্বাদ পেয়ে অবসাদে পেকে ওঠে ধান।’
হেমন্তের রোদে পাকা ধানের মাঠগুলো মৌলভীবাজারে যেন এক সঙ্গে সোনালি উৎসবের আভা ছড়িয়ে দিয়েছে। কৃষকের ঘরেও নতুন ধান তোলার আনন্দঘন উৎসব।
গতকাল ভোরে আলো একটু একটু করে ছড়িয়ে পড়ছে। ধীরে ধীরে সেই আভা মুছে স্নিগ্ধ ভোরের সূর্য উঁকি দিচ্ছে। মৌলভীবাজার কুলাউড়া উপজেলার বরমচাল ইউনিয়নের হাকালুকি হাওর পারের ভুকশিমইলের পাকা রাস্তায় তখনো গভীর নিস্বব্ধতা। মানুষের ঘুম ভাঙেনি, চারপাশ শান্ত, নীরবতার চাদরে ঢাকা। দেখা যায় গ্রামীণ পাকা সড়কটি চলে গেছে, তার দুই পাশে সারি সারি গাছ। সকালের রোদে সেই গাছগুলো ঝলমল করছে। সড়কের পাশেই থরে থরে সোনালি ফসল। পাকা ধানের গাছে তখনো লেগে আছে শিশিরবিন্দু।
মাথা উঁচু করে থাকা গাছের সারি থেকে ছায়া পড়ে মৃদু বাতাসের সঙ্গে মিশে পশ্চিম পাশের ফসলের বুকে ঢেউ তুলেছে। সেই ছায়া আর রোদ মিলে ধানের ওপর ফুটে উঠেছে এক অপূর্ব চিত্র মনে হবে যেন কেউ সারা রাত ধরে রঙতুলি দিয়ে চিত্র এঁকেছে। এই সৌন্দর্য সত্যিই কেবল সেই মানুষই দেখতে পাবেন, যিনি প্রভাতের আলোয় এই আঁকাবাঁকা পথ ধরে হাঁটেন।
বরমচালের মাধবপুর গ্রামের পাকা সড়কে শুকানোর জন্য ধান ছড়িয়ে দিচ্ছিলেন সালামত খান। তিনি হাসিমুখে বললেন, এলাকায় সবার আগে ধান রুইছি। তাই সবার আগে কাটরাম। ধান খুব ভালা অইছে। কেউ যদি কয় ভালা অইছে না, আমি মানতাম নায়।’ তিনি ১৯ কিয়ার জমিতে রণজিৎ ও ব্রি-ধান ৪৯ জাতের ধান চাষ করেছেন। এছাড়া নিজেদের খাওয়ার জন্য কালিজিরা, চিনিগুঁড়া ও বিরইন ধানের চাষও করেছেন।
/ইউএমএইচ