আঁধার কাটিয়ে আলোর দিশারি মর্জিনা আহমেদ

নিবেদিতা দাস

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতা অনেকের জীবনে থামার সংকেত হয়ে আসে কিন্তু মর্জিনা আহমেদের জীবনে এটি হয়ে উঠেছে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি। নিজে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হয়েও

2026-01-14T05:25:11+00:00
2026-01-14T05:25:11+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
আঁধার কাটিয়ে আলোর দিশারি মর্জিনা আহমেদ
চোখে না দেখলেও মানুষ দেখেন যিনি
নিবেদিতা দাস
প্রকাশ: বুধবার, ১৪ জানুয়ারি, ২০২৬, ৫:২৫ এএম 
নিজে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হয়েও আজ তিনি অসংখ্য দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুর জন্য আশার নাম। ছবি : সময়ের আলো
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতা অনেকের জীবনে থামার সংকেত হয়ে আসে কিন্তু মর্জিনা আহমেদের জীবনে এটি হয়ে উঠেছে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি। নিজে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হয়েও আজ তিনি অসংখ্য দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুর জন্য আশার নাম। তার হাত ধরেই বইয়ের আলোয় আলোকিত হচ্ছে এমন সব শিশু, যাদের জন্য শিক্ষা এখনও স্বপ্নের মতো। মর্জিনা আহমেদ বলেন, চোখে না দেখলেও মানুষ দেখার ক্ষমতা হারায় না। শুধু দেখার ভাষাটা বদলে যায়। 

শৈশব থেকেই তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, দৃষ্টিশক্তি না থাকলেও শেখার আগ্রহ বা মেধার কোনো ঘাটতি থাকে না কিন্তু সমাজে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য উপযোগী শিক্ষা উপকরণের অভাব তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। সাধারণ পাঠ্যবইগুলো ব্রেইলে সহজলভ্য না হওয়ায় অনেক মেধাবী শিশু শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ে। এই বাস্তবতা থেকেই জন্ম নেয় তার স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান ডিডব্লিউএস-ডিসেবল্ড ওয়েলফেয়ার সোসাইটি (ডিডব্লিউএস)।

ডিডব্লিউএস মূলত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য ব্রেইল বই ও সহায়ক শিক্ষা উপকরণ তৈরি করে। পাশাপাশি দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতেও কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। মর্জিনা আহমেদের ভাষায়- শিক্ষা কোনো দয়ার বিষয় নয়, এটি মানুষের মৌলিক অধিকার। আমি শুধু সেই অধিকার নিশ্চিত করতে চাই।

ডিসেবল্ড ওয়েলফেয়ার সোসাইটি একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা, যা ২০০৪ সালে মর্জিনা আহমেদের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাতা। শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না। তিনি জানান, পরিবার, বন্ধু ও ঘনিষ্ঠ পরিচিতজনরা পাশে না দাঁড়ালে এই পথচলা সম্ভব হতো না। পরিবার আমাকে মানসিক শক্তি জুগিয়েছে, বন্ধুরা দিয়েছে সাহস ও আত্মবিশ্বাস, আর পরিচিতজনদের সহযোগিতায় ধীরে ধীরে গড়ে ওঠেছে এই প্রতিষ্ঠান।

ডিডব্লিউএস সুবিধাবঞ্চিত এবং দুস্থ প্রতিবন্ধী মানুষের সমান অধিকার এবং জাতীয় উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে তাদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর জন্য কার্যক্রম পরিচালনা করছে, যার মধ্যে রয়েছে সক্ষমতা বৃদ্ধিমূলক প্রশিক্ষণ, সমর্থন ও সচেতনতা বৃদ্ধি। 

