বরিশালে টিসিবির স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড বিতরণে ধীরগতির কারণে বিপাকে পড়েছেন নিম্নআয়ের মানুষরা। তারা কার্ডের জন্য আবেদন করার পর মাসের পর মাস ধরে ঘুরছেন সিটি কপোরেশনের ওয়ার্ড সচিবদের কার্যালয়ে। রমজান মাসের আগে কার্ড না পেলে ভোগান্তিতে পড়তে হবে এসব মানুষদের। সিটি করপোরেশন বলছে, দ্রুত এই সমস্যার সমাধান হবে। অন্যদিকে টিসিবি কর্তৃপক্ষ বলছে, ইতিমধ্যে ৭২ ভাগ সুবিধাভোগীদের হাতে স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড তুলে দেওয়া হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তথ্যে অমিল, এক পরিবারে একাধিক কার্ডসহ নানা অনিয়মের কারণে বরিশালে বাতিল করা হয় টিসিবির প্রায় ৫৮ হাজার কার্ড। পরে নতুন করে স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড বরাদ্দ দেওয়া শুরু হয়। বরিশাল সিটি করপোরেশন এলাকায় ৯০ হাজার সুবিধাভোগীর মধ্যে স্মার্ট কার্ড বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। আর এ লক্ষ্যে আবেদন গ্রহণ করে সিটি করপোরেশন। তবে স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ডের জন্য অনেকে আবেদন করলেও ৬-৭ মাস অপেক্ষার পরও কার্ড পাচ্ছেন না। আবেদনের পর কার্ড নম্বর পেলেও ঢাকা থেকে প্রিন্ট হয়ে আসতে দেরি হওয়ায় ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে তাদের।
সিটি কপোরেশনের ওয়ার্ড সচিবরা বলছেন, তারা কার্ডের জন্য ঢাকায় পাঠান। কার্ড প্রিন্ট হয়ে আসতে ৩-৪ মাস সময় লাগছে। সুবিধাভোগীরা প্রতিনিয়তই কার্ড পেতে ভিড় করছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিসিসির ১৬ নম্বর ওয়ার্ড সচিবের দায়িত্বে থাকা শোয়েব রহমান বলেন, আবেদনের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অনলাইনে দেখা যায় কার্ড হয়েছে কি না। যেসব কার্ড হয় তার একটি নম্বরও পড়ে। এই নম্বর পড়লে আমরা জানিয়ে দেই কার্ড আসবে ঢাকা থেকে তৈরি হয়ে। কিন্তু এটা ঢাকা থেকে আসতে ৩-৪ মাস সময় লেগে যায়। এটা জনগণকে আমাদের বোঝাতে সমস্যা হয়। আমার ওয়ার্ডে যে বরাদ্দ তার অর্ধেক আমি পেয়েছি। যারা পায়নি তাদের প্রতিদিন জবাবদিহি করতে হয়।
এরই মধ্যে ৭২ শতাংশ উপকারভোগীকে টিসিবি কার্ড হস্তান্তর করার কথা জানিয়েছেন বরিশাল টিসিবি আঞ্চলিক কার্যালয়ের কর্মকর্তা। বরিশাল সিটি করপোরেশন এলাকায় ৯০ হাজার কার্ডের মধ্যে ৬৪ হাজার ৬০৮টি কার্ড সিটি কপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করার কথা জানান এই কর্মকর্তা। এ ছাড়া বরিশাল জেলায় ১ লাখ ২৯ হাজার ৯২১টি কার্ডের মধ্যে ৯৬ হাজার ৮৪০টি কার্ড হস্তান্তরের কথা জানান তিনি। যাচাই বাছাইয়ের কারণে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে এবং দ্রুত সমস্যার সমাধান হবে বলেও আশ্বস্ত করেন টিসিবির আঞ্চলিক কর্মকর্তা।
