গ্রিনল্যান্ডের ইলুলিসাটে ডিস্কো বে-তে বরফচূড়া ভেসে যাচ্ছে। সংগৃহীত ছবি
গ্রিনল্যান্ড বর্তমানে শীতের গভীর অন্ধকারে ঢাকা। এই বিশাল দ্বীপে প্রায় ৫৬ হাজার মানুষ বসবাস করে, যারা মূলত ইনুইট জনগোষ্ঠীর অন্তর্গত। নিউ ইয়র্ক ও মস্কোর মাঝামাঝি অবস্থানে থাকা এই হিমশীতল দ্বীপের দিকে সম্প্রতি নজর দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, আমাদের গ্রিনল্যান্ড দরকার। এটি এখন কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় নিরাপত্তার কারণে গ্রিনল্যান্ড আমাদের জন্য অপরিহার্য, এবং ডেনমার্ক একা দ্বীপটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না।
ট্রাম্পের এই মন্তব্যে গ্রিনল্যান্ডের সরকার উদ্বিগ্ন। তারা দ্বীপের স্বাধীনতার অধিকার রক্ষা করতে চায়। ডেনমার্ক গ্রিনল্যান্ডকে স্বায়ত্তশাসিত হিসেবে পরিচালনা করছে এবং তাদের অবস্থানকে সমর্থন করছে। ইউরোপের দেশগুলোও মার্কিন সম্প্রসারণ ও সম্ভাব্য দখল পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছে।
তবে ট্রাম্পের মন্তব্যের আগে থেকেই গ্রিনল্যান্ড ভ্রমণপ্রিয় হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠছিল। এখানে পৌঁছানো আগে কঠিন ছিল, কারণ সরাসরি ফ্লাইট সংখ্যা খুব কম ছিল। এখন পরিস্থিতি বদলেছে। ২০২৪ সালে রাজধানী নুকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর চালু হয়েছে, এবং ২০২৫ সালে ইউনাইটেড এয়ারলাইন্স নিউয়ার্ক থেকে নুক পর্যন্ত সাপ্তাহিক দু’বার সরাসরি ফ্লাইট চালু করেছে।
২০২৬ সালে আরও দুটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর খোলা হবে। প্রথমটি এপ্রিল মাসে দক্ষিণ গ্রিনল্যান্ডের কাকোরতক, এবং দ্বিতীয়টি অক্টোবর মাসে ইলুলিস্যাটে, যা দ্বীপের প্রধান পর্যটন কেন্দ্র।
ইলুলিস্যাট ও আইসবার্গের জাদু
ইলুলিসাটে আইসফিয়ার্ড সেন্টার (ক্যাঙ্গিয়াতা ইল্লোরসুয়া)-এর বোর্ডওয়াকে ঘুরছেন। সংগৃহীত ছবি
ইলুলিস্যাট গ্রিনল্যান্ডের পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত। এটি একটি সুন্দর হ্যালিবুট এবং চিংড়ি সমৃদ্ধ বন্দর। পর্যটকরা এখানে প্রায় লাখো বছরের পুরানো বরফ দিয়ে ফিল্টার করা ক্রাফ্ট বিয়ার উপভোগ করতে পারেন।
ইলুলিস্যাট ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ আইসফজর্ডের জন্য বিখ্যাত। এখানে প্রায়ই ম্যানহাটনের আকাশচুম্বী ভবনের মতো বিশাল আইসবার্গ ভেসে আসে, যেন ভুতুড়ে জাহাজ। ছোট নৌকা পর্যটকদের আইসবার্গের কাছে নিয়ে যায়, তবে খুব কাছাকাছি যাওয়া বিপজ্জনক। এক জাহাজের অধিনায়ক বলেন, একবার আমি দেখেছি একটি আইসবার্গ ভেঙে বিশাল তরঙ্গ তৈরি করছে, এরপর আর কখনও কাছে যাইনি।
ডিস্কো বে-তে একটি হাম্পব্যাক তিমি ডুব দিচ্ছে। সংগৃহীত ছবি
ডিস্কো বে তিমি পর্যবেক্ষণের জন্যও বিখ্যাত। জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হাম্পব্যাক, ফিন এবং মিঙ্কে তিমি প্ল্যাঙ্কটন খায়। এখানে তিমির মাংসও খাওয়া হয়। ইনুইটরা নারওয়াল, মেরু ভাল্লুক, কস্তুরী-ষাঁড় এবং ক্যারিবু শিকার করে এবং কখনও কখনও এগুলো খাবারে ব্যবহার করে।
ইলুলিস্যাট সমুদ্র ক্রুজের কেন্দ্র। ২০২৪ সালে গ্রিনল্যান্ডে ১ লাখ ৪১ হাজার দর্শনার্থী ক্রুজে অংশ নিয়েছিল। পশ্চিম উপকূল বিশেষ করে উত্তর আমেরিকা ও আইসল্যান্ড থেকে আসা পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয়। আগে ক্রুজিং অ্যাডভেঞ্চারপূর্ণ ছিল, কিন্তু এখন এটি মূলধারার পর্যটন।
২০২৬ সালে সূর্যগ্রহণও পর্যটকদের সংখ্যা বাড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষ ক্রুজ পরিচালনা হবে যাতে পর্যটকরা সূর্যগ্রহণ দেখতে পারেন।
ক্রুজ জাহাজগুলো দক্ষিণ উপকূল ঘুরে যায়। তারা রঙিন ছোট গ্রামগুলো, ডিস্কো দ্বীপ, দক্ষিণ গ্রিনল্যান্ডের প্রাচীন কুঁড়েঘর ও ভাইকিং লংহাউসের ধ্বংসাবশেষ দেখায়। এছাড়াও পর্যটকরা ইটারনিটি ফজর্ডের আকর্ষণীয় নীল জল উপভোগ করতে পারে।
দূরবর্তী ও রুক্ষ গ্রিনল্যান্ড
গ্রিনল্যান্ডের পূর্বাঞ্চলের দূরবর্তী গ্রাম ইট্টোকোর্তোর্টিমিট দেখা যাচ্ছে।
পূর্ব গ্রিনল্যান্ডের উপকূল তুলনামূলক কম পর্যটক পায়। এখানে ফজর্ড এবং বরফের দৃশ্য অত্যন্ত সুন্দর। কোনো রাস্তা নেই এবং জনসংখ্যা মাত্র ৩,৫০০। ছোট জাহাজ পর্যটকদের এই অঞ্চলে নিয়ে যায়। বিশেষভাবে জনপ্রিয় হলো স্কোরসবি সাউন্ড, যা বিশ্বের বৃহত্তম ফজর্ড সিস্টেম। পাহাড় এবং ঝুলন্ত উপত্যকা পর্যটকদের মুগ্ধ করে। উত্তর যাত্রায় উত্তর-পূর্ব গ্রিনল্যান্ড জাতীয় উদ্যানও রয়েছে।
পর্যটকরা মেরু ভাল্লুক, কস্তুরী ষাঁড়, রাজহাঁস, আর্কটিক শিয়াল এবং ওয়ালরাস দেখতে পান। কিছু প্রাণী স্থানীয়দের জন্য শিকারযোগ্য।
গ্রিনল্যান্ডে ভ্রমণে মাস্ক অক্সসহ নানা বন্যপ্রাণীর দেখা মেলে
ইটোককোর্টুরমিট গ্রাম একটি বিশেষ স্থান। এটি প্রতিবেশী গ্রাম থেকে ৫০০ মাইল দূরে অবস্থিত। এখানে মাত্র ৩৪৫ জন মানুষ বসবাস করে। বছরের নয় মাস তারা বরফের মধ্যে থাকে। গ্রীষ্মে জাহাজ আসে এবং তখনই পর্যটকরা স্থানীয়দের সঙ্গে মেলামেশা করতে পারে।
স্থানীয়রা প্রায় সব খাবার শিকার করে। মেটে বারসেলাজসেন, যিনি গ্রামে একটি গেস্টহাউস চালান, বলেন, “আমার বাবা-মা প্রায় সব খাবার শিকার করতেন এবং পুরানো উপায়ে মাংস সংরক্ষণ করতেন।” মাত্র একটি মাস্কক্স ৪৪০ পাউন্ড মাংস দিতে পারে।
আর্কটিক অরোরাস ও শীতকালীন অ্যাডভেঞ্চার
নর্দান লাইট, যা এখানে গ্রিনল্যান্ডের পূর্বাঞ্চল, অ্যামাসালিক জেলার টিনিটেকিলাক-এ দেখা যাচ্ছে, শীতকালে পর্যটকদের বড় আকর্ষণ।
পূর্ব গ্রিনল্যান্ডে নর্দার্ন লাইট বা অরোরা বোরিয়ালিস শীতকালে পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ। শীতকালে ইনুইটরা স্নোমোবাইল ব্যবহার করে, তবে কুকুর-স্লেজ এখনও ব্যবহার হয়। পর্যটকরা শীতের কুকুর-স্লেজিং অভিজ্ঞতা নিতে পারেন, যা এক ঘণ্টা থেকে কয়েকদিন পর্যন্ত হতে পারে। কখনও কখনও ইগলু বানানোর প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়।
সিসিমিউট (পশ্চিম) এবং তাসিলাক (দক্ষিণ-পূর্ব) কুকুর-স্লেজিংয়ের প্রধান কেন্দ্র।
গ্রিনল্যান্ড অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়েছে-দীর্ঘ দূরত্বের স্কিইং, হেলিস্কি, হিমবাহের ওপর হেলিকপ্টার থেকে স্কিইং, ১০০-মাইল দীর্ঘ আর্কটিক সার্কেল ট্রেইল হাইকিং। তবে এই সময় মেরু ভাল্লুক দেখা যেতে পারে, তাই আগ্নেয়াস্ত্র সঙ্গে রাখা প্রয়োজন।
ধীরে ধীরে গ্রিনল্যান্ডের জীবনও পরিবর্তিত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বরফ গলছে। ভবিষ্যতে দ্বীপটি আন্তর্জাতিক রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হতে পারে।
ভ্রমণ লেখক ও আর্কটিক বিশেষজ্ঞ মার্ক স্ট্রাটন ছয়বার গ্রিনল্যান্ড ভ্রমণ করেছেন। তিনি নিজ অভিজ্ঞতা শেয়ার করে বলেছেন, তিনি অরোরা বোরিয়ালিস দেখেছেন, ডিস্কো দ্বীপ ভ্রমণ করেছেন, ইনুইটদের সঙ্গে কুকুর-স্লেজ করেছেন এবং একবার আইসফ্লোতেও আটকা পড়েছেন।
এই কারণে, গ্রিনল্যান্ডে ভ্রমণ শুধুমাত্র দর্শনের জন্য নয়, এটি প্রকৃতি, সংস্কৃতি এবং মানুষের জীবনধারার এক অসাধারণ মিশ্রণ।