নিউ ইয়র্কের বৃষ্টি-ভেজা দিনগুলো

নভেদ আহমেদ

সাহিত্য

১৯৯০ সাল। নিউ ইয়র্কের রাস্তায় তখন বরফ নেই, কিন্তু হাওয়ার কামড় এমন যে কান, নাক সবকিছু ঝিনঝিন করে আসে। এয়ারপোর্ট

2026-01-13T20:00:32+00:00
2026-01-13T20:56:17+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬,
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
সাহিত্য
নিউ ইয়র্কের বৃষ্টি-ভেজা দিনগুলো
নভেদ আহমেদ
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারি, ২০২৬, ৮:০০ পিএম  আপডেট: ১৩.০১.২০২৬ ৮:৫৬ পিএম
গ্রাফিক : সময়ের আলো
১৯৯০ সাল। নিউ ইয়র্কের রাস্তায় তখন বরফ নেই, কিন্তু হাওয়ার কামড় এমন যে কান, নাক সবকিছু ঝিনঝিন করে আসে। এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে প্রথমবার রুজভেল্ট এভিনিউর ভিড়ের সামনে দাঁড়িয়ে সজীব শুধু একটাই জিনিস খুব স্পষ্টভাবে অনুভব করল—এটা তার চেনা পৃথিবী না। উপরের উঁচু ট্র্যাকে ৭ ট্রেন গর্জন করে গেল, নিচে ট্যাক্সি, বাস, গালাগাল, কেউ সিগারেট ধরাচ্ছে, কেউ ফুটপাতে তাড়াহুড়া করে হাঁটছে। কোথাও কোনো ফাঁকা নেই। সে ছোট করে একটা নিঃশ্বাস নিল, নিজের কোটের কলারটা একটু উঁচু করল, আর ভেতরে ভেতরে ভাবল—‘ঠিক আছে, যা-ই হোক, এখান থেকেই শুরু।’

তার মামাতো ভাই এসে পৌঁছে দিলো জ্যাকসন হাইটসের এক পুরোনো বিল্ডিংয়ের বেসমেন্টে। সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতেই ভেজা দেওয়ালের গন্ধ নাকে এলো। দরজাটা একদিকে ঝুলে আছে; ভেতরে ঢুকেই সে দেখল—একটা সিঙ্গেল বেড, যার থেকে স্প্রিং বেরিয়ে আছে, পাশে কুঁজো হয়ে থাকা একটা টেবিল, তাতে পুরোনো টেলিফোন আর ছেঁড়া খবরের কাগজ। সিলিং-এর নিচ দিয়ে মোটা গরম পানির পাইপ গেছে, তার থেকে মাঝে মাঝে টুপটাপ পানি পড়ছে। মেঝের কার্পেট অনেকদিন পরিষ্কার হয়নি, ধুলো জমে আছে, কোণে অচেনা কারও ফেলে যাওয়া একটা সুটকেস পড়ে আছে, যার চেইন ভাঙা।

সুটকেস খুলে সে নিজের জামাকাপড় গুছিয়ে রাখল—দুইটা শার্ট, একটা মানানসই প্যান্ট, কয়েকটা গেঞ্জি, তোয়ালে, আর ছোট প্লাস্টিকের ব্যাগে করে মা’র দেওয়া এক জোড়া রাবারের স্যান্ডেল। শুয়ে পড়ার আগে মাথাটা বালিশে রাখতেই মনে হলো—ঘুম এসে যাচ্ছে, কিন্তু তার মাথার মধ্যে সবকিছু একসঙ্গে চলতে চাইছে—বাড়ির উঠোন, আমগাছের নিচের ঠান্ডা ছায়া, মা’র গলা, বাবার কাশি, বাসের হর্ন, এয়ারপোর্টের ভিড়, আর এই বেসমেন্টের স্যাঁতস্যাঁতে নীরবতা। হিটার ঠিকমতো কাজ করছে কিনা বুঝতে কিছুক্ষণ যেন কান খাড়া করে রাখল। সজীব চোখ বন্ধ করে খুব ছোট করে ফিসফিস করল, ‘এটাই এখন ঘর। অন্য কিছু ভাববার সময় নেই।’

প্রথম কয়েকটা দিন সে কোনো কাজেই লাগল না। মামাতো ভাই কাজের ফাঁকে খবর আনত—কোথাও কেউ কাউন্টারম্যান চাইছে, কোথাও অথবা ডেলিতে dishwashing-এর দরকার আছে। সজীবের মাথায় তখনও বিমানের আওয়াজ গুঞ্জন করছে, সময়ের পার্থক্যে রাত-দিন গুলিয়ে গেছে। তবু সে রোজ দুপুরের দিকে একটু বাইরে বের হত। ৭৪ নম্বর স্ট্রিটের মোড়ে দাঁড়িয়ে মানুষজন দেখত—হিজাব পরা মহিলা, শাল গায়ে পুরুষ, কেউ বাংলা বলছে, কেউ হিন্দি, কেউ উর্দু। তবু সে নিজেকে কোনো একটার সাথেও গেঁথে যেতে পারত না। একটা হালকা ভাসমান অবস্থা—না পুরো একা, না পুরো কারও মধ্যে।