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হয়েও একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা যে কতটা কঠিন- তা অকপটে স্বীকার করেন মর্জিনা আহমেদ। সমাজের অবহেলা, মানুষের অবিশ্বাস এবং আর্থিক সংকট প্রতিনিয়তই বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকেই বিশ্বাস করতে চাননি, একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী নারী বই তৈরি করতে পারেন কিংবা একটি সংগঠন দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করতে পারেন। তবে তিনি মনে করেন, অক্ষমতা শরীরে নয়, অক্ষমতা বাস করে মানুষের মনে। 

এই দীর্ঘ পথচলায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল অর্থায়ন। বিভিন্ন সময়ে বন্ধুবান্ধব ও স্বেচ্ছাসেবীরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী পাশে দাঁড়িয়েছেন। করপোরেট পর্যায়ে এইচএসবিসি ডিডব্লিউএসের কার্যক্রমে ফান্ডিংয়ের মাধ্যমে সহযোগিতা করেছে, যা ব্রেইল বই প্রকাশ ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। 

মর্জিনা আহমেদ ২০১৬-২০১৭ সালে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) সঙ্গে যুক্ত হন। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য পাঠ্যবই ও শিক্ষা উপকরণ তৈরিতে তার ভূমিকা অনন্য। ডিডব্লিউএসের মাধ্যমে তৈরি বইগুলো শুধু পাঠ্যবই নয় বরং আত্মবিশ্বাস তৈরির হাতিয়ার। গল্প, ছড়া ও নৈতিক শিক্ষায় ভরপুর এসব ব্রেইল বই শিশুরা আনন্দের সঙ্গে শিখতে পারে। 

নারী হিসেবে তার পথচলা ছিল আরও কঠিন। প্রতিবন্ধকতা, নারী পরিচয় এবং অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা- এই তিনটি বাস্তবতাকে একসঙ্গে মোকাবিলা করতে হয়েছে তাকে। তবুও তিনি কখনো হাল ছাড়েননি। নিজের অভিজ্ঞতাকেই শক্তিতে রূপান্তর করেছেন। তার মতে- একজন নারী যখন নিজের পায়ে দাঁড়াতে শেখে, তখন সে শুধু নিজের জীবন নয়, আশপাশের অনেক জীবনও বদলে দিতে পারে। 

শুধু বই তৈরি নয়, ডিডব্লিউএস নিয়মিতভাবে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য পাঠচক্র, অভিভাবক সচেতনতা কর্মশালা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও প্রতিযোগিতামূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। পাশাপাশি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য টেইলারিং প্রশিক্ষণ এবং বাক ও শ্রবণপ্রতিবন্ধীদের জন্য আইসিটি ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থাও করেন। দরিদ্র শিশুদের পড়াশোনার খরচ বহনে সহায়তা ও শিক্ষা উপকরণ বিতরণও প্রতিষ্ঠানটির নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ। 

মর্জিনা আহমেদ বলেন, সবচেয়ে বড় সমস্যা এখনও ফান্ডিং। তবে তিনি থেমে থাকতে রাজি নন। তার স্বপ্ন- দেশের প্রতিটি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিশু যেন শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত না হয়। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে আরও সহযোগিতা পেলে ডিডব্লিউএসের কার্যক্রম দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার ইচ্ছা তার। তিনি বিশ্বাস করেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থাই পারে একটি মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে। 

আজ মর্জিনা আহমেদ শুধু একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী নারী নন, তিনি অনুপ্রেরণার প্রতীক। তার জীবন বলে দেয়Ñ শারীরিক সীমাবদ্ধতা কখনো মানুষের স্বপ্নকে সীমাবদ্ধ করতে পারে না। সাহস, অধ্যবসায় আর মানবিকতার সমন্বয়েই বদলে যায় অনেক জীবন। মর্জিনা আহমেদের মতো নারীরাই প্রমাণ করেন, সত্যিকারের শক্তি চোখে নয়- হৃদয়ে। 

সময়ের আলো/এনএ 

  বিষয়:   আঁধার কাটিয়ে  আলোর দিশারি  মর্জিনা আহমেদ  চোখ  মানুষ 


Loading...
Loading...
- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: