বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় নারীরা বরাবরই পিছিয়ে। রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দেওয়ার দৃশ্যে নারীদের উপস্থিতি পুরুষের চেয়ে বেশি থাকে। কিন্তু ভোটার তালিকায় নারীরা পুরুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চললেও, রাজনীতির মঞ্চে আসন পাওয়ার লড়াইয়ে তারা এখনও অসম অবস্থানে রয়েছে। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫১ শতাংশ নারী, সেই অনুপাতে নারী ভোটারের সংখ্যাও বেশি। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, এত ভোটার থাকা সত্ত্বেও কেন সংসদ, স্থানীয় সরকার বা রাজনৈতিক নেতৃত্বে নারীর সংখ্যা এত কম?
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী- বাংলাদেশে বর্তমানে মোট ভোটার ১২ কোটি ৬৩ লাখ ৭ হাজার ৫০৪ জন। এর মধ্যে নারী ভোটারের সংখ্যা ৬ কোটি ২২ লাখ ৫ হাজার ৮১৯ জন। অর্থাৎ মোট ভোটারের প্রায় ৪৯.৩ শতাংশই নারী। অন্যদিকে পুরুষ ভোটার ৫০.৭ শতাংশ। সংখ্যার এই সমানে-সমান অবস্থান প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশীদার নির্বাচনে নারীরা কোনোভাবেই পিছিয়ে নেই। ভোটার হিসেবে প্রায় অর্ধেক নারী হলেও, দেশের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ এখনও অন্ধকারে।
স্থপতি ইসরাত জাহান মনে করেন, নারী ভোটার সংখ্যা বেশি হলেও নারী প্রতিনিধি কম থাকা আমাদের সমাজ ও রাজনীতিতে ভারসাম্যহীনতার ইঙ্গিত দেয়। অনেক নারী ভোটে অংশ নিলেও সামাজিক বাধা, পারিবারিক চাপ, আর্থিক সীমাবদ্ধতা ও রাজনৈতিক সুযোগের অভাবে নেতৃত্বের জায়গায় পৌঁছাতে পারেন না। দলীয় মনোনয়নে সমতা, সচেতনতা বৃদ্ধি ও নিরাপদ রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। নারীর অংশগ্রহণ বাড়লে সিদ্ধান্ত গ্রহণ আরও বাস্তবমুখী, সমতাভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে।
সমাজকর্মী ও স্বপ্নতরী সংগঠনের সভাপতি কোহিনুর বেগম বলেন, নারী ভোটার বেশি কিন্তু নারী প্রতিনিধি কম- এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীর ক্ষমতায়নে বড় বৈপরীত্য। আমার দৃষ্টিতে এটি ইতিবাচক রাজনৈতিক সচেতনতা ও কাঠামোগত দুর্বলতা দুটিই। ইতিবাচক হিসেবে বলতে পারি, নারী ভোটারদের সংখ্যাধিক্য প্রমাণ করে যে নারীরা নিজেদের ভোটাধিকার সম্পর্কে সচেতন এবং রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে ইচ্ছুক।
আর নেতিবাচক দিক হলো- রাজনৈতিক দলগুলোতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীর অংশগ্রহণ এখনও কম। দলের মনোনয়ন পাওয়া, অর্থায়ন এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে যোগ্য নারী প্রার্থীরা অনেক সময় মূল ধারার রাজনীতি থেকে দূরে থাকেন বা মনোনয়ন পান না। এ ক্ষেত্রে আমি মনে করি, শুধু সংরক্ষিত আসন বা কোটা নয়, সরাসরি আসনে দলীয় মনোনয়নের ক্ষেত্রে নারীদের আরও গুরুত্ব দিতে হবে। মূলত ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকে নেতৃত্ব পর্যায়ে নারীদের উত্তরণ ঘটাতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোকে জেন্ডার সংবেদনশীল হতে হবে এবং দলের ভেতরে সমতা নিশ্চিত করতে হবে, যা বিভিন্ন গবেষণাতেও উঠে এসেছে।
স্কুলশিক্ষক সালিমা নাসরিন বলেন, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫১ শতাংশ নারী। সেখানে নারী ভোটার নিঃসন্দেহে বেশি। নারী প্রতিনিধি এর তুলনায় কম হওয়ায় কিছুটা বিব্রতকর। নারীদের চাওয়া-পাওয়া যতটা নারীরা বুঝতে পারবে ততটা পুরুষ বুঝবে না। আপনারা খেয়াল করেন নারীদের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে ভোটপ্রাপ্তিতে।