প্রায় এক সপ্তাহ পর কাজের খবরটা এলো। এক পরিচিতের মাধ্যমে ব্রঙ্কসের একটা ডেলিতে কাউন্টার সহকারী দরকার—কেউ গেলে দেখে আসতে পারে। সজীব কোনোরকমে সাবওয়ে ম্যাপ বুঝে, বারবার ভুল স্টেশন দেখে, লোকজনকে জিজ্ঞেস করে পৌঁছল। কর্নারে ছোট ডেলি—কাঁচের দরজা, বাইরে থেকে দেখলে ordinary; ভেতরে ঢুকতেই কফির গন্ধ, গ্রিলের হিসহিসে শব্দ, ফ্রিজারের হালকা গুঞ্জন, টোস্টের গন্ধ। কাউন্টারের পেছনে লোকটা—কার্লো—মাঝবয়সী, হাতে কফির কাপ, চোখে ক্লান্তির চিহ্ন।

সে সজীবের দিকে তাকিয়ে ছোট করে বলল, ‘You work hard?’
সজীব মাথা নাড়ল।
‘English?’
‘Little bit,’ সজীব বলল, গলা একটু শুকনো।
কার্লো হালকা মাথা নেড়ে বলল, ‘Okay. Morning shift. I see, then we talk.’

প্রথম কয়েকদিন তাকে বেশি পেছনের কাজেই রাখা হলো—প্লেট ধোয়া, মেঝে মোছা, গ্রিল পরিষ্কার করা, trash ফেলে আসা। তারপর ধীরে ধীরে তাকে কাউন্টারে দাঁড় করিয়ে গ্রাহকদের অর্ডার নিতে বলা হলো—‘Two eggs, over easy’, ‘Bagel with cream cheese’, ‘Black coffee, no sugar।’

কিছু কিছু শব্দ সে বুঝত না, মুখস্থ করত। কেউ খুব ব্যস্তভাবে বলত, কেউ ধীরে, কেউ রাগ করে বলত, কেউ কফির কাপ হাতে রেখে হাসতে হাসতে tip দিয়ে দিত। এভাবে কাজের রুটিন তৈরি হতে লাগল। ভোরে ওঠা, সাবওয়ে, ডেলি, কাজ, নোংরা প্লেট, ফ্রিজের ঠান্ডা হাওয়া, আবার সাবওয়ে।

কয়েক সপ্তাহ পরে এক পরিচিত তাকে জোগাড় করে দিলো রাতের কাজ—কুইন্সের একটা লিভারি cab কোম্পানিতে। অফিসটা ছোট; একটা টেবিল, তার উপরে তিনটা ফোন, এক পাশে পুরোনো সোফা, দেয়ালে হাতের লেখা তথ্য—‘No smoking inside’, ‘No fighting’, ‘Pay on time।’


dispatcher—মাইক—সবসময় ফোনের পাশে বসে থাকে। রাত নামলেই ফোনগুলো চেঁচাতে শুরু করে, মাইক গলা উঁচু করে বলে, ‘Twenty-five, Jackson Heights… Thirty-two, Jamaica… hurry up guys!’

সজীব প্রথম দিকে ম্যাপ বুঝতে পারত না ঠিকমতো। গাড়ি চালাতে চালাতে ভুল exit নিয়ে ফেলত, অন্য দিকে চলে যেত, আবার ফিরতে হত। কোনো কোনো যাত্রী হত rude, কেউ drunk, কেউ গাড়িতে উঠে ফোনে বাংলা গালাগাল করত, আবার কেউ চুপচাপ বসে থাকত, নামার সময় ছোট করে বলত, ‘ধন্যবাদ ভাই, ভালো থাকবেন।’ 
ডেলির কাজ আর cab—দুই জব মিলিয়ে তার চোখের নিচে কালো দাগ পড়তে শুরু করল। রাতে বাসায় ফিরতে ফিরতে তিনটা বাজে, আর ভোরে আবার অ্যালার্ম।

এই সবের মধ্যে বাড়ির কথা আসে শুধুই calling card-এ। payphone-এর সামনে দাঁড়িয়ে, ঠান্ডায় হাত কাঁপতে কাঁপতে সে নম্বর টিপত। অনেক সময় লাইন কেটে গেলে আবার ডায়াল।
‘হ্যালো, আম্মা?’
‘হ্যাঁ রে, কেমনে আছিস?’
‘চলতেসে। দুইটা কাজ করছি।’
মা একটু পরেই একই কথা বলতেন, ‘তোর জন্য কিছু ছবি পাঠাইছি ডাকযোগে। দুই-তিনটা মেয়ে। দেখিস। জীবনটা একা কাটাবি না।’

একদিন বাসায় ফিরে সে ড্রয়ার থেকে খামটা বের করল। তিনটা সাদা পাসপোর্ট সাইজ ছবি—একজন শাড়ি পরে, মাথার গোঁজে ফুল; আরেকটা সালোয়ার কামিজ পরে, মুখে চাপা হাসি; আরেকজন একটু গম্ভীর চেহারা। ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো—এরা সবাই একই জগতে থাকে, যেখানে uncertainty কম, দায়িত্ব অন্যভাবে ভাগ হয়। তার নিজের জীবনটা এখনো কোনো নির্দিষ্ট কাঠামো পায়নি। সে ছবিগুলো ভাঁজ করে আবার খামের ভেতর রেখে দিলো।