টিসিবির সহকারী পরিচালক শতদল মণ্ডল বলেন, স্মার্ট কার্ড বিতরণের আগে ৫৭ থেকে ৫৮ হাজার কার্ড বাতিল হয়েছিল। ইতিমধ্যে আমরা বরিশাল সিটি করপোরেশনের কাছে কার্ড হস্তান্তর করেছি। এটি ধাপে ধাপে বাড়ছে। কার্ডগুলো আসলে এগুলো ভেরিফিকেশন হতে হয়। তথ্য যাচাই-বাছাই করে কার্ড প্রস্তুত করা হয়। আমরা মোট কার্ডের ৭২ শতাংশ সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করতে পেরেছি। আশা করছি, দ্রুত এটি শেষ করতে পারব। কার্ডে নাম্বার পড়ার পরে সেটি ক্রস চেক করতে হয়। রমজানের আগেই কাজের ভালো অগ্রগতি হবে বলে আশা করা যায়।
বরিশাল সিটি করপোরেশন বলছে, টিসিবি কার্ড বিতরণ চলছে। বরিশাল সিটির ৯০ হাজার উপকার ভোগীর মাঝে স্মার্ট কার্ড বিতরণ করা হবে। বিলম্ব হলেও হতাশ হওয়ার কিছু নেই। যারা আবেদন করেছেন তাদের হাতে কার্ড পৌঁছে যাবে।
বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল বারী বলেন, বরিশাল সিটি করপোরেশনের ৩০টি ওয়ার্ডে নানা জটিলতায় অনেকগুলো কার্ড বাতিল হয়। ৯০ হাজার কার্ড পূর্ণ না হওয়ায় আবেদন চলমান থাকে। অনেক আবেদনে মোবাইল নম্বর নিয়ে জটিলতা থাকায় সফটওয়্যারে নেয় না। এসব কারণে দেরি হচ্ছে। প্রতি মাসে নতুন করে আপডেট হচ্ছে। ঢাকা হেড অফিস কারেকশন করে বরিশালে পাঠায়। আমরা ফোন করে কার্ড দিয়ে দেই। অনেকে আবেদন করার পর কার্ড হয়ে গেছে, নম্বরও পড়েছে। ঢাকায় সারা দেশের কার্ড এক জায়গা থেকে প্রিন্ট হয়। আমরা যোগাযোগ রাখছি। যারা আবেদন করেছেন তারা পেয়ে যাবেন। দুশ্চিন্তার কারণ নেই।
বরিশাল সিটি করপোরেশন এলাকার বাসিন্দা নাজমা বেগম বলেন, আমি ৬-৭ মাস আগে টিসিবি কার্ডের জন্য আবেদন করেছি। কিন্তু অনলাইনে কার্ডের নম্বর পড়েলেও কার্ড আসেনি। সামনে রোজার মাস। টিসিবি কার্ড পেলে আমাদের উপকার হতো। এই কার্যক্রমটি দ্রুত করা গেলে আমরা উপকৃত হতাম।
আকলিমা নামের আরেক নারী বলেন, আমরা নিম্নআয়ের মানুষ। সিটিবি কার্ড পেলে আমাদের উপকার হয়। বাইরে তেল, চিনির অনেক দাম। আমরা চাই টিসিবি কার্ডটি যেন দ্রুত দেওয়া হয়। মিরাজ নামের আরেক ভুক্তভোগী বলেন, আমি গাড়ি চালাই, আয় অনেক কম। টিসিবি কার্ডের আবেদন করেছি অনেক দিন আগে। কিন্তু অনেক দিন ঘুরেও কার্ড পাইনি। এখান থেকে জানিয়েছে কার্ড হয়েছে। তবে ঢাকা থেকে প্রিন্ট হয়নি।
নিম্নআয়ের মানুষের জন্য ন্যায্য মূল্যে খাদ্য পণ্য বিক্রি করে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ টিসিবি।
এ জন্য ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করা হয়। ২০২২ সালে বরিশাল সিটি করপোরেশনে এই কার্ডধারীর সংখ্যা দাড়ায় ৯০ হাজার। অনিয়মের অভিযোগে প্রায় ৫৮ হাজার ৪২৬টি কার্ড বাতিল করে টিসিবি। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের শেষের দিকে উপকারভোগীদের স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ শুরু হয়। বরিশাল সিটি করপোরেশনের ৩০টি ওয়ার্ডের সচিবদের কাছে স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ডের আবেদন জমা দেয় উপকারভোগীরা। যাচাই-বাছাই শেষে উপকারভোগীদের মধ্যে সেগুলো দেওয়া হচ্ছে। তবে এখনও অনেকেই স্মার্ট কার্ড না পেয়ে সচিবদের শরণাপন্ন হচ্ছেন।
সময়ের আলো/কেএইচও