কতটা তাদের কল্যাণে আসবে সেটা সময়ে বোঝা যাবে। আবার দেখা যাচ্ছে, কিছু কিছু রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্রেই নারী নেই, তাদের কোনো নারী প্রতিনিধি সংসদে যাবে না। তা হলে নারী নেতৃত্ব বাদ দিয়ে কীভাবে নারীর উন্নয়ন হবে? আরেকটা ব্যাপার এবার বেশ লক্ষ করা যাচ্ছে, তা হলো তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্ব। এটি একটি পরিবর্তনের আভাস। বোঝা যাচ্ছে তরুণ ভোটাররা সেদিকেই যাবে। তবে পরিতাপের বিষয় হলো আন্দোলন-সংগ্রাম প্রচারে সবার আগে নারীদের দেখবেন কিন্তু পরবর্তী সময়ে তাদের আর কোনো জায়গায় রাখা হয় না।
গাইনি ও প্রসূতি বিশেষজ্ঞ ডা. বিলকিস বেগম চৌধুরীর মতে, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারী কম থাকায় নারীদের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বিষয়গুলো যথাযথ গুরুত্ব পায় না। তিনি মনে করেন, মাতৃত্বকালীন স্বাস্থ্য, মানসিক স্বাস্থ্য বা কর্মজীবী নারীর স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় নারী প্রতিনিধির অভাব স্পষ্টভাবে অনুভূত হয়। তার অভিজ্ঞতায়, মাঠপর্যায়ের সমস্যাগুলো বোঝার জন্য নীতিনির্ধারণী টেবিলে নারীর উপস্থিতি জরুরি।
জনতা ব্যাংকের কর্মকর্তা উম্মে রোকসানা বলেন, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক ক্ষমতার মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক আছে। রাজনীতিতে আসতে হলে সময়, টাকা আর নেটওয়ার্ক দরকার। অনেক নারীই পরিবার ও কর্মস্থলের দ্বৈত চাপে সেই জায়গায় পৌঁছাতে পারেন না। তার মতে, রাজনৈতিক দলগুলো যদি আর্থিক সহায়তা ও প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ায়, তা হলে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়তে পারে।
সহকারী অধ্যাপক আমেনা আক্তার লিপি বলেন, সমস্যাটি শুধু সংখ্যার নয়, মানসিকতারও। আমরা এখনও নেতৃত্বকে পুরুষের জায়গা হিসেবে দেখি। নারীকে আন্দোলন, প্রচার বা ভোটের মাঠে দেখা যায় কিন্তু সিদ্ধান্তের জায়গায় নয়। তিনি বলেন, শিক্ষিত তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই মানসিকতা কিছুটা বদলাচ্ছে, যা ভবিষ্যতের জন্য আশাব্যঞ্জক।
সমাজকর্মী জেবুন্নেসা চৌধুরী বলেন, আন্দোলন-সংগ্রামে নারীরা সামনে থাকে কিন্তু পরে তাদের আর দেখা যায় না। শুধু সংরক্ষিত আসন নয়, সরাসরি নির্বাচনে নারীদের জন্য নিরাপদ ও সম্মানজনক পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। এই প্রেক্ষাপটে তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্ব নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেক তরুণ ভোটার পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন। তারা নারীর নেতৃত্বকে শুধু প্রতীকী নয়, কার্যকর দেখতে চান। এটি একটি ভালো ইঙ্গিত হলেও বাস্তব পরিবর্তনের জন্য দলীয় সিদ্ধান্তই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
নারী ভোটার বেশি কিন্তু নারী প্রতিনিধি কম- এই বাস্তবতা বদলাতে হলে কয়েকটি বিষয় একসঙ্গে এগোতে হবে। দলীয় মনোনয়নে নারীদের জন্য সমান সুযোগ, রাজনৈতিক সহিংসতা ও হয়রানি বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক ও প্রশিক্ষণ সহায়তা এবং সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি। নারীর অংশগ্রহণ বাড়লে সিদ্ধান্ত গ্রহণ হবে আরও বাস্তবমুখী, সমতাভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক। ভোটের লাইনে নয়, নেতৃত্বের টেবিলেও নারীর উপস্থিতি নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।
সময়ের আলো/কেএইচও