এমন এক সময়ই ফারহানার সঙ্গে পরিচয়। সেটা কোনো নাটকীয় ঘটনা না, কোনো বড় বিপদ না, কোনো সিনেমার মতো ধাক্কা না। খুব সাধারণ একটা দুপুরে, রুজভেল্টের ভিড় ঠেলে ভেতরের দিকে একটা delivery নিয়ে যাওয়ার সময়। কয়েকটা বাংলাদেশি দোকানের মধ্যে ‘Meghna’ নামের একটা ছোট গ্রোসারি—চালে-ডালে-মসলায় ভরতি। দরজা খুলেই সে নাকে পেল পেঁয়াজ, ধনেপাতা, শুকনা মরিচ আর তাজা মাছের মিশ্র গন্ধ। ভেতরে কিছু লোকজন শপিং করছে, আর কাউন্টারের পেছনে কেউ বসে নগদ টাকা নিচ্ছে, হিসাব লিখছে।

সেই মেয়েটাই ফারহানা। চুল পিছনে বেঁধে রাখা, চোখে হালকা কাজল, গায়ে স্বাভাবিক সোয়েটার, মুখে কোনো সাজগোজ নেই, কিন্তু কণ্ঠ steady।
‘Delivery?’
‘হ্যাঁ,’ সজীব বলেছিল।
‘ওই কর্নারে রেখে সাইন করে যাও।’

দেখা এখানেই শেষ হওয়া উচিত ছিল, কিন্তু বেরোনোর সময় সজীব লক্ষ্য করল—অনেক গ্রাহক কথা বলছে রুক্ষ গলায়, সে কিন্তু শান্তভাবে উত্তর দিচ্ছে, কোনো অতিরিক্ত মিষ্টতা ছাড়া।

পরের বার ডেলিভারি নিয়ে গেলে বাইরে বরফ গলছে, রাস্তার উপর কালচে স্লাশ, হাওয়ার মধ্যে একটা কাঁচের মতো ঠান্ডা ভাব। দোকানে ঢোকার মুহূর্তে সে হাত ঘষতে ঘষতে তাকাতেই ফারহানা বলল, ‘এই হাতগুলো দেখো, একদম ice cube।’ একটু হাসি ছিল কথার মধ্যে।
সজীব হালকা হাসল, ‘বাইরে তো আজকে সিনেমার মতো ওয়েদার।’
ফারহানা ভ্রু তুলে বলল, ‘তুমি বোধহয় রোমান্টিকদের দলে। সবাই গালি দিচ্ছে, তুমি কেবল ওয়েদারের প্রেমে পড়েছ!’

এই ধরনের কথোপকথন কোনো সম্পর্কের ঘোষণা না, কিন্তু একটা জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যায়। শীতের কয়েকটা মাস, ডেলিভারির রুটিন, দোকানে মাঝে মধ্যে ঢোকা–বেরোনোর মধ্যে দুজনের কথা একটু একটু করে জমা হতে থাকে। কখনো–বা স্রেফ দুই কথায়—‘কাজ কেমন?’ ‘ভালো’—এর মধ্যে সীমাবদ্ধ। কখনো–বা একটু বেশি—‘প্রথম কবে এসেছ?’ ‘ভালো লাগে এখানে?’—তবু খুব বেশি ঘনিষ্ঠতা নয়।

একদিন দোকান বন্ধের পরে দরজা ভেতর থেকে ঠেলে লাগাচ্ছিল ফারহানা, সজীব তখন খালি crate গোছাচ্ছে। হঠাৎ সে বলল, ‘চা খাবে? নতুন চা এসেছে, এক কাপ খেলে ক্ষতি কী?’ পেছনের ছোট রান্নাঘরে তারা দাঁড়িয়ে থাকল স্টিলের কাপ হাতে। সস্তা টি-ব্যাগ, দুধ, চিনি—এই সব মিলিয়ে ordinary চা। টেবিল ভরা বিল, কলম, প্লাস্টিক ব্যাগ, পাশে ঝোলানো ঝাড়ু, গ্যাসের আগুনের শব্দ। তবু ওই এক কাপ চা যেন সজীবের সেই দিনের সবচেয়ে নরমাল মুহূর্ত।

এইভাবে তাদের মধ্যে একটা সহজতা তৈরি হয়—কোনো নাম না থাকা, কোনো লেবেল না থাকা, একটা আলগা বন্ধুত্বের মতো। সজীব রাতের বেলা বাসায় ফিরে বিছানায় শুয়ে মাঝে মাঝে সেই কয়েক মিনিটের ছোট্ট কথা মনে করত, ভাবত—‘এই শহরে কেউ যদি আমার নাম মনে রাখে, সেটা সম্ভবত এই মেয়েটা।’ আর ফারহানা নিজের কাজের মাঝে কখনো কখনো খেয়াল করত—‘এই ছেলেটা অনেক চুপচাপ, কিন্তু চোখের ভেতরে সবসময় একটা টেনশন থাকে।’

কয়েক মাস পর একদিন কথা প্রসঙ্গে ব্রুকলিন ব্রিজের প্রসঙ্গ উঠল। ফারহানা বলল, ‘গেছো কখনো?’
সজীব মাথা নাড়ল।
‘একদিন চলে আসো। শহরকে একটু অন্য দিক থেকে দেখতে ইচ্ছে করলে, ওখানে দাঁড়ানো লাগে।’

কয়েকদিন পর এক সন্ধ্যায়, কাজ শেষে, তারা সেতুর কাঠের পথ ধরে হাঁটছিল। অনেক লোক, ট্যুরিস্ট, সাইকেল, jelling করা শব্দ, দূরে ম্যানহাটনের skyline। বাতাসে তীব্র ঠান্ডা, নদীর উপর আলো ভেঙে পড়ছে। তারা দুজন দাঁড়িয়ে ছিল রেলিংয়ের পাশে। কেউ কিছু বড় কথা বলছিল না। ফারহানা বলল, ‘এখানে অনেক রাত দাঁড়িয়ে থেকেছি একা। মনে হচ্ছিল, এই শহরটা আমার মতো মানুষদের শুধু ব্যবহার করে ফেলে দেয়। তবু এখান থেকেই ফেরার পথও খুঁজতে হয়।’ সজীব সেই রাতে প্রথমবার বুঝল—মেয়েটা হাসিখুশি থাকলেও তার ভেতরে অনেক অন্ধকার জায়গা আছে।

এই সব ছোট দৃশ্য, ছোট কথা, ছোট পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকার অভ্যাসগুলো মিলিয়ে একটা fragile সম্পর্ক তৈরি হচ্ছিল, যদিও কেউই সেটা জোরে উচ্চারণ করতে রাজি ছিল না। কিন্তু শহর কারও convenience অনুযায়ী চলে না। ঘণ্টা, দিন, সপ্তাহ, মাস সব মিলিয়ে একটা সময় এলো, যখন কার্লো ডেলিতে সজীবকে সাইডে ডেকে বলল, ‘বিজনেস কম, কিছু ঘণ্টা কমাতে হবে।’ একই সময়ে লিভারি অফিসে মাইকও বলতে লাগল, ‘নতুন ড্রাইভার এসেছে, clean record, তাদের শিফট দিতে হবে। তুই একটু এডজাস্ট কর।’ ‘এডজাস্ট’ মানে ইনকাম কমে যাওয়া, হিসাব টানটান হয়ে যাওয়া। তার উপরে বছরখানেক ধরে ঝুলে থাকা immigration-এর ফাইল, ভুল তারিখ, ভুল কাগজে সই, নতুন আবেদন—সব মিলিয়ে মাথার মধ্যে যেন স্ট্যাটিক noise।

আরও পড়ুন

এই অবস্থায় কোনো সম্পর্ক ধরে রাখা কারও পক্ষে সহজ না। সজীব ধীরে ধীরে ফোন কম করতে শুরু করল, দোকানে ডেলিভারি গেলেও কেবল কাজের কথা বলে ফিরে আসত। ফারহানা একসময় সরাসরি জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি কদিন ধরে অনেক দূরে থাকছ। কিছু হয়েছে?’
সে শুধু ছোট করে বলল, ‘কাজ নাই, সমস্যা আছে, মাথা কাজ করে না। এই সব কথা বলে কী হবে?’
ফারহানা একটু হেসে বলেছিল, ‘তোমার সব প্রবলেম সলভ করতে পারব না জানি, কিন্তু পাশে বসে থাকা জিনিসটা একেবারে useless না।’
সজীব সেই সময়টা হয়তো ভুলভাবে বুঝল। সে ভাবল—নিজের অস্থিরতা অন্যের কাঁধে চাপানো উচিত না। তারপর ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে একটা ফাঁক তৈরি হয়ে গেল। এটা কোনো ঝগড়া না, কোনো ব্যাপক নাটকও না—শুধু একটা ধীরে সরে যাওয়া। কয়েক মাস পর তাদের যোগাযোগ প্রায় অদৃশ্য হয়ে গেল।

এই কয়েক বছরে সজীবের জীবন অন্য দিকে গড়াল। দিনমজুরের মতো কাজ করে, খানিকটা ভাগ্য আর অনেকটা পরিশ্রম মিলিয়ে সে প্রথমে এক বাংলাদেশি ট্রাভেল এজেন্সিতে কাজ জুটিয়ে নেয়। টিকেট কাটা, বুকিং করা, মানুষের পাসপোর্ট ধরে ‘মক্কা, ঢাকা, দুবাই’—সব জায়গার ভিসা, তারিখ মিলিয়ে দেখা—এগুলো করতে করতে তার মাথায় একটা ধারণা জন্মায়—‘আমি যদি অন্যের টিকেট কেটে খাই, তাহলে একদিন নিজের অফিস কেন চালাতে পারব না?’

ধীরে ধীরে সে সেই জায়গায়ই পৌঁছে যায়। Roosevelt Avenue থেকে একটু ভেতরে ছোট একটা শোরুম—দরজায় কাঁচ, তার ওপরে সস্তা vinyl সাইনবোর্ডে লেখা ‘Sajib Travels & Tours।’ ভেতরে একটা ডেস্ক, পুরোনো DOS কম্পিউটার, বড় একটা মনিটর, দেয়ালে দু-একটা পোস্টার—‘Cheap Fare to Dhaka’, ‘Special Hajj Package।’ চেয়ারের সারি; গরমকালে ফ্যান, শীতকালে সস্তা স্পেস হিটার। তবু যখনই সে সকালে সাটার তুলে দরজা খুলত, ভেতরে ঢোকার সময় একটা ফিলিং আসত—যা-ই হোক, এটা তার নিজের জায়গা।

Immigration-এর দীর্ঘ ঝামেলাগুলোরও ধীরে ধীরে সমাধান হলো। ফর্ম, lawyer, ফি, বারবার কাগজ ফেরত আসা, নতুন করে সই, নতুন করে জমা—সব শেষে একদিন একটা চিঠি এলো—তার status এখন regular। সেই দিন রাতে বাসায় ফিরে সে প্রথমবার বেসমেন্টের সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে মনে করল, ‘এই শহরে বেঁচে থাকার অধিকারটাও সত্যি সত্যি পাওয়া গেল।’

একটা সাধারণ বিকেলে, কোনো বিশেষ auspicious দিন না, এজেন্সির দরজার ছোট বেলটা টুং করে বেজে উঠল। সজীব ফোনে কথা বলছিল—দু’একটা ভাড়া কনফার্ম করছে, কার যেন ডেট চেঞ্জ। ফোন রেখে মাথা তুলে তাকাতেই সে থমকে গেল। দরজার ফ্রেমের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে ফারহানা। তার পাশে ছোট একটা মেয়ে—চার-পাঁচ বছরের, বেণী বাঁধা, হাতে ছোট ব্যাগ, চোখে কৌতূহল।
তার ভাষা যেন এক মুহূর্তের জন্য আটকে গেল। সে কেবল বলতে পারল, ‘তুমি?’
ফারহানা একটু হাসল, আগের থেকে মুখে বেশি রেখা, কিন্তু হাসি এখনও একই—‘তুমিই তো।’
পরের কিছু সপ্তাহ তাদের মাঝে আবার একটা নতুন phase শুরু হলো। তারা বসে ছোট ছোট বিরতিতে কথা বলল—এজেন্সির চেয়ারে, রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে, কখনও–বা subway স্টেশনে নেমে। ফারহানা জানাল, তার বিয়ে হয়েছিল। নিউ ইয়র্কেরই এক বাংলাদেশি ছেলের সঙ্গে। প্রথমে সব ঠিকঠাক, তারপর ধীরে ধীরে mismatch—চাওয়া-পাওয়া, ego, responsibility ভাগ না হওয়া, কাজের চাপ, পরিবারের কথা—সব মিলিয়ে সম্পর্কটা খাদের দিকে নামতে শুরু করে। একটা সময় এসে আলাদা থাকতে হয়, তারপর ফাইল চলে যায় কোর্টে, কাগজে সই হয়, তালাক চূড়ান্ত হয়। সে মেয়েকে নিয়ে আলাদা থাকে, মা এসে কিছুদিন থেকে আছে, তারপর থেকে তারা তিনজন—মা, মেয়ে, আর সে—নিঃশব্দে শহরের একটা কোণার মধ্যে নিজেদের মতো করে দিন কাটায়।

এই জায়গায় এসে সজীব তার জীবনের নিজের স্যাঁতস্যাঁতে বেসমেন্ট, কাজ হারানোর টেনশন, immigration অফিসের চেয়ারে বসে থাকা দিনগুলো মনে করল। দুজনের কষ্ট একরকম না, কিন্তু দুটোই নিউ ইয়র্কের ভেতরের কঠিন একটি ছবির অংশ। তারা কেউই আর কিশোর বয়সের প্রেমিক–প্রেমিকা না। তাই এবার তাদের গল্পের গতি অনেক ধীর, অনেক হিসেবি, আবার ততটাই সৎ হয়ে উঠল।

মাহিরা—ছোট মেয়েটার সঙ্গে সজীবের সম্পর্কও আস্তে আস্তে তৈরি হতে লাগল। প্রথম দিকে সে ‘uncle’ বলে ডেকেই দূরে দূরে থাকত। পরে একদিন পার্কে গিয়ে দোলনায় উঠে ‘আরেকটু!’, ‘আরেকটু!’ বলে চেঁচাতে চেঁচাতে হেসে উঠতে লাগল। সজীব দোলনা ঠেলে দিচ্ছিল; তার মনে হচ্ছিল, কেউ প্রথমবার তাকে অবলীলায় বিশ্বাস করছে। সে মেয়েটার জুতো ভালো করে বাঁধতে শিখল, রাস্তা পার করিয়ে দিলো, আইসক্রিম cone ধরতে সাহায্য করল। খুব বড় কোনো ঘটনা না, কিন্তু তার জীবনে আগে এইসব ছোট, repeat হওয়া মুহূর্ত ছিল না।

এদিকে দেশে মা আগের মতোই ফোনে একই প্রশ্ন তুলছেন। ‘তোর ফাইল এখন ঠিক আছে, কাজ আছে, ঘর আছে—এখন জীবনটাকে একটু জায়গায় আন।’ নতুন করে কিছু ছবি পাঠিয়েছেন ডাকযোগে। সজীব কয়েকদিন ছবিগুলোর খাম খোলেইনি। পরে খুলে দেখে আবার ড্রয়ারে রেখে দেয়। একদিন রাতে সে হঠাৎ বলেই ফেলল, ‘আম্মা, এখানে একজনকে দেখছি… divorced, একটা মেয়ে আছে। মানুষটা ভালো, strong।’ ওপাশে কিছুক্ষণ ভারী নীরবতা। তারপর মা আস্তে বললেন, ‘মানুষ যদি সত্যি ভালো হয়—তা হলে তুই হিসেব করে সিদ্ধান্ত নিস। আমার কথা পরে ভাবিস, আগে নিজেরটা ভাব। শুধু… আবার যেন ভেঙে না পড়িস।’ কথাগুলোর মধ্যে নিষেধ নেই, আবার নিঃশর্ত অনুমতিও নেই—দুয়ের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে থাকা এক ধরনের মা-সুলভ চিন্তা।
একদিক থেকে decision-এর ভার নিয়ে সে যখন ঘুরপাক খাচ্ছে, অন্যদিকে ফারহানাও নিজের ভেতরে হাজারটা প্রশ্নের সঙ্গে লড়ছে। একা থেকে, বাচ্চা সামলে, পৃথিবীর সন্দেহ আর গসিপের সঙ্গে বাঁচতে বাঁচতে কারও হাত ধরা—এটা তার জন্য খুব সহজ কোনো কাজ না। একদিন রান্নাঘরে ভাত বসিয়ে সে হালকা গলায় বলেছিল, ‘আমার জগতে তুমি ঢুকতে চাইলে, বুঝে ঢুকতে হবে। আমি আর কোনো ফেলে যাওয়া মানুষ না চাই।’ সজীব শুধু বলেছিল, ‘আমি যদি safe option চাইতাম, অনেক আগেই safe route নিতাম। আমি তোমাদের—তোমাকে আর বাচ্চাকে মাথায় নিয়েই হিসেব করছি।’

এরপর এলো ফারহানার মা’র প্রসঙ্গ। তিনি জ্যামাইকার দিকে একটা পুরনো অ্যাপার্টমেন্টে থাকেন; ফারহানার তালাকের পরে এসে মেয়ের পাশে দাঁড়িয়েছেন। বছরের পর বছর গ্রামে, ছোট শহরে থেকে জীবন কাটিয়ে, হঠাৎ নিউ ইয়র্কের ঝড়ো বাস্তবতায় এসে তিনি খুব দ্রুত শিখেছেন—এখানে মানুষকে বুঝতে হয় অন্যভাবে। তিনি সজীব সম্পর্কে অনেক কিছু শুনেছেন মেয়ের মুখে। একদিন সরাসরি বললেন, ‘ডেকে আনো। দেখতে চাই।’

সজীব সেদিন বাসে চেপে জ্যামাইকার পথে যাচ্ছিল, হাতের তালু ঘামে ভিজে। সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে মনে হচ্ছিল—এই দরজার ওপারে যা আছে, সেটা শুধু একটা ছোট ঘর না, এই সম্পর্কের উপর বড় একটা final stamp। ফারহানা দরজা খুলে ভেতরে নিল। লিভিং রুমে পাতলা কার্পেট, টেবিলে ওষুধের বোতল, কোরআন শরিফ খোলা, পাশে ছোট side-table-এ চশমা ও পানির গ্লাস। ফারহানার মা চেয়ারে বসে আছেন। গায়ে শাল, চোখে ক্লান্তি, দৃষ্টিতে পরীক্ষা।

সজীব কাছে গিয়ে সালাম করল। তিনি হালকা মাথা নাড়িয়ে বললেন, ‘বোসো বাবা।’ কয়েক মুহূর্ত কেউ কোনো কথা বলল না। টিভির হালকা শব্দ, রান্নাঘর থেকে আসা চায়ের গন্ধ, আর দেয়ালের ঘড়ির টিকটিক। একটু পর তিনি জানালা পেরিয়ে অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে আস্তে বললেন, ‘আমার মেয়ে অনেক কিছু সহ্য করেছে। বিয়ের পরে কত কিছু বদলেছে, তুই তো জানিসই। আজকে নতুন করে কারও ওপর ভরসা করার আগে আমি ভাবি—ও আর ভেঙে পড়লে আমি সামলাব কীভাবে?’
সজীব মাথা নিচু করে বলল, ‘আমি guarantee দিতে পারব না আন্টি, কিন্তু আমি পালাব না—এটা বলতে পারি।’
তিনি একটু থামলেন, তারপর সরাসরি জিজ্ঞেস করলেন, ‘মানুষ কথা বলবে। বলবে, divorced মেয়েকে আবার কেন বিয়ে করল, বাচ্চাও আছে, নিজের ফ্যামিলি কী বলবে। এসব কথা শুনে তুই কী করবি?’
সজীব একটু সময় নিয়ে বলল, ‘শুরুর দিকে ভাবতাম, মানুষ কী বলবে সেটা খুব important। এখন বুঝি—মানুষ একদিন বলে, পরদিন ভুলেও যায়। যে মানুষগুলোকে সত্যিই carry করতে হয়—তারা আমার ঘরের ভেতরের তিনজন। বাকিরা background noise।’

ফারহানার মায়ের ঠোঁট কেঁপে সামান্য হাসির মতো একটা রেখা তৈরি হলো।
‘কথা ভালো বলিস,’ তিনি বললেন, ‘কাজে দেখব।’
সেদিন বেরোনোর সময় দরজার কাছে এসে তিনি শুধু এতটুকু বলেছিলেন, ‘ফারহানার ভিতরে অনেক জমে থাকা কথা আছে। steady জায়গা পেলে ও steady হয়ে থাকবে। তুই জায়গা দিতে পারিস কিনা, দেখা যাক।’ এই কয়েকটা শব্দ দুর্বল আশীর্বাদ নয়, বরং খোলা দরজার মতোন—দুজনের আগপিছ ভেবে নেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
এরপরের ধাপটা খুব loud না। কিছুদিনের মধ্যে ছোট একটা নিকাহ ঠিক হলো। জাঁকজমক কিছুই নেই। কুইন্সের এক মসজিদের ছোট হলঘরে অল্প কিছু চেনা লোক, দুইটা প্লাস্টিকের টেবিল, কিছু চেয়ার। ইমাম কোরআনের আয়াত পড়ে, দুজনের নাম ধরে দোয়া করলেন। মাহিরা নতুন জামা পরে এদিক-ওদিক ঘুরছে, মাঝে মাঝে সজীবের হাত ধরে টেনে দেখে নিচ্ছে—‘এখন তুমি আমাদের team-এর?’ কাগজে সই করার সময় সজীবের হাত মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠল। তার মনে হচ্ছিল, অনেক বছর ধরে suspended থাকা একটা সম্পর্ক অবশেষে vocabulary পেয়েছে।

বিয়ের পর তিনজন মিলে কুইন্সেরই একটু ভালো জায়গায় দুই বেডরুমের ফ্ল্যাট নিল। খুব বড় কিছু না, কিন্তু বেসমেন্টের চেয়ে আকাশটা এখানে বেশি দেখা যায়। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকলে দূরে ৭ ট্রেনের শব্দ ভেসে আসে, মাঝে মাঝে গাড়ির হর্ন, আর নিচের খেলাধুলার মাঠে ছেলেমেয়েদের চিৎকার শোনা যায়। কার্টন খুলে ঘর গোছানোর সময় মাহিরা হাতে রঙিন পেন্সিল নিয়ে হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, ‘এই বাসাটা কি আমাদের সব সময়ের জন্য থাকবে?’ ফারহানা এক মুহূর্ত থেমে গেল, উত্তর খুঁজে না পেয়ে জানালার দিকে তাকাল। সজীব মেঝেতে বসে প্লেট সাজাতে সাজাতে তার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘যতদিন পারব, এখানে থাকব। তুই এখানে বড় হবি, পড়বি, রাগ করবি, আবার চুপ করে কাছে এসে ঘুমাবি। আমরা দুজনও থাকব।’ মাহিরা বলল, ‘প্রমিস?’ সজীব ছোট করে মাথা নেড়ে বলল, ‘প্রমিস।’

এরপরের জীবনটা বাইরে থেকে দেখলে খুব সাধারণ—অফিস, দোকান, স্কুল, রান্না, ভাড়া, বিল, লন্ড্রি, গ্রোসারি, occasional doctor visit, parent–teacher meeting, community event। সকালবেলায় সজীব এজেন্সিতে যায়; কেউ টিকেট ক্যান্সেল করতে চায়, কেউ ডেট চেঞ্জ, কেউ স্পেশাল ‘রোম–ঢাকা–চট্টগ্রাম’ combo দেখতে চায়। মাঝে মাঝে কোনো যাত্রী গলা উঁচু করে, তাকে বোঝাতে হয়—‘রিফান্ড পুরোটা পসিবল না।’ মাথার মধ্যে সবসময় কিছু না কিছু হিসেব—rent, utility, business slow season, tax। ফারহানা মাঝে মাঝে দোকানে কাজ করে, কখনো অন্য ছোটখাটো job, আবার বাচ্চার homework, স্কুলের ইভেন্ট, মায়ের ওষুধ, নিজের ক্লান্তি—সব একসঙ্গে সামলায়। রাত হলে সবাই ফাঁকফোকর গুছিয়ে একসাথে table-এ বসে খায়।

ফোনের ওপারে রাজশাহীর ঘর এখনো সেইরকমই। মা মাঝে মাঝে বলে, ‘তোর গলায় আগের মতো অস্থিরতা আর শোনা যায় না। মেয়ের গলার আওয়াজও nice লাগল।’ সজীব তখন বুঝতে পারে—নিউ ইয়র্কে তার এই ছোট্ট ঘরে এখন আর শুধু তার নিঃশ্বাসের শব্দ নেই, আরও দুটো নিঃশ্বাস এসে মিলেছে। কাগজপত্র, কাজের চাপ, টেনশন সব আছে, তবু একটা নরম জায়গা আছে, যেখানে ফেরার মতো একটা দরজা আছে।

কমিউনিটির পরোক্ষ কথাবার্তাও মাঝে মাঝে কানে আসে। কেউ ভাবে, ‘divorced মেয়েকে বিয়ে করে বাচ্চার দায়িত্ব নিয়েছে—ছেলেটা একটু আলাদা।’ আবার কেউ ছোট গলায় বলে, ‘ও তো আগে ট্যাক্সি চালাত, এখন নাকি বিজনেসম্যান।’ এইসব চালচিত্রের কিছু সজীবের কানে আসে, কিছু আসে ফারহানার কানে, বেশির ভাগই দুজনই ইচ্ছে করে ইগনোর করে। তাদের কাছে রিয়েল কথাটা হচ্ছে—মাহিরার report card কেমন, মা’র হাঁটুর ব্যথা বাড়ল কি না, এ মাসের rent ঠিক সময়ে দেওয়া গেল কি না।

এক রাতে storm-এর পর হঠাৎ করে বিদ্যুৎ চলে গেল। ঘর অন্ধকার, হিটার বন্ধ। জানালার বাইরে হাওয়ার শব্দ, দূরে পুলিশের গাড়ির সাইরেন। মাহিরা একটু ভয় পেয়ে এসে সজীবের পাশে বসে পড়ল, ফারহানাও হাতড়ে মোমবাতি খুঁজছে। মোম জ্বালিয়ে ঘরের মধ্যে যখন নরম আলো ছড়িয়ে গেল, তখন সজীব আস্তে হাসল, বলল, ‘দেখো, নিউ ইয়র্ক সবসময় পারফেক্ট না। কিন্তু যতই ব্ল্যাকআউট হোক, কেউ না কেউ শেষ পর্যন্ত সুইচ অন করে।’ ফারহানা ছোট করে বলল, ‘তুমি এখন খুব বড় বড় কথা বলতে শিখেছ।’ সজীব কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, ‘বড় কথা না—এখানে টিকে থাকতে গেলে এ ধরনের কথাই ভরসা।’

রাতে বিছানায় শুয়ে ফারহানা বহুদিন পরে স্বাভাবিক গলায় বলল, ‘মানুষের কথা ভেবে জীবনে কতবার stop করেছি। এবারও ভয় পাই, কিন্তু এবার ভয়টা ভাগ হয়ে গেছে।’ সজীব পাশ ফিরে বলল, ‘ভয় ভাগ হলে অর্ধেক হয়। পুরোটাই যদি আমরা একসাথে টেনে নিতে পারি, তাহলে বাকিটা শহরের ওপর ছেড়ে দিলেও চলে।’

অনেক বছর পর কোনো এক সন্ধ্যায়, অফিস থেকে ফিরে সজীব দেখল, ডাইনিং টেবিলে কাগজ আর রঙপেন্সিল ছড়িয়ে রাখা। মাহিরা একটা ছবি এঁকেছে—তিনটা stick figure, একটাতে শাড়ি, একটাতে প্যান্ট-শার্ট, একটাতে ছোট frock। নিচে একটু বাঁকানো হাতের লেখায় লেখা, ‘আমরা।’ সে ছবিটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল। নিউ ইয়র্কের রাস্তায় যত neon sign আছে, তার কোনো একটা তার কাছে সেই মুহূর্তে এতটা গুরুত্বপূর্ণ নয়।

এই গল্পের কোনো grand climax নেই—কেউ ফ্লাইট ধরছে না, কেউ ব্রিজ থেকে ঝাঁপ দিচ্ছে না, কেউ dramatic কিছু বলছে না। আছে শুধু ছোট ছোট দিন, দায়িত্ব, ভুল, আর তা ঠিক করে নেওয়ার চেষ্টা। সজীব, ফারহানা আর মাহিরা—তারা তিনজন মিলে নিউ ইয়র্কের ভিড়ে নিজেদের জন্য একটু জায়গা বানিয়ে নিয়েছে। সব হিসেবই মেলেনি, সব ভয়ও কাটেনি।

একদিন রাতে ফারহানা পাত্র ধোয়া থামিয়ে আস্তে বলল,
‘একটা কথা বলব?’
সজীব তাকাতেই তার মুখে এক অদ্ভুত আলো—সঙ্কোচ, শান্তি আর লুকোনো আনন্দ।
‘আমরা… হয়তো চারজন হতে যাচ্ছি।’
কথাটা খুব বড় কিছু নয়, তবুও যেন ঘরের বাতাস একটু উষ্ণ হয়ে উঠল—যেন ordinary দিনের ভেতরেও হঠাৎ করে আশা ঢুকে যায়।
  বিষয়:   নিউ ইয়র্ক  বৃষ্টি  ছোটগল্প  গল্প  প্রেমের গল্প  নভেদ আহমেদ 


Loading...
Loading...
সাহিত্য- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: